বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

স্বেচ্ছাসেবকের খসড়া খাতায় গ্রিসের শরণার্থী শিবিরটি যেমন

রিতসোনা শরণার্থী শিবিরে ইসমাইল ইয়াজিদির তৈরি একটি দেয়ালচিত্র, ৩ মে, ২০১৬ – ছবি: রিতসোনা শরণার্থী শিবির ফেসবুক পাতা।

মাই এল-মাহদির লেখা

গ্রিসে সিরীয় শরণার্থীরা। এতদিনে হাজার হাজার ব্লগ পোস্ট, পত্রিকার নিবন্ধ এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে যুদ্ধ ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি জীবনের মরিয়া আশায় একেকটি পরিবারের সাগরে সলীল সমাধির গল্প ছড়িয়ে পড়েছে। আমি নিশ্চিত এমনকি যারা ঘটনাক্রমে হিংস্র ঢেউ পেরিয়ে বেঁচে শুধু সেই অমানবিক, “সাময়িক” শিবিরগুলোতে বছরের পর বছর কাটানোর জন্যে যেতে পেরেছে তাদের নিয়ে আরো বেশি গল্প বেরিয়েছে। কিন্তু ভালোর জন্যে হোক বা খারাপের জন্যেই হোক আমি উদ্বাস্তুদের নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছি না – যে জীবনে তারা সিরিয়ায় পিছনে ফেলে এসেছে অথবা কিভাবে তারা শেষ পর্যন্ত গ্রিসে এসে পৌঁছেছে। আমি তাদের বর্তমান অবস্থা ও এই মানবিক সংকটের অবসান ঘটানোর জন্যে আমাদের তাদের সাহায্য করার ভূমিকা –অথবা সেটার অভাব – নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি।

সম্প্রতি আমি গ্রিসে জাতিসংঘ অভিযানের পাশাপাশি পাঁচটি আলাদা মানবিক এনজিওর কর্মকেন্দ্র রিতসোনা শিবিরে কয়েক সপ্তাহ অতিবাহিত করে এসেছি। রিতসোনা হলো এথেন্সের কেন্দ্রস্থল থেকে উত্তরে এক ঘন্টার গাড়িপথ দূরত্বে ইউবোয়েয়া দ্বীপের প্রধান শহর চালকিসের বাইরে অবস্থিত একটি পুরাতন সামরিক ঘাঁটি। এখানকার জনসংখ্যার মোটামুটি দুই-তৃতীয়াংশই সিরীয় আর বাকি এক-তৃতীয়াংশ কুর্দী, ইরাকী এবং আফগান।

ডুবে যাওয়া মর্যাদা

শিবিরে জীবনের রূঢ় বাস্তবতাগুলোর একটি হলো সেখানে টিকতে পারা তো দূরের কথা সেটা পরিমাপ করাই কঠিন – সেখানে আত্মসম্মান আর মর্যাদার এতটাই অভাব যে এটা এতটাই নিচে নেমে গেছে যেনে মনে হচ্ছে ডুবে তলিয়ে যাওয়ার আগে হিংস্র ঢেউ এটাকে গ্রাস করে ফেলেছে। এটা মর্যাদার অবনমিত অনুভূতি – তাবু থেকে বেরিয়ে মাসের পর মাস ধরে আপনার “সাময়িক” আশ্রয় হয়ে ওঠা অস্থায়ীভাবে নির্মিত কোন কাফেলার (ক্যারাভান) বাক্সে গিয়ে খুশি থাকার মতো। এটা এমন একটা মর্যাদাবোধ যে এনজিও কর্মীদের দয়ায় আপনার সমগ্র জীবিকা হারিয়ে ফেলা – যারা তাদের কর্তৃত্ব এবং জনগণের পক্ষ থেকে নেয়া তাদের সিদ্ধান্তে উদ্বাস্তুরা যেটুকু পাচ্ছে তাদের সেটুকু গ্রহণ করে খুশি থাকতে শেখায়। যে মানুষ ইতোমধ্যে ভেঙ্গে পড়েছে তাদের সঙ্গে কেন এটা করা হয়? আমরা স্বেচ্ছাসেবকরা কি সব সময় জানি তাদের জন্যে কোনটা সবচেয়ে ভাল? আমরা কি আমাদের পক্ষ থেকে অন্যদের একই রকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি দিই?

পছন্দ করার স্বাধীনতা সম্পর্কে এটা বলা হচ্ছে না; এটা জনগণকে তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেয়া এবং ভুল করার সুযোগ দেয়া সম্পর্কেও নয়। এটা আত্ম-নিয়ন্ত্রণের ব্যাপার। শরণার্থীরা চিন্তা করতে পারার মতো প্রতিটি ঝুঁকি নেয় কারো নিয়ন্ত্রণের একেবারে বাইরে থাকা বিষয়গুলির উপর নির্ভর করে কোন শিবিরে – দৈবক্রমে – শুধু পৌঁছানোর আর ভাল বা মন্দ খারাপ নির্বিশেষে অন্য কারো সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাছে আত্মসমর্পণের জন্যে।

“চলুন ইংরেজি শেখানো যাক!” প্রত্যেকেরই ইংরেজি শেখা দরকার এবং শিখতে চায়, ঠিক আছে? বাবা-মায়ের এবং শিশুদের নিজেদের ইচ্ছে এড়িয়ে “চলুন শিশুদের জন্যে খেলনা কেনা যাক।” খাদ্য বা জামাকাপড়ের জন্যে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিস্থিতির কারণে নিষ্ঠুর বাস্তবতার অংশ। একজন মানুষ হিসেবে আপনি কম মূল্যবান হয়ে উঠেছেন।

যুগ যুগ ধরেই শরণার্থীরা খাদ্য বা জামাকাপড় জন্যে লাইন ধরতে চায় না: আজকে তারা চায় ঠিক একজন বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ, ইসরায়েলী দখলদারিত্বের মুখে একজন ফিলিস্তিনি, অথবা বিশ্বের যেকোন স্থানের একজন নারীর মতো তাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করা হোক। লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ব্যথার একটি অংশকে আপনার স্বীকার করতে হলেও, যুদ্ধাঞ্চলের বাইরে থাকা আপনাদের কিছু লোককে কখনো এটা সহ্য করা তো দূরে থাক এমনকি চিন্তাও করতে হয়নি। এটা হচ্ছে অপছন্দ না করতে দেওয়া – লাইনের শেষে খাদ্য নিয়ে দাঁড়াতে পেরে অথবা সামাজিক গণমাধ্যমে আপনার জন্যে দুঃখ অনুভব করা একটি ছবিতে রূপ দান করতে পেরে কৃতজ্ঞ হওয়ার – প্রস্তাব পাওয়ার হতাশা।

সম্ভবত: আমাদের শরণার্থীদের প্রতি আচরণের দিকে এমনভাবে নজর দিতে হবে যেন এগুলো তাদের নিজেদের অর্জিত একটি অধিকার, তাদেরকে দিতে চাওয়া আমাদের দাতব্য কিছুর মতো নয়। তাদের নিজেদের জন্যে লড়তে দেয়ার সুযোগ করে আমাদের প্রচেষ্টাগুলোর লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। হয়তো এটা তাদের নিজেদের মুক্তির জন্যে – বিশেষ করে সেটা আমাদের যেখানেই নিয়ে যাক না কেন – পথ করে দেয়ার মতো একটা সহজ ব্যাপার। যে দেশে তাদের স্থানান্তর করা হবে, তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, তাদের এবং তাদের সন্তানদের শিক্ষা প্রদান ইত্যাদি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে তাদেরকে অধিকার সম্পর্কে আমাদের শিক্ষিত করে তোলা দরকার।

সম্ভবত: আমাদের তাদের দিকে এমনভাবে দৃষ্টি দিতে হবে যেমনভাবে আমরা চাই তারা আমাদের দিকে দৃষ্টি দিক: মর্যাদা ও আত্মসম্মানের সঙ্গে।

আসলেই কি আমরা সাহায্য করছি?

স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এটা একটা মজার ব্যাপার, যেভাবে অন্যান্য আরো সবার সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে চাকাগুলো চালু করে আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছেছি। নির্দিষ্ট একটি মিশন সম্পাদনের জন্যে নিয়ে আসা অস্থায়ী বহিরাগতদের মতোই, আমরা যেন গল্পের কোন অংশ নই। তবে আমরা পছন্দ করি বা না করি, আমরা আখ্যানটিরই অংশ, এবং এটিকে ভালভাবে প্রভাবিত করছি।

ব্যক্তি হিসেবে আমরা আমাদের অহংবোধের সঙ্গে যুদ্ধ করি। একটা জিনিস বুঝতে হবে – আসলে খুব অল্প সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকরাই সেটা করার মতো যথেষ্ট শক্তি রাখেন। অবশ্য আমাদের অহংবোধ দমন করাটা সম্পূর্ণ একটা ভিন্ন গল্প। অনিবার্যভাবেই স্বেচ্ছাসেবকরা সম্ভবত: অভাবীদের খাবার খাওয়ানোর পরিবর্তে নিজেদের অহমিকাকে গুরুত্ব দিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। ফলাফলটা এতটাই লোভনীয় যে অনেকে এক মিনিটের জন্যে থেমে নিজেদের জিজ্ঞাসা করতে ভুলে যান: আসলেই আমরা সাহায্য করছি কিনা?

অনেক স্বেচ্ছাসেবীদের দ্রুত সংযুক্ত হওয়া শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর দেয়াতে আশ্চর্যের কিছু নেই। তবে সেই সাহায্য কেমন?

স্বেচ্ছাসেবীরা শ্রেষ্ঠত্বের ভান না করে পারে না। শিবিরগুলোতে তারা ব্যাথায় ফুলে ওঠা একটি বুড়ো আঙ্গুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকে এবং যেটা সবসময়ই অনিচ্ছাকৃত নয়। স্বেচ্ছাসেবীরা প্রায়ই সময় ও দক্ষতার একটি মহান উৎসর্গের মাধ্যমে নিজেদের একজন মূল্যবান সেবা প্রদানকারী হিসেবে দেখতে চায়। তারা অন্যান্যদের মহান হওয়ার আশা করে এবং তাদের স্মরণ করিয়ে দেয় তারা যা করছেন তা করার কারণে তারা কতটা মহৎ।

কিন্তু এটা কোন পরিষেবা নয় – শরণার্থীদের অধিকার। আর এটা বিতর্কিত হওয়া উচিৎ নয়।

দানের তহবিল দিয়ে আমরা যে দোকান থেকে রিতসোনা শিবিরের মানুষের জন্যে কেনা-কাটা করতাম সেখানে একবার আমি আমার দানের পয়সায় ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে আরো পাওয়ার জন্যে দরকষাকষি করার চেষ্টা করলাম। ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা জুড়ে জীবিকা নির্বাহ করা মিশরীয় ক্যাশিয়ার “আমার সঙ্গে সম্পর্ক করতে” সম্মত হলো। তবে খরচ কমানোর পরিবর্তে সে আমাকে বেশি দাম লেখা একটি চালান লিখে দিতে চাইলো। তার মতে, অনেক স্বেচ্ছাসেবী এবং এনজিও কর্মী এরকম জাল চালান নিয়ে বাড়তি টাকাটা পকেটে পুরে নেয়। তাই তার কাছে এটা পরিষ্কার হলো যে এটা আমার কাছে নতুন। আর এজন্যেই সে মূল্য নড়চড় করেনি।

সেটা ছিল শুধু হিমশৈলের উপরিভাগ। কিছু স্বেচ্ছাসেবী অনুদান থেকে তাদের ভ্রমণের খরচ কেটে নেয়। বৃহত্তর স্বচ্ছতার জন্যে আবেদন সত্ত্বেও মাত্র অল্পকিছু এনজিও আসলে তাদের আর্থিক বিবরণ প্রকাশ করে। এমনকি তার চেয়েও কম দাতারা এসবের বিস্তারিত জানতে চায়। আমরা যা চাচ্ছি সেরকম যদি পরিবর্তন হয়, শুরু করার জন্যে সম্ভবত: এটা একটা ভাল জায়গা।

আমার মতে, শরণার্থীদের সাহায্য করার জন্যে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সম্পূর্ণভাবে এনজিওদের পাশ কেটে যাওয়া। শরণার্থীদের সাথে আমাদের সরাসরি যুক্ত হওয়া কোন কঠিন কাজ নয়।  তারা আমাদের মতো মানুষ শুধু ভিন্ন পরিস্থিতিতে আটকে যাওয়া। তাদের প্রতি অসুস্থ্য বা অক্ষম রোগী হিসেবে আচরণ করলে কোন কাজ হবে না।

শরণার্থীরা। ছবি: পিক্সাবে, পাবলিক ডোমেইন।

এটা নিয়ে আমার এক বন্ধুর ভিন্ন একটি ঘটনা রয়েছে। সে অত্যন্ত দক্ষ এবং তার কাজ সম্পর্কে অতিসতর্ক একজন বয়স্ক জার্মান ডাক্তার ভদ্রলোকের কাহিনী যুক্ত করেছে। রোগীদের প্রদত্ত সুবিধার মধ্যে তার সাধ্যমত সেরা চিকিত্সা দেয়া তার কাজ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই ডাক্তার রোগীদের গ্রহণ করে্ন, তাদের রোগ নির্ণয় করেন, তাদের চিকিৎসা দেন। তিনি যে দেশে কাজ করেন সেখানকার ভাষায় কথা বলেন না, এবং তিনি খুব দূরবর্তী, প্রায় ঠান্ডা স্বভাবের। কিন্তু তিনি তার সামনে পড়া প্রত্যেকটি ব্যক্তির চিকিৎসা করেন, এবং তিনি চিকিৎসা সুবিধা স্থাপন এবং বিকশিত করে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেন যাতে তার চলে যাওয়ার পর প্রকল্পটি নিজেই টিকে থাকতে পারে। অনেকেই হয়তো তাকে চিনে না, তাকে গ্রাহ্য করে না, বা এমনকি তার কথা মনেও করে না, যদিও তিনিই সম্প্রদায়টিকে সরাসরি সাহায্য এবং উন্নতিতে সহায়তা করছেন। কোন কৃতিত্ব দাবি নয়। কোন লোক-দেখানো নয়। কোন আবেগ নয়। শুধু বিশুদ্ধ সমস্যা সমাধান।

আমার অবশ্য না মেনে নেয়ার কোন কারণ নেই। এনজিওরা স্বেচ্ছাসেবীদের উপর কঠোর নিয়ম আরোপ করে – বিকাল ৫টার পরে শিবিরে থাকতে নিষেধ করে। আমি এই নিয়মটি ঘৃণা করি। তাই কয়েক সপ্তাহ পরে আমি এনজিও থেকে আবাসন  শিবিরের মধ্যে সরিয়ে নিলাম। আমি একজন শরণার্থী বন্ধু এবং তার দুই মেয়ে্র সঙ্গে তাদের কন্টেইনারে থাকতে শুরু করলাম। আমি কখনোই বলবো না যে আমি তাদের জীবন যাপন করেছিলাম। কিন্তু আমি বলবো যে আমি আরো তীক্ষ্ণ একটা লেন্সের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করছিলাম।

আমি দূরবর্তীতা এবং পেশাদারিত্বের মাধ্যমে কাজে অত্যন্ত দক্ষ ও কার্যকর হওয়ার ব্যাপারে একমত হলেও আমি মনে করি যে ঘনিষ্ঠতাও এক্ষেত্রে সাহায্য করে। হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত আমাদের ছেড়ে আসতে হয়েছে; তবে নিশ্চিত যে বাস্তব পণ্য সরবরাহ করার চেয়ে শরণার্থীদের সঙ্গে আবেগগত বন্ধন গঠনে আমরা হয়তো আরো বেশি সময় এবং প্রচেষ্টা ব্যয় করতে পারতাম। আমি অস্বীকার করব না যে আমি আমার নিজের জ্ঞান ভাভাগাভাগি করার চেয়ে সিরীয় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে শরণার্থীদের কাছ থেকে আমি বেশি শিখেছি।

কিন্তু ঘনিষ্ঠ বন্ধন প্রতিষ্ঠা করে আমরা অন্যদের – এবং নিজেদেরকে স্মরণ করিয়ে দিই যে তারাও মানুষ। আর আমরা এই প্রক্রিয়ায় আরো মানুষ হই।

হাসপাতালগুলো সবসময় আপনার ভাষায় কথা বলে না

নিত্যদিনের চিকিৎসা প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে রিতসোনা শিবিরের বাসিন্দাদের সংখ্যার প্রাচুর্য থাকায় তাদের অনেককেই দেখাশোনা করা যেতো না। জরুরী ক্ষেত্রে অবশ্য গ্রিক জাতীয় জরুরী চিকিৎসা পরিষেবা (এপসিলনকাপ্পাআলফাবিটা, এথনিকো কেনত্রো এমসিস ভোয়থিয়াস) শিবিরের বাসিন্দাদের সবচেয়ে কাছের হাসপাতালটিতে আনা-নেয়া করতো।

কেউ হাসপাতালে যেতে চাইতো না, কিন্তু একটি ভিন দেশের মাটিতে আপনি একজন সিরীয় হলে সেটা এমনকি আপনার কল্পনার তুলনায়ও নিকৃষ্ট। শরণার্থীরা একাকীত্বের সাগর আর অজানার ভয়ে নিমজ্জিত হয়। এটা আপনি তাদের চোখে দেখতে পাবেন। আর শিবিরে যাত্রাপথের কঠোর পরিস্থিতি শিশুদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই বিশেষ করে মারাত্মক শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা তৈরি করে।

গ্রিক ডাক্তারদের অবশ্য অনেকেই না ইংরেজি বলতে পারতেন, আর না তাদের কোন অনুবাদক ছিল না এবং অধিকাংশ রোগী শুধু নিজেদের আরবি অথবা কুর্দিতে প্রকাশ করতে পারতো। প্রায়শ:ই বাসিন্দাদের হাসপাতালের জরুরী সেবা নিতে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করে চিকিত্সা পাওয়ার জন্যে তাদের কী করতে হবে সেটা কখনো বুঝতে পারার আশা ছেড়ে দিয়ে চলে আসতে হতো।

রোগীদের সঙ্গ দেয়া আমার কাজ হওয়ায় শিবিরে আমার আরবী ভাষা উপকারে এসেছিল। গত মে মাসে রিতসোনার কোন একটি এনজিও একটি অনন্য উদ্যোগ শব্দযুক্ত “হাসপাতাল চালানো” প্রবর্তন করে; যে দলটিতে আমি কাজ করেছিলাম। গ্রিক সেনাবাহিনীর লাইসেন্সের অধীনে পরিচালিত রেড ক্রসের সহযোগিতায় আয়োজিত একটি কর্মসূচী এটা। তারা চিকিৎসা পরিবহন, ইংরেজি, গ্রিক এবং আরবি অনুবাদ এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করে। এই দলটিও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে থাকে।

আমি সেই দলটির একজন গর্বিত সদস্য। প্রতিটি দিন আমাদের দিকে ছুঁড়ে দেয়া যে কোন সমস্যা, মামলা ও জটিলতা সামাল দিয়ে আমাদেরকে চালকিসের উপর দিয়ে লাফিয়ে অথবা এথেন্সের সব পথ মাড়িয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসতে হতো।

শিবিরটি মূলত: কাদার উপরেই তৈরি সেই বাস্তবতা ভুলে গিয়ে কাদামাখা জুতা নিয়ে আসার জন্যে অনেকসময় হাসপাতালের কর্মীরা আমাদের অনভিপ্রেত মনে করতো। আমি একদিন হাসপাতালে আসার কথা মনে করতে পারি। দেখি, সম্ভবত: শিবির থেকে আসা এবং নিশ্চিতভাবেই আরব একজন অল্পবয়সী নারী কারো সঙ্গ ছাড়াই সারাক্ষণ একা একা বসে ছিলেন। বোঝাই যাচ্ছে তিনি যোগাযোগ অথবা মহাদেশটিতে তার বয়ে নিয়ে আসা স্তুপীকৃত সব বেদনারাশি থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা একেবারে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে তার বিবরণ এবং একজন প্রিয়জনের (ফোন) নম্বর দিলেন যাতে আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি যেটা তিনি নিজে করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ভাগ্যক্রমে সব বাধা পেরিয়ে তিনি বেঁচে গিয়েছেলেন।

আমার মনে হচ্ছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না জলের সীমানা এবং জল শেষ পর্যন্ত কিভাবে সিদ্ধান্ত নিবে যে কাদেরকে উপরে উঠার সুযোগ দেওয়া হবে আর কাদেরকে ডুবে গিয়ে নিচে তলিয়ে যাওয়ার জন্যে ফেলে রাখা হবে।

মাই এল-মাহদি কারিগরি বিষয় নিয়ে কাজ করা আয়ারল্যান্ড-ভিত্তিক একজন মিশরীয়। তিনি #জানু২৫ বিপ্লবে অংশ নেয়া লক্ষ লক্ষ মানুষের একজন এবং পরবর্তীটিতে অংশ নেয়ার জন্যে তিনি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .