বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

ঢাকাই বিরিয়ানি: নবাবদের খাবার টেবিল থেকে সাধারণের পাতে উঠার গল্প

চিংড়ির বিরিয়ানি। ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেয়া এবং ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্স এর আওতায় প্রকাশিত।

এটি তৃতীয় প্রবন্ধ আমাদের “বিরিয়ানির গল্প” সিরিজের যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সহজলভ্য এই খাবারকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরার একটি প্রয়াস। এই পর্বে আমরা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বিরিয়ানির সংস্কৃতি নিয়ে আলাপ করব।

আপনাকে স্বাগত জানাই বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকায়। শহরে পা রেখেই আপনি মুখোমুখি হবেন ভয়ংকর এক অরাজক যানজটের। তবে, যানজটে বসেই আপনি রাস্তার পাশের খাবারের দোকান থেকে পেয়ে যেতে পারেন মশলাদার খাবারের ঘ্রাণ! ঠিকই ধরেছেন, বিরিয়ানির ঘ্রাণ। শহরে বিরিয়ানির এতো জনপ্রিয়তা, মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে জিভে জল আনা বিরিয়ানির দোকান।

যদিও খাবার হিসেবে বাঙালির খাদ্য তালিকায় বিরিয়ানির সংযুক্তি কয়েক শতকের।

বাংলাদেশ বঙ্গীয় বদ্বীপ অঞ্চলের একটি দেশ। পলি-বাহিত এই উর্বর জমিতে ৫ হাজার বছর ধরে ধান চাষ হয়ে আসছে। আর দেশজুড়ে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী। জমিতে উৎপাদিত ধান, আর নদীর মাছ মিলে বাঙালিদের ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ পরিচয়কে পোক্ত করেছে।

কালের পরিক্রমায় মাছ-ভাতের সাথে বাঙালির খাবার সংস্কৃতিতে যুক্ত হয়েছে অনেক খাবার। এদের মধ্যে অন্যতম হলো মোগল খাবার, যা মোগলাই খাবার নামে পরিচিত। মোগল শাসকগোষ্ঠীর হাত ধরে মোগলাই খাবার বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে। আর মোগলাই খাবারের কথা উঠলেই প্রথমেই আসে ঢাকাই বিরিয়ানির কথা।

বিরিয়ানি যেভাবে ঢাকায় এলো

সপ্তদশ শতাব্দির কথা। সেই সময়ে মোগল শাসকরা ঢাকাকে প্রাদেশিক রাজধানী ঘোষণা করে। আর সেই সূত্রে প্রশাসনিক কার্যক্রম সামলানোর জন্য ঢাকায় পা রাখেন সুবেদার ও তাদের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা। তারা তাদের খাবার-দাবার রান্নার জন্য লখনৌ থেকে সাথে নিয়ে আসেন বাবুর্চিদের। এরাই বাংলা মুল্লুকে বিরিয়ানির প্রচলন ঘটান। কিন্তু প্রশাসনিক বদলের ফলে ঢাকা ছেড়ে সুবেদাররা চলে গেলেও বাবুর্চিদের হাত ধরে আসা কিছু সহযোগী ঢাকায় থেকে যান। পরে এদের উত্তরসুরীরা ঢাকায় বিরিয়ানির দোকান খুলে মোগল খাবারের ধারা অব্যাহত রাখেন। একটা সময়ে এতে ঢাকার স্থানীয় রন্ধনপ্রণালি ঢুকে একটা নিজস্ব আদল লাভ করে। এবং স্বাদের গুণে কালক্রমে নবাবদের খাবার টেবিল থেকে বিরিয়ানি সাধারণ মানুষের অন্দরে স্থান করে নেয়।

ঢাকা শহরের ট্রেডমার্ক খাবার হলো বিরিয়ানি। শহরের সব জায়গায় দেখা মিলবে বিরিয়ানির দোকানের। ছবি: লেখক।

ঢাকাই বিরিয়ানি’র ব্র্যান্ড

ঢাকা শহরের ট্রেডমার্ক হিসেবে যদি অল্প কিছু জিনিসকে বেছে নিতে বলা হয়, তবে প্রথম দিকে থাকবে কাচ্চি বিরিয়ানির নাম। যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান বা বন্ধুদের আড্ডা কিংবা পুনর্মিলনী, যেখানের খাবারের আয়োজন থাকবে, খাদ্য তালিকায় বিরিয়ানি থাকবেই। আর ঢাকাই বিরিয়ানির কথা উঠলে প্রথমেই নাম আসে হাজির বিরিয়ানি। যার যাত্রা শুরু ১৯৩৯ সালে। হাজির বিরিয়ানির বিশেষত্ব হলো তেল বা ঘি নয়, সম্পূর্ণটাই সরিষার তেলে রান্না হয়। মাংস হিসেবে এতে থাকে খাসির মাংস। ঢাকার আরেকটি বিখ্যাত বিরিয়ানি ব্র্যান্ড হলো ঝুনুর বিরিয়ানি। এটি মুরগির মাংস দিয়ে রান্না করা হয়। শাহ সাহেবের বিরিয়ানি, নান্না বিরিয়ানি আর ফখরুদ্দিনের কাচ্চিও ভোজনরসিকদের কাছে সমান জনপ্রিয়।

সম্প্রতি জনপ্রিয় ইউটিউবার ও ফুড ভিডিও ব্লগার ট্রেভর জেমস বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি পুরান ঢাকার হাজির বিরিয়ানি এবং নান্না বিরিয়ানি খেয়ে এর সুস্বাদের প্রশংসা করেছেন।

খাসি, গরু বা মুরগি দিয়ে বিরিয়ানি রান্না মোগল ঐতিহ্য। তবে, ‘মাছে-ভাতে বাঙালির’ দেশে বিরিয়ানি বিভিন্ন মাছ যেমন চিংড়ি মাছ বা মাগুর মাছ দিয়েও রান্না হয়ে থাকে। পাশাপাশি সবজি বিরিয়ানি, নিরামিষ বিরিয়ানিও হয়ে থাকে। ওদিকে হাজীর বিরিয়ানির পরিবেশনের ট্রাডিশন হচ্ছে কাঁঠাল পাতায় বেড়ে দেয়া।

বিরিয়ানি রান্নার রকমফের

কাঁঠাল পাতায় বেড়ে দেয়া হাজির বিরিয়ানি। ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেয়া এবং ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্স এর আওতায় প্রকাশিত।

বিরিয়ানি মূলত দুই ভাবে রান্না করা হয়। পাক্কি বিরিয়ানি, মাংস আর চাল আলাদা করে রান্না করা হয় তারপর তাদের স্তরে স্তরে মিশিয়ে দমে দেয়া হয়। কাচ্চি বিরিয়ানি, বেশির ভাগই খাসি বা ভেড়ার মাংস দিয়ে রান্না করা হয়, যেখানে মাংস দই আর মশলা দিয়ে মাখিয়ে হাড়ির নীচে রাখা হয়। তার ওপর আলু আর চাল দিয়ে মুখটা খুব ভাল করে কাপড় আর আটা মেখে বন্ধ করে দিয়ে কয়লার আঁচে বসানো হয়। ভাপে মাংস, আলু, চাল সব এক সাথে রান্না হয়।

তবে গুরুচণ্ডালি ব্লগে সুকান্ত ঘোষ বিরিয়ানি রান্নার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য’র কথা তার লেখায় উল্লেখ করেছেন:

বিরিয়ানী তৈরীতে নাকি তেঁতুল কাঠের আগুন লাগে- আগুনের আবার নাকি পরত থাকে । আধুনিক যন্ত্রে তাপ মেপে নয় – বিরিয়ানী তৈরী হয় আগুনের রঙ দেখে ।

তিনি আরো লিখেছেন:

বিরিয়ানী রাঁধতে গেলে নাকি চাল ভিজিয়ে রাখতে হয় দুধের মধ্যে সারারাত। সেই দুধে একটু কেশর মেশানো থাকবে । আর যে পাত্রে বিরিয়ানী হবে সেই পাত্রের নিচের তলে তেজ পাতার একটা লেয়ার দিয়ে রাখতে হবে।

বিয়ে এবং বিরিয়ানি

বাংলাদেশের বিয়েতে প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মূল আকর্ষণ থাকে নানা পদের খাবারের আয়োজন। আর খাবারের তালিকায় সবার আগে থাকে বিরিয়ানি। বিরিয়ানি ছাড়া যেন বিয়ের আয়োজন সম্পূর্ণ হয় না। তাই, বিয়ে বাড়ির ভোজে বিরিয়ানি না থাকার কারণে বর-কনে পক্ষের মধ্যে ঝগড়ার নজিরও আছে। বিয়ে বাড়িতে সাধারণত কাচ্চি বিরিয়ানি পরিবেশন করা হয়ে থাকে।

বিয়ে বাড়ির বিরিয়ানি রান্নার রেসিপি:

বিরিয়ানি খাবার নয়, ভালোবাসা

বাঙালিদের কাছে বিরিয়ানি যেন খাবার নয়, ভালোবাসার আরেক নাম। বারে বারে খাবে। আর খানিকটা মশলাদার খাবার বলে খাওয়ার পর পেট ভার হয়ে আসবে। তবুও বাইরে খাবার খাওয়ার কথা উঠলে বিরিয়ানিকেই প্রথমে রাখবে। রবি ঠাকুরের ভাষায় বলতে গেলে, তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শত বার!’

হাসিব গাজীর টুইটারেও যেন এটার প্রতিফলন দেখা যায়:

এই পোস্ট পড়ে ঢাকার বিরিয়ানির স্বাদ নিতে ইচ্ছে করছে? চলে আসুন। কোথায় কোথায় সুস্বাদু বিরিয়ানির স্বাদ নিতে পারেন, তার লিস্ট রইলো এখানে

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .