বেলারুশে ব্লগার, সাংবাদিক ও সৃজনশীলরা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত

চাপের মধ্যে রয়েছে বেলারুশীয় সাংবাদিকবৃন্দ (বাম থেকে ডান): ক্যাটসিয়েরিনা আন্দ্রেয়েভা, দারিয়া চুলতসোভা এবং ক্যাটসিয়েরিনা বারিসেভিচ। “বসন্ত” মানবাধিকার কেন্দ্রের সৌজন্যে প্রাপ্ত চিত্র।

দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রপতি আলেক্সান্দার লুকাশেঙ্কার বিরুদ্ধে ২০২০ সাল থেকে চলমান বিক্ষোভের দমন-পীড়নের অংশ হিসেবে বেলারুশীয় কর্তৃপক্ষ এখন ব্লগার, সাংবাদিক এবং সৃজনশীল শ্রেণীর উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে।

গত আগস্টের পর থেকে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে যাদের অনেককেই “জনশৃঙ্খলা লঙ্ঘন” করার জন্যে জরিমানা এমনকি ফৌজদারি সাজাও দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অনলাইনে পোস্ট প্রদান এবং মিডিয়াতে সমাবেশগুলির প্রচারকারীরা কঠোর শাস্তি পেয়েছে।

ষষ্ঠ বারের মতো রাষ্ট্রপতি পদে থাকার চেষ্টা করার পরে আগস্টে লুকাশেঙ্কার বিরুদ্ধে গনঅসন্তোষের ঢেউ ওঠার পর থেকে সেটা বিভিন্ন মাত্রায় সাথে অব্যাহত রয়েছে। নির্বাসিত বিরোধীদলীয় প্রার্থী সভিয়াতলানা শিখানোস্কায়া লুকাশেঙ্কার পদত্যাগ এবং তিনি জিতেছেন বলে বেশিরভাগের বিশ্বাস করা নির্বাচনটি পুণরায় অনুষ্ঠানের দাবি অব্যাহত রেখেছেন। তবে লুকাশেঙ্কা এসব দাবিতে কর্ণপাত না করে বরং সাংবিধানিক সংস্কার এবং অন্যান্য আধাআধি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন।

ইতোমধ্যে দেশটি রাস্তায় সমাবেশের উপর দমনাভিযান এবং প্রকাশ্য বিক্ষোভ প্রকাশকে অপরাধমূলক করা  অব্যহত রেখেছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে টেলিগ্রামের বিভিন্ন চ্যানেল  “চরমপন্থা”র আইনি সংজ্ঞা বিস্তৃত করার আইনের কথিত একটি খসড়া জনগণের দৃষ্টিগোচর করেছে বলে রেডিও মুক্ত ইউরোপ জানিয়েছে

প্রস্তাবিত পরিবর্তনের আওতায় বেলারুশের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পরিষেবাগুলি “চরমপন্থী” বলে গণ্য ব্যক্তি ও সংস্থার একটি তালিকা চালু রাখবে। এই কালো তালিকাভুক্তদের চাকরিতে থাকতে, সরকরের অনুমোদন ছাড়া বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন করতে অথবা চিকিৎসা, শিক্ষা বা প্রকাশনা কার্যক্রমে জড়িত থাকতে বাধা দেওয়া হতে পারে।

ব্লগের জন্যে সাড়ে চার বছর কারাদণ্ড

৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে মিনস্কের একটি আদালত স্থানীয় ব্লগার পাভেল স্পিরিনকে লুকাশেঙ্কার শাসনের দুটি সমালোচনামূলক ব্লগের জন্যে সাড়ে চার বছর কারাদন্ডে দন্ডিত করে। প্রকাশিত ভিডিওগুলির মধ্যে একটি ভিডিও বেলারুশের মাদক পাচারের বিষয়ে, আর অন্য ভিডিওটি ২০২০ সালের আগস্টের বিক্ষোভ এবং এতে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি পুলিশী বর্বরতার বিষয়ে মন্তব্য করেছিল।

প্রসিকিউটর ৩৬ বছর বয়সী এই ব্লগারকে “বর্ণবাদী, জাতীয় অথবা অন্যান্য সামাজিক বিদ্বেষ প্ররোচিত করার উদ্দেশ্যে উদ্দেশ্যমূলক ক্রিয়াকলাপের” (বেলারুশ প্রজাতন্ত্রের ফৌজদারি বিধির ১৩০ অনুচ্ছেদের ১ম অংশ) দায়ে অভিযুক্ত করেছিল

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে ব্লগার ব্লগার পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর্যন্ত প্রাক-বিচার আটক ছিলেন এবং তাকে তার পরিবারের  সাথেও দেখা করতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেছেন এসময় তাকে “চূড়ান্ত অবমাননা” করা হয়েছে। ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে আদালতের বক্তব্যে স্পিরিন বলেছেন যে তার ব্লগগুলি “কঠোর হলেও ছিল নিছক সমালোচনা:”

Например, газета администрации Александра Лукашенко тиражом 300 тысяч экземпляров критикует гораздо более жестко, чем я, призывая отбирать детей у протестующих, сравнивая их с фашистами. И никто не обвиняет этих журналистов и редакторов в разжигании ненависти, это просто резкая критика.

উদাহরণস্বরূপ, [রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন – সংস্করণ] আলেক্সান্দার লুকাশেঙ্কার প্রশাসনের ৩,০০,০০০ কপি ছাপা হওয়া পত্রিকাটি আমার বিক্ষোভকারীদের থেকে বাচ্চাদের সরিয়ে নেওয়া এবং তাদের ফ্যাসিস্টদের সাথে তুলনা করার চেয়ে আরো বেশি কঠোর সমালোচনা করে। আর কেউ এসব সাংবাদিক ও সম্পাদকদেরকে ঘৃণা প্ররোচিত করার দোষ দেয় না, (অথচ) এটা শুধু কঠোর সমালোচনা।

বিক্ষোভের প্রতিবেদনের জন্যে কারাদণ্ড

১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে মিনস্কের একটি আদালত সাংবাদিক দারিয়া চুলতসোভা এবং ক্যাটসিয়েরিনা আন্দ্রেয়েভাকে দণ্ডিতদের কলোনিতে দুই বছরের কারাদন্ডে দণ্ডিত করে। ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর তারিখে একটি সমাবেশের সহিংস একটি ছত্রভঙ্গ সরাসরি সম্প্রচারের সময় এই নারীকে আটক করে। বেলস্যাট নামের একটি স্বাধীন টেলিভিশনে কর্মরত চুলতসোভা এবং আন্দ্রেয়েভা উভয়ের বিরুদ্ধে বেলারুশ প্রজাতন্ত্রের ফৌজদারি বিধির ৩৪২ ধারার ১ম অংশ অনুসারে “মোটাদাগে জনশৃঙ্খলা লঙ্ঘনকারী কর্মকাণ্ড সংগঠিত করা এবং এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার” অভিযোগ আনা হয়েছে

সহকর্মী সাংবাদিক হান্না লিউবাকোভা টুইট করেছেন যে তিনি প্রেস সদস্যদের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে আরো বেশি দমন-পীড়নের আশংকা করেছিলেন।

#বেলারুশে মেধাবী পেশাজীবী এবং গুণী সাংবাদিক দারিয়া চুলতসোভা এবং ক্যাটসিয়েরিনা আন্দ্রেয়েভা দুই বছরের কারাদন্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। নভেম্বর মাসে #মিনস্ক এর একটি সমাবেশ থেকে সরাসরি সম্প্রচারের জন্যে তাদের আটক করা হয়েছিল। পশ্চিম থেকে কোন প্রতিক্রিয়া না হলে এরকম আরো কিছু হবে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংস্থা সীমান্তবিহীন প্রতিবেদকের বার্লিন দপ্তরের প্রধান ক্রিশ্চিয়ান মির এই বাক্যটিকে “বীভৎস” আখ্যায়িত করে ডয়চে ভেলেকে বলেন যে এটি “ক্রমবর্ধমান দমন-পীড়নের একটি নতুন পর্যায়” এর ইঙ্গিত দেয়:

В прошедшие недели и месяцы с начала протестов после президентских выборов в августе мы наблюдали многочисленные аресты журналистов, однако во всех случаях речь шла о кратковременном заключении под стражу, например, на 14 дней. Сегодня же, впервые с момента августовских выборов, речь идет о приговоре, срок которого исчисляется годами.

আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ এবং মাসের মধ্যে আমরা একাধিক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার হতে দেখলেও সবক্ষেত্রেই এগুলি ছিল ১৪ দিনের স্বল্প-মেয়াদী আটকাদেশের উদাহরণ। কিন্তু আগস্টের পর আজকে আমরা প্রথমবারের মতো বছরের হিসেবে মাপা একটি দণ্ডের বিষয়ে কথা বলছি।

বেলারুশে প্রেসের স্বাধীনতা লঙ্ঘন অনুসরণকারী স্থানীয় সংস্থা বেলারুশীয় সাংবাদিক সমিতি (বিএজে) জানিয়েছে যে বর্তমানে মোট ১০জন গণমাধ্যম কর্মী আটক এবং তাদের কাজের জন্যে বিচারের বা সাজা শোনার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৯ ফেব্রুয়ারি তারিখে শুরু হয়ে চলমান বিচারাধীন স্বাধীন ওয়েবসাইট টুট.বাইয়ের সাংবাদিক ক্যাটসিয়েরিনা বারিসেভিচ রয়েছেন।  বারিসেভিচ এবং আর্টিয়োম সোরোকিন নামে একজন চিকিৎসককে বেলারুশ প্রজাতন্ত্রের ফৌজদারি বিধির ১৭৮ ধারার ৩য় অংশ) অনুসারে “চিকিৎসার গোপনীয়তা প্রকাশ করার” দায়ে অভিযুক্ত হয়ে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন।

প্রসিকিউশন অনুসারে বিক্ষোভ চলার সময় পুলিশ হেফাজতে মারা যাওয়া বিক্ষোভকারী রমন বান্দারেঙ্কাকে সোরোকিন চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছিলেন। আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা প্রথমে বান্দারেঙ্কা মাতাল ছিলেন বললেও তার মৃত্যুর প্রতিবেদনে বারেসেভিচ যে মেডিকেল রেকর্ড (সোরোকিন সরবরাহ করেছেন বলে কথিত) উপস্থাপন করেছিলেন তাতে মৃত্যুর সময় বান্দারেঙ্কার রক্তে কোন মদ পাওয়া যায়নি। ফলে মানবাধিকার কর্মীরা তার মৃত্যুটিকে দাঙ্গা পুলিশের নির্মম মারধরের ফলাফল বলে সন্দেহ করছে

সৃজনশীল প্রকাশের উপর দমনাভিযান

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক নতুন ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে সাংবাদিক এবং অনলাইনে প্রভাব সৃষ্টিকারীরা কর্তৃপক্ষের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছেন। এর পাশাপাশি বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানানো শিল্পী এবং অন্যান্য সৃজনশীলরাও এই উত্তাপ অনুভব করছেন।

ইয়াঙ্কা কুপালা জাতীয় একাডেমিক থিয়েটারের প্রাক্তন পরিচালক পাভেল লাতুশকার মতো কয়েকজনের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। অন্যান্যদের অবস্থা আরো খারাপ। লোক সংগীত ও নৃত্যশিল্পী মাহিলিয়ভ ভোলা সেমচাঙ্কা অ্যামনেস্টিকে বলেছেন যে তিনি ২০২০ সালের অক্টোবরের পর থেকে “অননুমোদিত” সভায় অংশ নেওয়ার কারণে একাধিক গ্রেপ্তার এবং জরিমানার মুখোমুখি এবং কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হয়েছেন। প্রথমবার সেমচাঙ্কা তার বাইক চালানোর সময় গ্রেপ্তার হয়ে সাত দিন আটক ছিলেন। দ্বিতীয়বার, তাকে তিন দিনের জন্যে আটক করে তার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ চলার সময় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বেলারুশীয় লোকসংগীত গেয়ে “একটি গানের মাধ্যমে প্রতিবাদ” করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

“আমার প্রথম আটকের পরে আমি বাড়িতে আসতে ভয় পেয়েছিলাম, বেশিরভাগ রাতে আমি বন্ধুদের বাড়িতে ঘুমাতাম। এখন আমি এই নিত্য বিপদ নিয়ে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমরা সবাই যেকোন মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হতে পারি,” অ্যামনেস্টিকে বলেছেন সেমচাঙ্কা।

বেলারুশ অ্যামনেস্টির জ্যেষ্ঠ্য প্রচারক আয়েশা জঙ্গের মতে, কর্তৃপক্ষ সব ধরনের ভিন্নমতের চিহ্ন দমন করার উদ্দেশ্যে পদ্ধতিগতভাবে “বেলারুশের স্ব্তস্ফূর্ত সাংস্কৃতিক জীবন এবং এর সবচেয়ে সৃজনশীল সদস্যদেরকে ধ্বংস করছে।”

জরিমানা, আটক বা নির্বাসনের মতো রাষ্ট্রের ক্রমাগত চাপে থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিক, চিত্রকর, সংগীতশিল্পী এবং অনলাইনে প্রভাব সৃষ্টিকারীরা লুকাশেঙ্কাকে চ্যালেঞ্জ জানানো প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ও বিরোধী আন্দোলনের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।

বেলারুশের বিক্ষোভের ওপর গ্লোবাল ভয়েসেসের বিশেষ কাভারেজ পড়ুন।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .