বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রতিবাদে সাংবাদিকদের #আমিগুপ্তচর প্রচারণা

ফেসবুক থেকে স্ক্রিনশট – সাংবাদিকরা #আমিগুপ্তচর পোস্টার ধরে প্রতিবাদ করছে

গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশে ফেইসবুক ব্যবহার করেন এমন সাংবাদিকদের অনেকের প্রোফাইলে দেখা গেছে, তারা হাতে একটি প্ল্যাকার্ড ধরে আছেন। তাতে লেখা, #আমিগুপ্তচর

তারা মন্ত্রীপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত একটি কালো আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন যেখানে সাংবাদিকদের গোপনে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ নামে প্রস্তাবিত আইনটির মূল লক্ষ্য ডিজিটাল অপরাধ দমন করা। গত ২৯শে জানুয়ারি আইনটির খসড়া মন্ত্রীসভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়। এটিকে এরপরে জাতীয় সংসদে পাঠানো হবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্যে। যেহেতু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, এই আইন পাশ হতে হয়ত কোন সমস্যা হবে না।

নতুন এই আইনটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) আইন, ২০১৩কে প্রতিস্থাপিত করবে যেটি নিয়ে গত কয়েক বছরে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। এর ৫৭ ধারায় ইলেকট্রনিক ফর্মে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশকে অপরাধ ধরা হয় যদি তা “দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে”। এই অপরাধের জন্যে অনধিক চৌদ্দ বছর এবং অন্যূন সাত বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে এই আইনে উল্লিখিত অস্পষ্ট বিধানগুলোর অপপ্রয়োগের মাধ্যমে অনেক সাংবাদিক এবং ব্লগারদের নামে মামলা করা হয়েছে তাদের লেখা বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁদের উক্তির ফলশ্রুতিতে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার প্রেক্ষিতে গত বছর জুলাই মাসের আইন মন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছিলেন যে অচিরেই ৫৭ ধারা রদ করা হবে।

কেন এই #আমিগুপ্তচর

প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর ৩২ ধারায় বলা হয়েছেঃ

সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি বেআইনিভাবে প্রবেশ করে কোনো ধরনের তথ্য-উপাত্ত, যে কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে, তাহলে সেটা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হবে এবং এ অপরাধে সেই ব্যক্তি ১৪ বছর কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷

অনেক সাংবাদিক এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মনে করছেন যে এই আইন ব্যবহার করে সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী বা রাজনীতিবিদদের অনিয়ম তুলে ধরার জন্যে তাঁদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে গুপ্তচরবৃত্তি ধরা হবে।

একাত্তর টিভির বিশেষ সংবাদদাতা পারভেজ রেজা, অনেকের মতে যিনি এই অভিনব প্রতিবাদটি প্রথম শুরু করেছেন, লিখেছেন:

অনেকেরই প্রশ্ন, কেন সাংবাদিকরা নিজেকে গুপ্তচর হিসেবে স্বীকার করে নিচ্ছে? সহজ উত্তর, সরকার, রাষ্ট্র এখন আইনের মাধ্যমে আমাদের গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত করার পায়তারা করছে।[…]

অনুসন্ধানী সাংবাদিক করেন বদরুদ্দোজা বাবু। তিনি লিখেছেন:

#আমিগুপ্তচর
আমি বদরুদ্দোজা বাবু। অনুসন্ধান করি, সাংবাদিকতা করি। মানুষের স্বার্থে কাজ করি। অনিয়ম আর দুর্নীতি খুঁজি। ফলে আমাকে সরকারি অনেক নথি জোগাড় করতে হয়! ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভাষায়, এখন আমি গুপ্তচর!

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর হলে সংবাদ প্রকাশের জন্য তথ্য সংগ্রহ করার কাজ কঠিন হয়ে যাবে বলে সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন।

কী আছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এ মোট ৪৮টি ধারা রয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীরা মূলত এই আইনের ৩২ নম্বর ধারাটি নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। তবে এই আইনে আরও অনেক ধারা রয়েছে যা দেশে অনলাইনে বাক স্বাধীনতা এবং গনমাধ্যমের কর্মীদের অধিকার খর্ব করতে পারে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় ১৪ বছর জেল ও জরিমানার বিধান রয়েছে “রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ” বা “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা” ইত্যাদি অপরাধের জন্যে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর খসড়াতে দেখা যাচ্ছে যে ৫৭ ধারায় উল্লিখিত অপরাধগুলোকে চার ভাগে ভাগ করে ৩ থেকে ১০ বছরের সাজা রাখা হয়েছে। এর বিতর্কিত কিছু ধারার মধ্যে রয়েছেঃ

- ২৭ ধারাঃ ওয়েবসাইট বা ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রে এমন কোন তথ্য থাকলে যা মানুষের “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে” – এমন অপরাধের জামিন হবে না এবং ৫ বছরের জেল বা দশ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তি।

- ২৮ ধারাঃ গণমাধ্যমে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ – এটি জামিনযোগ্য অপরাধ – শাস্তি ৩ বছরের জেল এবং ৩ লাখ টাকা জরিমানা – অথবা উভয়ই।

- ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধ বা জাতির জনকের প্রতি মানহানিকর কোন তথ্য প্রকাশ করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

- নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে আরও ক্ষমতা দেয়া হয়েছে পরওয়ানা ছাড়া গ্রেফতারের জন্যে যদি কোন পুলিশ অফিসার মনে করেন উক্ত আইনের আওতায় কোন অপরাধ ঘটেছে বা ঘটতে যাচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনিটর নামক একটি অনলাইন পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেনঃ

The Digital Security Act is an Eyewash. It is section 57 for all intent and purposes. All the provisions have merely been redistributed among other sections. It's approval will ensure that people lose their freedom of speech.

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন একটি ধোঁকা ছাড়া কিছুই না। উদ্দেশ্য এবং তীব্রতা বিবেচনায় এটি সেই ৫৭ ধারারই নব সংস্করণ। ৫৭ ধারার বিধানগুলো শুধু কিছু ধারায় ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এটি অনুমোদিত হলে জনগণ বাক স্বাধীনতা হারাবে।

বড়ুয়া আরও বলেছেন ঢাকা ট্রিবিউনের সাথে সাক্ষাৎকারেঃ

Why won’t I be able to record something wrong happening before my eyes? If I try to copy classified government records, we have the Official Secrecy Act for that.

আমার চোখের সামনে যা ঘটছে তা কেন আমি রেকর্ড করতে পারব না? আমি যদি সরকারি অতি গোপনীয় তথ্য চুরি করতে যাই তাহলে তো দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইনের বিধান পূর্বেই রয়েছে (নতুন আইনের কি দরকার) ।

ফেসবুক থেকে স্ক্রিনশট

এদিকে নতুন আইনের মাধ্যমে সরকার ঔপনিবেশিক আমলের অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্টের (দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইনের) ঐতিহ্য অনুসরণ করছে বলে সাংবাদিক ও ব্লগার মাসকাওয়াথ আহসান উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন:

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ প্রণয়ন দেখে অনুভূত হয়; সরকার ২০১৮ সালের বাস্তবতায় বসে ১৯১৮ সালের তামাদি শাসন কৌশল অনুসরণের চেষ্টা করছে। বৃটিশ শাসনে অফিশিয়াল সিক্রেসি এক্ট বা দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন প্রণীত হয়েছিলো। ঔপনিবেশিক অপশাসন চালিয়ে যাবার জন্যই জনগণের স্বার্থে পরিচালিত সরকারী দপ্তরের তথ্য জানার অধিকার থেকে জনগণকেই বঞ্চিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিলো এই আইনের মাধ্যমে।

৩২ ধারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পেরেক ঠুকে দিবে বলে মনে করেন আদিত্য আরাফাত। তিনি লিখেছেন:

এ ধারায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বলতে কিছুই থাকবে না। সারাবিশ্বেই অনুসন্ধানী বা অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্টিংয়ের তথ্য সাংবাদিকরা জনস্বার্থে গোপনেই নিয়ে থাকেন। এ ধারার প্রয়োগে কোনো দুর্নীতির সংবাদের তথ্য সংগ্রহ করা যাবে না। এমনিতেই দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, দুর্নীতি বিরোধী রিপোর্টং করা অনেক ঝুঁকির। থাকে মামলা হামলার শংকা। [..] আর যাই হোক ধারাটি যারা তৈরি করেছেন তারা অসৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি এবং দুর্নীতি পরায়ন ব্যক্তিদের বাহবা পাবেন, হয়তো পাচ্ছেনও।

ওদিকে পারভেজ রাজা আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের ব্যপারে মন্তব্য করেছেন অনলাইন পত্রিকা সারাবাংলা.নেট র সাথে সাক্ষাৎকারে:

আইনমন্ত্রী বলছেন, ”গুপ্তচরবৃত্তি আর সাংবাদিকতা এক নয়, দুর্নীতির খবর করলে এই আইন প্রযোজ্য হবে না।” আপনি কিভাবে নিশ্চয়তা দিচ্ছেন মন্ত্রী বাহাদুর? আইনের প্রতিটা প্রয়োগ কি আপনাকে জিজ্ঞেস করে হবে? ৫৭ ধারা অপপ্রয়োগের শিকার কিন্তু সাংবাদিকরাই বেশি হয়েছেন।

শুধু সাংবাদিকরাই নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এর প্রতিবাদ করেছেন। দা ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে যে মনে হয় সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে দেয়া উপদেশগুলোকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে এই আইনের খসড়াতে। বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকরা একজোট হয়ে সরকারকে আইন কার্যকরের আগে সবার সাথে আলোচনা করার অনুরোধ জানিয়েছে।

1 টি মন্তব্য

আলোচনায় যোগ দিন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .