বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

সিরিয়া থেকে পাঠানো মার্সেল শেহওয়ারো'র প্রতিবেদন

Marcel Shehwaro

মার্সেল শেহওয়ার: “বিদ্রোহ”। জর্দানে আরব ব্লগারদের মিটিং-এর সময় আমের সোয়েইদানের তোলা। অনুমতি নিয়ে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

গ্লোবাল ভয়েসেস এর জন্যে লেখা পুরস্কার পাওয়া এই শিল্পমানসম্পন্ন ধারাবাহিকটিতে সিরীয় ব্লগার এবং আন্দোলনের কর্মী মার্সেল শেহওয়ারো সিরিয়ার সশস্ত্র যুদ্ধের প্রাণকেন্দ্র আলেপ্পো এবং ফলস্বরূপ সিরিয়ার বাইরে নির্বাসন থেকে তার জীবনযাপনের বর্ণনা দিয়েছেন।

২০১৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারিখে “সিরিয়া থেকে পাঠানো” অনলাইন ধারাবর্ণনা বিভাগে ২০১৫ অনলাইন সাংবাদিকতা পুরস্কার জেতে। বিচারকেরা তার “একান্তই ব্যক্তিগত লেখা”র প্রশংসা করেছেন “সাধারণত মেরুর চরম প্রান্ত থেকে বলা একটি যুদ্ধের ধূসর এলাকাগুলো” খূঁজে বের করার জন্যে।

মূলত: আরবি ভাষায় লেখা এই গল্পগুলো অনুবাদ করেছেন আমিরা আল হুসাইনি এবং লারা আল মালাকেহ। মার্সেল শেহওয়ার মার্সেলিতা.কম–এ ব্লগ এবং @মার্সেলিতা–তে টুইটগুলোও করেছেন প্রাথমিকভাবে আরবি ভাষাতেই।

গ্লোবাল ভয়েসেসে মার্সেল

“হ্যাঁ, আমরা খ্রিস্টান, কিন্তু আমরা ইহুদী, মুসলমান, আরব, আফগানদের ভয়ে ভীত এবং তারা “আমাদের” নয়। আপনারা দেখুন ভালবাসাও শ্রেণী ও সংযুক্তির উপর ভিত্তি করে বাছাইকৃত। কিন্তু কোন কারণে যিশু খ্রিস্ট ওগুলো বলে যেতে ভুলে গিয়ে সবার জন্যে ভালোবাসার কথা বলেছিলেন।”

“আমাকে কি তোমাদের ক্রুদ্ধ মনে হয়? আমি তোমাদের আচরণ রপ্ত করতে পারিনি। কাউকে রাগান্বিত দেখা গেলে সন্দেহজনক মনে হয়। আমি জানি আর আপনারাও জানেন আমরা কতটা আবেগপ্রবণ। আপনারা তো দেখলেন বিশ্বের সব বিমান আমাদের সরকার আমাদের উপর অহোরাত্র বোমা বর্ষণ করতে সাহায্য করছে বলে আমরা এখনো কম ক্রুদ্ধ হতে শিখিনি। আমি বিমানবন্দরে প্রফুল্ল এবং খুশি চেহারা বজায় রাখার চেষ্টা করবো, যদি তোমাকে একটা ছোট ইঙ্গিত দেয়ার অনুমতি দাও: বিমানবন্দরে তোমরা প্রফুল্ল এবং খুশি চেহারার কোন সিরীয় দেখতে পেলে তক্ষুণি তোমাদের আসলেই সন্দেহজনক হয়ে ওঠা উচিৎ।”

“আমাদের তখন খুব অল্প যে জীবনশক্তিটুকু বেঁচে ছিল সেটা আমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। তাদেরকে একদম আমাদেরই মতো মনে করার চেষ্টাটাও ফুরিয়ে যাচ্ছিল, তারা যতটা না আমাদের মতো – শিকারে – পরিণত হচ্ছিল, আমরা আরো বেশি তাদের মতো – খুনী – হয়ে উঠছিলাম।“

“আজকে আমি জানি না আমি কি বিশ্বাস করি। এটা হলো যুদ্ধ। সারাক্ষণ জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঝুলে বেঁচে আছি। আপনার প্রয়োজন হয় সবসময় শত্রুদের অনিবার্য মৃত্যুর দিকে চালনা করে বেঁচে থাকার একটি প্রবৃত্তির, অথবা আত্মসমর্পণ। অন্যজনের বিজয়ের জন্যে আপনাদের একজনকে মরতে হবে। সহিংসতা সবকিছুকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে: আমাদের আশা, আমাদের বিশ্বাস এবং বিশ্বের ওপর আমাদের আস্থা।একেবারে শুরুর দিকে আমাকে অনেক সহিংস প্রশ্নের উত্তর পুনর্বিবেচনা করতে হয়েছিল: আমি কি একজন খুনী? আমি কি হত্যা করতে সক্ষম? আমি কি হত্যা করতে চাই?”

“আমি আমার চারপাশের বন্ধুদের জড়ো করি। তাদের অধিকাংশই প্রথমবারের মতো একটি ক্রিসমাস ট্রি সাজাচ্ছে যদিও তাদের কাছে এই আচার-অনুষ্ঠানটির ধর্মীয় কোন মানে নেই। তারা আমার পাশে থেকে আমার আনন্দ ভাগ করে নিতে এসেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিচিত্র জাওয়াদ, আনন্দের সঙ্গে বলেন: “খ্রিস্টান ভোজ সত্যিই চমৎকার।” আমার মুক্ত সিরীয় বাহিনীর বন্ধু আলী আমাকে গাছের তলায় রেখে দিতে বলার জন্যে সে একটি উপহার নিয়ে এলো। এটা নিয়ে আমি ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। হত্যা করার খুব ছোট একটি পিস্তল। সে বললো: “এটা কিছু নয়। যদি তারা তোমার জন্যে আসে,”- সে আইএসআইএস’কে বুঝিয়েছে – “তুমি তাদেরকে তোমাকে জীবিত পেতে দিবে না।”

“আমি ঠিক নিশ্চিত নই একজন সিরীয়র স্বাভাবিক অস্তিত্বে কোন জিনিস ‘ব্যক্তিগত’ এবং ‘সবার’ নির্ধারণ করে। আমার বন্ধুরা প্রতিরোধের বন্ধু -আমাদের জীবনগুলো কারাগারে যাওয়া, পালানো আর আমাদের শহীদ বন্ধুদের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। আমার পরিবারের বাকি থাকা একমাত্র ব্যক্তি যার সংস্পর্শে আমি আছি সে হলো আমার বোন যাকে আমার সম্পর্কিত নিরাপত্তার কারণে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হতে হয়েছে। তার স্থানচ্যুতি বাকি থাকা বিশ্বের সিরীয় রক্তক্ষরণেরই অংশ।”

“আমি জানি না এটা বলতে আমার কতটা অসুস্থ বোধ হয়, কিন্তু আমি সত্যি সত্যিই মৃত্যুর কাছাকাছি সেখানেই ভাল ছিলাম। আনন্দ এক ধরনের বীরত্ব – মৃত্যুর মুখোমুখি সোজাসাপ্টা একটি চ্যালেঞ্জ। আনন্দ এখানে কখনো কখনো অপরাধবোধের ভার আর মৃত্যুর মুখোমুখি একই বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা জীবনের গল্প নিয়ে অবাস্তব স্মৃতি রোমন্থনে পর্যবসিত হয়।”

“আমার মা মারা যাওয়ার পর তাকে ছাড়া বাড়িতে উদযাপন করাটা উপযুক্ত মনে হয়নি। আমি এখনও কালো পরিধান করে আছি। আমার ছেলেবেলার বন্ধুরা ভুলে গিয়েছে বা ভুলে ভান করেছে – আমার জন্মদিন। আমার সাথে যুক্ত হওয়ার ভয় আমাদের সম্পর্কের নিশ্চিত করার নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের পার্থক্যগুলো রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। এটা একটি ধারালো নৈতিক পার্থক্য হয়ে ওঠে যাকে আর হাস্যরস বা এমনকি বিদ্রূপ দিয়ে জোড়া লাগানো যাবে না।”

“সেই ঘরে আমি বিশাল পরিমাণ খাদ্য রান্না করতে শিখলাম, আমার দশজন পুরুষ বন্ধুকে খাওয়ানোর জন্যে যথেষ্ট। সেই বাড়িতে আমি রাজনীতির কথা বলা এবং আমাদের পরিবার সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ গল্পগুলো ভাগাভাগি করার জন্যে অনেক রাত জেগে থাকতাম। আমি তাহাদেরই জানতে পেরেছি তারা আমার জানতে পেরেছি. ব্যালকনিতে আমরা একসঙ্গে অনেক চোখের জল ঝরিয়েছি এবং আমাদের পাগলাটে বেপরোয়া বন্ধুদের জন্যে উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষা করেছি। সবসময় আন্দোলনের গৃহহীন কর্মীতে ভরপুর সেই ব্যস্ত বাড়িতে আমি জেনেছি যুদ্ধের সময় কিভাবে একজনের গোপনীয়তা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়।”

“গির্জার প্রাঙ্গণে প্রবেশের পর একটি বাসভর্তি নিরাপত্তা বাহিনীর লোকদের দেখে আমি প্রায় ভেঙ্গে পড়েছিলাম। আমি জানি না কেন আমার মায়ের শেষকৃত্যের সঙ্গে একটি সশস্ত্র নিরাপত্তা উপস্থিতি যুক্ত হয়েছে। এর সবকিছু আমাকে ভেঙ্গে দিতে পারতো যদি এটা আমাকে জড়িয়ে ধরা বিপ্লবী শুভ্রতা না হতো। আমি জানি না এতো সব লোক কোথা থেকে এসেছিলেন, কিন্তু তাদের ধারণ করা সমস্ত ভালবাসা এবং স্বীকৃতি আমাকে শান্তি এনে দিয়েছিল। গির্জার সিঁড়ি ভর্তি সাদা শার্ট পরিহিত বিপ্লবীরা তাদের হাতে লাল গোলাপ উঁচিয়ে ধরে নীরবে ও শ্রদ্ধায় স্বাধীনতার চিৎকার দিচ্ছিল।”

“আমার পরিষ্কার করা দরকার যে সিরীয় জনগণের “বিজয় সুপারমার্কেট”-এ কেনাকাটা করতে যাওয়ার সুযোগ ছিল না – সেখানে তিউনিশিয়ার জাইন আল আবেদিন বেন আলির মতো করে বা মিশরের হোসনি মোবারকের পদত্যাগ করার মতো আসাদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে কিনা সেসব আইটেম বিক্রি হচ্ছিল। তাছাড়া, আমাদের কাছে লিবিয়ার মতো ন্যাটো বিকল্প কেনার পর্যাপ্ত তেলও ছিল না। পরিবর্তে আমরা আল-কায়েদা কিনেছি, যেটা আমরা হলুদ ফিতা দিয়ে প্যাঁচানো অবস্থায় মূল্যছাড় দেয়া ঝুড়িতে পেয়েছি।”

“একটি খুব স্বাভাবিক দিনে – আলেপ্পো যখন মারা যাচ্ছে – বোমা ও মৃত্যুর আঘাত থেকে দূরে তুরস্কে একজন বন্ধুর সঙ্গে দুপুরের খাবারের সময় আমার শহর থেকে দূরে থেকে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ সেবার মতো বিলাসিতা ভোগের অপরাধবোধে দম প্রায় বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি – পার্শ্ববর্তী ব্যক্তিটির মতোই সামাজিক মিডিয়া আসক্ত একজন ব্যক্তি হিসেবে – আমার ফেসবুক পাতাটি খুলি। সেখানে, আমি আমার দেয়ালে বিদ্রোহীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকা একজন বন্ধুর কাছ থেকে একটি বার্তা পেলাম।”

“তিন মাসে অনেক কিছু বদলে গেছে। মিডিয়ার ক্যামেরাগুলো অদৃশ্য হয়েছে। কিছু লোক দাড়ি রাখা শুরু করেছে। অন্যরা আফগান সাজের পরা শুরু করেছে। কেউ কেউ আইএসআইএস নিয়ে আলোচনা করতে না চাইলেও অন্য আরো অনেকে এই দলটির জন্যে তাদের সমর্থনকে অতিরঞ্জিত করছিল।”

“বিপ্লবীরা প্রায় দুই বছর ধরে ভাগ হয়ে যাওয়া শহরটির অংশগুলোকে পুনর্মিলিত করার আশা করছে। সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু এলাকা এবং বিদ্রোহীদের হাতে থাকা অন্যান্য অংশ নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাদা হয়ে আমরা আলেপ্পোর বাসিন্দারা বিভক্ত জনগণ হয়ে গেছি।”

“প্রথম দিন থেকেই তারা আমাকে বলেছে যে তার স্বামী কারাগারে ছিল আর আমার যে গানটি গাওয়ার অভ্যাস সেটা তার বিষণ্ণতা জাগিয়ে তুলতে পারে। সেটা আমাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেনি। আমরা বন্দীদের পরিবার সম্পর্কে শুনে শুনে এটাকে স্বাভাবিক মনে করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছিলাম যে আসাদের সিরিয়াতে কারারুদ্ধ হওয়া এবং যারা কারাগারের বাইরে – অথবা যারা নিজেদেরকে এমন মনে করে – তারা ব্যতিক্রম।”

“দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে গেছে। আমরা হয়তো দিন দু'য়েক বা এক সপ্তাহের ধরে অভিযোগ জানাই, তারপর আসাদের হত্যার যন্ত্র – মাঝে মাঝে স্কাড মিসাইল – দিয়ে গোলাবর্ষণ দামেস্কের গ্রামাঞ্চল থেকে শহরের দিকে ঘুরিয়ে দিলে মৃতদের দেহাবশেষগুলো কবর দেয়ার জন্যে আমাদের মনোনিবেশ করতে হয়।”

“একটি প্রাণঘাতী বুলেটে মাকে হারানো কারো মাতৃদিবস এবং মা’দের নিয়ে লেখা একেবারে মলম লাগানোর মতো কিছু নয়। এমনকি লেখার জাদুকরী ক্ষমতার বিষয়ে আমরা একমত হলেও কিছু ব্যথা আছে যা আসলেই খুব প্রকাণ্ড। সেগুলো আপনার শরীর ও আত্মার ক্ষয় করে এবং ঔষধ দিয়েও সারানো যায় না।”

“এই পোস্টটি একটু ভিন্ন একটি স্বাভাবিক মেয়ের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে হওয়ার কথা ছিল। এই নামকরণটি কারো কারো কাছে আকর্ষণীয় বলে তাকে এক্টিভিস্ট আখ্যা দেয়া যাক।”

“আমি বুঝতে পেরেছি এবছর সিরীয় বিপ্লবের তৃতীয় বার্ষিকী সম্পর্কে কথা বলতে আমরা কতো দেরী করেছি। এটা যেন এই আলা দেরী করিয়ে দিলেই বিষণ্ণ বাস্তবতার পরিবর্তন হয়ে যাবে। আমরা বিপ্লবটি শুরু হওয়ার পর থেকে তৃতীয় বছর পালন করছি।”

“কে আমি? আমি সবসময় এটিকে উত্তর দিতে অথবা এ সম্পর্কে লিখতে বিশেষত: আজকে, সিরীয় বিপ্লবের সূচনা থেকে তিন বছর পর, সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন বিবেচনা করেছি। সত্যটি হল যে আমি আসলেই জানি না আমার আগেকার সেই তারুণ্যের সাথে আমার এখনকার কতটা মিল রয়েছে।”

Marcell Shehwaro at the funeral of her mother, who was killed at a Syrian regime forces' checkpoint in June 2012. Fellow activists paid tribute by carrying red roses.

মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় মার্সেল শেহওয়ার, যাকে সিরীয় সরকারি বাহিনীর একটি চেকপয়েন্টে ২০১২ সালের জুন মাসে হত্যা করা হয়েছিল। সহযোদ্ধা এক্টিভিস্টরা লাল গোলাপ নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। ছবির সৌজন্যে মার্সেল শেহওয়ার।