বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

লিঙ্গ পরিবর্তিত নারীর চিকিৎসা গ্রহণ বিড়ম্বনার কাহিনী

লেখকের ছবি, অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত

জুলাই মাসের একদিন খুব সকালে তিনি তার অস্থি-পেশীর (অর্থোপেডিক) চিকিৎসকের সাথে সাক্ষাতের জন্যে তৈরী হন। তাকে মেয়েদের মতো দেখালেও কাজ করতে যাওয়ার সময়ের মতোই রাস্তায় তার জন্যে মন্তব্য এবং উত্যক্ত হওয়া যেন অনিবার্য। এটা কোন ব্যাপার না, দুই মাসের সাধ্য সাধনার পরে চিকিৎসকের এই সাক্ষাৎকারের ব্যাপারে তিনি খুশি। গোসল করার সময় তার মনে পড়ে তিন বছর আগে তার চিকিৎসা পরিষেবা তাকে নারী হিসেবে জানার পর থেকে আর তার সাথে তার পুরুষের চেহারার সময়ের মতো আচরণ করা বন্ধ করে দেওয়ার কথা।

তিন বছর আগে একবার তার খুব খারাপ ধরনের ঠান্ডা লাগে। কিন্তু চিকিৎসক তার উপসর্গগুলোর জন্যে তার হরমোনকে দায়ী করে। সেই থেকে তার স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলোর জন্যে তার লিঙ্গগত পরিবর্তন দায়ী হতে শুরু করে। তার হাঁটু ব্যাথা করলে সেটা হরমোনের কারণে; তার বিষণ্ণতা বা উদ্বেগের কারণ একজন স্কুল শিক্ষক হিসেবে তার একজন নারীর মতো পোশাক পরিধান করার কারণে। তারা কখনো মেনেই নেয়নি যে তার সহকর্মী শিক্ষক এবং অভিভাবকরা তার প্রতি দুর্ব্যবহার করেই চলছে।

তার আরো মনে পড়ে যায় গত সেপ্টেম্বরে তিনি একটা জরুরি সমস্যা নিয়ে তিনবার চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন। কয়েক মাস ধরে তিনি সেগুলো না গ্রহণ করলেও প্রথম দুইবার তারা তার তলপেটে ব্যথার জন্যে তার হরমোনকে দায়ী করে। তৃতীয় পরিদর্শনের সময় চিকিৎসক অবিলম্বে তার অ্যাপেনডিক্স অপসারণের নির্দেশ দেন। অস্ত্রোপচারের পর তাকে পুরুষ হিসেবে বিবেচনা করা চিকিৎসক তার পেটের ব্যথা উপেক্ষা করে তাকে সময়ের আগেই বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। তার উপর, তার সাথে বাকি কর্মীরাও দুর্ব্যবহার করে, যেমন একজন চিকিৎসকের সেবা পাওয়ার অনুরোধ করায় একজন সেবিকা চিৎকার করে তাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কেন নারী হওয়ার ভান করছো?”

রক্তক্ষরণের ফলে তার পেটে রক্তশূন্যতা সৃষ্টি হলে তাকে আবার এক সপ্তাহ পরে ফিরে আসতে হয়। তিনি প্রায় এক মাসের জন্যে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন – কিন্তু এবার তার সাথে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করা হয়। কারণ তিনি আর চুপ না থেকে লিখিতভাবে তার অভিযোগ জানাতে শিখেছিলেন। ফ্লোরের দায়িত্বরত চিকিৎসক হাসপাতালে আগের ভর্তি রুগীগুলোর সময় তার সাথে খারাপ আচরণের জন্যে তার কাছে ক্ষমা চান।

লেখকের ছবি, অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত

অস্থি-পেশীর চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্যে পোশাক পরা শেষ করে তিনি চিন্তা করে দেখেন তার – এখনকার ব্যথাটি তীব্রতর হলেও – অ্যাপেন্ডিসাইটিসের সেই সময়ের মতো জীবনের ততটা ঝুঁকি নেই। তিনি একটি বাস ধরে যেখানে তার মতো সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের চিকিৎসা দেওয়া একটি চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছান। রক্ষীরা তার প্রতি সম্মানজনক আচরণ করে, কারণ তিনি তাদের তা করাতে পেরেছিলেন; তারা তাকে অসুস্থ দৃষ্টিতে দেখতো অথবা তাকে উপহাস করতো। গ্রাহক পরিষেবার কাছে অভিযোগ করে তিনি এই ফলাফলটা পান।

উপস্থিতির লাইনে দাঁড়ানো লোকেরা পুরুষ বলে উল্লেখ করে তাকে সচেতনভাবে একজন পুরুষ থেকে একজন নারীর ব্যবধান অস্বীকার করতে থাকে। লাইনে থাকা লোকজন ও পরিচারককে তার আইডি কার্ডে লেখা লিঙ্গ ও নাম ব্যবহার করতে বলার পর, তিনি চিকিৎসকের ডাকের জন্যে রুমে অপেক্ষা করেন। তিনি একটি আসনে বসলে অন্যান্য শিক্ষকরা বিস্ময় বা ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। কয়েকজন বয়স্ক লোক তার দিকে তাকিয়ে “কীভাবে মানুষ আজ হারিয়ে যাচ্ছে” সে সম্পর্কে একটি গল্প শুরু করে। তিনি সাক্ষাৎকারের প্রতি মনোযোগ দিতে তার মনের মধ্যে এই পরিস্থিতিগুলো মানিয়ে নেন।

তিনি শুনতে পান অফিস থেকে একজন চিকিৎসক তাকে ডাকছে। তিনি তার নাম শুনে স্বস্তি পান। এর কারণ হল দু’ বছর আগে আইনি সুরক্ষায় জেতার পরে তারা সামাজিক পরিচয় কর্তৃপক্ষকে পরিচয় নথিতে তার নাম এবং লিঙ্গ পরিবর্তন করার নির্দেশ দেওয়ার পরেও তার চিকিৎসা ইতিহাসে তারা তার অতীতের “মৃত নাম” – যা এখন আর তার পরিচয়ের কোন অংশ নয় – দৃশ্যমান রেখে দেয়। যেমন কেউ অপরাধ করলে তা তাদের রেকর্ডে রয়ে যায়, তেমনি “রেকর্ড” হওয়ার কারণে তারা এগুলি আর মুছে ফেলে না। তার অপরাধ: তার নাম পরিবর্তন।

অফিসে ঢুকে তিনি লক্ষ্য করেন যে কিছু দিন আগে অন্য একজন অর্থোপেডিস্ট তাকে পুরুষ হিসেবে ভাষায় সম্বোধন করে তাকে “সঙ্গী” হিসেবে ডাকার চেয়ে তার সাথে ভিন্নরকম আচরণ করা হচ্ছে। আজকের চিকিৎসক তার নিতম্বের অবস্থার দিকে মনোনিবেশ করে সম্ভাব্য ট্রোক্যান্টেরাইটিস নিশ্চিত করার জন্যে পরীক্ষার নির্দেশ দেন। এটা তার অন্যান্য সাক্ষাৎকার গুলির চেয়ে আলাদা ও অস্বাভাবিক – তার শরীর ও যৌনাঙ্গ এবং “একজন নারী হিসাবে বেঁচে থাকার ভুল” এর বিষয়গত মূল্যায়নের পরিবর্তে যেটা কেবল একটি রোগ নির্ণয়ের উদ্দেশ্যেই করা।

একই লেখকের লেখা: বেঁচে থাকার জন্যে মরতে ভয় না পাওয়া লিঙ্গ পরিবর্তিত নারীর চেয়ে সাহসী আর কিছু নেই

“অনেক চিকিৎসক তার একজন পুরুষ হওয়া ‘উচিৎ’ বলে মনে করে, (পুরুষ হিসেবে) তার দুর্বলতার জন্যেই তিনি মেয়েদের পোশাক পরতে শুরু করেছেন।” এই কারণেই তারা সাধারণত “আপনি একজন তরুণ যুবক”, “আপনার পুরুষ বৈশিষ্ট্য দুর্বল” এর মতো কথা বলে থাকে; “আপনাকে যা দেওয়া হয়েছে সাহসের সাথে তা মেনে নিন।” তিনি অন্য নারী শিক্ষকদের মতোই আচরণ পেতে চান, যাদেরকে তাদের শরীর বা সম্পর্ক নিয়ে তিরস্কার করা হয় না!

তাকে ছাড় দিয়ে তার পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়। তিনি দুই বছর আগে তার অনুরোধ করা লিঙ্গ পুনর্নির্ধারণ অস্ত্রোপচার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার সুযোগটি গ্রহণ করেন। পুরুষাঙ্গ সহ বা ছাড়া তিনি এখনো একজন নারী এই ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হলেও এটা থাকায় তিনি অস্বস্তি বোধ করেন। এটি এমন একটি বিষয় যা অনেক চিকিৎসক বুঝতে পারে না কারণ তারা তাকে বলে যে “এটা একজন মানুষের কাছে সেরা জিনিস।” কিন্তু এটি তার অস্বস্তি তৈরী করে; এটা (তো) তার শরীরের অংশ নয়। তারা তাকে আবার জানায় যে অস্ত্রোপচারটি করা যাবে না।

এতোগুলি অসফল পদক্ষেপ এবং আনুষ্ঠানিকতার পরে তিনি এখন একটি নতুন বাধার সম্মুখীন হয়েছেন: যোনির প্রসারণকারী চিকিৎসক তার দেশ কলম্বিয়ায় নেই। ইউরোলজিস্ট তাকে সতর্ক করে দেন যে এটা ছাড়া অন্য কোন অপারেশন নেই। একই ইউরোলজিস্ট ধরে নিয়েছিলেন যে রোগীর একজন পুরুষ সঙ্গী আছে এবং তার কোন সমস্যা হবে না; যখন রোগী ব্যাখ্যা করলেন যে তিনি একজন লেসবিয়ান (নারী সমকামী), তখন বিশেষজ্ঞ ধরে নেন যে যোনিপথ সরু হলেও তার কোন সমস্যা হবে না, কারণ লেসবিয়ানদের এটার প্রয়োজন নেই। ভবন থেকে বেরিয়ে বাসের জন্যে অপেক্ষা করার সময় তিনি ভেবে বিস্মিত হন সমকামী জন্মগত একলিঙ্গের নারীদেরকেও এই ইউরোলজিস্ট এই একই কথা বলবেন কিনা।

ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে এসে গ্রহণযোগ্য স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার এবং একজন শিক্ষক হিসেবে চাকরি বজায় রাখার জন্যে তাকে যে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে সেটা অনুধাবন করার পরেও তিনি সিদ্ধান্তে অবিচল থাকেন। তিনি বুঝতে পারেন যে ২০২০ সালে চিকিৎসা পরিষেবার অভাবে মারা যাওয়া আলেহান্দ্রা মনোকিউকোর মতো তার লিঙ্গ পরিবর্তিত বোনেরা পরিকল্পিতভাবে তাদের জীবন ও অস্তিত্বকে অস্বীকারকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটির হাতে মারা যাচ্ছে। স্পেনে প্রায় ৫০ শতাংশ লিঙ্গ পরিবর্তিত মানুষ “চিকিৎসকের অফিসে গিয়ে বৈষম্য বোধ না করার জন্যে তাদের চিকিৎসা সাক্ষাৎকার বাতিল করে বা বিলম্বিত করে” এবং ১৭ শতাংশ সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসকের কাছে যাওয়াটাই এড়িয়ে যায়।

সুতরাং তিনি জানেন যে নীরব থাকাটা ঠিক নয় এবং তিনি মর্যাদাপূর্ণ ও চিকিৎসাগত ভাবে নৈতিক, বৈষম্যহীন পরিষেবার জন্যে লড়াই চালিয়েই যাবেন, কারণ লিঙ্গ পরিবর্তিত মানুষের স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার, কোন প্রশ্রয় নয়।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .