একটি আন্দোলনের সূত্রপাত যে মীম থেকে: ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির অন্দর মহলে

Screenshot from the YouTube Video "Cockroach Janta Party Ka Pehla Manifesto" (CJP's first manifesto) by Cockroach Janta Party. Fair use.

স্ক্রিনশটটি নেওয়া হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির ইউটিউব অ্যানিমেশন ভিডিও “ককরোচ জনতা পার্টি নামের দলের প্রথম ইশতেহার থেকে। ফেয়ার ইউজ অনুসারে ব্যবহার করা হয়েছে। গ্লোবাল ভয়েসেস-এর এআই নীতি কোন এআই চিত্র ব্যবহারের অনুমতি দেয় না, কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমরা ঘটনার বাস্তবতায় ছবিটি ব্যবহার করেছি।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির আর দশটা দিনের মত এক সাধারণ দিনে, ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে করা একটি তাৎক্ষণিক মন্তব্য এমন একটা ঘটনার  সূত্রপাত ঘটায়, যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি: এই মন্তব্যের কয়েক দিন পরেই লক্ষ লক্ষ তরুণ ভারতীয় প্রকাশ্যে নিজেদের ‘তেলাপোকা’ বলে ডাকতে শুরু করে এবং এমন একটি দলে যোগ দেয়, নির্বাচন কমিশনের তালিকায় যে দলটির কোন অস্তিত্বই নেই।

তেলাপোকার ইংরেজি নাম ককরোচ ব্যবহার করে গঠিত হওয়া ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি-এর যাত্রা শুরু একটি মিম থেকে, তবে এই দলটি খুব দ্রুত, বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশের অন্যতম এক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে, যে ব্যবস্থায় তরুণদের কথা শোনার চেয়ে, তাদের নিয়ে বেশি কথা বলছে বলে মনে হয়।

শুরু ও শব্দের মানে পাল্টে যাওয়া

সিজেপিএ-এর উত্থান, ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এক মন্তব্যে কারণে। আর এই ঘটনার সূত্রপাত, ২০২৬ সালের ১৫ই মে তারিখে ভুয়া ডিগ্রি এবং পেশাগত নীতিমালা সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের একটি শুনানি থেকে। উক্ত শুনানির সময়, দেশটির প্রধান বিচারপতি সুরিয়া কান্ত যাদের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে এমন আইনজীবী ও ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে “তেলাপোকা” এবং “পরজীবী”-র মতো শব্দ ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়। শুনানির বিবরণ অনুযায়ী, তিনি বলেছিলেন:

সমাজে এখন এমন সব পরজীবীর বাস, যারা এই চলমান ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ শানছে, আর আপনারা তাদের সাথে হাত মেলাতে চান? তেলাপোকার মতো এমন অনেক তরুণ-তরুণী আছে, যারা না পায় চাকরি, আর যাদের না আছে পেশা জুটিয়ে নেওয়ার মত যোগ্যতা। তাদের মধ্যে কেউ নিজেই আবার হয়ে ওঠে প্রচার মাধ্যম বা মিডিয়া, আবার কেউ কেউ হয় সোশ্যাল মিডিয়া, কেউ আবার আরটিআই (রাইট টু ইনফরমেশন বা তথ্য অধিকার) কর্মী, কেউ বা অন্য অন্য কোনো কর্মী বা একটিভিস্ট, আর তারা সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে… আর সেই আপনারা করেন আদালত অবমাননার মামলা!!

প্রচলিত প্রচার মাধ্যম এই মন্তব্যের ভাবানুবাদ করে, আর দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে, এই প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরে অনলাইনে প্রকাশিত লেখা সবখানে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আর সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনায় দ্রুতই এটি একটি প্রভাবশালী আখ্যানে পরিণত হয় এই কারণে যে, ভারতের প্রধান বিচারপতি দেশের সংগ্রামরত তরুণ তরুণীদের কীটপতঙ্গের সাথে তুলনা করেছেন। প্রধান বিচারপতি পরে স্পষ্ট করেন যে তাঁর সমালোচনা কেবল জাল বা ভুয়া পরিচয়পত্রধারীদের লক্ষ্য করেই করা হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার তরুণ ব্যবহারকারীরা এই অপমানকে লুফে নেয় এবং এটিকে একটি পরিচয়ে রূপান্তরিত করে এই সিদ্ধান্ত নেয় যে, “তেলাপোকা” শব্দটি গালি না হয়ে তাদের সংহতির প্রতীক হয়ে উঠবে।

Screenshot from the Cockroach Janta Party Website. Fair use.

ককরোচ জনতা পার্টির ওয়েব সাইট থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট। ফেয়ার ইউজ অনুসারে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিশ্লেষণ ও দাবী

যদিও মিমের স্রোতে ভেসে যাওয়া এই আন্দোলনটিকে প্রথমে নেতৃত্বহীন এক আন্দোলন বলে মনে হয়েছিল, তবে পরে একজন ব্যক্তি এর সবচেয়ে পরিচিত সংগঠক হিসেবে আবির্ভূত হন: তাঁর নাম অভিজিৎ দীপকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়ালেখা করা ৩০ বছর বয়সী দীপকে একজন ভারতীয় ছাত্র। দীপকের রয়েছে ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় কাজ করার অভিজ্ঞতা। দীপকে এর বর্ণনা অনুসারে সিজেপি- হচ্ছে “তরুণদের দ্বারা পরিচালিত, তরুণদের জন্য গঠিত ও তরুণদের একটি রাজনৈতিক দল”।

তখন কী হবে, যদি সকল তেলাপোকা একসাথে বের হয়ে আসে।

এই আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল ১৬ই মে, ২০২৬ তারিখে—প্রধান বিচারপতির করা মন্তব্যের পরের দিন—যখন দীপকে একটি গুগল ফর্ম এবং ইনস্টাগ্রামে “ আমিও একটি তেলাপোকা” শিরোনামযুক্ত একটি ছবি বা গ্রাফিক পোস্ট করেন। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এর অনলাইন নিবন্ধন ২৫,০০০ ছাড়িয়ে যায় এবং ১৭ই মে তারিখের মধ্যে এর সদস্য সংখ্যা ৪০,০০০ থেকে ৪৫,০০০- ছাড়িয়ে যায়। ইনস্টাগ্রামে, অ্যাকাউন্টটির ফলোয়ার সংখ্যা একদিনে শূন্য থেকে বেড়ে প্রায় ৫ লক্ষে পৌঁছায়, ১৮ই মে তারিখে ৩০ লক্ষে পৌঁছায় এবং চার দিনের মধ্যে এর সদস্য সংখ্যা ১ কোটি অতিক্রম করে—যা শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ৮৭ লক্ষ সাবস্ক্রাইবার বা গ্রাহককে ছাড়িয়ে যায়।

দীপকে এবং তার ছোট একটি দল এর কেন্দ্রীয় অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে ও এর মাধ্যমে দলের যে বিভিন্ন কার্যক্রমের আহ্বান জানানো হয়, তারাই সেগুলো পরিচালনা করেন। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রাণশক্তির বেশিরভাগই আসে বিকেন্দ্রীভূত বা সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণ থেকে: বেনামী মিম-নির্মাতা, তেলাপোকার থিম গ্রহণকারী স্থানীয় পাতা বা পেজ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের চ্যাট গ্রুপগুলো ছিল এই আন্দোলনের প্রাণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় যদি কেউ নিজের পরিচয় “তেলাপোকা” হিসেবে চিহ্নিত করে তাহলে সাথে সাথে সিজেপিতে তার সদস্যপদ নিশ্চিত হয়ে যায়, যা এই ইমোজিটিকে (মানে তেলাপোকার চেহারা) অনলাইন সংহতির এক প্রতীকে পরিণত করেছে।

এই ব্যঙ্গাত্মক নান্দনিকতার আড়ালে রয়েছে একগুচ্ছ সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক দাবি। সিজেপি এর করা পোস্ট এবং ইশতেহার-গুলোয় বার বার সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন ভারতের বিচার বিভাগের-নির্বাহী পদে থাকা ব্যক্তিদের ঘন ঘন বদলি না করা হয়; সংসদে সংসদ সদস্যর দলত্যাগ এর নিয়মকানুন জোরদার করতে; ভারতের বিধান সভা ও রাজ্যসভায় মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে; ভুলতথ্য রোধে দলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে; এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষক দল ও  তাদের মাধ্যম  প্রতিযোগিতামূলক সরকারি চাকুরীর নিয়োগ পরীক্ষার সততা নিশ্চিত করতে এবং পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য কঠিন শাস্তির (দায়বদ্ধতার) ব্যবস্থা করতে

সিজেপি-র এত দ্রুত জনপ্রিয়তার কারণকে কাঠামোগত অসন্তোষ সমূহের মিশে যাওয়ার বিষয়টির মধ্যে দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এই আন্দোলন তরুণ ভারতীয়দের মাঝে বিরাজ করা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত তিনটি হতাশাকে কাজে লাগিয়েছিল: আর সেগুলো হচ্ছে বেকারত্ব ও স্বল্প কর্মসংস্থান, বারবার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রাতিষ্ঠানিক অযোগ্যতা, এবং অভিজাত শ্রেণীর সেই তাচ্ছিল্য যা পিতৃতান্ত্রিকতা ও সন্দেহের মধ্যে দোদুল্যমান। কথিত “তেলাপোকা” মন্তব্যটি প্রাতিষ্ঠানিক অসম্মানের একটি পূর্ব-বিদ্যমান আখ্যানের সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়।

স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া থেকে থেকে সড়কে করা বিক্ষোভ পর্যন্ত

২০২৬ সালের ৬ই জুন নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে এ সিজেপি-র প্রথম প্রতিবাদ সমাবেশটি ডিজিটাল থেকে বাস্তবভিত্তিক আন্দোলনে উত্তরণের সূচনা করে। শত শত সমর্থক, যাদের অধিকাংশই ছিলেন ছাত্রছাত্রী ও সদ্য স্নাতক ডিগ্রী অর্জনকারী, তারা তেলাপোকার মুখোশ পরেছিল এবং জাতীয় পতাকার পাশাপাশি পরীক্ষার প্রস্তুতির জীর্ণ বই বহন করেছিল। বারবার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং খাতা দেখার ভুলের জন্য শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে করা এই সমাবেশের নেতৃত্ব দিতে দীপকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফিরে আসেন

সাংবাদিক ভিজায়েতা সিংহ এক্স (পুর্বে যা টুইটার) নামের সাইটে শেয়ার করেন:

দিল্লির যন্তর মন্তরে আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে তেলাপোকা জনতা পার্টির সদস্যরা বিক্ষোভ করছেন। অভিজিৎ দীপকে এর আগে বিকেল ৫টার পরেও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশের কাছে অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের চলে যেতে অনুরোধ করছে। সিজেপি বলেছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করছেন ততক্ষণ পর্যন্ত বিক্ষোভ চলবে।

২২শে জুনের মধ্যে, প্রতিবাদটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান ধর্মঘটে পরিণত হয়। দলটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা ছত্রভঙ্গ হবে না এবং এই অবস্থান ধর্মঘটকে সরাসরি নিট (এনইইটি বা ন্যাশনাল এলিজ্যাবিলিটি কাম এনট্রেন্স টেস্ট) নামের মেডিকেল কলেজ এ ভর্তি পরীক্ষা কেলেঙ্কারিকে এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত করে। মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা অর্জনের জন্য দেশব্যাপী এই ভর্তি পরীক্ষা যা ১২ই মে বাতিল করা হয়েছিল, যখন তদন্তকারীরা একটি আন্তঃরাজ্য প্রশ্নফাসকারী চক্রের পর্দাফাঁস করে, যারা হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে হাতে লেখা প্রশ্নপত্র স্ক্যান করে ছড়িয়ে দিয়েছিল। এর ফলে ২২ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য হতে হয়। এই পদ্ধতিগত ব্যর্থতার জন্য ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সিকে (এনটিএ) সরাসরি দায়ী করার পাশাপাশি, আন্দোলনটি তার পরিধি বাড়িয়ে জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইপি ২০২০)-এরও বিরোধিতা করছে। এনইপি-কে একটি ছাত্রবিরোধী কর্মসূচির অংশ হিসেবে নিন্দা জানিয়ে, বিক্ষোভকারী ও তাদের সহযোগীরা দেশব্যাপী একটি সত্যিকারের ন্যায়সঙ্গত, সহজলভ্য এবং গণতান্ত্রিক শিক্ষা কাঠামোকে সুরক্ষিত করার জন্য এর পদ্ধতিগত সংস্কারের দাবি জানাচ্ছে।

২৮শে জুন পর্যন্ত বিক্ষোভকারীরা সেই স্থানেই অবস্থান করছিলেন, যেখানে ছাত্র সংকট নিয়ে ২৭শে জুনে প্রদান করা চরমপত্র এর  ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার সাড়া দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রখ্যাত উদ্ভাবক ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেছিলেন; দীপকে আরও অভিযোগ করেছেন যে, মেডিকেল এর ভর্তি পরীক্ষার (এনইইটি) প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষার অনিয়মের প্রতিবাদে করা বিক্ষোভ চলাকালে বিজেপি সমর্থকরা সেখানে বিক্ষোভকারী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছিল।

এই সশরীরী উপস্থিতি তিনটি উদ্দেশ্য সাধন করেছিল: এটি প্রমাণ করেছিল যে সিজেপি-এর অনুসারী গোষ্ঠী নিছক ভার্চুয়াল বা কেবল অনলাইনে সক্রিয় ছিল না; এটি গণমাধ্যমে প্রচারের এমন একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল যা আন্দোলনের নিজস্ব পরিমণ্ডলের বাইরেও এর বয়ানকে প্রসারিত করেছিল; এবং এটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল, যার ফলে এই আন্দোলন পুলিশি ব্যবস্থা ও নজরদারি সামনে চলে আসে।

সম্মানিত মিত্র ও প্রজন্মগত সংহতি

লাদাখ-ভিত্তিক একজন সুপরিচিত প্রকৌশলী, শিক্ষা সংস্কারক এবং জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুক ২ জুন ঘোষণা করেন যে, এই বিষয়ে ৫ জুনের মধ্যে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তিনি ৬ জুন তারিখে এই বিক্ষোভে যোগ দেবেন। তিনি আরও বলেন, “পরিস্থিতি যখন এতই খারাপের দিকে যাচ্ছে, তখন যেকোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত।” দীপকের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই আন্দোলনটি ছিল “অত্যন্ত দেশপ্রেমমূলক” এবং “বিদেশী শক্তি” থেকে মুক্ত। এর মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের বহিরাগত হস্তক্ষেপের ক্রমবর্ধমান বয়ানকে স্পষ্টভাবে খণ্ডন করেন।

ওয়াংচুক, ৬ই জুন যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে এবং ১৫ই জুন বেঙ্গালুরুর প্রতিবাদে যোগ দেন। অভিনেতা ও সমাজকর্মী প্রকাশ রাজ ১৫ই জুনের বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কের প্রতিবাদে যোগ দেন এবং ওয়াংচুক ও দীপকের পাশাপাশি বৃষ্টিস্নাত জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন। অভিনেতা অতুল কুলকার্নিও একইভাবে তরুণ নাগরিকদের যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। আর  এই আন্দোলন তার ক্রমবর্ধমান গণমাধ্যম সংযোগ পরিচালনার জন্য অনুসন্ধানী সাংবাদিক সৌরভ দাস, জননীতি বিশেষজ্ঞ আশুতোষ রাঙ্কা এবং রাজনৈতিক গবেষক বিজেতা দাহিয়াকে আনুষ্ঠানিক ভাবে মুখপাত্র হিসেবে নিযুক্ত করে।

শিক্ষা সংস্কার ও নাগরিক সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বদের সমর্থন, সিজেপি-কে অপরিণত বা বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত বলে খারিজ করে দেওয়ার রাষ্ট্রের মৌখিক কৌশলকে জটিল করে তুলেছিল। এটি বিক্ষোভের দৃশ্যগত ধরণও বদলে দিয়েছিল: তেলাপোকার মুখোশ ও মিমের পাশাপাশি, ক্যামেরায় এখন ছাতার নিচে হাতে পরীক্ষার খাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জাতীয়ভাবে পরিচিত মুখগুলোও ধরা পড়ছিল

রাজ্য এবং রাজনৈতিক দলের সাড়া

সিজেপি একবার দৃশ্যমানতার একটি সীমা অতিক্রম করার পর, রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া তিনটি ধারায় পরিচালিত হয়েছিল। নিয়ন্ত্রক ও প্রযুক্তিগত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে এমন খবরও ছিল যে, চালু হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই সিজেপি-র ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং গ্রুপটির উল্লেখ থাকা সোশ্যাল মিডিয়ার কন্টেন্ট জিও-ব্লক বা সীমাবদ্ধ করা হয়। “ভারতে অ্যাকাউন্ট স্থগিত” নোটিশের স্ক্রিনশট অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে, যা এই ধারণাটিকে আরও শক্তিশালী করে যে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো রসিকতা সহ্য করে না।

নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে, সিজেপি অ্যাটদ্যারেট ককরোচইজব্যাক ( @Cockroachisback) হ্যান্ডেলের অধীনে একটি বিকল্প এক্স অ্যাকাউন্ট চালু করে, যে অ্যাকাউন্টের প্রথম পোস্টে ঘোষণা করা হয়, “তোমরা কি ভেবেছিলে আমাদের তাড়াতে পারবে? হাহাহা,” এবং এর সাথে একটি এআই-দিয়ে তৈরি পোস্টার ছিল যেখানে লেখা ছিল “তেলাপোকারা ফিরে এসেছে।” নতুন অ্যাকাউন্টটি প্রথম ৯০ মিনিটে ২৩,৮০০ অনুসারী অর্জন করে এবং এর বায়োতে বা এই অ্যাকাউন্টের পরিচিতির বর্ণনায় ​​কেবল লেখা ছিল: “তেলাপোকা মরে না।”

একটি জনস্বার্থ মামলার মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে আইনি প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, যেখানে সিজেপি-র আদালতকক্ষের মন্তব্য ও বিচারিক চিত্র ব্যবহারের বিষয়টিকে একটি অবৈধ “বাণিজ্যিকীকরণ” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যা জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করেছে এবং বিচারিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছে। মৌখিকভাবে, রাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সিজেপি-কে “বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত,” বিরোধী দলের একটি ফ্রন্ট, অথবা নিছক দায়িত্বজ্ঞানহীন তরুণ হিসেবে খারিজ করে দেয় এবং তাদের দাবির মূল বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে চলে।

সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব এবং আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো বিরোধী নেতারা সিজেপি-কে জন অসন্তোষের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য ব্যক্তিত্বরা আরও সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন; উদাহরণস্বরূপ, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সাধারণ সম্পাদক ডি. রাজা নিট  নামের  পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস সংকট নিয়ে সিজেপি-র নেতৃত্বে হওয়া প্রতিবাদের প্রতি অবিচল সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। এই নানা ধরনের সমর্থন সত্ত্বেও, কিছু নেতা এখনও এই আন্দোলন নিয়ে সন্দিহান।

“আমি এটাকে গুরুত্ব দিই না,” বলেছেন সন্দীপ দীক্ষিত, একজন প্রাক্তন সাংসদ, যিনি কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে সুশীল সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। “মানুষ কোনো  একটা কিছুতে ক্লিক করেই নিজেদের রাজনৈতিক কর্মী ভাবা শুরু করছে – এটা বাজে কথা। আমার মনে হয় এটা একটা সাময়িক উন্মাদনা।”

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

এই আন্দোলন ইতোমধ্যেই একটি ভারতের রাজনৈতুক পরিমণ্ডলে একটা পরিমাপযোগ্য প্রভাব ফেলেছে: এটি পরীক্ষার সততা, বিচার বিভাগীয়-নির্বাহী নিয়োগের ধরণ এবং প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকে এমন একটি গণ  আলোচিত বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে, যুবসমাজ আগে সমস্ত বিষয় সম্মিলিত দাবির পরিবর্তে ব্যক্তিগত অভিযোগের মাধ্যমে উত্থাপন করত। হয় সিজেপি, একটি আনুষ্ঠানিক দাবী তুলে ধরার মাধ্যমে পরিণত হবে, রাষ্ট্রীয় চাপে ভেঙে পড়বে, নাকি বিদ্যমান দলীয় কাঠামোয় রাজনৈতিক দলের সাথে মিশে যাবে— অথবা এমন একটি পরিবেশে মীম-চালিত আন্দোলনের মাধ্যমে জীবনচক্র সম্পর্কে আরও তথ্য দেবে, যেখানে আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা নেই কিন্তু অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা কার্যকর রয়েছে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .