মধ্য নেপালের বন্যার পরদিন

Map by Google Earth via Nepali Times. Used with permission.

মানচিত্রটি গুগল আর্থ থেকে নেপালি টাইমসের সৌজন্যে প্রাপ্ত। অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত।

কুন্দ দীক্ষিতের লেখা এই প্রতিবেদনটি মূলত নেপালি টাইমস-এ প্রকাশিত হয়েছিল। বিষয়বস্তু অংশীদারিত্ব চুক্তির আওতায় এর একটি সামান্য সম্পাদিত সংস্করণ গ্লোবাল ভয়েসেস-এ পুনঃপ্রকাশ করা হলো।

কাঠমান্ডু থেকে ঠিক ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭,২৪৫ মিটার উচ্চতার বিশাল লাংটাং লিরুং পর্বতটির রয়েছে এক হৃদয়বিদারক ইতিহাস।

২০১৫ সালের এপ্রিলে ৭.৮ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প মধ্য নেপালে আঘাত হানে এবং এর দক্ষিণ দিকে তুষারধস নেমে আসে, যা নিচের হিমবাহে আছড়ে পড়ে এবং পুরো লাংটাং গ্রামটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অন্তত ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছিল।

গত ২৬ আগস্ট নেপাল সময় ঠিক সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে (গ্রিনউইচ সময় ভোর ২টা ৫২ মিনিট) চীন সীমান্তের কাছাকাছি ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এবারের ভূমিকম্পের ফলে লাংটাংয়ের উত্তর অংশে একটি বিশাল তুষারধস ঘটেছে।

যদিও লাংটাং লিরুং সম্পূর্ণভাবে নেপালের অভ্যন্তরে অবস্থিত, তবুও এর তুষারধস থেকে ধেয়ে আসা ধ্বংসাবশেষ চীনের সীমান্ত ঘেঁষা বর্ষাস্ফীত লেন্দে খোলা নদীর গতিপথ আটকে দেয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই কৃত্রিম জলাধারটি ফেটে যায় এবং কাদা, পানি ও পাথরের এক বিশাল স্রোত ত্রিশূলী নদী বেয়ে তীব্রবেগে নেপালের দিকে ধেয়ে আসে।

প্ল্যানেট ল্যাবস থেকে পাওয়া স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা অন্তত এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছেন। ভূমিকম্পের ফলে উত্তর অংশের পাহাড়ের ঢাল ধসে গিয়েছিল নাকি তুষারধসটি এতটাই প্রকাণ্ড ছিল যে এর ফলেই ভূকম্পনের সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও মতভেদ রয়েছে।

ভূমিকম্পটি যদি মূল অনুঘটক হয়ে থাকে, তবে এটি এমন এক পর্বতকে আঘাত করেছিল যার বরফ ও তুষারস্তর বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আগেই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। একই সাথে ঘটনাটি ঘটেছিল বর্ষা মৌসুমের একেবারে শেষভাগে, যখন পাহাড়ের ঢালগুলো ভারী তুষারে ঢেকে ছিল এবং হিমবাহ গলে যাওয়ায় সৃষ্ট যে নুড়ি-পাথরের স্তূপ একসময় চিরহিমায়িত মাটির কারণে সুসংহত থাকত তা ইতোমধ্যেই পানিতে পুরোপুরি সিক্ত হয়ে পড়েছিল।

যদিও নির্দিষ্ট এই দুর্যোগটির সূত্রপাত নেপালের অভ্যন্তরে একটি হিমবাহে হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, তা সত্ত্বেও এটি তিব্বত মালভূমি থেকে সৃষ্ট হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণে বন্যা, চিরহিমায়িত মাটি গলে যাওয়া এবং নুড়ি-পাথরের স্তূপ ধসে আন্তঃসীমান্ত বিপর্যয় ডেকে আনার ক্রমবর্ধমান দীর্ঘমেয়াদি হুমকিকে উন্মোচন করছে।

কোনো ভূমিকম্পের আঘাত ছাড়াই, এই একই কারণগুলোর সম্মিলিত প্রভাবে সাম্প্রতিককালে একের পর এক হিমালয় সুনামি দেখা দিয়েছে: ২০২১ সালের চামোলি ও মেলামচি, ২০২৩ সালের সিকিম, ২০২৪ সালের থামে, ২০২৫ সালের ভোটে কোশি এবং চলমান ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়। এই দুর্যোগগুলোর প্রায় সবকটিই ঘটেছে বর্ষা মৌসুমে।

গত বছরের ৮ই জুলাই রসুয়াগাধির বন্যা (নিচের মানচিত্রে বিস্তারিত রয়েছে) ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটায়। বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেপাল-চীন সীমান্ত বন্দরে রাখা অনেক যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং নেপালের সেই সব মহাসড়ক, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সঞ্চালন লাইন ধ্বংস করে, যেগুলো আগের প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর মাত্র মেরামত করা হচ্ছিল।

Image by Google Earth via Nepali Times. Used with permission.

ছবিটি গুগল আর্থ থেকে নেপালি টাইমসের সৌজন্যে প্রাপ্ত। অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত।

হিমবাহের উপরিভাগের কিছু বড় জলাশয় একত্রিত ও বিস্ফোরিত হয়ে ভাটিতে ধ্বংসাবশেষের তীব্র স্রোত ভাসিয়ে নেওয়ার কারণেই এই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। গত বছর চীনের পক্ষ থেকে নেপালের স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে এই বিপদের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে এই বছর কোনো ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি।

এছাড়াও, তুষারধস এবং বন্যার উৎপত্তিস্থল সীমান্তের অনেক কাছাকাছি হওয়ায় মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই কাদা-পাথরের এই ভয়াবহ স্রোত রসুয়া চেকপয়েন্টে পৌঁছে যায়।

২০২৬ সালের ২৭ আগস্টের মধ্যে সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা ১৬০ ছাড়িয়ে গেছে এবং এই সংখ্যা কয়েক শ’তে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাতারাতি ২০০ কিলোমিটার ভাটিতে, নেপালের নওয়ালপরাসি জেলায় নারায়ণী নদীতে ভেসে আসতে দেখা গেছে অসংখ্য মানুষের মরদেহ, পশুর মৃতদেহ এবং ধ্বংসাবশেষ।

Image via Nepali Times. Used with permission.

ছবিটি নেপালি টাইমসের সৌজন্যে প্রাপ্ত । অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত।

এই বিপর্যয়টি ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসবে। জলবায়ু সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনাগুলোতে নেপাল দীর্ঘদিন ধরে এই দাবি উত্থাপন করে আসছে। অবকাঠামো ও সম্পদের এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হবে শত কোটি ডলার।

মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় থাকা অন্তত ছয়টি প্রধান জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র সম্পূর্ণ ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নুয়াকোটে অবস্থিত নেপালের ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রিড-স্কেল সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি পলির নিচে চাপা পড়ে যায়।

নির্মাণাধীন অন্যান্য প্রকল্পগুলোও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর ওপর থাকা অন্তত এক ডজন সেতু ভেসে গেছে, যার মধ্যে কয়েকটি ছিল ৭০ কিলোমিটার ভাটিতে। এর ফলে উত্তরাঞ্চলের দিকে যাওয়া মহাসড়কগুলোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

Image via Nepali Times. Used with permission.

ছবিটি নেপালি টাইমসের সৌজন্যে প্রাপ্ত । অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জেন-জি বিক্ষোভের মুখে আগাম নির্বাচন দিতে বাধ্য হওয়ার প্রায় ঠিক এক বছর পরই নেপালে এই বিপর্যয় আঘাত হানলো, যে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) ভূমিধস বিজয় লাভ করেছিল। মাত্র ছয় মাসেরও কম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা তার সরকার এখন বিধ্বস্ত ত্রিশূলী উপত্যকা জুড়ে তাৎক্ষণিক সন্ধান ও উদ্ধার অভিযান এবং ব্যাপক পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে নেপালকে ভূমিকম্প এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি কার্যকর কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যা ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবেই আরও বৃদ্ধি পেতে চলেছে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .