
রাসুয়ার বিশ্বাস তামাং-এর স্কুল আইডি কার্ড। ছবিটি নেপালি টাইমসের সুমন নেপালির তোলা, অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত।
ফটোসাংবাদিক সুমন নেপালি কর্তৃক লিখিত এই প্রতিবেদনটি মূলত ২০২৬ সালের ২৮ আগস্ট নেপালি টাইমস-এ প্রকাশিত হয়েছিল। কন্টেন্ট-শেয়ারিং চুক্তির অংশ হিসেবে এর একটি সামান্য সম্পাদিত সংস্করণ গ্লোবাল ভয়েসেস-এ পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে।
তারা নদীর তীরবর্তী পাহাড়ি জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল। শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন এবং মানসিকভাবে তারা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। চোখের সামনেই নিজের মা আর বোনকে রাক্ষুসে বন্যার তোড়ে ভেসে যেতে দেখেছিল পাঁচ বছরের শিশু কীর্তি তামাং। সে ছিটকে পাহাড়ের ঢালে গিয়ে পড়ায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। পরবর্তীতে জঙ্গল থেকে আরও দুটি শিশুর সঙ্গে তাকে উদ্ধার করা হয়।
কীর্তি কথা বলতে পারছে না। বিশ্বাস তামাং নামে তার স্কুলের আরেকজন শিক্ষার্থী আরও গুরুতরভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, যার গলায় তখনও ঝুলছিল স্কুলের আইডি কার্ড। তাকে খুঁজে পাওয়া শিক্ষকেরা পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে তার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই নারী পার্শ্ববর্তী একটি জেলায় বসবাস করেন এবং বেত্রাবতীর একটি ইংরেজি মাধ্যম পাবলিক স্কুলে পড়াশোনার জন্য তার সন্তানকে পাঠিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন: মধ্য নেপালের বন্যার পরদিন
আমি বসে এই দৃশ্যগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আবেগ আমার ওপর বন্যার মতোই আছড়ে পড়ছিল। আমি আমার ক্যামেরাটি ব্যাগ থেকে বের করিনি; এটি অসম্মানজনক বলে মনে হয়েছিল। আমি কেবলই একজন নীরব সাক্ষী হয়ে এই যন্ত্রণা ও দুঃখ ভাগ করছিলাম।
আমরা ভোর ৪টায় মোটরবাইকে করে কাঠমান্ডু ত্যাগ করেছিলাম এবং যখন তোখার গিরিপথের চূড়ায় পৌঁছালাম, তখন ভোর হচ্ছিল। পথে আমরা চা পানের উদ্দেশ্যে কিছুক্ষণের জন্য যাত্রাবিরতি নিয়েছিলাম এবং এরপর আবার পথ চলা শুরু করি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ধ্বংস ও মৃত্যুর প্রথম লক্ষণগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করল: ২৪ ঘণ্টা আগে নদী যেখানে পুরো শহর গ্রাস করেছিল, সেখানে কেবল ক্ষতচিহ্ন পড়ে আছে। নদীর দুই পাশের বনের সীমানা কর্দমাক্ত গাছপালা নিয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে, যা অবিশ্বাস্য উচ্চতায় খাড়া ছিল। টিকে থাকা তিনতলা ভবনের ছাদ থেকে ধ্বংসাবশেষ ঝুলছিল। আর উল্টে থাকা ও অর্ধেক মাটির নিচে চাপা পড়া টিপার ট্রাকগুলো চারদিকে ছড়িয়ে ছিল।
ত্রিশূলী বাজার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দেবীঘাট ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। চীনের সীমানা পর্যন্ত সামনের রাস্তাটি আর ছিল না। দুপুর ১:০০ টায় বেত্রাবতী পৌঁছানোর জন্য আমরা বনের ভেতরের পথ দিয়ে আমাদের বাইকগুলো ঠেলে নিয়ে গিয়েছিলাম। যে ১০ কিলোমিটার দূরত্ব আমি আগে মাত্র কয়েক মিনিটে পার করেছিলাম, তা পার করতে এবার পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগেছিল।
কাদায় পিছলে যাওয়ার কারণে আমরা বারবার আমাদের বাইক থেকে পড়ে যাচ্ছিলাম। পুরো পথ জুড়ে মানুষের ঢল নেমেছিল যারা হেঁটে নিচের দিকে যাচ্ছিলেন এবং বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া আত্মীয়-স্বজনদের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় কি না, তা নদীর কাদামাখা পাড়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে খুঁজছিলেন। সেখানে কয়েকজন চীনা নাগরিকও ছিল, যারা একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সহকর্মীদের খুঁজছিলেন।

নেপালি টাইমসের সুমন নেপালির তোলা ছবিটিতে বাম দিকে কাদা এবং ডান দিকে বাড়িঘর ও সবুজ মাটি দেখা যাচ্ছে, যা অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত।
এরপর আমাদের চোখে পড়ল মরদেহগুলো। আমি একটি গাছের ছায়ায় বসে পড়লাম এবং আমার ক্যামেরাটি টেনে তোলার শক্তি পাচ্ছিলাম না। সেখানে আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী এক তরুণী ছিলেন, যাঁর দেহটি কারও বসতভিটার দেওয়ালের বাইরে পলিমাটিতে ঢেকে ছিল।
তাঁর দেহটি তাড়াহুড়ো করে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর পায়ের নখে নেলপালিশ লাগানো ছিল।
মরদেহটি পরিচিত কারও কি না, তা দেখতে মানুষজন চারপাশে ভিড় জমায়। তাঁরা চাদর দিয়ে নিজেদের নাক-মুখ ঢেকে রেখেছিলেন, মাথা নাড়ছিলেন এবং এরপর নিচের দিকে চলে যাচ্ছিলেন।
অবশেষে একজন পুরুষ মানুষ এলেন। তিনি ছিলেন ওই নারীর স্বামী। তিনি নিঃশব্দে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং তাঁর সাথে থাকা সঙ্গীরা তাঁকে টেনে তুললেন।
মহাবিপর্যয়
এই ক্ষতি অত্যন্ত বিশাল। এটি অবশ্যই একটি জাতীয় বিপর্যয়। কিন্তু এগুলো হাজার হাজার পরিবারের জন্য চরম শোকের ঘটনাও বটে। বেঁচে থাকার জন্য হয় আপনাকে সত্যিই অত্যন্ত ভাগ্যবান হতে হতো, না হয় ফুঁসে ওঠা ঘোলা পানির স্রোত ডিঙিয়ে উঁচুতে আরোহণ করার মতো পর্যাপ্ত শারীরিক সক্ষমতা থাকতে হতো।
এমনকি যারা তাদের আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের মরদেহ খুঁজে পাচ্ছেন, তারা ভাগ্যবান; কারণ অধিকাংশ মানুষই তাদের পরিবারের সেই সদস্যদের কোনো সন্ধান পাচ্ছেন না যাদের সাথে তারা সেদিন সকালেও একসাথে চা খেয়েছিলেন। কিংবা হারিয়েছেন এমন ছেলে, মেয়ে, বোন অথবা বাবা-মাকে — যাদের তারা কাদার প্রবল স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন।
এই মহাবিপর্যয় এতটাই বিশাল যে, সবচেয়ে দক্ষ এবং পর্যাপ্ত সম্পদশালী দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ সংস্থার পক্ষেও এটি পুরোপুরি মোকাবিলা করা অসম্ভব। আর যদি দ্রুত খাবার পৌঁছায় এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র গড়েও তোলা হয়, তবুও এত বিপুল সংখ্যক মানুষ তাদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বাস্তবতাকে কীভাবে মেনে নেবে? পরিবারের সদস্য, ঘরবাড়ি, ফসলের মাঠ, গবাদি পশু এবং নিজেদের সর্বস্ব হারানোর সেই চিরস্থায়ী ক্ষত তারা কীভাবে কাটিয়ে উঠবে?
আমি ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের খবর সংগ্রহ করেছিলাম, কিন্তু এই ট্র্যাজেডির মাত্রা সম্পূর্ণ আলাদা। আমি আমার সম্পাদককে বলেছিলাম যে আমি এটি কেবল একটি সাধারণ সাংবাদিকতার দায়িত্ব হিসেবে করতে পারব না; এর গভীরতা আরও অনেক বেশি। এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে আমি যা দেখেছি তা আমাকে এবং জীবনের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে আমূল বদলে দিয়েছে। এই অনিত্যতা, মুহূর্তের মধ্যে পুরো বিশ্ব চরাচর বিলীন হয়ে যাওয়ার এক গভীর অনুভূতি।
নিউজ ডেস্ক থেকে আমাকে ছবি তোলার পাশাপাশি মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়ার এবং তাদের নাম, বয়স ও অনুভূতির কথা জানার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরাসরি তাদের এই প্রশ্নগুলো করার মতো মানসিক অবস্থা আমার ছিল না। অবশেষে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে দূরপাল্লার লেন্স ব্যবহার করে কিছু দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে সমর্থ হই।

দুইজন মহিলা ধ্বংসযজ্ঞ পরিদর্শন করছেন। ছবি: নেপালি টাইমসের সুমন নেপালি, অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত।
শূন্যে তাকিয়ে আপনমনেই কথাগুলো বলছিলেন বেঁচে যাওয়া এক নারী, “আমরা কোনো সতর্ক সংকেত পাইনি, উজানের দিক থেকেও কেউ আমাদের জানায়নি যে বন্যা ধেয়ে আসছে”। তিনি আরও বলেছিলেন, “চোখের পলকে পানি উঁচুতে দেখা গেল, আর পরের মুহূর্তেই তা সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল। এটা এত দ্রুত ধেয়ে এসেছে।”
একটি বিষয় আমার চোখে সবচেয়ে বেশি লেগেছে, আমরা যেসব গ্রামের ওপর দিয়ে এসেছি সেগুলোর প্রায় সবকটিতেই মূলত নারী, শিশু এবং বৃদ্ধরাই ছিলেন। পুরুষের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য — যা বিপুলসংখ্যক তরুণদের শহর কিংবা বিদেশে পাড়ি জমানোরই স্পষ্ট প্রমাণ। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে এসে দেখছে যে তাদের ঘরবাড়ি ও পরিবার বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।।
আমার অনুমান, এই বিপর্যয়ে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের বেশিরভাগই নারী। এবং সেই সাথে শিশুরা, যারা বুধবার সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
একজন ওয়ার্ড চেয়ারম্যান জীবিতদের তালিকা তৈরি করতে এসেছিলেন। যেখানে জীবিতদের তালিকা থেকে মৃতদের নাম বাদ দেওয়া হবে। কিন্তু এই ঘটনায় তিনি নিজেও তার সহকর্মীদের হারিয়েছেন।
কিছু ত্রাণসামগ্রী নিয়ে সেনাবাহিনীর ট্রাকগুলো এসে পৌঁছাল; গাঢ় নীল আকাশে দিনভর হেলিকপ্টারগুলো এপাশ-ওপাশ ওড়াউড়ি করছিল। এই সবকিছুর মধ্যেই শুক্রবারের পূর্ণিমা তিথিতে জনাই পূর্ণিমা উৎসব উপলক্ষে গোসাইকুন্ড যাওয়ার উদ্দেশ্যে একদল তীর্থযাত্রী ধুনচে অভিমুখে উঁচু পথ ধরে এগিয়ে চলছিলেন। মনে হয়, জীবন তার নিজের নিয়মেই চলে।
আরও পড়ুন: নেপালে বুকভাঙ্গা কান্না আর আশার মেলবন্ধন
কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নেমে আসবে, তাই আমরা কাঠমান্ডু ফেরার উদ্দেশ্যে আমাদের বাইকের গতি বাড়িয়ে দিলাম। বিশ্বাস নামের একজন দিশেহারা শিশুকে অবশেষে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দিতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা মোটরবাইক নিয়ে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পথিমধ্যে আমরা বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোকে তাদের পূর্বের ঘরবাড়ির স্থানটি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করতে দেখি।

উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে একদল লোক নিচের কাদামাখা ভূমির দিকে তাকিয়ে আছেন। ছবি: নেপালি টাইমসের সুমন নেপালি, অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত।


















