বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

এক টাকায় খাবার পাচ্ছেন বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা

ক্লাস শেষে ১ টাকা দিয়ে খাবার খাচ্ছে বিদ্যানন্দের শিক্ষার্থীরা। এক টাকার আহার ফেইসবুক পেইজ থেকে ছবিটি নেয়া হয়েছে। অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

ক্লাস শেষে ১ টাকা দিয়ে খাবার খাচ্ছে বিদ্যানন্দের শিক্ষার্থীরা। এক টাকার আহার ফেইসবুক পেইজ থেকে ছবিটি নেয়া হয়েছে। অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

এক টাকায় মিলছে দুপুরের খাবার! অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন ৪০০ বছর আগের শায়েস্তা খাঁ’র আমলের গল্প বলছি বুঝি! না, এখনকার সময়ের ঘটনা এটি।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে এক টাকার বিনিময়ে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি নিয়েছে বিদ্যানন্দ নামের প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা-সহ ৫টি জেলায় গত মে মাস থেকে এই প্রকল্প চালু হয়েছে। সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত প্রজেক্টের আওতায় ১২১,০০০ সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও বৃদ্ধদের মাঝে আহার বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিদিন ৩০০ পথশিশুর মাঝে এক টাকায় খাবার বিতরণ করা এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

এক টাকায় আহার প্রজেক্ট শুরু হয়েছিল বিদ্যানন্দের বেঁচে যাওয়া খাবার বাজেট থেকে। উল্লেখ্য, বিদ্যানন্দ মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবামূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সারাদেশে স্কুলটির ৫টি শাখা রয়েছে যেখানে ৭৫০ জনের বেশি সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। এই উদ্যোগের পিছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রয়েছেন কিশোর কুমার দাস। কিশোর বর্তমানে প্রবাসী। চাকরিসূত্রে বসবাস করেন পেরু’র লিমা শহরে। উদ্যোগের পিছনের কারণ প্রসঙ্গে তিনি গ্লোবাল ভয়েসেস-কে বলেন:

নিজেই ছিলাম মন্দিরের সামনে ক্ষুধার লাইনে। তখন চিন্তা ছিলো, আমিও একদিন ফিরিয়ে দিবো এই খাবার। সেই চিন্তা থেকে করা। আমাদের ৫টা স্কুলে প্রতিবছর দরিদ্র ছাত্রছাত্রী ঝড়ে পড়ে, তাঁদের আটকানো একটা কারণ ছিলো। আরেকটা কারণ ছিলো খুবই দরিদ্র শিশুদের স্কুলে টানার জন্য।

বাংলাদেশের সংবিধানে সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিতের কথা বলা হলেও দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ অভুক্ত অবস্থাতেই রাতে ঘুমাতে যান। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুরা।

বাংলাদেশে পথশিশুরা সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। এরা বেশিরভাগ রাস্তায়, বাস ও রেলস্টেশনে রাত কাটায়। ক্ষুধায় অন্ন জোটে না। এদের জন্যই এক টাকার আহার প্রজেক্ট।

টাকা ছিলো না সেদিন, তাই সবজী-ভাত দিচ্ছিলাম রেলস্টেশনে শিশুদের। এমন দিনগুলোতে ভদ্রবেশী উশৃঙ্খলরা আমাদের উপদেশ আর তিরস্কারে ভাসিয়ে দেয়। তেমনি সেদিন এক ভদ্রলোক বললেন, "এসব পচা খাবার খাবি কেন? আয় আমার সাথে, বিরিয়ানি কিনে দিচ্ছি।" এমন সময় ৯-১০ বছরের এক শিশু বলল, "আপুরা এতদুর থেকে খাবার নিয়ে আসে প্রতিদিন, উনাদের থেকে না খেলে তো উনারা কষ্ট পাবেন।" আরেকজন বলল, "আপনি তো প্রতিদিন আসবেন না।"  ছবি: এক টাকার আহার ফেইসবুক পেইজ। অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

“টাকা ছিলো না সেদিন, তাই সবজী-ভাত দিচ্ছিলাম রেলস্টেশনে শিশুদের। এমন দিনগুলোতে ভদ্রবেশী উশৃঙ্খলরা আমাদের উপদেশ আর তিরস্কারে ভাসিয়ে দেয়। তেমনি সেদিন এক ভদ্রলোক বললেন, "এসব পচা খাবার খাবি কেন? আয় আমার সাথে, বিরিয়ানি কিনে দিচ্ছি।" এমন সময় ৯-১০ বছরের এক শিশু বলল, "আপুরা এতদুর থেকে খাবার নিয়ে আসে প্রতিদিন, উনাদের থেকে না খেলে তো উনারা কষ্ট পাবেন।" আরেকজন বলল, "আপনি তো প্রতিদিন আসবেন না।" ছবি: এক টাকার আহার ফেইসবুক পেইজ এর সৌজন্যে। অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

‘আমি ২০০টা কচি ফুলকে অন্তত এক বেলা খাওয়াতে চাই’

শুরুতে বিদ্যানন্দের বেঁচে যাওয়া টাকা, আর এর প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাস অর্থায়ন করলেও পরে এতে অনেক মানুষ যুক্ত হয়েছেন। কেউ তার জন্মদিন উদযাপনের বাজেটের টাকা দিয়েছেন। কেউ ঈদের বোনাসের টাকা দিয়েছেন। কেউ টিউশনি’র জমানো টাকা নিয়ে অভুক্ত শিশুদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

শুধু ব্যক্তিগত অর্থায়ন নয়, সার্ভারঘোস্ট ফাউন্ডেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান গুগল থেকে পুরস্কারের প্রাপ্ত টাকা দিয়েছে প্রজেক্টে।

সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। ছবি: এক টাকার আহার ফেইসবুক পেইজ। অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। ছবি: এক টাকার আহার ফেইসবুক পেইজ। অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

যারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাদের একজনের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে প্রজেক্টের ফেইসবুক পেইজে:

আমি খুব ছোট একটা চাকরি করি, সম্বল খুব নেই। তবে ঈদে যে বোনাস পাইছি তা দিয়ে ২০০টা কচি ফুলকে অন্তত এক বেলা খাওয়াতে চাই।

পেইজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উনার অর্থাজনে ২০৩ জন শিশুর মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

এক টাকা দিয়ে খাবার কিনে খাচ্ছে শিশুরা। এক টাকার আহার ফেইসবুক পেইজ থেকে ছবিটি নেয়া হয়েছে। অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

এক টাকা দিয়ে খাবার কিনে খাচ্ছে শিশুরা। এক টাকার আহার ফেইসবুক পেইজ থেকে ছবিটি নেয়া হয়েছে। অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

‘আমি চেয়েছি শিশুদের ভেতর ‘ভিক্ষা’ শব্দটি মুছে ফেলতে’

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য খাবারের দাম এক টাকা রাখা প্রসঙ্গে কিশোর কুমার দাস এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন:

বিষয়টিকে যেন ভিক্ষা হিসেবে না দেখা হয় সেজন্য শিশুদেরকে এক টাকা দিয়ে খাবার কিনতে হয়। শুরুতে বিষয়টি নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করেছে, কিন্তু এখন শিশুগুলোর মধ্যে অহংবোধ এসেছে। অনেকে আজ বাকিতে খাবার নিলেও কাল এসে টাকাটা দিয়ে যাচ্ছে। আমি এ জায়গাটাই বদলাতে চেয়েছিলাম, শিশুদের ভেতর ‘ভিক্ষা’ এবং দাতাদের মধ্যে ‘দান’ শব্দটি মোছার জন্য।

খাবারের মেন্যুতে বেশিরভাগ সময় সবজি-ভাত থাকে। তবে কেউ অনুদান দিলে মাংস-পোলাওয়ের মতো ভালো খাবার জোটে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। আর এই খাবারগুলো রান্না করে থাকেন বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবীরা।

ভিডিও ভুবন ইউটিউবে এই প্রজেক্ট নিয়ে একটি ভিডিও প্রতিবেদন আপলোড করেছে:

দেখা গেছে, বাংলাদেশে বেশিরভাগ স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ একসময়ে এসে বন্ধ হয়ে গেছে। তাই ভবিষ্যতে যেন ‘এক টাকায় আহার’ প্রজেক্ট চালু থাকে, সেজন্য কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে কিশোর কুমার দাস গ্লোবাল ভয়েসেস-কে বলেন:

বেশীরভাগ প্রতিষ্ঠান শুরু হয় আবেগি মাথায়, অনভিজ্ঞ হাতে, বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে দুর্বল হয়ে হারিয়ে যায়, বিশেষ করে পেশা আর সংসার শুরু করে। আমরা শুরু করছি এসব স্টেজ পার করার পর। আরেকটি ব্যাপার হলো, অর্থের সংস্থান। উদ্যোক্তাকে নিজেই স্বাবলম্বী হতে হবে প্রতিষ্ঠান চালাতে, বিনা অনুদানে প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর চালানোর সক্ষমতা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদী চালাতে আমি নিজের ব্যবসার মালিকানা এই বিদ্যানন্দকে দিয়ে দিয়েছি, এটা দিয়ে এর খরচের অনেকটা পূরণ করা যাবে।

এক টাকার আহার প্রজেক্টকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে খাবার ভ্যান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রজেক্টের স্বেচ্ছাসেবকরা সেই ভ্যানে খাবার নিয়ে রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন জায়গায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে বিতরণ করছেন। একদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন কিছু খাবার ভ্যান আর দোকান থাকবে, যেখান থেকে শিশুরা নামমাত্র মূল্যে খাবার কিনতে পারবেন, এমন স্বপ্নই দেখছেন প্রজেক্টের উদ্যোক্তারা।

বস্তির শিশুদের জন্য খাবার রান্না করেছেন লিমা জিগজ্যাগ হোটেলে আগত অতিথিরা। এক টাকার আহার ফেইসবুক পেইজ থেকে ছবিটি নেয়া হয়েছে। অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

বস্তির শিশুদের জন্য খাবার রান্না করেছেন লিমা জিগজ্যাগ হোটেলে আগত অতিথিরা। এক টাকার আহার ফেইসবুক পেইজ থেকে ছবিটি নেয়া হয়েছে। অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

সীমানা পেরিয়ে

পেরু’র রাজধানী লিমাতেও এক টাকায় আহার প্রজেক্টের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সেখানে প্রতি সপ্তাহে বস্তির সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়। পেরুতে কিশোর কুমার দাসের একটি হোটেল ব্যবসা আছে। সেখান থেকে অর্জিত মুনাফা তিনি এই কাজে ব্যয় করেন। রান্নার আয়োজন হয় হোটেলের রান্নাঘরে। রান্নায় অংশ নেন হোটেলের অতিথি হিসেবে আসা বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা

কিশোর স্বপ্ন দেখেন, তার এই প্রজেক্ট একদিন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। অভুক্ত থাকবে না পৃথিবীর কোনো শিশুই। কারণ, ছোটবেলায় খাবারের আশায় মন্দিরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেছেন তিনি। বোঝেন ক্ষুর্ধাত মানুষের বেদনা। তাই পাশে দাঁড়াতে চান সুবিধাবঞ্চিত মানুষের।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .