কমিউনিটির উদ্যোগে যেভাবে বেঁচে আছে নাইজেরিয়ার কাম ভাষা

Nigerian youth

ড. জ্যাকব লেসাজ ও ভাষা নথিবদ্ধকরণ দলের কয়েকজন সদস্য। ছবি: ওবিদাহ আমোস। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

এই পোস্টটি গ্লোবাল ভয়েসেস এর আগস্ট ২০২৬ এর বিশেষ ধারাবাহিক “আদিবাসী অধিকার” (Indigenous Rights) – এর অংশ। এই সিরিজটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে, যাতে আদিবাসীদের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্রবিন্দুতে এনে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করা যায়, এবং আদিবাসী নেতা, কর্মী ও সম্প্রদায়ের সদস্যদের গল্পসহ অন্যান্য বিষয় তুলে ধরা যায়। এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশে সহায়তা করতে চাইলে এখানে ক্লিক করে অনুদান দিতে পারেন।

ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকি ঠেকাতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় কি হতে পারে সেই ভাষার মানুষদেরই নিজেদের ভাষা নথিবদ্ধ করার সুযোগ ও সক্ষমতা দেওয়া? কাম ল্যাঙ্গুয়েজ প্রজেক্ট দেখাচ্ছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে পরিচালিত উদ্যোগ বিপন্ন ভাষা সংরক্ষণে কতটা কার্যকর হতে পারে।

কাম, যা নিংওম নামেও পরিচিত, নাইজেরিয়ার তারাবা অঙ্গরাজ্যের বালি লোকাল গভর্নমেন্ট এরিয়ার ২৯টি গ্রামে প্রচলিত একটি ভাষা। বর্তমানে এই ভাষায় কথা বলেন আনুমানিক ৮,০০০ থেকে ১১,০০০ মানুষ।

উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ার আরও অনেক আদিবাসী ভাষার মতো কাম ভাষাও ২০১৬ সালের আগে গবেষকদের নজরের বাইরে ছিল। ফলে ভাষাটি নথিবদ্ধ ও সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লিখিত সাহিত্য, অভিধান, মানসম্মত বানানরীতি কিংবা অডিও-ভিজ্যুয়াল রেকর্ডিং, কোনোটিই গড়ে ওঠেনি।

ভাষাটি সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে কাম ল্যাঙ্গুয়েজ প্রজেক্ট শুরু করেন হামবোল্ট ইউনিভার্সিটি অব বার্লিনের ইনস্টিটিউট অব এশিয়া অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের ভাষাবিদ ও প্রভাষক ড. জ্যাকব লেসাজ।

পরবর্তী ১০ বছর তিনি কাম জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে কাজ করেন এমন একটি পদ্ধতিতে, যাকে তিনি “বিকেন্দ্রীভূত” দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বর্ণনা করেন। বাইরের বিশেষজ্ঞ হিসেবে এসে কাজ করার বদলে তিনি কাম সম্প্রদায়ের ১৪ জন সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি ভাষা নথিবদ্ধকরণ দল গড়ে তোলেন।

২০২৬ সালের মার্চে ১০ বছরের প্রকল্পটি শেষ হওয়ার সময় দলটি কাম ভাষার একটি ব্যাকরণভিত্তিক রেফারেন্স, একটি ডিজিটাল অভিধান, ৩০৭টি অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিং এবং ভাষাটিকে ঘিরে একটি স্বতন্ত্র ওয়েবসাইট তৈরি করেছিল।

হোয়াটসঅ্যাপে গ্লোবাল ভয়েসেসের আবদুলরশীদ ফাদিপের সঙ্গে আলাপকালে লেসাজ এই ভাষা নথিবদ্ধকরণ প্রকল্পের পেছনের গল্প তুলে ধরেন।

African King

কাম ভাষা নথিবদ্ধকরণ প্রকল্পের সমাপ্তি উদ্‌যাপনে আমন্ত্রিত কয়েকজন রাজকীয় অতিথির সঙ্গে প্রয়াত কাম রাজা ইসা সারকিন সাওয়া (সাদা পোশাকে)। ছবি: ওবিদাহ আমোস। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

জিভি: নাইজেরিয়ার ভাষাগুলো নিয়ে কাজ করার আগ্রহ আপনার কীভাবে তৈরি হলো?

জেএল: নাইজেরিয়ায় ভাষার বৈচিত্র্য যেমন বিপুল, তেমনি সেগুলো নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ঘাটতি। একই সঙ্গে অনেক জনগোষ্ঠী চান তাদের ভাষা নিয়ে গবেষণা হোক এবং তা যথাযথভাবে তুলে ধরা হোক। দেশটির ৫০০টির বেশি ভাষার প্রায় অর্ধেকই কখনো উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার আওতায় আসেনি। আফ্রিকার মধ্যে নথিবদ্ধ না হওয়া ভাষার এই হারই সবচেয়ে বেশি।

একজন ভাষাবিদের জন্য এই কাজ একই সঙ্গে জরুরি ও রোমাঞ্চকর। আগে কখনো নথিবদ্ধ হয়নি এমন একটি ভাষা গভীরভাবে অধ্যয়ন করলেও ভাষার শ্রেণিবিন্যাস, ইতিহাস, এমনকি ভাষাবিজ্ঞান সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণা বদলে যেতে পারে। কাম ভাষা ছিল ঠিক এমনই একটি আবিষ্কার। এটি নাইজার-কঙ্গো ভাষাপরিবারের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু পরিচিত কোনো উপগোষ্ঠীর সঙ্গে একে সহজে মেলানো যায় না। ফলে প্রশ্ন ওঠে, ভাষাটি বর্তমান অঞ্চলে কীভাবে এল। এর কিছু ব্যতিক্রমী ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্যও রয়েছে, যা ভাষাবিজ্ঞানের বিস্তৃত কিছু বিতর্ক বুঝতে নতুন আলো ফেলতে পারে।

বৈজ্ঞানিক গুরুত্বের বাইরেও এই কাজ ভাষাভাষী মানুষের জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে। তারা চান তাদের ইতিহাস নথিবদ্ধ হোক এবং ভাষা সংরক্ষিত থাকুক। নাইজেরিয়া এমন একটি বিরল জায়গা, যেখানে ভাষাবিজ্ঞান যেমন বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভাষাভাষী মানুষের কাছেও তা বাস্তব অর্থ বহন করে। কারণ তাঁরা নিজেরাই নিজেদের ভাষা নথিবদ্ধ করতে চান।

জিভি: ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকির বিচারে কাম ভাষার অবস্থান কোথায়? এটি কি এখনই গুরুতর হুমকির মুখে?

জেএল: কাম এখনো দৈনন্দিন জীবনে সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হয়, তাই ভাষাটি এখনই সংকটাপন্ন নয়। তবে এই অঞ্চলের আরও অনেক ভাষার মতো এটিও বাস্তব চাপের মধ্যে রয়েছে।

ভাষা হারিয়ে যাওয়া কখনো শুধু ভাষার বিষয় নয়। একটি ভাষা টিকে থাকে সেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরগুলোতে, যেখানে মানুষ সেটি ব্যবহার করে। সেই পরিসরগুলো হারিয়ে গেলে ভাষাটিও ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে। কৃষিকাজের কথাই ধরা যাক। ঐতিহ্যগতভাবে কাম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ কৃষক। জমিতে কাজ করা, ফসল প্রক্রিয়াজাত করা কিংবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে বেচাকেনার সময় তাঁরা নিজেদের ভাষা ব্যবহার করেন। কিন্তু কেন্দ্রীভূত অর্থনীতির টানে বা অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে কৃষিকাজ কঠিন হয়ে পড়ায় মানুষ যদি শহরে চলে যায়, তখন এসব ভাষিক পরিসরও হারিয়ে যায়। তার জায়গায় তৈরি হয় নতুন পরিবেশ, যেখানে অন্য ভাষার ব্যবহার বেশি।

ধরা যাক কেউ রাজ্যের রাজধানী জালিঙ্গোতে চলে গেলেন। সেখানে দৈনন্দিন জীবনই তাকে বেশি হাউসা ভাষা ব্যবহার করতে বাধ্য করবে। জীবনযাত্রা বদলালে ভাষার ব্যবহারও বদলায়। আর এখন যেহেতু সড়কপথে কাম গ্রামগুলো বড় অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, এই পরিবর্তন খুব দ্রুতও ঘটতে পারে।

তাই আমি কাম ভাষাকে বলব স্থানীয়ভাবে স্থিতিশীল, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা ভাষাটি তখনই নথিবদ্ধ করছি যখন এটি এখনো মানুষের প্রতিদিনের জীবনে সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গত ১০ বছরের কাজের মূল লক্ষ্যও ছিল সেটিই।

জিভি: নিজের ভাষা নয়, এমন একটি ভাষা নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে নৈতিক বিষয়গুলো আপনি কীভাবে বিবেচনায় নিয়েছেন? আর এই নথিবদ্ধকরণ প্রক্রিয়াকে গড়ে তুলতে স্থানীয় ভাষাভাষীদের ভূমিকা কী ছিল?

জেএল: আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কমিউনিটি শুধু এই কাজে যুক্ত থাকবে তা নয়, বরং কী নথিবদ্ধ হবে এবং কীভাবে হবে, সেই সিদ্ধান্তেও তাদের নেতৃত্ব থাকবে। সময়ের সঙ্গে আমি এমন একটি পদ্ধতির দিকে গেছি, যাকে আমি বলি বিকেন্দ্রীভূত মাঠগবেষণা। এখানে গবেষক একমাত্র বিশেষজ্ঞ বা সিদ্ধান্তগ্রহণকারী নন। দক্ষতা, সরঞ্জাম ও সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কমিউনিটির সহযোগীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়। ভাষাবিদ সেখানে মূলত সহায়ক ভূমিকা পালন করেন।

বাস্তবে এর অর্থ ছিল, কাম দলের সদস্যরা প্রতিটি ধাপে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিয়েছেন। রেকর্ডিং, প্রতিলিপি তৈরি, অনুবাদ, এমনকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে কোন বিষয়গুলো সংরক্ষণ করা দরকার, সেই সিদ্ধান্তও তাঁরা নিয়েছেন। এর মধ্যে ছিল মৌখিক ইতিহাস, স্থানীয় জ্ঞান এবং সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নানা গল্প। ফলে এই নথিবদ্ধকরণে কমিউনিটি দলের কাছে যে বিষয়গুলো মূল্যবান বলে মনে হয়েছে, সেগুলোরই প্রতিফলন ঘটেছে।

তবে এটাও স্বীকার করতে হবে, একাডেমিক কাঠামো সব সময় এই ধরনের কাজকে সহজ করে না। এখনো স্বল্পমেয়াদি ফলাফল এবং পুরোপুরি তাত্ত্বিক গবেষণার দিকে প্রবল চাপ রয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানের অনেক গবেষণায় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সরাসরি উপকারের চেয়ে গবেষণার প্রশ্নকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে ক্ষেত্রটি বদলাচ্ছে। এখন আরও বেশি প্রকল্প এমন মডেল তৈরির চেষ্টা করছে, যেখানে মানসম্মত গবেষণা ও কমিউনিটির অগ্রাধিকারকে একে অপরের বিপরীতে দাঁড় করাতে হয় না।

আমার লক্ষ্য এমন একটি কাজের পদ্ধতি তৈরি করা, যেখানে কমিউনিটির প্রকৃত মালিকানা থাকবে এবং প্রকল্প শেষ হওয়ার বহু পরও সেই কাজ স্থানীয়ভাবে মূল্যবান থাকবে। একই সঙ্গে আমি মনে করি, যেসব মানুষের ভাষা আমরা গবেষণা করি, তাঁদের সঙ্গে গভীর অংশীদারত্ব আমাদের তাত্ত্বিক গবেষণাকেও অনেক সমৃদ্ধ করতে পারে। সম্পর্কটি সঠিকভাবে গড়ে উঠলে সবাই উপকৃত হয়।

African dancers

কাম ভাষা নথিবদ্ধকরণ প্রকল্পের সমাপ্তি উদযাপন। পরিবেশিত নৃত্যটির নাম এন্সুরং (Ǹsúróng)। ছবি: ওবিদাহ আমোস ও রেভারেন্ড সল স্যামুয়েল। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

ভাষা নথিবদ্ধকরণ সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করা কমিউনিটির সদস্য বাবাঙ্গিদা আউদু প্রকল্পটির শুরুর গল্প এভাবে বলেন:

২০১৬ সালে শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি [লেসাজ] সারকিন দাওয়ায় আসার পর তিনি কমিউনিটির প্রবীণদের সঙ্গে দেখা করতে শুরু করেন। তাদের একজন ছিলেন আমার বাবা। তিনি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তার এমন কোনো শিক্ষিত সন্তান আছে কি না, যার সঙ্গে তিনি কাজ করতে পারেন। এরপর বাবা আমাকে বাড়ি ফিরে আসতে বলেন। তখন আমি আবুজায় ছিলাম।

ফিরে আসার পর ওই ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের কয়েকটি বৈঠক হয়। সেখানে আমি প্রতিলিপি তৈরি ও অনুবাদের কাজে তাকে সহায়তা করি। আমি এই প্রকল্পে যুক্ত হয়েছিলাম, কারণ আমি চেয়েছিলাম আমার ভাষা আরও এগিয়ে যাক। পরে আমাকে ভাষা নথিবদ্ধকরণ সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর আমরা আরও কয়েকজনকে যুক্ত করি এবং দুজন করে সদস্য নিয়ে ছয়টি দল গঠন করি। সব মিলিয়ে দলে ছিলেন ১২ জন।

তিনি আরও বলেন:

আমরা ইংরেজিতে কথা বলতাম। তার কথা বলার ধরন বুঝতে অভ্যস্ত হতে কিছুটা সময় লেগেছিল। কখনো কখনো তাকে ভালোভাবে বোঝানোর জন্য আমাদের উদাহরণ দিয়ে বা দেখিয়ে বুঝাতে হতো। তিনি সব সময় শেখার জন্য আগ্রহী ছিলেন। কোনো কিছু বুঝতে না পারলে তিনি আরও পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে বলতেন।

দলের আরেক সদস্য গারবা রাহাব প্রেশাস মনে করেন, কমিউনিটির সদস্যদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার কারণেই প্রকল্পটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভাষাটি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পেরেছে।

প্রকল্পের সদস্যদের ভিডিও ও অডিও রেকর্ডিংয়ের জন্য ক্যামেরা ব্যবহার শেখানো হয়েছিল। আর আমাকে শেখানো হয়েছিল কীভাবে কথাগুলো লিখিত রূপে তুলে এনে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হয়। সাধারণত নথিবদ্ধকরণের দিনে আমরা কাম গ্রামগুলোতে যেতাম এবং বিভিন্ন বিষয়ে স্থানীয় ভাষাভাষীদের সাক্ষাৎকার নিতাম। রেকর্ড করা ভিডিওগুলো ইয়াকুব [লেসাজ]-এর কাছে পাঠানো হতো। তিনি সেগুলো দেখে নিতেন, এরপর আমরা প্রতিলিপি তৈরি ও অনুবাদ করতাম।

জিভি: প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন, আর সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?

জেএল: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কোভিড-১৯। আমার নাইজেরিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই সেটা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এটি বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের পুরো ক্ষেত্রটিকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল। আমরা অনেকটাই নির্ভর করি বাইরের গবেষকের কোনো কমিউনিটিতে সরাসরি গিয়ে কাজ করার ওপর। মহামারি দেখিয়ে দেয়, এই মডেল কতটা ভঙ্গুর। একই সঙ্গে এটি এমন একটি ধারণাকেও আরও দৃঢ় করে, যার দিকে আমি আগেই এগোচ্ছিলাম। কমিউনিটির মানুষদের যদি নিজেদের ভাষা নথিবদ্ধ করার দক্ষতা ও সরঞ্জাম থাকে, তাহলে কোনো বিদেশি গবেষক সেখানে যেতে না পারলেও কাজ থেমে থাকে না।

তাই আমরা দূর থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পদ্ধতি গ্রহণ করি। কাছাকাছি একটি কমিউনিটির বাসিন্দা এবং ভাষা নথিবদ্ধকরণের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এলিশা ইউনানার সঙ্গে মিলে আমরা প্রায় ১০ জনের একটি প্রাথমিক কাম দলকে দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দিই। সেখানে তাদের নিজেদের হাতে রেকর্ডিং সরঞ্জাম ব্যবহার শেখানো হয়।

তবে সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়াও ছিল আলাদা এক চ্যালেঞ্জ। নাইজেরিয়ায় স্থানীয়ভাবে এসব সরঞ্জাম কেনার কোনো ব্যবস্থা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল না। তাই আমাকে জার্মানিতে সেগুলো কিনতে হয় এবং নাইজেরিয়াগামী বন্ধুদের সহায়তায় কাম কমিউনিটির কাছে পাঠাতে হয়।

ফাইল আদান-প্রদানও বেশ ঝামেলার ছিল। অডিও ও ভিডিও ফাইলের আকার বড়, আর গ্রামগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগ ছিল অনির্ভরযোগ্য। আমরা জালিঙ্গোভিত্তিক কিছু মানুষের মাধ্যমে ফাইল আপলোডের ব্যবস্থা করি, কারণ সেখানে ইন্টারনেট তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল।

শ্রুতিলিপি তৈরির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ছিল ভিন্ন ধরনের। কাম ভাষার নিজস্ব কোনো লিখনপদ্ধতি ছিল না। সবচেয়ে কার্যকর হয়েছে ভাষাভাষীদের নিজস্ব ভাষাবোধের ওপর আস্থা রাখা। তারা স্বাভাবিকভাবে যেভাবে ধ্বনিগুলো লিখে প্রকাশ করত, সেখান থেকেই আমরা শুরু করি। পরে পড়তে অসুবিধা হলে ধাপে ধাপে সেগুলোর সমাধান করা হয়েছে, বাইরে থেকে কোনো পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়া হয়নি।

দলটি প্রতিটি চ্যালেঞ্জই দারুণভাবে সামলেছে। আমরা একসঙ্গে যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে আমি সত্যিই গর্বিত।

জিভি: কাম ভাষা যদি আগামীকালই হারিয়ে যায়, আপনার মতে বিশ্ব কী হারাবে?

জেএল: কাম জনগোষ্ঠীর জগৎ অনেক কিছু হারাবে। তাদের রসিকতা, গল্প, একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক প্রকাশের নিজস্ব ধরন, এমনকি যারা ভাষাটি বোঝে না তাদের কাছ থেকে কিছু কথা গোপন রাখার উপায়ও হারিয়ে যাবে।

আর বাকি বিশ্বের জন্য এর অর্থ হবে মানব সংস্কৃতি ও ভাষাকে বোঝার এমন একটি জানালা হারিয়ে ফেলা, যা আমরা এখনো পুরোপুরি খুলে দেখতে পারিনি।

লেসাজ মনে করেন, কাম ভাষার ভাষাগত ঐতিহ্যের মালিকানা কাম জনগোষ্ঠীরই। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পে তৈরি উপকরণগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .