ভারতে হিজড়াদের শত্রু হলো সামাজিক বিশ্বাস ও ধারণা

Image via Flickr by Johanan Ottensooser. CC BY-NC-SA 2.0.

শারীরিকভাবে পুরুষ হলেও হিজড়ারা মানসিককভাবে নিজেদের নারী হিসেবে চিহ্নিত করে। তারা ভারতে সমাজচ্যুত এবং প্রায়শই দলবদ্ধভাবে থাকে, জীবিকা নির্বাহের জন্যে পতিতাবৃত্তি বা ভিক্ষা করে। ফ্লিকারের মাধ্যমে ইয়োহানান ওতেনসুজার এর তোলা ছবি। অবাণিজ্যিক-একইরকম ভাগাভাগি ২.০ সৃজনী সাধারণ অনুমতি।

ভারতে লিঙ্গ পরিবর্তিত (ট্রান্সজেন্ডার বা ট্রান্স) মানুষদের হিজড়া (আরবণী, কোঠি এবং জোগাপ্পা নামেও পরিচিত), খোজা  বা আন্তঃলিঙ্গ মানুষসহ ব্যাপক বিস্তৃত নানা পরিচয় রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে এই মানুষগুলোকে প্রায়ই আনুষ্ঠানিকভাবে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। লিঙ্গ পরিবর্তিতদের মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো চারপাশের বৃহত্তর দ্বি-লিঙ্গের দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেকে আলাদা হিসেবে গ্রহণ করতে পারা। পরেরটি হলো, নিজেদেরকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে না পেরে পরিবার, স্কুল এবং পারিপার্শ্বিকতার সাথে মানিয়ে নিয়ে তাদের সমর্থন অর্জন। সবচেয়ে কঠিন হলো তাদের জীবনের সাথে জড়িত বিভিন্ন অংশীজনের সহিংস ও নিপীড়নমূলক প্রতিক্রিয়া যার কারণে প্রায়শই তাদের সাধারণ চাকরি চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এবং সর্বোপরি অসহযোগিতামূলক স্বাস্থ্য খাত এবং পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া চ্যালেঞ্জ।

গ্লোবাল ভয়েসেস ভারতে লিঙ্গ পরিবর্তিতদের মুখোমুখি হওয়া অসংখ্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করতে ইমেলের মাধ্যমে সোমাভা বন্দোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে৷

Somabha Bandopadhay

ছবিটি দিয়েছেন সোমাভা বন্দোপাধ্যায়।

সোমাভা কানাডার মন্ট্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান স্কুলের পরিদর্শক গবেষণা সহযোগী এবং ভারতে তিনি কোলকাতাস্থ পশ্চিমবঙ্গ বিচারিক বিজ্ঞান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কনিষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সহযোগী যেখানে  থেকে তিনি হিজড়া সহিংসতা ও নিপীড়নের উপর পিএইচডিও পেতে যাচ্ছেন। তিনি একজন সম্প্রদায়ের সক্রিয় কর্মী এবং তিনি তাঁর রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রদায়, পুলিশ এবং বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সাথে প্রচারণা, আইনি সচেতনতা এবং সংবেদনশীলতার কাজে নিযুক্ত রয়েছেন।

সোমাভা লিঙ্গ পরিবর্তিতদের প্রতি ন্যায্য ও সমান আচরণের প্রয়োজনীয়তা এবং বৈষম্যের অবসান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ে তার কাজ নিয়ে কথা বলেছেন। প্রতিক্রিয়ার স্পষ্টতার জন্যে সম্পাদনা করা হয়েছে।

গ্লোবাল ভয়েসেস (জিভি): কীভাবে এবং কেন আপনি আপনার সক্রিয়তা এবং লিঙ্গ পরিবর্তিত সমস্যা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন?

সোমাভা বন্দোপাধ্যায় (এসবি): অষ্টম শ্রেণিতে আমার সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক লিঙ্গ পরিবর্তিত ব্যক্তিদের উপর বক্তৃতা দেন এবং তাঁর কথাগুলি আমাকে এতটাই অনুপ্রাণিত করে যে আমি ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হই। আইন স্কুলে একই আগ্রহ মাঝে মাঝে চলতে থাকে। কিন্তু একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতা এই বিষয়ের প্রতি আমার ভালবাসাকে বাড়িয়ে তুলে আমাকে তাদের জন্যে বাকি জীবন কাজ করতে অঙ্গিকারাবদ্ধ করে।

আমি আমার এলএলএম (আইনে স্নাতকোত্তর) গবেষণার অংশ হিসেবে এই বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে আমার পিএইচডির জন্যে কাজ চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি বুঝতে পেরেছি যে মানবাধিকার আইন এই জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে ব্যাপকভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রতিটি পরিস্থিতিতে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গোষ্ঠী।

জিভি: ভারতে লিঙ্গ পরিবর্তিতদের বর্তমান অবস্থা কী?

এসবি: এটা সত্য যে সুরক্ষা দানের জন্যে ২০১৪ সালের যুগান্তকারী রায়টি রয়েছে।

এই রায়টিই প্রথম রায় এবং ভারতের সর্বোচ্চ আদলতের কোর্টের একমাত্র রায় যা ভারতে আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং এসআরএস বা লিঙ্গ পুনর্নির্ধারণী অস্ত্রোপচারে প্রক্রিয়ার অধিকার প্রদানের মাধ্যমে “তৃতীয় লিঙ্গ” ব্যক্তি বা লিঙ্গ পরবর্তিত মানুষদের আইনগত স্বীকৃতি দিয়েছে। বিচারকরা লিঙ্গ পরিবর্তিত ব্যক্তিদের দুর্দশার কথা স্বীকার করে তাদের আইডি কার্ড এবং কল্যাণ প্রকল্পগুলিতে তাদের পছন্দের লিঙ্গ পরিচয়ের মাধ্যমে তাদের আইনত সুরক্ষিত এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার  নির্দেশ দিয়েছে।

লিঙ্গ পরবর্তিতদের অধিকার রক্ষার জন্যে ২০১৯ সালে নতুন আইন প্রণয়ন করা হলেও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো রয়েই গেছে

আইন পাস করাটা অবশ্যই তাদের প্রতি সম্মানজনক মনোভাব নয়। এখন ধীরে ধীরে তাদের জন্যে  বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সেগুলি থেকে সুবিধা পেতে সরকার প্রয়োজনীয় পূর্বশর্তগুলি চূড়ান্ত করছে না। লিঙ্গ পরিবর্তিত ব্যক্তিদে, বিশেষ করে, বাড়িতে, স্কুলে, রাস্তায় ও কর্মক্ষেত্রে এবং শিক্ষক, পুলিশ ও হাসপাতালের মতো অন্যান্য অংশীজনের কাছ থেকে তারা যে সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয় সেখান থেকে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা এখনো অনেক দূরের স্বপ্ন।

জিভি: লিঙ্গ পরিবর্তিত এবং হিজড়াদের মধ্যে পার্থক্য কী? তাদের সংগ্রাম কতটা ভিন্ন?

এসবি: লিঙ্গ পরিবর্তিত একটি লিঙ্গগত পরিচয়। সুতরাং, একটি জৈবিক লিঙ্গের মধ্যে কেউ অন্য লিঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত হলে এবং জৈবিকভাবে পুরুষ হলেও যে  নিজেকে একজন মহিলা হিসেবে বেশি সনাক্ত করে সেই হলো হিজড়া।

হিজড়া সম্প্রদায়
ভারতীয় সমাজে হিজড়াদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং বিয়ে বা সন্তানাদি জন্মদান বা মৃত্যুর সময় আচার-অনুষ্ঠানাদি অনুসরণ ও গ্রহণ করার রয়েছে। হিজড়া পেশার সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে আচার-অনুষ্ঠান পালন এবং পরিবারের সুখ ও সমৃদ্ধির জন্যে আশীর্বাদ করে। পেশাগতভাবে তারা এই আচারগুলি সম্পাদন করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে এবং তাদের দলগুলোতে একটি কঠোর অনুক্রম মেনে চলা হয়।

হিজড়া হলো একজন পুরোহিত হওয়ার মতো একটি পেশা ছাড়াও একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় যা পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশসহ মূলত ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত। কয়েক শতাব্দী ধরে প্রচলিত এই পেশাটিতে অন্য যেকোনো পেশার মতোই স্বকীয় দায়িত্ব। সুতরাং, তাদের সংগ্রাম নানাভাবে ভিন্ন।

হিজড়া পেশায় সম্প্রদায়ের মধ্যে সংগ্রাম করলেও লিঙ্গ পরিবর্তিত ব্যক্তিরা বহির্বিশ্ব থেকে সুরক্ষিত থাকে। তবে অন্যান্য পেশায় লিঙ্গ পরিবর্তিত ব্যক্তিদের সমাজের বিভিন্ন জায়গায় – কর্মক্ষেত্রে,  ক্লিনিক বা অন্য যেকোনো স্থানে সারাক্ষণ লড়াই চালিয়ে যেতে হয়।

জিভি: বেকারত্ব, বৈষম্য এবং সামাজিক বর্জন কি সামাজিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের মধ্যে নিহিত?

এসবি: এটি অন্যান্য জিনিসের চেয়ে বেশি সামাজিকীকরণের উপর নির্ভরশীল। এটি দ্বি-লিঙ্গবাদের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বিভিন্ন নিয়ামককে অন্তর্ভুক্ত করে। এটাই মূল সমস্যা। আমি বলবো ধর্মগুলোতে এটা কম, কারণ বেশিরভাগ ধর্মে লিঙ্গ পরিবর্তিতদের অস্তিত্বকে ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যাকে জনগণ উপেক্ষা করে অথবা সমকামিতার সাথে গুলিয়ে ফেলে। সুতরাং, সামাজিক বিভিন্ন বিশ্বাস ও ধারণা আজকের এই পরিস্থিতিটি তৈরি করেছে।

জিভি: কীভাবে লিঙ্গ পরিবর্তিত লোকেরা তাদের প্রতি বৈষম্যের মোকাবিলা ও প্রতিরোধ করে?

এসবি: প্রত্যেকের ভাগাভাগি করার মতো নিজস্ব গল্প ও অভিজ্ঞতা থাকায় লিঙ্গ পরিবর্তিত ব্যক্তিরা নিজেরাই এই প্রশ্নের উত্তরটি সবচেয়ে ভালোভাবে দিতে পারে। সম্প্রদায়ের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কর্মরত একজন হিসেবে আমি বলতে পারি যে বাস্তবতা খুবই কষ্টকর। তবে তাদের কাছে লড়াই করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই – হয় সাহায্যের জন্যে সম্প্রদায়কে জড়ো করে, পুলিশের কাছে গিয়ে, প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করে আদালতের কাছে যাওয়া অথবা সবচেয়ে খারাপ এবং দুর্বল উদাহরণটি হলো, এগুলোকে চলতে দেওয়া এবং মানিয়ে নিতে না পারলে সম্ভবত নিজেদের জীবন নিয়ে নেওয়া। এটি তাদের প্রতিক্রিয়া জানানো, তাদের সাড়া দেওয়া এরকম অগণিত রূপের মতো বিভিন্ন নিয়ামকের উপর নির্ভর করে এবং আমার প্রতিক্রিয়াটি কেবল ছোট্ট একটি সংক্ষিপ্ত রূপ মাত্র।

জিভি: আপনার কাজ কীভাবে লিঙ্গ পরিবর্তিতদের অধিকার এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখে?

এসবি: আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে আমি লিঙ্গ পরিবর্তিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তার উদ্বেগ দেখছি। ফলে আমি অপরিহার্যভাবে অপরাধমূলক কর্মের বিরুদ্ধে সুরক্ষার দেওয়া একটি আইনের মাধ্যমে সহিংসতা, নিপীড়ন এবং মানবাধিকারের দিকে দৃষ্টি দিয়েছি। এটি এই কারণে যে আমি মনে করি সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ছাড়া ইতিহাস যেমন দেখায় তেমনভাবে লিঙ্গ পরিবর্তিত ব্যক্তিরা স্পষ্টতই সেই সব নাগরিক অধিকার পরিমণ্ডলে অপরাধমূলক পরিণতি বরণ করার কারণে অন্যান্য সমস্ত নাগরিক অধিকার সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি অর্থহীন প্রতিভাত হবে। আমি লিঙ্গ পরিবর্তিত ব্যক্তিদের জীবন রক্ষার্থে এটি অনুসারে কাজ করার মতো একটি যথার্থ কর্তৃপক্ষের কাছে এটি তুলে ধরতে পারার আশা করি।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .