ইন্ডিয়া থেকে ভারত: ঔপনিবেশিক পরিচয় পুনঃসংজ্ঞায়িত করা নাকি মুছে ফেলা?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবি ব্যবহার করে গ্লোবাল ভয়েসেসের অলঙ্করণ। ফ্লিকার/ সৃজনী সাধারণ অবাণিজ্যিক একইরকম ব্যবহার ২.০ অনুমতি)

এই গল্পটি গ্লোবাল ভয়েসের নাগরিক গণমাধ্যম পর্যবেক্ষকের মুখপত্র আন্ডারটোনসের অংশ। আন্ডারটোনসের গ্রাহক হোন

আমাদের সারা বিশ্ব জুড়ে প্রকাশিত গণমাধ্যম আখ্যান সন্ধানের মুখপত্র আন্ডারটোনসে আবারো স্বাগতম। এই সপ্তাহে আমরা ইন্ডিয়া নাম পরিবর্তন করে ভারত সম্পর্কিত সাম্প্রতিক জল্পনা কভার করবো। আমি ভারতীয় লেখক ও সাংবাদিক স্নিগ্ধা বনসাল।

আমরা দক্ষিণ এশীয় দেশটির এখন পর্যন্ত সহাবস্থান করা দুটি নামের ভেতরে ঢুকে তারা কীসের প্রতিনিধিত্ব করে এবং সম্ভাব্য নাম পরিবর্তন নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের প্রভাবশালী আখ্যানগুলি দেখবো৷ এতো বছর ধরে দ্বি-ভিত্তিক ‘ইন্ডিয়া ও ‘ভারত’ সৃষ্টিকে কেউ কেউ অহিন্দু সংখ্যালঘুদের অবস্থান অবনমন বা অন্যরা ঔপনিবেশিকতা মুক্তির চর্চা হিসেবে দেখছে।

দুটি নামই জাতির ইতিহাসের অংশ। ‘ইন্ডিয়া’ গ্রিক ও পারসিক অভিযাত্রীদের কাছ থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়, যারা খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম দিকে সিন্ধু নদীর নামানুসারে নামকরণ করেছিল। অন্যদিকে প্রাচীন হিন্দু গ্রন্থে ‘ভারত’ পাওয়া যায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর গৃহীত ১৯৪৮ সালের সংবিধান দেশের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্যে উভয় নামকে স্বীকৃতি দেয়

কয়েক দশক ধরে হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ভারতকে সরকারি নাম বানানোর জন্যে চাপ দিয়েছে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আদর্শিক মূল সংগঠন আরএসএস আফগানিস্তান থেকে মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও হিমালয় জুড়ে বিস্তৃত হিন্দু আদর্শের একটি ‘অখন্ড ভারত‘ বা ‘অবিভক্ত ভারতের’ স্বপ্ন দেখে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিজেপি নেতারা প্রায়শই এই দৃষ্টিভঙ্গির পুনরাবৃত্তি করেন।

পাকিস্তানের মতো অন্যান্য দেশের নেতারা অখন্ড ভারতকে “ভারতের প্রতিবেশী দেশসহ তার নিজস্ব ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পরিচয় ও সংস্কৃতিকেও অধস্তন করতে চাওয়া একটি সংশোধনবাদী ও সম্প্রসারণবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ” বলে আখ্যা দিয়েছে

বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতকে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের পছন্দের আখ্যান বেড়েছে। তবে এই বছরের সেপ্টেম্বরে ভারত আয়োজিত জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে বিদেশী নেতাসহ ১৭০ জন অতিথির কাছে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর একটি আনুষ্ঠানিক নৈশভোজের আমন্ত্রণ পাঠানো হলে সাম্প্রতিক বিতর্কটি শুরু হয়। চিঠিতে মুর্মুকে “ভারতের রাষ্ট্রপতি” হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ভারতকে “ভারত” বলতে কোন সাংবিধানিক আপত্তি না থাকলেও আমি আশা করি সরকার দেশের দুটি সরকারি নামের একটি শত শত বছর ধরে গড়ে ওঠা অগণ্য ব্র্যান্ড মূল্যের “ইন্ডিয়া”-কে পুরোপুরি বাতিল করার মতো অতোটা বোকা না। আমাদের উচিত…

বিজেপি নেতৃবৃন্দ ও সরকার সমর্থকদের দাবি ইন্ডিয়া ব্রিটিশদের দেওয়া একটি নাম বলে ইন্ডিয়ার নাম ভারতে পরিবর্তন করা হবে ঔপনিবেশিকতা মুক্তির একটি চর্চা। এই দাবি ইতিহাসবিদরা খণ্ডন করেছে

বিরোধী দলগুলি অভিযোগ করেছে বিজেপি ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে “ভারতীয় জাতীয় উন্নয়ন অন্তর্ভূক্তি জোট” (ইন্ডিয়া) নামের ২৬টি বিরোধী দলের জোটকে ধ্বংস করতে এই নাম পরিবর্তন করতে চায়। সমালোচকদের আরো দাবি সরকার দুর্নীতি, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি থেকে মনোযোগ সরাতে বিতর্কটি ব্যবহার করছে। কিছু হিসেব মতে এই নাম পরিবর্তনটি ১৪ হাজার কোটি রুপির (প্রায় ১৮,৫০০ কোটি টাকা) একটি ব্যয়বহুল রিব্র্যান্ড নির্দেশ করে।


বর্ণনা: “ইন্ডিয়া নাম বদলে ভারত করা ঔপনিবেশিকতা মুক্তির দিকে একটি পদক্ষেপ

শ্রীলঙ্কা ও এস্বাতিনির মতো অন্যান্য দেশ তাদের ঔপনিবেশিক যুগের নাম পরিবর্তনের পদ্ধতি অনুসরণ ‘ভারত’-এর পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী আখ্যান। এছাড়াও এই আখ্যানটি বিজেপির দেশকে তার ঔপনিবেশিক ঘোর থেকে মুক্তির অভিযানের সাথে খাপ খায়।

ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি ভারতকে ঔপনিবেশিকতামুক্ত করার নামে বিভিন্ন শহর, ল্যান্ডমার্ক ও আইনের নাম পরিবর্তন করেছে। হ্যাভলক দ্বীপ স্বরাজ দ্বীপে এবং রাজার পথ নামে পরিচিত নতুন দিল্লির একটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক কর্তব্য পথে পরিবর্তিত হয়েছে।

ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে কম জানা কারো কাছে ঔপনিবেশিকতা মুক্তির প্রচেষ্টা একটি স্বাগত পদক্ষেপ বলে মনে হলেও ভারতীয় কট্টর ডানপন্থীদের হিসেবে দেশটিতে ব্রিটিশরা প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করেনি, বরং মুসলমান “হানাদাররা” এসেছে শত শত বছর আগে।

বিজেপির ঔপনিবেশিকতা মুক্তির কথাতে ভারতের সমৃদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ বুননের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠা মুঘল ইতিহাস মুছে ফেলার কথাও রয়েছে। মুসলমান ভাবধারার শহরের নামগুলি হিন্দু নামে যেমন এলাহাবাদকে প্রয়াগরাজে পরিবর্তন করা এবং পাঠ্যপুস্তক থেকে মুঘল ইতিহাস মুছে ফেলা হয়েছে। সরকারের মদদ থাকায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ক্রমেই ঘনীভূত হয়ে ওঠার সময়ে এই পরিবর্তনগুলি শক্তিশালী হচ্ছে।

এই মুছে ফেলা বিজেপির হিন্দুপন্থী আখ্যানের সাথে মিলিত হয়ে সমালোচকদের সরকারের ভারতীয় ইতিহাস পুনর্লিখনের চেষ্টার অভিযোগকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

জাতীয় আলোচনাকে স্বপক্ষে প্রভাবিত করার বিজেপি্র অভ্যাসের মতোই খেলাধুলা ও বিনোদনের বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা ঔপনিবেশিকতা মুক্তির আখ্যানকে ভাগাভাগি করেছে।

অনলাইনে এই আখ্যান যেভাবে চলছে

প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেট খেলোয়াড় বীরেন্দ্র শেবাগ বিজেপি আখ্যানের সমর্থক হিসেবে পরিচিত।

এই টুইটটিতে তার নিজের টুইটের জবাবে তিনি “ইন্ড_বনাম_পাক” এর পরিবর্তে “ভা_বনাম_পাক” হিসেবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ক্রিকেট ম্যাচ হ্যাশট্যাগ করেছেন।

তিনি ইন্ডিয়া ব্রিটিশদের দেওয়া একটি নাম দাবি করে আসন্ন ক্রিকেট বিশ্বকাপে ভারতীয় ক্রিকেট কর্তৃপক্ষকে খেলোয়াড়দের জার্সিতে দেশের নাম পরিবর্তন করে ভারত করার অনুরোধ করেন। ক্রিকেটও একটি ঔপনিবেশিক খেলা উল্লেখ করায় তিনি টুইটার ব্যবহারকারীদের দ্বারা ট্রোলের শিকার হন।

এই আইটেমটি নামের উৎস ভুলভাবে উল্লেখ করে ভুল তথ্য ছড়িয়ে আমাদের নাগরিক স্কোর কার্ডে -৩-এর মধ্যে -১ নেতিবাচক স্কোর পায়। এটি বিশেষ করে ক্রীড়া অনুরাগীদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগকেও জাগ্রত করে।


আখ্যান: “বিজেপির হিন্দুত্ব এজেন্ডা ‘অন্যান্য’ সংখ্যালঘুদের খুঁজছে

ভারত ধর্মীয় অর্থদ্যোতনাসহ একটি সংস্কৃতজাত শব্দ বলে অনেক ভারতীয়ের কাছে ইন্ডিয়া দেশের ধর্মনিরপেক্ষ, বহুসাংস্কৃতিক প্রকৃতিকে ধারণকারী একটি বিস্তৃত শব্দ। তাদের আশঙ্কা ইন্ডিয়া বাদ দিয়ে ভারত বেছে নেওয়া হলে তা হিন্দুদেরকে দেশের একমাত্র ন্যায্য নাগরিক বিবেচনা করে সংখ্যালঘুদের আরো বিচ্ছিন্ন করে দেবে।

ভারত ২২টি সরকারি ভাষা ও বিশ্বের প্রতিটি প্রধান ধর্মসহ একটি বহুজাতিক দেশ হলেও অ-হিন্দুদের “অন্যান্য” করা ভারতের কট্টর-ডান দৃষ্টিভঙ্গিতে অখন্ড ভারত ও একটি জাতি-ধর্মীয় রাষ্ট্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ।

এই দৃষ্টিভঙ্গি বিজেপির দাবিতে দেশের ন্যায্য নাগরিক ও মুসলমান, খ্রিস্টান, অ-ব্রাহ্মণ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, সরকারের সমালোচক ইত্যাদির মতো এই দৃষ্টিভঙ্গির ভাগীদার নয় তাদের মধ্যে একটি পার্থক্য তৈরি করে। সরকারের অসহিষ্ণুতার সমালোচনাকারীদের ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তাদের অনেকের বিচার করা হচ্ছে

জাতীয়তাবাদী হিন্দুদের ভারতের সাথে এবং সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ইন্ডিয়ার সাথে যুক্ত করে এই ‘অন্য’ করার চর্চাটি সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানানোর চেষ্টা করবে।

অনলাইনে এই আখ্যান যেভাবে চলছে

এটি বিজেপি সরকারের সাথে ভিন্নমত পোষণের জন্যে পরিচিত ও হিন্দিভাষীদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় সাংবাদিক রবিশ কুমারের অনুরাগী একটি অ্যাকাউন্টের একটি টুইট৷

টুইটটি অনুসারে যারা হিন্দু ও মুসলমানদের পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে তারা এখন একইভাবে ‘ইন্ডিয়া’ ও ‘ভারত’ নামগুলিকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এই টুইটের সাবটেক্সটটি সরকারের দেশকে আরো বিভক্তের চেষ্টার প্রতি সমালোচনা।

বিজেপির বিরুদ্ধে অন্য যেকোনো টুইটের মতো এটিও মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। অনেকেই এই পোস্টের সাথে একমত পোষণ করে বলেছে মোদি “জুমলাস” বা “চাঞ্চল্যকর অঙ্গীকার” করতে পছন্দ করেন। কয়েকটি মন্তব্য টুইটটিকে “হিন্দুভীতি” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এই আইটেমটি সরকারের এই নামগুলি নিয়ে ধর্মীয় মতভেদ কেন্দ্রিক অশান্তি উস্কে দিয়ে দেশে অশান্তি ছড়ানোর সূক্ষ্ম প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অনুগামীদের সতর্ক করে বলে আমাদের নাগরিক সূচকে +৩-এর মধ্যে একটি ইতিবাচক স্কোর +১ পেয়েছে।


এরপরে কি

সকলের দৃষ্টি ২০২৪ সালের প্রথম দিকের আসন্ন ভারতীয় সাধারণ নির্বাচনের দিকে হলেও সরকারের এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে পুনঃসংজ্ঞায়িত না করা সত্ত্বেও বিজেপি নেতৃবৃন্দ ও সমর্থকরা দেশটিকে ভারত হিসেবে উল্লেখ করে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের আগে তাদের অনুকূলে জাতীয়তাবাদী মনোভাব জাগাতে এই প্রসঙ্গটি এনেছে, বা সরকার আসলেই এটি কার্যকর করতে চায় কিনা তা দেখার বিষয়। তবে নাম পরিবর্তন না করলেও আমরা আশা করতে পারি সম্ভবত স্কুলের বই থেকে শুরু করে ‘ভারত’ সরকারি যোগাযোগে ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যবহৃত হবে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .