বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে “নিরামিষভোজী রাষ্ট্র”? ঠিক তা নয়

সিলেটের এক মাছবাজারে রাখা মাছের প্রদর্শনী। ছবি ফ্লিকার থেকে ডেভিড স্ট্যানলির, সিসি বাই ২.০।

সম্প্রতি বৃটিশ সংবাদপত্র দি টেলিগ্রাফ বাংলাদেশকে “বিশ্বের সবচেয়ে নিরামিষভোজী” রাষ্ট্র শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।এতে ২০০৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিভাগের এক প্রতিবেদনের উল্লেখ করা হয়, যেখানে দেখানো হয়েছে যে বাংলাদেশের একজন নাগরিক গড়ে বছরে ৪ কিলোগ্রাম মাংস গ্রহণ করে, যার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিক বছরে ১২০ কিলোগ্রাম মাংস গ্রহণ করে।

তবে স্যোশাল মিডিয়া মন্তব্যকারীরা দ্রুত এই বিষয়টি চিহ্নিত করেছে যে এই “নিরামিষভোজীর” তকমা মোটেও সঠিক নয়। বাংলাদেশের নাগরিকেরা বছরে গড়ে খুব সামান্য পরিমাণ মাংস গ্রহণ করে, কারণ মাছ বাঙ্গালীর ঐতিহ্যবাহী প্রধান খাবার এবং সাধারণত মাংস এক দামী খাবার।

ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লির নাগরিক সুমিত কুমার বনশাল টেলিগ্রাফের পাঠকদের সতর্ক করে দিয়েছেন যেন এর প্রবন্ধের মাধ্যমে যেন কেবল শিরোনামে থাকা “নিরামিষভোজী” শব্দের কারণে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ না করে, সামগ্রিক অর্থে তারা এই প্রবন্ধের মাধ্যমে কোন বিচার না করে বসেঃ

এই প্রবন্ধ এমন ভাবে বর্ণনা করছে যেন মনে হচ্ছে তারা বলছে একটি “নিরামিষভোজী” রাষ্ট্রের সর্ব নিম্ন মাংস গ্রহণের হার!! প্রথমত বিষয়টি হচ্ছে পরিমাণে কম মাংস গ্রহণ করা, এমনকি রুপক অর্থেও তা যদি হয়।

দ্বিতীয়ত বাংলাদেশ হচ্ছে আগাগোড়াই এক মৎস্যভোজী রাষ্ট্র আর একারণেই সেখানকার নাগরিকদের অবশ্য পরিমাণে কম মাংস গ্রহণ করার কথা!!

এই প্রবন্ধে পরিসংখ্যানের অতীব দুর্বল ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশে বিশ্বের অন্যতম এক জনসংখ্যা অধ্যুষিত রাষ্ট্র, ২০১৬ সালের এক হিসেবে ৫৬,৯৮০ হাজার বর্গমাইল (১৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের) এই রাষ্ট্রে মোট ১৬ কোট ৩০ লক্ষ নাগরিকের বাস। কৃষি দেশটির অর্থনীতির প্রধান এক চালিকা শক্তি এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রধান খাদ্য হচ্ছে ভাত, মাছ, ডাল এবং বিভিন্ন রকমের তরকারি। বাংলাদেশ স্বাদু পানির মাছ চাষের জন্য সুপরিচিত এবং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে দেশটি মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছে

বাংলাদেশ একটি মুসলমান সংখ্যা গরিষ্ঠ রাষ্ট্র এই বিষয়টি মাথায় রাখলে গৃহপালিত চতুষ্পদ প্রাণী অথবা হাস-মুরগীর মত প্রাণীজ প্রোটিন খাবারের তালিকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ থাকার কথা ছিল, যার মধ্যে মাংস অন্যতম। তবে পরিবারের প্রচুর পরিমাণ সব্জির তরকারি এক সাধারণ ব্যাপার, কারণ গড়ে একজন বাংলাদেশী; বিশেষ করে যারা গ্রামীণ এলাকায় বাস করে তারা আর্থিক কারণে প্রায়শই খাবারের তালিকায় মাংস যোগ করতে পারেন না।

বাংলাদেশের এক প্রচলিত শহুরে খাবার সম্বন্ধে বিদেশে বাস করা বাংলাদেশী নাগরিক বিকয় রাসেল ফেসবুকে মন্তব্য করেছে

আমি ঠিক কোনভাবে বিশেষজ্ঞ নই, কিন্তু আমার জানা মতে, বাংলাদেশী রান্নার ঐতিহ্য মূলত মাছ এবং সব্জি। ১৯৯০ এর দশকের শেষের দিকে ঢাকায় বেড়ে ওঠার সুবাদে দেখেছি ঘরে যে খাবার রান্না করা হত তাতে গরুর মাংস বা মুরগী প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকত না। এই বিষয়ে নিশ্চিত যে বাংলাদেশের খাবারে কিছু মাংসের রান্না রয়েছে (যেমন কাচ্চি, তেহেরি, কাবাব ইত্যাদি), কিন্তু এখনো নিরপেক্ষ ভাবে বলা যায় এগুলো বাংলার রান্নার আধুনিক সংযোজন। তবে এখনো দেশটার সাধারণ/ মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকের কাছে মাংস অনেক দামি এক খাবার।

ঢাকা ট্রিবিউনের এক উপসম্পাদকীয়তে লেখা প্রবন্ধে মোহাম্মদ সাদি উল্লেখ করেছেন “বাংলাদেশী একজন নাগরিকের গড়ে বছরে মাংসের চাহিদা প্রায় ৪৩.২৫ কিলোগ্রাম, কিন্তু চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ গড়ে মাত্র ৯.১২ কিলো, যা নির্দেশ করছে বাংলাদেশীদের মাংস গ্রহণে ৭৯ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। এর কারণ হচ্ছে ক্রয় ক্ষমতা, এখন ক্রয় ক্ষমতা গড়ে মাত্র চার কিলোতে নেমে এসেছে।

২০১৪ সালে ভারতে বর্তমান প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতা আসে এবং হিন্দু ধর্ম অনুসারে গরুকে পবিত্র জ্ঞান করে এই প্রাণী রক্ষায় বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর পরের বছর গুলোয় ভারত খুব সামান্য পরিমাণ গরু বাংলাদেশ রপ্তানি হতে দিয়েছে। যার ফলে বাংলাদেশে গুরুর মাংসের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায়। যার ফলে বাংলাদেশের অনেক গরীব নাগরিকদের কাছে গরুর মাংস অনেক দামি খাবার এবং তাদের অন্য ধরণের প্রোটিনের গ্রহণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঢাকায় এক কসাইয়ের দোকান, ছবি ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনিস্টিটিউট-এর যা ফ্লিকার হতে নেওয়া, ২০১০সালে। সিসি বাই এনসি এনডি ২.০

টেলিগ্রাফের দাবীর বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে কিছু মতামতা বেশ কঠোর ছিল, যা বাংলাদেশের কিছু স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ হয়ে আসে, সায়ান এস. খান নামে ফেসবুকের এক মন্তব্যকারী নিম্নোক্ত মন্তব্যটি করেছেন:

এটা খুবই বাজে যে দি টেলিগ্রাফের ভ্রমণ বিষয়ক কিছু সাংবাদিক কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে খুব বিপজ্জনক ভাবে বিভ্রান্ত হয়েছে, এটা আরো বেশী বেদনাদায়ক যখন প্রশ্ন ছাড়াই আমাদের প্রচার মাধ্যমে পুনরায় প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে, যে পরিমাণ অদ্ভুত এক ব্যাখ্যা তা বহন করা খুব কঠিন

উন্নয়ন কর্মী রাশেদ রাহগির এই উত্তেজনা নিয়ে প্রশ্ন করেছে:

এটা কী কোন অর্জন? অথবা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মনে হচ্ছে গ্লাসের অর্ধেক খানি। জনপ্রতি সর্ব নিন্ম পরিমাণ প্রোটিন গ্রহণ।

অনেকে এই বিষয়টি তুলে ধরেছে যে বাংলাদেশী নাগরিকেরা নিরামিষভোজীদের দলে পড়ে না। বাংলাদেশ নিরামিষভোজী সমাজের সভাপতি দাবি করেছেন যে কেবল সমাজের খুব সামান্য অংশ হচ্ছে নিরামিষভোজী। মারিয়ে, একটি নিরামিষভোজী ভ্রমণ ব্লগের লেখিকা, তিনি উল্লেখ করেছেন যে বাংলাদেশী রান্নায় প্রায়শ মাংসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় এবং এখানে পুরোপুরি নিরামিষ খাবার পাওয়া খুব কঠিন।

আর নাদিয়া খান ফেসবুকে মন্তব্য করেছে:

এমনকি আপনি বাংলাদেশে এমন কোন জায়গা খুঁজে পাবেন না যেখানে খুব কম লোক শুধুমাত্র নিরামিষ খাবার নিয়ে সামান্য আলোচনা করছে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .