আজারবাইজানে দশ দিনে পাঁচ সাংবাদিক গ্রেপ্তার

আজিজ করিমভের ছবি, অনুমতিসহ ব্যবহৃত।

নভেম্বরে স্বাধীন সাংবাদিক উলভি হাসানলি ও সেভিঙ্ক ভ্যাগিফগিজি এবং প্রতিবন্ধী অধিকার কর্মী মোহাম্মাদ কেকাক্লভের গ্রেপ্তার আজারবাইজানের সাংবাদিকতা ও সুশীল সমাজ সম্প্রদায়ের মধ্যে শোকের তরঙ্গ পাঠিয়েছে। হাসানলি, ভ্যাগিফগিজি ও কেকালভকে অভিযুক্ত করা একটি সংগঠিত গোষ্ঠীর চোরাচালানের কথিত অপরাধের চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে সাক্ষী হিসেবে আরো বেশ কয়েকজন স্বাধীন সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে ডাকা হয়।

এই সাংবাদিকদের একজন নার্গিজ আবসালামোভাকে একই অভিযোগে ১ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করে তিন মাসের প্রাক-বিচার আটকাদেশ দেওয়া হয়। একটি পৃথক তদন্তে আজারবাইজানীয় কর্তৃপক্ষ অবৈধ নির্মাণের যে অভিযোগে কানাল ১৩-এর প্রতিষ্ঠাতা আজিজ ওরুজভকে আটক করা হয়েছে, শুরুতেই তিনি তা অস্বীকার করেছেন। এর ফলে মাত্র দশ দিনে গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিকের সংখ্যা দাঁড়ালো পাঁচে।

আগের মতোই অভিযান চলছে

গ্রেপ্তারের নতুন ঢেউ আগে একইধরনের দমনাভিযান দেখা অনেক আজারবাইজান পর্যবেক্ষকদের সতর্ক করেছে। ওসি মিডিয়ার সাথে একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে বাকুর একটি স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রধান আনার মোম্মাদলি ব্যাখ্যা করেছেন, “পরিস্থিতি আসলে কখনোই পরিবর্তিত হয়নি।” “এবার পার্থক্য হলো দমনাভিযানের লক্ষ্যবস্তু বিশেষ করে [চিহ্নিত] স্বাধীন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকবৃন্দ। কর্তৃপক্ষ একটি পরিষ্কার বার্তা পাঠাচ্ছে: ‘ব্যবস্থাকে ভয় করো।'”

অসংখ্য নাগরিক কর্মী ২০১৩ ও ২০১৪ সালের মধ্যে গ্রেপ্তার ও নানা ধরনের নিপীড়নে গ্রেপ্তারদের মধ্যে সাংবাদিকরা থাকলেও দমনাভিযানটি মূলত দেশের সোচ্চার নাগরিক সমাজ বিশেষজ্ঞদের লক্ষ্য করেই সংঘটিত। ওসি মিডিয়া পডকাস্টে য়ারো কথা বলা আজরবাইজানি লেখক ও চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি প্রার্থী বাহরুজ সামাদভের মতে, সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারগুলি “স্বাধীন, স্থানীয় গণমাধ্যমের সমাপ্তির” ইঙ্গিত দিচ্ছে৷

তদন্তের অপেক্ষায় থাকা হাসানলি, ভ্যাগিফগিজি ও কেকালভকে গ্রেপ্তারের পর থেকে প্রাক-বিচার আটকে সাজা দেওয়া হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের আট বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। এসব গ্রেপ্তার ছাড়াও আবজাস মিডিয়ার অফিসে পুলিশি অভিযানে কথিত ৪০,০০০ ইউরো পাওয়াকে প্রতিষ্ঠানটি  তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রমাণের জন্যে কর্তৃপক্ষের সাজানো বলে অভিযোগ করেছে৷

আবজাস মিডিয়া তার রাষ্ট্রপতি আলিয়েভের পরিবারের ব্যবসায়িক লেনদেনসহ ২০২০ সাল থেকে নাগর্নো-কারাবাখের পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় কথিত দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্যে সুপরিচিত। কর্তৃপক্ষ চারজনের বিরুদ্ধে আনা চোরাচালানের অভিযোগের কোনো প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আবজাস মিডিয়ার সাংবাদিকদের অভিযোগ, আর কোনো প্রমাণ না পাওয়া গ্রেফতারকৃত কানাল ১৩ সাংবাদিক আজিজ ওরুজভের বিরুদ্ধে অবৈধ নির্মাণের অভিযোগ করা হয়েছে।

“ব্যবস্থাকে ভয় করার” সরকারি বার্তাটি সত্য কিনা তা দেখার বিষয়। ওসি মিডিয়া পডকাস্টে স্বাধীন সাংবাদিক ইসলাম শিখালি বলেছেন, “এসব গ্রেপ্তার স্বাধীন সাংবাদিকদের থামাতে পারবে না […] এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের সবাই জানতো শেষ পর্যন্ত তাদের সাথে এটা ঘটতে পারে। লক্ষ্য হলো কাজ চালিয়ে যাওয়া।”

প্রতিহিংসা

কিছু আজারবাইজানীয় পন্ডিত বলেছেন সাংবাদিকদের উপর হামলাগুলি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে কারাবাখে সামরিক অভিযানের জন্যে আজারবাইজানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার সাথে সরাসরি জড়িত। এগুলিকে সামাদভ যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও যেকোনো পশ্চিমা সমালোচনার বিরুদ্ধে বাকুর সরকারি “স্নায়বিক” প্রতিক্রিয়া বলে উল্লেখ করেছেন।

আগেকার টুইটার এক্সে টুইটের একটি ধারাবাহিকে ইউএসএইডের প্রধান সামান্থা পাওয়ার ভাগাভাগি করেছেন:

দুই মাস আগে নাগর্নো-কারাবাখে আজারবাইজানের সামরিক অভিযানে এক লক্ষেরও বেশি লোক বাড়িঘর ছেড়ে প্রতিবেশী আর্মেনিয়ায় চলে যেতে বাধ্য হয়। যুক্তরাষ্ট্র নাগর্নো-কারাবাখের জাতিগত আর্মেনীয়দের পাশে রয়েছে। (১/৪)

সরকারিভাবে বাকু প্রতিক্রিয়া জানায়। একটি দীর্ঘ টুইটে রাষ্ট্রপতির সহকারী হিকমেত হাজিয়েভ লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকায় আজারবাইজানের ভূমি দীর্ঘ ৩০ বছর আগ্রাসী আর্মেনিয়ার দখলে থাকার সময় আরো লক্ষাধিক আজারবাইজানি কুখ্যাত ও রক্তাক্ত জাতিগত নির্মূলের শিকার হয়। আজকাল একই নীতি একইরূপে প্রকাশ অব্যাহত রয়েছে।”

ক্ষমতাশালী বাস্তুচ্যুত জনগণকে আরো আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলে হাজিয়েভ তার সমালোচনা চালিয়ে গিয়ে “আজারবাইজানীয় শরণার্থী ও আইডিপিদের [অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি] দুর্দশার বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে তার সময়কালে ক্ষমতাশালী আর্মেনিয়ার দখলের নিন্দা তো দূরে থাক নীরব থাকার জন্যে ক্ষমতাশালীকে অভিযুক্ত করেছেন।” তার শেষ কথা হলো আজারবাইজানে ইউএসএইডের কোনো স্থান নেই।

“নাগর্নো-কারাবাখের ভবিষ্যত” শিরোনামে ১৫ নভেম্বরে পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির শুনানির সময় মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস ও'ব্রায়েন প্রকাশ করেন ১৯ সেপ্টেম্বর সামরিক হস্তক্ষেপের পূর্বাপর “ঘটনা নথিবদ্ধ করার” জন্যে যুক্তরাষ্ট্র “স্বাধীন তদন্তকারীদের নিযুক্ত” করেছে। তিনি আরো বলেন তার দেশ বাকু সরকারকে “প্রত্যাবর্তনে ইচ্ছুক নাগর্নো-কারাবাখের আর্মেনীয়দের তাদের বাড়িতে ফিরে বা এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক স্থানগুলিতে যাওয়ার সুবিধা” প্রদানের আহ্বান অব্যহত রেখে আজারবাইজানের সাথে উচ্চ-স্তরের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও সম্পৃক্ততাও বাতিল করেছে।

ও'ব্রায়েনের বিবৃতিটি খাপ খায়নি বলে আজারবাইজান ২০ নভেম্বর নির্ধারিত আর্মেনিয়ার সাথে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বৈঠক থেকে তার পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়

এদিকে ২০ নভেম্বর মোহাম্মদ কেকালভ নিখোঁজ এবং উলভি হাসানলিকে ২১ নভেম্বর ও সেভিঙ্ক ভ্যাগিফগিজিকে ২২ নভেম্বর আটক করা হয়। এক সপ্তাহ পরে কর্তৃপক্ষ আজিজ ওরুজেভ ও নার্গিজ আবসালামোভাকে গ্রেপ্তার করে।

বছরব্যাপী ডাইনি শিকার

এবছর আজারবাইজান গ্রেপ্তারগুলি ছাড়াও জুলাই মাসে বরেণ্য রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক কর্মী গুবাদ ইবাদোগলুকে গ্রেপ্তার করে:

গতকাল (২৩ জুলাই) বাকুতে আজারবাইজানীয় শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদ গুবাদ ইবাদোগলুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ তার স্ত্রীকে মারধর করেছে।

ইবাদোগলুর বিরুদ্ধে একটি সংগঠিত গোষ্ঠী থেকে জাল টাকা অর্জন বা বিক্রির বানোয়াট অভিযোগ করা হয়েছে।

বেশ কিছু নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মী প্রশাসনিক আটকের শিকার হয়েছে। সক্রিয় কর্মীরা রাষ্ট্রীয় নীতি বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করার পরে প্রায়শই এই ধরনের আটকগুলি করা হয়। স্বাধীন অনলাইন সংবাদ মঞ্চ মাইক্রোস্কোপ মিডিয়া অনুসারে, এই গ্রীষ্মে – জুন থেকে আগস্টের মধ্যে – অন্তত সাতজন প্রশাসনিক ও ছয়জন প্রাক-বিচার আটকে দন্ডিত এবং তিনজন সাংবাদিক হয়রানি ও কাজে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। গ্রামটিতে সোনা আহরণের ফলে পরিবেশগত ক্ষতির প্রতিবাদ করলে পুলিশ সোয়ুডলুর বাসিন্দাদের উপর অসামাঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি ও সহিংসতা ব্যবহার করে।

রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত গ্রেপ্তার নথিভুক্তির একটি স্বাধীন স্থানীয় গোষ্ঠী সংকলিত সাম্প্রতিক প্রকাশিত তালিকা অনুসারে আজারবাইজানে সাম্প্রতিক এই আটকগুলিতে রাজনৈতিক বন্দীর সংখ্যা ২৫৪-তে উন্নীত হয়েছে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .