বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

মালয়েশিয়া: মানব যখন পণ্য

২০০৯ সালের শুরুতে মালয়েশিয়া দু:খজনকভাবে বিদেশী তদন্তের কবলে পরে সুনাম নষ্ট করে। আমেরিকার সিনেট মালয়েশিয়ায় মানব পাচার নিয়ে একটি তদন্ত পরিচালনা করে। একটি সংবাদ সংস্থা জানাচ্ছে যারা পাচার হচ্ছে তাদের বেশীরভাগই মায়ানমারের নাগরিক, তবে অন্য বিদেশীদেরও একই সাথে সন্দেজজনক কারনে সরকারী কর্মকর্তারা মালেয়িশয়া-থাই সীমান্তে নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জোর করে টাকা আদায় করা হচ্ছে অথবা মানব পাচারকারী সিন্ডিকেট বা দল এর কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে।

এএফপির এক রিপোর্ট অনুসারে আমেরিকার একজন সিনেট কর্মকর্তা বলেন:

আমেরিকার বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগ এর কর্মচারীরা বার্মা (মায়ানমারের পুরোন নাম) এবং অন্য বিদেশী নাগরিক যারা মালয়েশিয়ায় অভিবাসী হয়েছিল তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া ও তাদের পাচারকারীদের হাতে তুলে দেবার উপর যে রিপোর্ট তৈরী করা হয়েছে তার উপর পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সন্দেহজনকভাবে দেখা হচ্ছে যে এতে মালেয়শিয়ার সরকারি কর্মকর্তাদেরও হাত রয়েছে— এই সব অভিযোগের মধ্য রয়েছে বার্মিজ ও অন্য অভিবাসী – তাদের কাছ ইউএনএইচসিআর-এর কাগজ থাকুক বা না থাকুক – তাদের প্রথমে মালয়েশিয়ার সরকারের বন্দীশালা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর তাদের থাই-মালয়েশিয়া সীমান্তে যানবাহন করে নিয়ে যাওয়া হয়।

অভিযোগের ভিত্তিতে বলা যায়, সীমান্তে তাদের কাছে টাকা চাওয়া হয়, অথবা দক্ষিণ থাইল্যান্ড-এ তাদের পাচার করার জন্য পাঠানো হয়। মালয়েশিয়া মানব পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, এটা হয়তো কোন নতুন বিষয় নয়। মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় বিরোধী দল নেতা মি: লিম কিট সিয়াং। তিনি তার ব্লগে পোস্ট করেছেন যে আমেরিকান সরকারের ২০০৭ সালের ট্রাফিকিং ইন পারসন (টিআইপি) বা ব্যক্তি পাচার নামক রিপোর্টে মানব পাচার তালিকার তৃতীয় স্থানে মালয়েশিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত করছে।

Photo courtesy of Adli Ghazali

ছবি আদলি গাজজালির সৌজন্যে

বিরোধী দলীয় নেতা চার্লস সান্তিয়াগো তার ব্লগে এক বিবৃতি দিয়েছেন:

সম্প্রতি আমেরিকান সিনেট বিবৃতি দিয়েছেন যে মালয়েশিয়ান সরকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিদেশী নাগিরকদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করার সাথে মানবাপাচারকারী দলের যোগ থাকা কোন বিস্ময়ের ব্যাপার নয়।

বার্মার উদ্বাস্তুদের ব্যাপারটি মাথায় রেখে আমি গতবছর এই বিষয়টি সংসদে তুলেছিলাম। আমার সাথে ছিল মানবাধিকার সংগঠন যেমন তেনাগানিতা এবং মাইগ্রেশন ওর্য়াকিং গ্রুপ (অভিবাসী শ্রমিক সংগঠন)। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ হামিদ আলবার বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে যান — পুরোন প্রথায় তিনি এই প্রশ্নের উত্তর দেন। সৈয়দ হামিদ আলবার আমার প্রশ্নের উত্তরে সংসদে বলেন অভিবাসী বিভাগ একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি তৈরী করেছে। আর এই তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কোন অভিবাসী কর্মকর্তা বার্মিজ বা অন্য কোন উদ্বাস্তু পাচারের সঙ্গে জড়িত নয়। হয় সৈয়দ হামিদ অভিবাসী বিভাগের গল্পটি বিশ্বাস করছে যে তারা নিজস্ব কমর্তকর্তারা এই অপরাধের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে, অথবা তিনি চাজ্ছেন মালয়েশিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে ধামা চাপা দিতে।

Photo courtesy of M.A.M09

ছবি এম.এ.এম০৯ এর সৌজন্যে

সান্তিয়াগো আরও বলেন:

যদিও উদ্বাস্তুদের কাছে ইউএনএইচসিআর এর কার্ড বা পরিচয়পত্র আছে তারপরও উদ্বাস্তুরা এখানে সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে কখন না তাদের অভিবাসী কর্তৃপক্ষ ধরে ফেলে। তারপর এবং তাদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়, যেখানে তারা রাজনৈতিক বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।

তারা ধারাবাহিক ভাবে রেলার (মালয়েশিয়ার এক স্বেচ্ছাসেবক দল) অফিসারদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়। তারা এখন স্থায়ী ভাবে শিকারীর মতো অভিবাসী এবং উদ্বাস্তুদের খুঁজে বেড়ায়। তারা এমনকি উদ্বাস্তুদের জঙ্গলে তৈরী করা অস্থায়ী ঘরবাড়ীও জ্বালিয়ে দেয়।

কর্মকর্তারা প্রথমে যদিও তাদের গ্রেফতার করে তবে পরে তারা অভিবাসী ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী উভয়কে একত্রে একটি ছোট্ট অভিবাসী কেন্দ্রে জমা করে। সেখানকার অন্যতম প্রধান শাস্তি চাবুকের আঘাত।

সংক্ষেপে উদ্বাস্তুরা অবহেলিত হিসেবে এদেশে বাস করে। যেহেতু মালয়েশিয়া এখন ১৯৫১ সালের উদ্বাস্তু নীতিমালাকে স্বীকৃতি দেয় না, তার মানে সরকারের সরকারী ভাবে উদ্বাস্তুদের স্বীকৃতি দেবার বাধ্যবাধকতা নেই। অথবা উদ্বাস্তুরা ইউএনএইচসিআর-এর যে কাগজপত্র বহন করে তা মানতে এই সরকার বাধ্য নয়।

এর দুর্ভাগ্যজনক আরেকটি মানে হলে মালয়েশিয়ার সরকার অভিবাসী অফিসের প্রতি আসা ক্ষমতা অপব্যহারের অভিযোগগুলো চোখ বন্ধ করে বাতিল করে দিতে পারে। তারা উদ্বাস্তুদের ভয় দেখিয়ে পকেটে টুপাইস কামিয়ে নিতে পারে। যারা টাকা দিতে পারে না সেই সমস্ত মেয়েদের নিয়ে সোজা পতিতালয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়। অথবা পুরুষদের ক্ষেত্রে মাছধরার নৌকা কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয় অথবা দাসখত লিখে তাদের শ্রমিক হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

ইতিমধ্যে যে সমস্ত উদ্বাস্তু এবং অভিবাসী এখন দেশটিতে দরখাস্ত করে অবস্থান করছেন, তারা উপযুক্ত পয়:নিস্কাশন, পায়খানা ও টয়লেট সুবিধা, গৃহায়ণ, খাবার এবং ওষুধ সুবিধা ছাড়াই বাস করছে। তারা এবং তাদের সন্তানরা কিছু কাগজের টুকরো ও অন্যের দয়ার উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।

দি স্টার নিউজপেপার এর ব্লগে মিনিয়াট্রুস বর্ণনা করছেন,

আমার ব্যাক্তিগত আশা যে আমেরিকা প্রমাণ করতে পারবে মালয়েশিয়ার অভিবাসী সংক্রান্ত কর্মকর্তাগণ মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। যদিও আমি মালয়েশিয়া অবৈধ অভিবাসী আসাকে সমর্থন করি না, কিন্তু মালয়েশিয়ান অভিবাসী বিভাগের মধ্যে এটা যেন স্বাভাবিক ঘটনা যে তারা বন্দী বা আটকে রাখা অবৈধ শ্রমিকের শ্রম (উৎপাদন) অপব্যবহার করবে।

কাজেই, আরো একবার- মালয়েশিয়ান সরকারের ভন্ডামি লম্বা সময় ধরে প্রকাশিত হয়েছে। তারা বিভিন্ন দেশের লোকদের সাহায্যের কথা বলে, কিন্তু আমাদের নিজেদের দেশে তার কর্মকান্ডের ঠিক নেই, এখানে আমাদের দেশে মানুষকে টাকার জন্য দাসের মতো ব্যবহার করা হয়।

বার্মিজ উদ্বাস্তু ও কাগজপত্রহীন অভিবাসী শ্রমিকরা এখানে যে সকল মালয়েশিয়াবাসীর কাছে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় তা সবার ভালোই জানা আছে। বেশীর ভাগ শহুরে লোক, অথবা যারা সুধী বা নাগরিক সমাজের সাথে জড়িত তারা মালয়েশিয়া আটক অভিবাসী শ্রমিকদের বন্দী রাখার ব্যাপারে যথারীতি সচেতন। তারা জানে ক্যাম্পে ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্যাতন হয়। মালয়েশিয়া যে মানব পাচারেরর জন্য একটা আদর্শ জায়গা, এটি তার পরবর্তী দুর্ভাগ্যজনক ধারাবাহিকতা।

Photo courtesy of Adli Ghazali

ছবি আদলি গাজজালির সৌজন্যে

তদন্তের উত্তরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতানুগতিকভাবে জানায়, মালয়েশিয়ায় এই ব্যাপারে কোন অনিয়ম বা খারাপ কাজ হলে তার দায়ভার মালয়েশিয়া সরকার নেবে না। সান্তিয়াগো তার ব্লগে বর্ণনা করছেন,

……স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ হামিদ আলবার সংসদে সেই পুরোন প্রথায় এর প্রতিউত্তর দিচ্ছেন – যে একটা বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে যারা এই বিষয়ে তদন্ত করবে। পাচারের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ পায় একটি ব্যাক্তিগত মালিকানাধীন টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি৭-এ।

যেমনটা ধারণা করা হয়েছিল, তদন্ত কমিটি অভিবাসী কর্মকর্তাদের কোন দোষ পায়নি। তারা যে বার্মিজ বা অন্য কোন উদ্বাস্তুকে পাচার করার কাজে নিয়োজিত ছিল তারও কোন প্রমাণ নেই।

যদিও মন্ত্রীর বক্তব্যর বিপরীতে বক্তব্য এসেছে অজস্র অভিবাসী ব্যাক্তির কাছ থেকে। যারা অধিকার প্রদানের সচেষ্ট সেই সমস্ত প্রতিষ্ঠান, সরকারী নয় এমন প্রতিষ্ঠান বা এনজিওর কাছ থেকে এবং যারা পাচারের শিকার তাদের কাছ থেকে।

সৈয়দ হামিদ, না পেরেছেন অভিবাসী বিভাগের অপরাধকে নিছক গল্পকে বলে প্রমাণ করতে, যা কিনা তারই নিজস্ব কমকর্তা এই অপরাধের বিরুদ্ধে তদন্ত করেছ, না পেরেছেন মালয়েশিয়ার বিরুদ্ধে আসা প্রচারণা ঠেকাতে। সান্তিয়াগো মালয়েসিয়াকিনিকে** বলেন।

এখন ২৪শে এপ্রিল ২০০৯ এক রিপোর্ট করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে আমেরিকার সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের উর্ধ্বতন রিপাবলিকান নেতারা মালয়েশিয়ান সরকারের কাছে মালয়েশিয়া এবং দক্ষিণ থাইল্যান্ডে বার্মিজ অভিবাসী পাচার এবং ঘুষ সংক্রান্ত যে সমস্ত কাগজ রয়েছে তা হস্তান্তর করেছে। এই রিপোর্টের মধ্যে অভিযোগ করা হয়েছে অবৈধ মায়ানমার (বার্মা)- এর অভিবাসীকে মালয়েশিয়া থেকে ভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা পরিণত হয়েছে মানবপাচারের ঘটনায়। আর যদি তাদের কাছে টাকা না থাকে তবে তারা বাধ্য হয়েছে থাইল্যান্ডের পতিতালয়, মাছধরার নৌকা এবং রেস্টুরেন্টগুলোতে কাজ করতে।

আমেরিকার সিনেটের এই রিপোর্ট সাধারণভাবে লুগার রিপোর্ট নামে পরিচিত। এক বছর ধরে অভিবাসী এবং মানবধিকার কর্মীদের সাক্ষাৎকারের উপর ভিত্তি করে কমিটির সদস্যগণ এটি তৈরী করেছেন ।

যারা সম্প্রতিক সময়ে মায়নামার (বার্মা) থেকে অভিবাসী হিসেবে এখানে এসেছে তাদের কাছ থেকে জোর পুর্বক টাকা আদায় করা হচ্ছে এবং পাচার করা হচ্ছে। পাচার করার উদ্দেশ্যই তাদের মালয়েশিয়ার উত্তরে থাইল্যান্ড সীমান্তে জোর পুর্বক নিয়ে যাওয়া হয়। মালয়েশিয়া থাইল্যান্ড সীমান্তে তাদের নিয়ে আসার সাথে মানুষ পাচারাকারীরা এইসব অভিবাসীদের উপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। যে সমস্ত অভিবাসী টাকা দিতে পারে না (পাচারাকারীদের) তারা থাইল্যান্ডে পাচার হয়ে যায়। তারা এবং সেখানে মানুষের দরজায় গিয়ে নিজেদের বিক্রি করে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা তৈরী হচ্ছে। এই সব পাচার হয়ে যাওয়া ব্যাক্তিরা সেখানে কাজ করতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে রয়েছে মাছ ধরার নৌকায় কাজ করা থেকে পতিতালয়-এ কাজ করা।

আমেরিকার সিনেট কমিটি রিপোর্টে মালয়েশিয়াকে বলছে বিষয়টির সুষ্ঠ তদন্ত করতে। যারা বার্মিজ এবং অন্য অভিবাসীদের পাচার করে, বিক্রি করে এবং দাসত্বের মুখে ঠেলে দেয় সেই সমস্ত দোষীদের বিচার করতে মালয়েশিয়ান সরকারকে অনুরোধ করেছে।

Photo courtesy of Adli Ghazali

ছবি আদলি গাজজালির সৌজন্যে

বিখ্যাত বিরোধী দলীয় নেতা লিম তার ব্লগে লেখেন

সিনেট তদন্তকারী দল আরো অনেকগুলো রিপোর্ট পেয়েছে, যার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে যে বার্মিজ মেয়েরাও পাচারকারীদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এমনকি এর মধ্যে কিছু নির্যাতন তার স্বামীর সামনে ঘটে থাকে। কিছু এনজিও কর্মীর মতে- কেউ এই ধরনের ঘটনায় বাধা দিতে পারে না। এর কারন তাহলে তাকে গুলি খেয়ে বা ছুরিকাঘাতে জঙ্গলে পড়ে থাকতে হবে।

(যদি বার্মিজ মেয়েটি) দেখতে সুন্দরী হয় তাহলে তাকে পতিতালয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়। একজন উদ্বাস্তু বলেন যদি তারা দেখতে সুন্দরী না হয় তাহলে তাদের রেস্টুরেন্ট বা বাসায় কাজ করার জন্য বিক্রি করে দেওয়া হয়।

কমিটি ২০০৭ সালে এই তদন্ত কাজ শুরু করে। সে সময় বার্মিজ অভিবাসীদের কাছ থেকে এই ধরনের অভিযোগ আসতে থাকে। যদি অফিসাররা এই ধরনের পাচারের কাজে অংশগ্রহন নাও করে থাকে তবে তারা তা জানতো কি ভাবে পাচার হচ্ছে।

এই রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে সমস্ত বার্মিজ অভিবাসী দেশ ছেড়ে পলিয়েছে, তাদের দেশে ফেরা মানেই বার্মার সামরিক জান্তার হাতে পড়া। আর তার মানেই আবার ক্ষতির শিকার হওয়া যা মালয়েশিয়ার সরকার কোনমতেই বিশ্বাস করে না যা রিপোর্ট জানাচ্ছে।

লিম নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মি: নাজিব রাজাক-এর প্রতি আহবান জানিয়েছে যেন নতুন নির্বাচিত সরকার লুগার রিপোর্টের উপর তার ক্ষমতা প্রর্দশন করে। যে লক্ষ্যে এই রিপোর্টের উপর সরকারী কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রিপোর্টে মালয়েশিয়াকে অভিযুক্ত করা হয়েছে মালয়েশিয়ার সরকারী কর্মতারা বার্মিজ উদ্বাস্তুদের পাচারের সঙ্গে জড়িত। যারা সাম্প্রতিক সময়ে পতিতা হিসেবে বিক্রি হয় এবং অন্য জোরপুর্বক শ্রমে বিক্রি হচ্ছে তাদের এই ঘটনার সঙ্গে মালয়েশিয়াও জড়িত ।

Photo courtesy of M.A.M09

ছবি এমএএম০৯ এর সৌজন্যে

এই রিপোর্টের উপর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সান্তিয়াগো তার ব্লগে বলেন,

এই বিষয়ে একটা কথা সরাসরি উল্লেখ করা প্রয়োজন, উদ্বাস্তুরা মালয়েশিয়া ভালো অর্থনৈতিক পরিবেশ বা বেশী টাকা পয়সা আয়ের জন্য আসে না। আসলে তাদের কাছে আরো কোন বিকল্প নেই। তারা বার্মা থেকে পালিয়ে মালয়েশিয়া আসে। পিছনে ফেলে আসে তাদের পরিবার এবং ছেলেমেয়ে। নিজের দেশে তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে তাই তারা মালয়েশিয়া চলে আসে ।

মালয়েশিয়াতে এসেও তাদের বিপদ শেষ হয়না। রেলা* নামের একটি সংগঠনের লোকেরা এখানে তাদের পশুর মতো খুঁজে ফেরে। রেলা হচ্ছে ভাড়া করা একটা গ্রুপ যারা নাগরিক সমাজের দ্বারা তৈরী। তারা এখন অভিবাসীদের জন্য অস্থায়ী পুলিশে পরিণত হয়েছে।

জাতিসংঘ হাই কমিশন অথাব ইউএনএইচসিআর এখানকার উদ্বাস্তুদের জন্য বিশেষ কার্ড দিয়ে দেয়। যেহেতু মালয়েশিয়া তাদের উদ্বাস্তু অবস্থাকে স্বীকৃতি দেয় না তাই কিনা এই কার্ড মালয়েশিয়া তাদের কোন কাজে আসে না। এখানে এসে উদ্বাস্তুরা এক ধরনের ফাঁদে পড়ে যায়। কারন এখানে এমন এক অবস্থার তৈরী যার ফলে তারা না পারে কাজ করতে, না পারে টিকে থাকতে। এবং তারা সবসময় অভিবাসী কর্তৃপক্ষ এবং রেলার অফিসারদের গ্রেফতারের চাপের মুখে থাকে।

কিন্তু মালয়েশিয়া সরকার কেবল সামরিক জান্তার সাথে ব্যাবসার বিনিময়ে আগ্রহী। মালয়েশিয়ার সরকারী তৈল কোম্পানী পেট্রনাস বার্মার সামরিক জান্তার সঙ্গে ব্যবসা লক্ষ ডলারে উন্নত করেছে।

আসিয়ান হচ্ছে এই এলাকার এক জোট। তারা খুবই উদার। কিন্তু বাস্তবে তারা বার্মার সামরিক বাহিনী সেখানে যে মানাবধিকার লংঘন করছে তার দিকে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। তার বদলে আসিয়ানের নেতারা বার্মার সামরিক জান্তার সাথে হাত মেলায় এবং কুটনৈতিক আলাপ চালায়। বার্মিজ সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে আসিয়ান সম্মেলনে দশ সদস্যের এই ব্লক কারো প্রতি হস্তপেক্ষ না করার নীতি বার্মিজ সেনাদেরকে আরও আরামে রাখবে। কারন এতে তাদের শতশত, হাজার হাজার রোহিঙ্গা, কারেন, চিন এবং অন্য সংখালঘু গোত্রের কাউকে হত্যা আর গুম করার জন্য জবাবদিহীতা করতে হবে না।

আমি নতুন স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি হিশামউদ্দিন তুন হুসাইনকে আহবান জানাচ্ছি যাতে তিনি এ বিষয়ে একটি নতুন তদন্ত শুরু করেন। এই বিষয়ে এবং লুগার রিপোর্টের ১০টি বিষয় প্রয়োগ করা, দেশটিতে মানবপাচার বিরোধী আইন তৈরী করা, আসিয়ানের ঘোষণা অনুযায়ী নিরাপত্তা প্রদান করা। এবং অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে প্রচারণা এবং দ্রুত জাতিসংঘের ১৯৬৭ সালের উদ্বাস্তু বিষয়ক সম্মেলনে আসা প্রস্তাবকে সমর্থন করা -এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যে অভিবাস এবং উদ্বাস্তুদের নিরাপত্তা এবং তাদের অধিকার নিরাপদ রাখা এবং প্রচার করা এই দেশটিতে এবং এই অঞ্চলে অভিবাসী এবং উদ্বাস্তুদের অধিকার রয়েছে।

Photo courtesy of M.A.M09

ছবি আদলি গাজ্জালির সৌজন্যে

বিরোধী দলের কার্যক্রমের বাইরেও, সুহাকম কমিশনার মি. এন শিভা সুব্রামনিয়ম রিপোর্ট করেছিলেন যে সুহাকম (মালয়েশিয়ার মানবাধিকার কমিশন) গত দুই বছর ধরে তারা মানব পাচার সমন্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগ পেয়ে আসছে। তিনি বিষয়টিকে উদ্বৃত করে বলেছেন, অভিযোগের ব্যপারটি আর্ন্তজাতিক ফোরামে তোলা হয়েছে। কিন্তু সমস্ত অভিযোগ একসাথে করা খুব কঠিন। মি. শিবা এছাড়াও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে তদন্ত করতে বলেছেন এবং এ ব্যাপারে যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছে।

এই রিপোর্ট এবং এ ব্যাপারে কার্যক্রম শুরু করার আহ্বান জানানো কিছু ব্লগার আবেগ জাগিয়ে তুলেছে। বব লিখছেন:

আজ ২১ শতকের দিন, এক বিশ্বায়নের যুগ, উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির যুগ। কেউ হয়তো ভাবতে পারে যে মানব প্রজাতি স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে, শান্তি এবং মানব মর্যাদা প্রদানের ক্ষেত্রে। দুভার্গ্যজনকভাবে আসলে তা ঘটে নি…আফ্রিকায় চারশো বছর ধরে যে আটলান্টিক দিয়ে পাড়ি দিয়ে দাস ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছিল, আমেরিকায় যাদের নিয়ে যাওয়া হত দাস হিসেবে, আজ তারচেয়ে বেশী লোক দাস হয়ে আছে। সেই ঘৃণিত ব্যবস্থা আবার ফিরে এসেছে। এখন আগের যে কোন সময়ের চেয়ে সস্তায় দাস কিনতে পাওয়া যায়।

আমাদের পৃথিবীতে সারা বিশ্বজুড়ে ব্যক্তি ধরে মানব পাচার সবচেয়ে বাড়তে থাকা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২.৪ মিলিয়ন লোক পাচার হয়। তাদের মধ্যে ১.২ মিলিয়নই হচ্ছে শিশু।

প্রত্যেকটি মিনিট, প্রত্যেকটি দিন, পুরুষ, নারী, এবং শিশুকে এক জায়গায় থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে অথবা বিক্রি করা হচ্ছে। এটি করা হচ্ছে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। তারাই পাচারের শিকার। তাদের দল বেধে সীমান্তে নিয়ে আসা হচ্ছে। মাহাদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অনেক সময় দলে ধরে তাদের পাচার করা হয় ঠিকই, কিন্তু প্রায়শ:ই তাদের একক ভাবে পাচার করা হয়। তারা এক যন্ত্রনার মধ্যে বাস করে। অন্যরা তাদের সকল চলাফেরা পর্যবেক্ষন করে। তাদের সাথে পশুর মতো ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সত্য হচ্ছে তারা কেবল পরিসংখ্যান নয়। তারা মানুষ। তাদের মধ্যে কেউ মা — কেউ শিশু এবং তারা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে।

মিন লি বর্ণনা করছেন

এখানকার বেশীর ভাগ মানুষ অসচেতন যে মানব পাচার আসলে কি এবং এই সময়ে মালয়েশিয়াতে কি হচ্ছে। আমরা আসলে যা খেয়াল করি তা হলো বিদেশী কর্মী, চাইনিজ, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশীদের। এখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য তাদের আনা হয়েছে— কিন্তু আমরা যা খেয়াল করি না তা হলো তাদের অনেককে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পরে তাদের জোর করে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাদের ঋণের কারনে ও হুমকির মাধ্যমে তারা এসব কাজ করছে। এখান থেকে বের হবার তাদের কোন রাস্তা নেই।

মানব পাচার এবং অভিবাসীদের সাথে বাজে ব্যবহার এমন একটা বিষয়, যা অনেক মালয়েশিয়াবাসী বিষয়টিকে জোরালোভাবে অনুভব করে। সক্রিয় কর্মী এবং প্রাক্তন বিনা বিচারে আটক লেখক ন্যাট টান তার ব্লগে লিখেছেন:

মালয়েশিয়া আসা বার্মিজ উদ্বাস্তু গ্রেফতার, আটকে রাখা এবং তাড়িয়ে দেওয়ার যে চক্র তা এক বাজে ও যন্ত্রনাদায়ক যন্ত্রনা অভিজ্ঞতা। তারা পথে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে তা প্রায়শই সংঘর্ষ এবং অপব্যবহারের মধ্যে শেষ হয়, যা পুরোপুরি মানবাধিকার লংঘন।

উপলদ্ধি করা যাচ্ছে শক্তিশালী পক্ষাবলম্বন বা এডভোকেসি এবং উদ্বাস্তুদের জন্য জায়গা তৈরী করা প্রয়োজন, যাতে তারা তাদের গল্পগুলো সবাইকে জানাতে পারে। তেনাগানিতা উদ্বাস্তুদের গল্প গুলো একসাথে করেছে। তারা এখানে একটি চক্রে ছিলেন। এখানে তাদের বন্দী করা হয় -আটকে রাখা হয় এবং তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তারা আবার মালয়েশিয়া ফিরে এসেছে। এই বই এর নাম রিভলভিং ডোর (ঘুর্ণায়মান দরজা)। এই বই মালয়েশিয়া অবস্থানরত উদ্বাস্তুদের পেশাগত এবং মর্যাদাগত অবস্থান তুলে ধরবে। তাদের সকল দলের সমর্থন প্রয়োজন। যে সমস্ত উদ্বাস্তু আমাদের মধ্যে বাস করে তাদের সবার সমথর্ন প্রযোজন।

The Fifty Refugees Website

৫০জন উদ্বাস্তু ওয়েবসাইট

আরিস একজন ৩৭ বছর বয়স্ক মালয়েশিয়ান। এই বিষয়টি তার কাছে এতটাই আগ্রহের যে প্রাক্তন এই ডাক্তার এক ওয়েবসাইট তৈরী করেছেন যার মধ্যে রয়েছে পঞ্চাশ জন উদ্বাস্তুর গল্প। এর শিরোণাম খুব সাধারণ, পঞ্চাশজন উদ্বাস্তু:

এই সব গল্প (উদ্বাস্তদের) মধ্যে রয়েছে হৃদয় বিদারক ঘটনা, বন্দীত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয় উপেক্ষা এবং অপমান। কিন্তু তার মধ্যেও রয়েছে আবার নিজের অবস্থা আগের মতো তৈরী করা সাহস, আশা এবং ভালোবাসও …. সেই সমস্ত মানুষ, যারা আপনার বয়সী অথবা অপনার নাতির বয়সী, অথবা আপনার পিতার বয়সী, সাধারণ মানুষ, রক্তমাংসের মানুষ, আশা আর স্বপ্নের মানুষ, আপনার আর আমার মতো মানুষ।

দুভার্গ বা ভাগ্যক্রমে লুগার রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ঠিক এক বছর পর যখন মালয়েশিয়া এন্ট্রি ট্রাফিকিং পারসোনাল ল বা মানব পাচার আইন প্রকাশ হল। প্রকাশিত এক নতুন সংবাদ অনুসারে ৩৩ জন সন্দেহজনক মানব পাচারের শিকার ব্যাক্তিকে এই আইন প্রয়োগ শুরু হবার চার মাসের মধ্যে উদ্ধার করা হয়।

লূগার রিপোর্টএর প্রতিক্রিয়া অনুসারে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মি: নাজিব বলেছেন আমরা এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।… আমরা মালয়েশিযাকে মানব পাচারেরর কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারি না…. কিন্তু তার আগে আমাদের আরো তথ্য জানতে হবে, জানতে হবে আরো ঘটনাও।

* দি পিপলস ভলান্টারি কোর( রেলা)
** একটি বিকল্প ধারার সংবাদ পোর্টাল
ছবি আদিল গাজজালি এবং এম.এ এম০৯ এর সৌজন্যে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .