কেনিয়ার সংসদের ‘কাউন্ডা স্যুট’ ও আফ্রিকীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাকের উপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক

কাউন্ডা স্যুট পরিহিত রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম রুটো। এমকবা নিউজে ‘রুটোর পোশাক পরার জন্যে সংসদ থেকে ইউডিএ এমপিকে বের করে দেওয়া হয়েছে‘ ইউটিউব ভিডিওর পর্দাছবি। ন্যায্য ব্যবহার।

মঙ্গলবার ২৮ নভেম্বর কেনিয়ার সংসদ কাউন্ডা স্যুট ও আফ্রিকীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা নিষিদ্ধের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ জাম্বিয়ার প্রয়াত রাষ্ট্রপতি কেনেথ কাউন্ডার নামকরণ করা কাউন্ডা স্যুট রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম রুটোর চেনা পোশাকগুলির অন্যতম।

🛑 কোনো কাউন্ডা স্যুট ও ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকীয় পোশাক নয়।

কেনিয়ার সংসদ ভবনের মধ্যে জাম্বিয়ার প্রয়াত রাষ্ট্রপতি কেনেথ কাউন্ডার নামকৃত কাউন্ডা স্যুট নিষিদ্ধ করেছে।

স্পিকার বলেছেন এগুলি সংসদের প্রতিষ্ঠিত পোশাকরীতিকে হুমকিতে ফেলেছে।

কেনিয়ার সংসদ এর আগে পোশাকরীতি নিয়ে আলোচনায় লিপ্ত হয়। সংসদের বিতর্ক কক্ষে ২০২০ সালের নভেম্বরে সাংসদদের ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকীয় পোশাকের অনুমতি দিয়ে একটি রুল জারি করা হয়। এই সিদ্ধান্তটি পোশাকরীতির নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করে আফ্রিকীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তির ইঙ্গিত দেয়। এটিকে এখন উল্টে দেওয়া হয়েছে।

সংসদের স্পিকার মোজেস ওয়েতাঙ্গুলা “সাংসদদের জন্যে উপযুক্ত পোশাকরীতি”র রূপরেখা দেন। তিনি পুরুষদের জন্যে উপযুক্ত পোশাক হিসেবে কোট, কলার, টাই, লম্বা-হাতা শার্ট, লম্বা ট্রাউজার, মোজা, জুতা বা পেশাগত পোশাক তালিকাভুক্ত করেন। নারীদের জন্যে রীতিটি হাতাকাটা ব্লাউজ নিষিদ্ধ করে স্কার্ট ও পোশাকের দৈর্ঘ্য অবশ্যই হাঁটুর নীচে এবং “শালীন” হতে হবে নির্ধারণ করেন। উল্লেখ্য কাউন্ডা স্যুটসহ ঐতিহ্যবাহী পোশাক অনুমোদিত পোশাকরীতি থেকে বাদ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠিত সংসদীয় পোশাকরীতিকে চ্যালেঞ্জ করা উদীয়মান ফ্যাশন প্রবণতার কারণে এই নিষেধাজ্ঞাটি  এসেছে বলে স্পিকার ব্যাখ্যা করেছেন

বৈশিষ্ট্যসূচক সাফারি জ্যাকেটের সাথে প্রায়শই মানানসই প্যান্ট মিলে কাউন্ডা স্যুটের ১৯ শতকের একটি ইতিহাস রয়েছে যাকে জনপ্রিয় করেন জাম্বিয়ার উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রথম রাষ্ট্রপতি কেনেথ কাউন্ডা। যেমন সিওইয়া কিয়াম্বির ওয়েবসাইট বলেছে, ১৯৬০-এর দশকে আফ্রিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের যুগে স্যাম নুজোমা ও জুলিয়াস নায়েরেসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কাউন্ডা স্যুট পরতেন।

কাউন্ডা পোশাকটির নামকরণের জন্যে নায়েরেকে কৃতিত্ব দিয়েছেন। কাউন্ডা গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের আইকনিক প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুং থেকেও অনুপ্রাণিত হতে পারেন — কাউন্ডা তার জামার শৈলী ও মতাদর্শের প্রশংসা করতেন। মূলত চীন প্রজাতন্ত্রের (তাইওয়ান) প্রতিষ্ঠাতা সান ইয়াত-সেন প্রবর্তিত ঝোংশান স্যুট নামে পরিচিত হলেও এই পোশাকটিকে যথার্থভাবে “মাও স্যুট“ও বলা হয়। অস্ট্রেলিয়া ও পশ্চিম ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক অংশে নেতা, বুদ্ধিজীবী ও সমাজতন্ত্রীরাও এধরনের স্যুট পরিধান করতেন।

কাউন্ডা স্যুট পরিধান করে এই নেতারা সংহতির মতাদর্শ প্রচার করে পশ্চিমা প্রভাব থেকে স্বতন্ত্রবোধের উপর জোর দিয়েছিলেন। এটি কাউন্ডা স্যুটকে আফ্রিকীয় পরিচয়ের প্রতীক ও পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত দেয়।

কেনিয়ার রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম রুটোকে প্রায়শই সরকারি অনুষ্ঠানে একটি আড়ম্বরপূর্ণ কাউন্ডা স্যুট পরতে দেখা যায়, যা দেশের রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তায় অবদান রাখে। টিভি৪৭-এর সাথে একটি সাক্ষাৎকারে রুটোর সরকারি দর্জি অশোক সানি বলেছেন রুটোর কাউন্ডা স্যুট পরার পছন্দটি আফ্রিকীয় সংস্কৃতিকে আলিঙ্গন করে পোশাক প্রস্তুতকারীদের প্রতিভাকে সমর্থন করে স্থানীয় শিল্প ও কেনিয়ার তৈরি পোশাকের সমর্থনের একটি প্রদর্শনী। তবে সানি স্বীকার করেছেন “বেশিরভাগ পুরানো স্বৈরশাসক” একই ধরনের পোশাক পরতেন বলে অন্যরা এটিকে “স্বৈরশাসক” চেহারা হিসেবে দেখেছে।

তবুও নিষেধাজ্ঞাটির দেওয়া ভিন্ন আখ্যানের ইঙ্গিত অসংখ্য আফ্রিকীয় সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই এখন প্রশ্ন করছেন কেন আফ্রিকীয় সংসদে আফ্রিকীয় পোশাক নিষিদ্ধ।

একজন ইউটিউব ব্যবহারকারী আফ্রিকাকে_মহান_বানাও একটি ভিডিওতে হতাশা প্রকাশ করে মন্তব্য করেছেন: 

আমাদের এখনো অত্যাচারীদের ভাষায় কথা বলাটা কি যথেষ্ট নয়? হা ঈশ্বর, আফ্রিকার কী দোষ? সংসদ কীভাবে আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক নিষিদ্ধ করতে পারে? এটাই আমাদের পরিচয় ও সংস্কৃতি। আরবদের দিকে তাকান, তারা পশ্চিমা পোশাক ব্যবহার করে না, তাদের সাংস্কৃতিক পোশাক ব্যবহার করে। কেনিয়ার জনগণকে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে (বাধ্য) হওয়াটা খুবই দুঃখজনক।

সিদ্ধান্তটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব ও আত্মসম্মান সম্পর্কিত একটি বিস্তৃত কথোপকথনকে প্রজ্বলিত করেছে। একজন এক্স ব্যবহারকারী বলেছেন:

আমাদের শিকড় থেকে ঔপনিবেশিক রীতিনীতির দিকে এই দূরে সরে যাওয়াটা আমাদের পরিচয়কে চাপা দেয়। আমাদের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে হবে, সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃত হওয়ার অজুহাতে আমরা পশ্চিমাদের সন্তুষ্ট করা চালিয়ে যেতে পারি না।

অন্যান্য সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহারকারীদের যুক্তিতে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আফ্রিকীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান পরিচয় অন্বেষণ ও আফ্রিকীয় শৈলী উদযাপনের উপায় ও অনুভূতির বিরোধিতার ইঙ্গিত দেয়।

অনেকের প্রশ্ন যখন অনেকেই হাস্যকরভাবে কাউন্ডা স্যুট শুধু রাষ্ট্রপতি রুটোর জন্যে সংরক্ষিত বলবে, তখন নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাককে সম্মান না করে কি আফ্রিকা বিশ্বব্যাপী সম্মান অর্জন করতে পারবে। সম্প্রতি সম্মিলিত গণতান্ত্রিক জোটের (ইউডিএ) একজন সংসদ সদস্যকে কাউন্ডা স্যুট পরার জন্যে চেম্বার থেকে বহিষ্কার করা হলে এই ধারণাটি গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে।

সমর্থকরা বৈশ্বিক মঞ্চে আফ্রিকীয় সংস্কৃতিকে প্রামাণিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে বৈচিত্র্যময় পোশাক শৈলী প্রবর্তনের পক্ষে যুক্তি দেয় বলে এটি ঔপনিবেশিক সময় থেকে চালু আইনে পরিচালিত সরকারের কর্তৃত্বের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .