বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

‘বেঁচে থাকার জন্যে মরতে ভয় না পাওয়া লিঙ্গ পরিবর্তিত নারীর চেয়ে সাহসী আর কিছু নেই’

লেখক লুসিয়া হিমেনেথ পেনুয়েলার তোলা ছবি, অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত

কোন একসময় একটি মেয়ের জন্ম হয়, যে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরই কেবল বাঁচতে শুরু করতে পেরেছিল।

লুসিয়া আলো দেখার জন্যে সারাজীবন আমার কাছে চিৎকার করে এসেছে। লুসিয়া আমার নিজেকে দেখতে শিখিয়েছে। আর তাই আমি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করা ও গর্বিত মা হওয়ার পরে ২০১৮ সালে আলোর মুখ দেখেছি।

আয়নার ভেতর তাকিয়ে নিজেকে চেনার মতো আর কিছুই নেই। অন্য কাউকে নয়, শুধু  আপনার নিজেকে দেখে। আপনার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করা, “এটাই আমি।” আপনি কে তা আবিষ্কার করা, আর এটা আপনার নিজের কাছে পুনরাবৃত্তি করা, কারণ আপনি জানেন যে নিজের মতো বেঁচে থাকা কতটা স্বস্তিদায়ক। আমি বিশ্বাস করি এটাই সুখের সংজ্ঞা: আপনি যা, তাই হয়েই শান্তিতে বেঁচে থাকা, আপনাকে হতে বলা ব্যক্তিত্ব নিয়ে নয়। সুখ হচ্ছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজে লুসিয়া হয়ে থাকতে পারা।

কিন্তু আমি আমার মতো একজন নারী হওয়ার পরই প্রথমবারের মতো আমার বাড়ির বাইরে পা রাখার বিপদ উপলব্ধি করেছি। তারপর থেকে এমন কোন দিন যায়নি আমি অপমানিত হইনি, অপরিচিতরা উপহাস করেনি এবং “বাঁচতে হলে দৌড়ে পালা” এই কথাটির জীবন্ত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আপনি আর আগের জায়গায় থাকতে পারবেন না বলে আপনাকে নতুন পাড়ায় যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এমনকি আপনার কর্মক্ষেত্রও হিংসাত্মক পরিবেশে পরিণত হয়েছে।

পিতামাতা এবং শিক্ষকদের দৃষ্টিতে আমি তাদের সন্তানদের উপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারি। আমি “বিপথগামী সমকামী”, “লিঙ্গ মতাদর্শ” এর প্ররোচনা, টেনে বের করে ফেলে দেওয়ার মতো একটি বিকৃতমনা। আপনি আপনার সহকর্মী শিক্ষক বন্ধুদের কথা শুনেছেন, তারা বলে যে তাদের সন্তানরা আপনার মতো না হয়ে বরং চোর বা মাদকাসক্ত হোক, তাও ভালো। আপনি যে শুধু তাদের কাছ থেকে এটা শুনেন তা নয়। এমনকি হেঁটে যাওয়ার সময় আপনি যাদের চেনেনও না এমন “ভাল মানুষ”রাও আপনাকে তাদের কলঙ্ক লেপনের বিষয়বস্তু করে তোলে।

আমি জানি না কখন আমি মানুষ, স্তন্যপায়ী, প্রাণী, বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীবও থাকি না – আর কখন আমি ব্যাকটেরিয়ার চেয়ে নগণ্য এবং ভাইরাসের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক কিছু হয়ে উঠি। আপনার সম্পর্কে কিছু বলা হলে সেটা আপনি শুনতে পান। কথিতভাবে আপনি যেভাবে “এটিকে পিছন থেকে নেন”, আপনি কতটা হতভাগা, কীভাবে আপনি আপনার মুখ দিয়ে ব্লো-জব করে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করছেন, এসব। মেকানিকের দোকান, থানা বা রাস্তার বিক্রেতাদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আপনি আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ্য করবেন ঐসব পুরুষরা যৌনতা এবং শিশ্ন-সম্পর্কিত বিষয়গুলি নিয়ে কতটা আচ্ছন্ন থাকে।

লেখকের তোলা এবং সম্পাদিত ছবি

বেঁচে থাকার জন্য এবং সম্ভব হলে বার্ধক্য লাভ করে মারা যাওয়ার জন্যে আমি সবসময় মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। আমার চামড়া ক্রমেই মোটা হচ্ছে। এর অর্থ এই নয় যে আমি আর আক্রান্ত নই, বরং আমি পাতা উল্টে পরবর্তী অধ্যায়ে যেতে চাই, এবং সম্ভব হলে শেষ পর্যন্ত আমি আমার নিজের জীবনটা লিখে যেতে চাই।

নারীদের যুদ্ধের আবর্জনা হিসেবে বিবেচনা করা এমন একটি দেশে আপনি বসবাস করলে এটা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। যে কোনো মুহূর্তে, আপনি একটি পুলিশ নিরাপত্তা চৌকিতে ধর্ষিত অথবা সেনাবাহিনীর একটি চৌকিতে নিহত হতে পারেন।

শুধু যে আপনাকে আপনার ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য একটি নাম এবং একটি লিঙ্গ ধরে সম্বোধন করা হচ্ছে তা নয়। আপনার উপস্থিতি তাদের সন্তানদের সমকামী করে তুলতে পারে এই ভয়ে বাবা-মা এবং শিক্ষকরা তাদের ছেলেদের স্কুলটি থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করে। ছবি আঁকার শিক্ষক আপনাকে বলে, স্কার্ট পরিহিত অবস্থায় আপনাকে দেখতে স্কটল্যান্ডের পুরুষদের মতো মনে হয়। ছেলেকে সমকামী করে তোলার জন্যে আপনাকে দোষারোপ করা সেই শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক বারবার ছাত্রদের সামনে আপনার দিকে চিৎকার চেচামেচি করে এবং হলওয়েতে আপনাকে থামিয়ে আঘাত করতে উদ্যত হওয়ার বিষয়ে  আপনি প্রশাসনকে অভিযোগ করলে সে আপনাকে “ফ্যাগট (সমকামী)” বলে গালি দেয়। কিন্তু সব ক্ষেত্রে প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া সবসময় একই: তারা (আপনার) কিছু করতে পারবে না।

আপনি যখন নিজেকে একজন নারী হিসেবে উপস্থাপন করেন, তখন বেশিরভাগ মানুষ আপনার জীবন সম্পর্কে তাদের নিজেদের মতামত এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী বলে মনে করেন। প্রত্যেকেরই একটা মতামত রয়েছে: আপনার সহকর্মীদের, এখনো আপনার সাথে কথা বলা আপনার দূরতম আত্মীয়, অথবা এমনকি কোস্টারিকার একজন খ্রিস্টান যাজক পর্যন্ত আপনার ছবিগুলি নিয়ে মজা করার জন্যে আপনার প্রোফাইল পরিদর্শন করেন। আপনার ব্যবস্থাপক এবং সহকর্মীদের মধ্যে আপনি এখনো যাদের সাথে কথা বলে তারা আপনাকে সময় দিতে বলে  এবং “এরকম হওয়ার কারণে” আপনার নিজের উপর আসা এসব মৌখিক ও শারীরিক আক্রমণগুলিকে উপেক্ষা করার পরামর্শ দেয়। কারণ আপনি কেবল একটা পোশাক, বস্তু বা সমস্যা ছাড়া আর কিছুই নন।

এখন যেহেতু মাসগুলি সব বছরে পরিণত হয়েছে, আমি জানি যে সমস্যাটি কেবল অজ্ঞতা নয় যে তা সময়ের সাথে ম্লান হয়ে যাবে। নির্যাতন চলতেই থাকে এবং আরো খারাপ হয়। সমস্যাটির শিকড় আরো গভীরে। এটা শ্রদ্ধার সাথে সম্পর্কিত।

কিছু কিছু জীবন যে বেঁচে থাকার যোগ্য নয় – পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তার মিডিয়ার মাধ্যমে এমন একটি অশ্রদ্ধার দৃষ্টিভঙ্গি আত্মস্থ করে ফেলেছে। এবং এর চেয়েও খারাপ ব্যাপার হলো এটা আমাদের পরিবারগুলিকেও ছেয়ে ফেলেছে।

পুরুষের জীবন যে নারীর জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান সেটা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা। আপনি একই লিঙ্গের লোকদের পছন্দ করলে আপনাকে আপনার এলাকা থেকে চলে যেতে হবে এবং নারীদের পোশাক পরে আপনার বাইরে যাওয়ার সাহসকে আপনার গলাটিপে মারতে হবে। আমার নারী বন্ধুদের জন্যে একটি পার্শ্ব টীকা: মনে রাখবেন, এই মাপকাঠিতে, আমি সবচেয়ে খারাপের চেয়েও খারাপ। অন্য কথায়, আমি যে সমাজে জন্মগ্রহণ করেছি তার মানদণ্ড অনুসারে আমার অনেক আগেই মারা যাওয়া উচিত ছিল।

ঠিক আপনাদের মতো,  আমরা জনগণ, আমরা মানুষ, এবং আমরা সংবেদনশীল। আমরা আপনার মা বা আপনার মেয়ের মতোই নারী। যে কোনো নারীর মতোই আমরা মা, কন্যা, অবিবাহিত এবং বিবাহিত নারী এবং অন্যদের ক্ষতি না করে আমাদের জন্যে আমরা যা সঠিক মনে করি সে অনুযায়ী আমরা আমাদের পরিবার তৈরি এবং জীবন যাপন করতে পারি।

ঘৃণা বন্ধ করুন এবং আমাদেরকে ২৫ বছরের বেশি বাঁচতে দিন, শুধু পতিতাবৃত্তি বা চুল কাটা ছাড়া যে কোনো চাকরি পেতে দিন। এই পেশাগুলি অন্যায় কিছু নয়, তবে এগুলি আমাদের পছন্দকে অস্বীকার করে।

আমরা জীবনকে বেছে নিয়েছি। চিকিৎসকদের দেওয়া কিছু জন্ম নথির কারণে আমরা নারী নই। আমরা নারী, কারণ ঘৃণা ও মৃত্যু (ভয়) সত্ত্বেও আমরা নারী হওয়া বেছে নিয়েছি।

নারী হিসেবে আমাদের নির্মাণ উন্নততর কারণ এটি সচেতন কিন্তু আরোপিত নয়, এবং এটা নির্দিষ্ট যৌনাঙ্গের উপর নির্ভর করে না। অন্যান্য মানুষের মতো বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা পুরুষাঙ্গ, যোনি, অন্তর্বর্তী অঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। কিন্তু জন্মগত নারী হওয়া ছাড়াও আমাদের এটার জন্যে কখনো কখনো জীবন দিয়ে পর্যন্ত লড়াই করতে হয়, অথচ জন্মের সময় তাদের প্রতি নির্দেশিত লিঙ্গ নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা বেশিরভাগ মানুষকে কখনো এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় না। কারণ একটাই, আমাদের স্কার্ট বা প্যান্টের নিচে রয়েছে আমাদের ভিন্নতর যৌনাঙ্গ।

আপনাদেরকে চিঠি লেখা এই কন্যা, জায়া, জননী এবং শিক্ষক ঘৃণা ও অস্বীকৃতির মধ্যেই ক্রমেই বেড়ে ওঠার  আশা রাখেন। এই সমস্ত কারণে, তিনি সাহস করে ঘোষণা করেন লিঙ্গ পরিবর্তিত নারী হয়ে বেঁচে থাকা বা এমনকি বেঁচে থাকার চেষ্টা করে মারা গেলেও, তার চেয়ে সাহসের আর কিছু নেই।

আপনি লেখককে অনুসরণ করতে পারেন, ইনস্টাগ্রামে: @লুসিভেরসোমুহের এবং ইউটিউবে:  লুসিভেরসো

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .