বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

করোনায় ‘নাই’ হয়ে যাচ্ছে নতুন-পুরোনো বইয়ের দোকান

নীলক্ষেত পুরোনো বইয়ের মার্কেট। পুরোনা, দুষ্প্রাপ্য, দুর্লভ কিংবা আউট অব প্রিন্ট বইয়েরও সন্ধান পাবেন এই মার্কেটে। ছবি তুলেছেন ফ্রান্সিসকো এনজোলা। ক্রিয়েটিভ কমন্স (সিসি বিওয়াই ২.০) লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুস্রোত বেড়েই চলছে। সংক্রমিতের সংখ্যায় বিশ্বে অষ্টাদশ এখন বাংলাদেশ। সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে এখন মৃত মানুষের স্বজনদের হাহাকার।

এরই মাঝে দেখা যাচ্ছে মহামারীর কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয় এর লক্ষণ। এই সুনামি'র প্রথম লক্ষণগুলির মধ্যে একটি হ'ল জুন মাসে লকডাউন নিষেধাজ্ঞাগুলি সহজ করার পরেও রাজধানী ঢাকার অনেক দোকান ক্রেতার অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমন বিপর্যয়ে রয়েছে বিশেষ করে বইয়ের দোকানগুলি।

এবছর মার্চ মাসে করোনাভাইরাস রোধে লকডাউন শুরু হলে রাজধানী-ঢাকা সহ দেশের বেশিরভাগ এলাকায় বইয়ের দোকানগুলি বন্ধ হয়ে যায়। এইসব দোকানের ক্রেতারা বেশিরভাগই বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী এবং পেশাদার। তবে এইসব বইয়ের দোকানকে আয়ের ধারায় ফেরানোর জন্যে তাদের অচিরেই বইয়ের দোকানে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় দুই কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। সেই অনুপাতে সৃজনশীল বইয়ের দোকানের বেশ অভাব রয়েছে। যে কয়েকটা ভালো বইয়ের দোকান রয়েছে, করোনায় সেগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে পুরোনো বইয়ের সবচেয়ে বড়ো মার্কেট হলো নীলক্ষেত। পুরোনা, দুষ্প্রাপ্য, দুর্লভ কিংবা আউট অব প্রিন্ট বইয়েরও সন্ধান পাবেন নীলক্ষেত পুরোনো বইয়ের মার্কেটে। মোস্তফা বইঘরের অবস্থান এই মার্কেটেই। ত্রিশ বছর আগে শুরু করেছিলেন। করোনা এসে দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে দিলো

View this post on Instagram

sidewalks as open book shop…#nilkhet

A post shared by Jimi Chakma (@jimichakma) on

পুরোনো, প্রকাশনা বন্ধ বই সংগ্রহের সুযোগের পরিসমাপ্তি

নীলক্ষেতে পুরোনো, নতুন আরো অনেক বইয়ের দোকান আছে। মোস্তফা বইঘর কেন অনন্য, সেটাই জানালেন লেখক শোয়েব সর্বনাম:

বাংলা ভাষায় প্রকাশিত যে কোন রেয়ার বই, প্রিন্ট আউট বই, হারায়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বইটা দরকার হইলে একমাত্র ভরসা ছিল মোস্তফা।
মোস্তফা হয় একজন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন লোক। যে কোন বইয়ের নাম বললেই সে চোখ বন্ধ করে সেই বইটার লেখকের নাম, প্রকাশনীর নাম, গায়ের দাম গড়গড় করে বলে দিতে পারে। তার চেয়ে বড় কথা, যেইখান থেকেই হোক বইটা ঠিকই জোগাড় করে এনে দিতে পারে!

মোস্তফা বইঘরের মালিক হলেন মোস্তফা নামের এক ব্যক্তি। বাংলা বই নিয়ে তার জানাশোনা অনেক গভীর। এহসান ইসলাম সেটাই তুলে ধরেছেন তার ফেইসবুক পোস্টে:

বই অনেকেই বিক্রি করে নীলক্ষেতে, পাঠক অনুযায়ি আগ্রহ জাগানিয়া বইও তুলে দিতে পারেন নাকের সামনে, কিন্তু বইয়ের প্রসঙ্গ ধরে আরেকটা বইয়ের খবর সবাই দিতে পারে না। আমি অজস্র দিন দেখেছি, মোস্তফা ভাই ঝুঁকে পড়ে বই পড়ছেন। নিতান্ত ফ্ল্যাপ নয়, ভেতরের পাতা উল্টে উল্টে পড়ছেন। গল্পের চমকলাগা খটকা নয়, প্রবাহটুকুও বলতে পারেন। পরের মুখে ঝাল খাওয়ার মতো শুনে শুনে আত্মস্থ করে তা বলা যায় না, বোঝা যায়।

মোস্তফা বইঘরের মতো পুরোনো বইয়ের দোকান বন্ধ হওয়ার ক্ষতি প্রসঙ্গে গবেষক, নাট্যকার নজরুল সৈয়দ লিখেছেন:

পরিবারে বিশাল বিশাল কয়েকটা তাক ভর্তি পুরনো পোকায় কাটা বই অধিকাংশ পরিবারের জন্যই অভিশাপের। অনেকটুকু জায়গা খেয়ে ফেলছে! হয়তো আস্ত একটা ঘরই দখল করে আছে! এগুলো কেউ পড়ে না, ছুঁয়েও দেখে না। পরিবারের বৃদ্ধ মানুষটি ঘোলা চোখে মাঝে মধ্যে তাকান, ধুলো ঝাড়েন, গন্ধ নেন। পরিবারের তরুণ সদস্যরা অপেক্ষা করে থাকে বুড়োর একটা গতি হলে এই জঞ্জাল ঝেঁটিয়ে বাড়ি থেকে বিদায় করার।
[…]

এই বইগুলো তখন কিনে নেন মোস্তফা মামারা। হয়তো একা পারেন না, কয়েকজন মিলে কিনে নেন। লট ধরে কিনে নেন। তারপর ফোন যায় আমাদের কাছে, যারা পুরনো বইয়ের পুরনো ক্রেতা। তাঁরা ঠিক চেনেন এই শহরে কে কে এই বইগুলো কিনতে পারে। আমি নিজে অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য বই কিনেছি এই সুবাদে।

মোস্তফা মামাদের পেশা বদলের ফলে এই ব্যাপারটি ঘটার আর সুযোগ থাকবে না। বইগুলো তখন চলে যাবে ভাঙ্গারির দোকানে। এমন অসংখ্য বই, যেগুলোর সারা পৃথিবীতেই হয়তো আর কোনো কপি নেই, কেউ জানেও না তার খবর… যে বইটা পেলে বিনিময়ে সমরখন্দ বুখারা দিয়ে দিতে রাজী, সে বইটার পুরনো পাতাগুলো ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হতে হতে… হারিয়ে যাবে বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির অমূল্য সব দলিল…

বাংলাদেশে সৃজনশীল বইয়ের দোকান দিন দিন কমছে

করোনাভাইরাসের কারণে শুধু মোস্তফা বইঘর নয়, নালন্দা, মধ্যমা, পেন্সিল নামের বইগুলোর মত বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে দীপনপুর নামের বৃহৎ পরিসরের বইয়ের দোকানটিও। দীপনপুর শুধু বইয়ের দোকান ছিল না, সাহিত্য সংশ্লিষ্ট নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো সেখানে। একটি ক্যাফে ছিল সেখানে যা সৃজনশীল মানুষদের আড্ডায় মুখরিত থাকতো সবসময়। উল্লেখ্য, মৌলবাদী হামলায় নিহত প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের স্মৃতির স্মরণে এই বইঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটিকে ফিরিয়ে আনার জন্যে সোচ্চার হচ্ছে অনেকে।

এদিকে সৃজনশীল বইয়ের দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পিছনে প্রকাশকরা পাঠকদের বই না কেনার কথা বলেন। লেখক মুনমুন শারমীন শামসও মনে করেন, বাঙালির জীবনে এখন বই সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ঢাকার মতো বিপুল জনসংখ্যার একটা শহরে ভালো বইয়ের দোকানের অপ্রতুলতার কথা তুলেছেন তার এক লেখায়

পুরোনো ঢাকার এক লাইব্রেরী (টেক্সটবুকের দোকান)। ছবি ফ্লিকার থেকে ডেভিড ব্রিউয়ারের সৌজন্যে। ( সিসি বাই-এসএ ২.০)।

বাংলাদেশে বইয়ের ডিজিটাল সংস্করন এখনো সহজলভ্য নয়

বাংলাদেশে ডিজিটাল বই প্রকাশ বা পড়ার অভ্যাস অনেক কারণেই গড়ে উঠেনি, যার মধ্যে রয়েছে ইলেক্ট্রনিক ই-বুক রিডারের উচ্চ মূল্য এবং ই-বুক পাঠকদের চাহিদার অভাব। রিফাত মুনিম এই বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় অনলাইন প্রকাশনার স্ক্রোল.ইনে লিখেছেন:

Although many publishers, such as the University Press Limited, are increasingly considering the potential of releasing ebooks, digital editions are yet to gain wider currency in Bangladesh, mainly owing to cultural orientation, and also because of the high prices of devices.

যদিও ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের মতো অনেক প্রকাশক ইবুক প্রকাশের সম্ভাবনা ক্রমশঃ বিবেচনা করছেন, ডিজিটাল সংস্করণগুলি এখনও বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি; মূলতঃ সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে, এবং অনেকটা ডিভাইসগুলির উচ্চমূল্যের কারণেও।

তবে, রিফাত মুনিম উল্লেখ করেছেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বইয়ের প্রকাশের হার বৃদ্ধি পেয়েছে:

In 2010, a little more than 3,000 books were published yearly, and the number now exceeds 6,500. Members of the Academic and Creative Publishers Association of Bangladesh reckon that more than 75% of books are launched during the Ekushey Book Fair, the country’s biggest book event. Currently, some 2,00,000 people depend directly on the publishing industry for their livelihoods, with nearly 10 times as many people involved indirectly with the industry.

২০১০ সালে বছরে ৩,০০০ এরও বেশি বই প্রকাশিত হত বাংলাদেশে এবং বর্তমানে সংখ্যাটি ৬,৫০০ ছাড়িয়েছে। তবে এর ৭৫% প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমীর একুশে বইমেলা চলাকালীন সময়ে (ফেব্রুয়ারি মাসে) – এমনটি মনে করেন একাডেমিক অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সদস্যরা। বর্তমানে প্রায় ২,০০,০০০ লোক তাদের জীবিকার জন্য সরাসরি প্রকাশনা শিল্পের উপর নির্ভর করে, এবং তার প্রায় দশগুণ লোক এই শিল্পের সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত।

২০২০ সালে একুশে বইমেলায় নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে ৪ হাজার ৯১৯টি, আর বিক্রির হিসাবে ৮২ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। আর সারাবছর কী পরিমাণ বই বিক্রি হয়, সে হিসাব জানা যায় না।

গত কয়েক বছরে, দেশে কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম দেখা গেছে যারা বইয়ের হার্ড কপি বিক্রি করে। দেশটির সবচেয়ে বড় অনলাইন বইয়ের দোকান রকমারিতে বছরে প্রায় ১০ লাখ বই বিক্রি হয়।

কিন্তু মোস্তফা বইঘর এবং দীপনপুরের মতো জনপ্রিয় বইয়ের দোকানগুলি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্ষতিটি কি অনলাইন প্লাটফর্মগুলো পূরণ করতে পারবে?

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .