বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

প্যালেস্টাইন: গাজা তার নিজস্ব ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন করেছে

যে মুহূর্তে সামনের মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য ফুটবল ভক্তরা প্রস্তুত হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আরেকটি ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে- আর এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে গাজায়। যখন ফিলিস্তিনিরা দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল বিশ্বকাপে তাদের দলকে পাঠাতে পারছে না, তখন ফিলিস্তিনিদের একটি দল গাজায় বাস করা বিদেশীদের দ্বারা তৈরি ফুটবল দলের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যে সমস্ত বিদেশীরা নিজ দেশের প্রতিনিধি হিসেবে নিজস্ব জাতীয় ফুটবল দল তৈরি করেছে। এটি এমন এক প্রতিযোগিতা যা মে মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রতিযোগিতা নিয়ে ফিলিস্তিনি ব্লগাররা বেশ উত্তেজিত ছিল-এবং তাদের দুইজন একটি খেলায় উপস্থিত থাকতে পেরেছিল।

গাজা বিশ্বকাপের ওয়েবসাইট তাদের এই প্রতিযোগিতা কি নিয়ে, সেই সম্বন্ধে আমাদের ব্যাখ্যা করছে:

সম্প্রতি ১৬ লক্ষ ফিলিস্তিনি ভূ-রাজনৈতিক ভাবে পঙ্গু করে রাখা এক এলাকায় আটকে রয়েছে, যে গাজা নানাবিধ অবরোধের কারণে নানা সমস্যায় জর্জরিত। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং যৌক্তিকভাবে আরো গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজে যুক্ত থাকা, যা অদূর ভবিষ্যৎ-এ গাজার লোকদের জন্যও প্রায় অসম্ভব। বলা যায় গাজা নামক এলাকা সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। […] সবাইকে একসাথে বাঁধার এক প্রেরণায় গাজা ফুটবল বিশ্বকাপ এক উচ্চমাত্রার পরিকল্পনা যা গাজায় বাস করা সম্প্রদায় ও সারা বিশ্বকে উদ্দীপ্ত করেছে। রাজনৈতিক বৈপরিত্যের মাঝে এটা এমন এক মিল, যা আমরা অনেক বেশি পরস্পরের সাথে ভাগ করে নেই। দুই সপ্তাহব্যাপী চলা এই বিশেষ ফুটবল প্রতিযোগিতার শুরু হয় এ বছরের মে মাসের প্রথম অর্ধে। গাজার ২০০ জন পেশাদার ও ২০০ জন শৌখিন বিদেশী ফুটবল খেলোয়াড়দের নিয়ে ১৬ টি ভিন্ন ভিন্ন দেশের জাতীয় ফুটবল দল তৈরি করা হয়। এটি করা হয় “গাজা বিশ্বকাপ” জেতার জন্য- এটি একটি হাতে বানানো শৈল্পিক বিজয় স্মারক বা ট্রফি যা গাজার বেশ কয়েক ধরনের ধাতু মিশ্রিত লৌহ থেকে তৈরি করা হয়েছে- গাজা বিশ্বকাপ নামক অনুষ্ঠানের আয়োজনের বিষয়টি গাজার ১৬ টি পেশাদার ফুটবল দল এবং গাজায় বাস করা একই সংখ্যক বিদেশী শৌখিন খেলোয়াড়ের দ্বারা সংগঠিত দলের যৌথ অংশীদারিত্বে তৈরি হয়। এই সমস্ত বিদেশীরা বিভিন্ন মানবিক কারণে এখানে বাস করে।

ছাত্ররা লাইফ অফ বিরজেইট ক্যাম্পাসে লিখছে (বিরজেইট পশ্চিম তীরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়), এই প্রতিযোগিতা একটি অসাধারণ ধারণা:

যারা দক্ষিণ আফ্রিকার শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার জন্য দিন গুনছে আমরা তাদের চেয়ে অনেক উন্নত কারণ তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তারচেয়ে উচ্চ-মানের এক বিশ্বকাপ এখানে এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে! আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিষয় এই যে আমরা ব্যক্তিগতভাবে সেখানে উপস্থিত থেকে ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারবো না, দখলকৃত সীমান্তে সীমিত অনুমতি এবং অবশিষ্ট কর্মকাণ্ডের জন্য, আবার ইন্টারনেট এবং টেলিভিশনের মত খুব সামান্য উপকরণ রয়েছে, যার মাধ্যমে আমরা মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখতে পারবো।[…] আমরা সাধারণ লোকের ছবি তুলছি যাদের শরীরের গঠন সাধারণ এবং সক্ষমতা সাধারণ মানের (অথবা তাদের চেয়ে কম), যারা গ্রীক দেবতা এডোনিস এর মত সুন্দর সিক্স প্যাক (সিক্স প্যাক-সুন্দর পেশীবহুল উদর বা পাকস্থলী)-এর মত সুগঠিত পেশাদার ক্রীড়াবিদের বিপরীত চেহারার, তারা খুব ভালো ফুটবল খেলছে। এটা খুব সুন্দর! এবং সত্যিই অসাধারণ….বিশ্বকাপের জন্য প্যালেস্টাইন।

হাইতাম সাব্বাহ ফিলিস্তিনি এক ব্লগার, যিনি বাহরাইনে বাস করেন। তিনি বলেছেন:

মনে হচ্ছে আরব সরকারগুলো যে কাজ করতে অথবা যা তুলে ধরতে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে ফুটবল সমর্থকরা সেই কাজটি করতে সমর্থ হয়েছে,: গাজার উপর আরোপ করা ইজরায়েলের অমানবিক অবরোধের ঘটনা তুলে ধরা!

গাজার দুই ব্লগার, যারা বয়সে তরুণ, তারা তাদের প্রথম ফুটবল খেলা দেখার সুযোগ পাওয়ায় উত্তেজিত ছিল। এটি ছিল এই প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় খেলা। লিনা আল শরিফ, লাইফ ফ্রম গাজাতে ব্লগ করেন। তিনি ফুটবল খেলা দেখার জন্য স্টেডিয়ামে যেতে পেরে বিস্মিত:

গাজার যে স্টেডিয়াম, তা পুরুষদের জন্য। মেয়েরা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যাচ্ছে, তা এখানে খুব একটা পরিচিত দৃশ্য নয়। কাজেই আমি এবং আমার বন্ধু শঙ্কিত ছিলাম যে, আমাদের বাবা-মা আমাদের সেখানে যাবার অনুমতি প্রদান করবে না। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আমার বাবা আমাকে স্টেডিয়ামে যাবার অনুমতি দিল এই ধারণায় যে, সেখানে গিয়ে আমি বিরক্ত হয়ে উঠবো এবং সাথে সাথে স্টেডিয়াম ছেড়ে আসবো। যদিও আমি ফুটবল সমর্থক নই তারপরেও আমি এতে উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ফুটবল মাঠে উপস্থিত থেকে মানুষ ফুটবল খেলায় খেলোয়াড়দের বল অন্যকে দিতে দেখে যে জয়ধ্বনি দিচ্ছে সে অনুভূতি নেবার চেষ্টা করবো না।

খেলা শুরু হবার কথা ছিল বিকেল ৫ টায়। আমরা তিনজন বালিকা কেবল পুরুষদের এলাকায় একা গিয়ে খেলা দেখতে চাইনি, কাজেই আমার বান্ধবীর ভাইয়েরা আমাদের সাথে এলো (যদিও তারা বয়সে আমাদের চেয়ে ছোট!)। স্কার্ফ (মাথার চুল কাপড়ে ঢাকা) পরা তিনটি মেয়েকে স্টেডিয়ামের প্রহরীরা এই দৃষ্টিতে বিদ্ধ করছিল “তোমরা এখানে কি করতে এসেছো?”। তারা ভেবেছিল আমরা সাংবাদিক, কিন্তু আমরা নিষ্পাপ ভাবে জবাব দিলাম “আমরা এখানে এসেছি, কারণ আমরা এই খেলাটি দেখতে চাই”। তারপরেও তারা বিস্মিত, কিন্তু তারা আমাদের সেখানে বসতে দিল যেখানে কেবল বিদেশী দলের সমর্থকরা ছিল, বাস্তবিক পক্ষে কেবল আমরা এই কয়জন ছিলাম সেখানকার মহিলা দর্শক, যারা পরে আরো মহিলা দর্শক আগমনের আশা করছিলাম।

লিনার পোস্টে আপনারা এই খেলা সম্বন্ধে পড়তে পারবেন। লিনা উপসংহার টেনেছে:

এটা ছিল আমাদের জন্য এক বিশেষ দিন। একটা নতুন অভিজ্ঞতা, যা আমাদের একটা ফুটবল খেলার যতটা কাছে পারা যায়, ততটা কাছে নিয়ে এসেছে। গাজা বিশ্বকাপ এমন একটা কর্মসূচি, যার মূল্য অনেকেই উপলব্ধি করবে। কিন্তু এই অনুষ্ঠানের চিন্তা, গাজার সবচেয়ে দুর্দশার জায়গাটা আঘাত করেছে… অবরোধের জায়গায়। অনেকেই গাজার তরুণ তুর্কী ও তাদের খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করে না। এই অনুষ্ঠান গাজাবাসীদের ঐক্যের একটা ধারণা দিয়েছে, ফুটবল খেলার মত বিনোদনের মাধ্যমে।

লিনা তার পোস্টে একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও তুলে ধরেছে, যা খেলা চলাকালীন সময় সে ধারণ করেছিল:

লিনার বান্ধবী আমাল, সে হোপ ইন গাজা (গাজায় আশা) ব্লগে, এই ফুটবল খেলায় তার উপস্থিতি নিয়ে লিখেছে:

এটা বিস্ময়কর বিষয় যে কি ভাবে [গাজায় বাস করা] বিদেশীরা এই বিশ্বকাপকে সমর্থন করেছে। আমি মনে করেছিলাম তারা এই প্রতিযোগিতাকে খুব গুরুত্বের সাথে নেবে না এবং তাদের কাছে এটা সামান্য বিষয়, তার বিপরীতে তারা এই কাজে এগিয়ে এলো এবং আমাদের সমর্থন করলো, আর আমার এবং সকল ফিলিস্তিনির কাছে এর মানে পুরো বিশ্বের সমর্থন। ফুটবল খেলা দেখতে যাওয়া আমার অন্যতম এক ইচ্ছা ছিল, এ কারণে বিদেশে যেতে চেয়েছিলাম, কারণ আমি জানতাম গাজায় কোনদিন ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হবে না। কিন্তু গাজায়, গাজা বিশ্বকাপ ২০১০, আমার এক ইচ্ছাকে পুরণ করেছে। এই বিশ্বকাপ বাইরের বিশ্বের জন্য এক চিৎকারের মত, যারা আমাদের অবরোধে আটকা পড়ে যন্ত্রণাবিদ্ধ হতে দেখে, যারা অক্ষম মানুষের মত কোন কিছু করতে পারে না,.. এটাই হল সেই কাজ, যা আমরা করতে পারি।

এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ করা হয়েছে।