
নাইজেরিয়ার কিছু স্কুলপড়ুয়া শিশু। ছবি : ডাগ লিনস্টেড (Doug Linstedt)। আনস্প্ল্যাশ( Unsplash) -এর মাধ্যমে বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য ।
নাইজেরিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার হঠাৎ করেই তাদের ২০২২ সালের জাতীয় ভাষা নীতি থেকে সরে আসায় ভাষা অধিকার কর্মীরা হতবাক হয়েছেন। পূর্বের নীতিতে শিক্ষাক্ষেত্রে দেশীয় ভাষা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও নতুন সিদ্ধান্তে শিক্ষার সব স্তরে একমাত্র মাধ্যম হিসেবে পুনরায় ইংরেজিকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
২০২২ সালে শিক্ষামন্ত্রী মাল্লাম আদামু আদামুর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জাতীয় ভাষা নীতি (এনএলপি) প্রবর্তন করা হয়েছিল। এই নীতি অনুযায়ী, স্কুলজীবনের প্রথম ছয় বছর শিক্ষার্থীদের পাঠদানের মাধ্যম হিসেবে দেশীয় ভাষা ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হয়। এই নীতির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়ার নিজস্ব ভাষার পাঠ্যক্রম, শিক্ষা উপকরণ ও সম্পদের উন্নয়নে উৎসাহিত করা এবং মাতৃভাষায় পাঠদানের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচিতে সহায়তা করা।
ভাষা নীতির পরিবর্তন
নাইজেরিয়ার বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী তুনজি আলাউসা ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর আবুজায় অনুষ্ঠিত শিক্ষাক্ষেত্রে ভাষা বিষয়ক সম্মেলনে ভাষা নীতি বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এর আগে ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ওন্ডো রাজ্যের আকুরেতে অনুষ্ঠিত ৬৯তম জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিলে এই সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা হয়েছিল।
নীতিটি বাতিলের ভিত্তি হিসেবে ব্যর্থতার উচ্চ হার এবং শিক্ষার্থীদের ইংরেজি অনুধাবনের ক্ষেত্রে কাঠখড় পোড়ানোসহ বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেছেন:
দেশের যে নির্দিষ্ট কিছু ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলে মাতৃভাষা শিক্ষা নীতিটি অতিরিক্ত মাত্রায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেসব অঞ্চলে পশ্চিম আফ্রিকান পরীক্ষা পরিষদ (WAEC), জাতীয় পরীক্ষা পরিষদ (NECO) এবং সমন্বিত উচ্চশিক্ষা প্রবেশিকা পরীক্ষা (UTME)-এ ব্যাপক হারে অনুত্তীর্ণের হার দেখা যাচ্ছে। এটি মূলত তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সুশাসনের বিষয়। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, নিম্ন-মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার স্তর পর্যন্ত সবখানেই ইংরেজি এখন শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
তিনি আরও বলেছেন:
গত ১৫ বছর ধরে নাইজেরিয়ার নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষা ব্যবহার করাটা আক্ষরিক অর্থেই শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদের আবেগ দিয়ে নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলতে হবে।
সিদ্ধান্তের সমালোচনা
তবে অনেক ভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ এবং সাংস্কৃতিক কর্মী এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। জাতীয় ভাষা নীতি (NLP) বাতিলের এই পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে নাইজেরিয়ান অ্যাকাডেমি অব লেটার্স (NAL) এবং মাতৃভাষা-ভিত্তিক শিক্ষা পুনরায় চালু করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক অ্যান্ড্রু হারুনা তাঁর বিবৃতিতে বলেছেন:
যে দেশ তার কোমলমতি শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করে, সে দেশ মূলত তাদের জ্ঞানের সবচেয়ে গভীর এবং খাঁটি উৎসগুলোতে প্রবেশাধিকার আটকে দেয়। শিক্ষার্থীদের তাদের মাতৃভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করার অর্থ হলো তাদের বুদ্ধিভিত্তিক ও কল্পনা শক্তির সম্ভাবনাকে খর্ব করা।
তিনি আরও বলেছেন:
আমাদের ভাষাগুলোকে রক্ষা করা এবং মাতৃভাষা-ভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো একটি জাতীয় দায়িত্ব এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের এক নৈতিক দায়বদ্ধতা।
নাইজেরিয়ার ভাষাতাত্ত্বিক সমিতি (LAN) একটি গণস্বাক্ষর কর্মসূচি শুরু করেছে। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নীতি পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তটি “বিশেষ করে গ্রামীণ ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষাগত অন্তর্ভুক্তি এবং সমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।” “জাতীয় ভাষা নীতি (২০২২) পরিবর্তন না করে তা বহাল রাখতে এবং এটিকে আরও মজবুত করতে” কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। ৯৯৯ জন যাচাইকৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর সম্বলিত এই আবেদনে সংগঠনটি কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে:
- জাতীয় ভাষা নীতি (২০২২) বাতিল না করে তা বহাল রাখা এবং আরও শক্তিশালী করা।
- দেশজুড়ে মাতৃভাষা-ভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা (এমটিবি-এমএলই) পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা।
- শিক্ষক, ভাষাবিদ এবং শিক্ষাক্রম প্রণয়নকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা।
- একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের সাথে স্বচ্ছ সংলাপের আয়োজন করা।
- সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে নাইজেরিয়ার সেই শিক্ষাগত দূরদৃষ্টিকে সমুন্নত রাখা।
২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বরে নাইজেরিয়ার একদল ভাষাবিদ, ভাষা সমিতি, সাংস্কৃতিক অংশীজন এবং সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা নাইজেরিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস সামিট (নাইজেরীয় ভাষা শীর্ষক সম্মেলন)-এ একত্রিত হয়েছিলেন। এই সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল নাইজেরিয়ার স্থানীয় ভাষাগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা এবং ২০২২ সালের জাতীয় ভাষা নীতি পুনর্বহাল ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার একটি উপায় খুঁজে বের করা। সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন:
২০২২ সালের জাতীয় ভাষা নীতি ছিল নাইজেরিয়ার অভ্যন্তরীণ এবং বিশ্বব্যাপী সফল দ্বিভাষিক ও বহুভাষিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে প্রাপ্ত কয়েক দশকের গবেষণা, পরামর্শ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল।
২০২২ সালের জাতীয় ভাষা নীতি (NLP)-র আকস্মিক বাতিলকরণ প্রতিষ্ঠিত গবেষণালব্ধ ফলাফলের পরিপন্থী এবং এটি নাইজেরিয়ার শিক্ষাগত লক্ষ্য, জাতীয় সংহতি এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান যেন ২০২২ সালের জাতীয় ভাষা নীতি বাতিলের সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করা হয় এবং প্রাথমিক শিক্ষায় নাইজেরিয়ার স্থানীয় ভাষাগুলোকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের বিধানগুলো অবিলম্বে পুনর্বহাল করা হয়।
সিদ্ধান্তের পক্ষে সমর্থন
ইতিমধ্যে কিছু নাইজেরিয়ান মাতৃভাষা শিক্ষা নীতি বাতিলের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন। জনমত বিশ্লেষক ও লেখক জনাব তোসিন আদেওতি বলেছেন, এই সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল। তিনি উল্লেখ করেছেনঃ
একটি প্রধান আদিবাসী ভাষাগোষ্ঠীর দেশের জন্য প্রণীত নীতি শত শত ভাষার মানুষের একটি দেশে চাপিয়ে দেওয়া যায় না… কয়েক ডজন ভাষায় একসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের জন্য নাইজেরিয়ার কাছে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষক, পাঠ্যপুস্তক বা অবকাঠামো নেই।
তিনি আরও বলেছেন:
এই নীতি বাতিলকে সমর্থন করার মানে আমাদের সমৃদ্ধ ভাষাগত ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করা নয়। নাইজেরিয়ার ভাষাগুলো সংরক্ষণ এবং সক্রিয় সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার দাবি রাখে। তবে এগুলোকে নিম্নলিখিত উপায়ে শক্তিশালী করতে হবে:
- বাধ্যতামূলক মাতৃভাষায় পাঠদান
- সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চা
- পাঠ্যবহির্ভূত এবং সম্প্রদায়-নেতৃত্বাধীন সমৃদ্ধি
- অনুবাদ প্রকল্প
- ডিজিটাল ভাষা সংরক্ষণ
এগুলো পরীক্ষিত এবং টেকসই পদ্ধতি। ৫০০টি ভাষার একটি দেশে আদিবাসী ভাষাগুলোকে শিক্ষার মাধ্যম করা সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়। সরকারের এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন আদিবাসী পরিচয়কে প্রত্যাখ্যান করা নয়। এটি নাইজেরিয়ার জটিলতার একটি স্বীকৃতি।
এই প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিটি প্রত্যাহারের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।






