বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

মতাদর্শের অপচ্ছায়া এবং ভেনেজুয়েলার শিক্ষা ব্যবস্থা

সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব ভেনেজুয়েলার প্রশাসন, আধুনিক ভাষা এবং শিক্ষা অনুষদ। ছবি ওয়ারাইরারেপানো ও গুয়াইচাইপুরোরসৌজন্যে। ক্রিয়েটিভ কমনস লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত।

কয়েক সপ্তাহ আগে, একটি খবর শুনে আমার ঘুম ভাঙল। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ঘোষণা দিয়েছেন যে উনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সকল মানবিক অনুষদ বন্ধ করে দিতে বদ্ধ পরিকর। উনি বলেন, “সকল বিশ্ববিদ্যালয়কে “স্বদেশ পরিকল্পনা ২০২৫” (অথবা প্লান দে লা পাত্রিয়া) এর আওতাধীন থাকতে হবে, প্রকারন্তরে উনি যেন এটাই বললেন, তারা একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ মেনে চলতে বাধ্য।

মাদুরো বলেন, “আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেইসব অনুষদ থেকে বের হওয়া হাজারো বৃত্তিধারীদের রাখতে পারিনা, যারা দেশের উন্নয়নে সামান্য অবদানও রাখছেনা।” তার মানে যেন কলা, আধুনিক ভাষাশিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বিষয়াদি (কুটনৈতিক বিষয়ও বলা হয়) রাষ্ট্রের উন্নয়নে কোন ভুমিকাই রাখছে না।

খবরটি পড়ে আমি রীতিমত শিউরে উঠলাম। আমিও সেই বিষয়গুলোর একটিতে পড়াশুনা করেছি বলেই নয়, বরং এই জন্যে যে এটি ভেনেজুয়েলার আগামি প্রজন্মের সকল সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পড়াশুনার উপর সরাসরি আঘাত।

অবশ্য এই খবরে আমি ততটা অবাক নই। গত তিন বছরে, বিশেষ করে গত বছরের বিক্ষোভগুলো – “বিপ্লব” যেভাবে মৌলবাদে রূপান্তরিত হয়েছে । বরং আমি, শিক্ষা ব্যবস্থার উপর সরকার নিজের মতাদর্শিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা চাপানোর জন্য কতটা অপ্রতিরোধ্য কতটা মুর্তিমান হয়ে উঠতে পারে, সেটা দেখে অবাক হচ্ছি ।

এরকম যে প্রথমবার হচ্ছে তা নয়, আর শুধু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই এর শিকার নয়

সমাজবিজ্ঞানী পি মন্তব্য করেন যে, “এরকম কিছু একটা ঘটা খুবই অবশ্যম্ভাবী ছিল।” গত তিন বছরে সরকার স্কুল পাঠ্যসুচিতে যে পরিবর্তন এনেছে সেটা পি খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করেছেন। উনি আরো বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই প্রতিবাদের মুল ঘাঁটি যা সরকার অনেক চেষ্টা করেও দমন করতে পারেনি।”

এরকম কিছু যে প্রথমবার হচ্ছে তা নয়, কয়েক বছর আগে, “Colección Bicentenaria” নামক স্কুলের একটি পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে বলে  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক আলোচনা হয়। সরকার যে শুধু সম্পুর্ন ভিন্ন এবং নিজের সুবিধা মত বানোয়াট ইতিহাস তৈরি করেছে তাই নয়, তারা এমন একটি ইতিহাস রচনা করেছে যাতে তাঁদের মতাদর্শ ভবিষ্যৎের মতামতগুলোকে একপথে এনেছে।

পি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন । আমি সেখানে তার অফিসে দেখা করতে যাই। তিনি আমাকে দুঃখভারাক্রান্ত দৃষ্টি দিয়ে তার অগোছাল লাইব্রেরি থেকে একটি বই বের করলেন। সেই কুখ্যাত “কলেকসিওন বাইসেন্তেনারিয়া” বইটির একটি কপি। উনি লক্ষ্যহীন ভাবে একটি পাতা খুলে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন, যেখানে দেখা যাচ্ছে, গাছের নিচে একটি মেয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছে আর শেভেজ তার রাষ্ট্রপতির পোষাকে মেয়েটিকে ধরে আছে ।

“স্বদেশ পরিকল্পনা”

পি বললেন, “সরকার খুব সতর্কতার সাথে তাদের মতাদর্শের জন্য একটি প্রজনন স্থল তৈরি করছে।” তিনি আমাকে কারাকাসের একটি সরকারি স্কুলের ছবি দেখালেন, যেখানে কিছু শিশু শেভেজের ছবির সামনে ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়েছে। ছয় বছরেরও কম বয়েসি এই শিশুগুলো ক্যামেরার সামনে তাদের দাতহীন মাড়ি দেখিয়ে হাসছে আর মিলিটারি সেলুট দিচ্ছে।

সরকারের এই “স্বদেশ” নামক পরিকল্পনাটা আমাকে ভাবায়। এটি এমন একটি ধারণা যা শুধু দেশের ইতিহাস আর অধিবাসীদেরই অন্তর্ভুক্ত করে না, এর মতাদর্শকেও ধারণ করে। এই “স্বদেশ পরিকল্পনা” যেন একটি নতুন দেশ, যেখানে আছে শুধু আরোপিত মতাদর্শ, সস্তা উগ্র দেশপ্রেম আর সুদৃঢ় সামরিক আয়োজন।

ধীরে ধীরে, নতুন ভেনেজুয়েলানরা মেনে নেবে যে, “শেভিজমো” শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি তাদের ভেনেজুয়েলান পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বছর দুই আগে যখন শিক্ষা মন্ত্রনালয় স্কুলের পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনে তখন আরেকটি ছোটখাটো কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। সরকারি দস্তাবেজ অনুযায়ী স্কুলগুলোর শিক্ষা পদ্ধতি ছিল “সরল, সঙ্কোচনমুখী এবং যান্ত্রিক”।

স্কুলের নতুন পাঠ্যসূচির প্রস্তাবনায় কোন বিষয়ভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক রাখা হয়নি, বরং বিভিন্ন প্রসঙ্গ বিষয় শেখানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এখানে আরো প্রস্তাব করা হয় যে, এই বিষয়গুলো অবশ্যই “স্বদেশ পরিকল্পনার পাঁচটি ঐতিহাসিক উদ্দেশ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি হতে হবে”।

পি আমাকে ব্যাখ্যা করলেন যে, এই সব সংস্কারের সাথে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের কোন সম্পর্ক নেই, বরং আছে উদ্দেশ্য প্রণোদিত অশুভ রাজনৈতিক আগ্রাসন। শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে “স্বদেশ পরিকল্পনার” এই ঐতিহাসিক বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবনাটি হুগো শেভেজের নিজ হাতে লেখা। ২০০৭ সালে “বলিভারিয়ান জাতীয় পাঠ্যক্রম” নামক একটি উপস্থাপনার উপর ভিত্তি করে একটি সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, তখন থেকেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

যদিও এই পরিকল্পনা ভোটের মাধ্যমে বাতিল হয়ে যায়, তবে ধীরে ধীরে বিভিন্ন অধ্যাদেশের মাধ্যমে সর্বসম্মতি ছাড়াই এটি আরোপ করা হচ্ছে।

এসব শুনে আমি কল্পনা করি আগামী দশকে ভেনেজুয়েলায় যে প্রজন্ম বেড়ে উঠবে তাদের কথা। এমন একটি প্রজন্ম যারা তাদের সরকারের কাছ থেকে প্রজ্ঞাপনপত্র পেয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। যেভাবে তাদের জীবন চালানো হচ্ছে সেটাকেই তারা তাদের মতাদর্শ ধরে নেবে। যে প্রজন্মের কাছে ভিন্নমত মানেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা। একটি মতদীক্ষ্য দেশ যেখানে কোন তর্ক বিতর্ক নেই। নীরব একটি দেশ।

আমার এমন একটা দেশের কথা ভাবলেই ভয় লাগে। যখন আমি কারাকাসের নোংরা কলহময় রাস্তা দিয়ে হাটি, আমি হতভম্ব হয়ে দেখি শেভেজ চারপাশ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একটি সর্বভুক প্রেতাত্মা যেন ওই হলুদ বিলবোর্ড আর ছেড়া পোষ্টার থেকে বের হয়ে আসছে। আর রাজনীতি সব সময় সবখানেই যেন ভয় আর বিশৃংখলার প্রতীক।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .