যে শিশুরা পৃথিবী চেনার আগেই যুদ্ধ শেখে

A boy walks along a dirt road at a camp in Idlib, Idlib Governorate, Syria. Photo by Ahmed Akacha on Pexels.

সিরিয়ার ইদলিবের একটি শিবিরে এক বালক। ছবি: আহমেদ আকাচা, পিক্সেলসবিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য

লিখেছেন নূরুদ্দিন ভিটিকাদান

২০২৩ সালের শেষের দিকের কথা, যখন গাজার দৃশ্যগুলো আমাদের টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠতে শুরু করে। আমি বারবার সেই দৃশ্যগুলোর কাছেই ফিরে যাচ্ছিলাম: ধ্বংসাবশেষ, সাইরেনের শব্দ, আর সাদা কাপড়ে মোড়ানো ছোট ছোট নিথর দেহগুলোর অসহনীয় নিস্তব্ধতা

ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা ছিল ব্যাপক। কিন্তু যা রয়ে গেছে তা হলো শিশুদের মুখগুলো — কেউ চলে গেছে, কেউ আহত, অনেকে আবার এতই ছোট যে বুঝতেই পারছে না কেন তাদের পুরো পৃথিবী একরাতেই ধসে গেল। খবরের প্রতিবেদনে হতাহত ও পরিসংখ্যানের সংখ্যাগুলো বলা হচ্ছিল, কিন্তু সেই সংখ্যাগুলোর পেছনে ছিল এমন কিছু গল্প যা টেলিভিশন বন্ধ করার পরও ঘর থেকে চলে যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল।

এটি আর কেবল যুদ্ধ কবলিত অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কোনো বাস্তবতা নয়। সার্বক্ষণিক যোগাযোগের এই যুগে পর্দা, পারস্পরিক কথাবার্তা এবং চারপাশের প্রাপ্তবয়স্কদের পারিপার্শ্বিক উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে শিশুরা সরাসরি যুদ্ধের সম্মুখীন হচ্ছে। এই নিবন্ধটিতে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে থাকা শিশুদের শৈশবকেও এই ধরনের পরিস্থিতি নীরবে বদলে দিচ্ছে।

আমি প্রায়ই আমার স্ত্রীর সাথে বসে আমাদের মাত্র দেখে আসা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতাম; আমরা এমন এক শোককে অনুধাবন করার চেষ্টা করতাম যা আমাদের নিজস্ব ছিল না, তবুও কোনো না কোনোভাবে তা আমাদেরই মনে হতো।

আর এই সবকিছুর মধ্যে আমি জরুরি একটা বিষয় এড়িয়ে গেছি।

আমার দুটি মেয়ে আছে। বড়টির বয়স প্রায় ১৫, সংঘাতের ভাষা বোঝার মতো যথেষ্ট বয়স হয়েছে তার। ছোটটির বয়স মাত্র ছয়, সে এখনো এমন এক জগতে বাস করে যেখানে প্রশ্নগুলো সরল আর উত্তরগুলো থেকে আশ্বাসের প্রত্যাশা থাকে। আমি যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি সময় তারা ঘরের ভেতরেই থাকত— সবকিছু দেখত, শুনত আর আত্মস্থ করত।

শুরুর দিকে তাদের প্রতিক্রিয়াগুলো ছিল মৃদু। এদিক-ওদিক তাকানো এবং কৌতূহলী হওয়া। স্ক্রিনের দিকে আঙুল উঁচিয়ে আমার ছোট মেয়েটি একবার জিজ্ঞেস করেছিল, “ওরা কাঁদছে কেন?” আমি তাকে এমন একটা উত্তর দিয়েছিলাম যা নিরাপদ মনে হয়েছিল। এটি কিছুটা অসম্পূর্ণ উত্তর, যা কেবল তাকে বাস্তবতার আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্যই তৈরি। কিন্তু শিশুরা শুধু শব্দই শোনে না; তারা মুখভঙ্গি, কণ্ঠস্বর এবং নীরবতাও পড়তে পারে। আমি যে বিষয়টিকে আড়াল করতে চেয়েছিলাম, তারা ততক্ষণে সেটি নিজেদের মতো করে বুঝে নিয়েছিল।

এরপর, সাম্প্রতিক সময়ে ‘সেখানকার দূরত্ব’ আর ‘এখানকার বাস্তবতার’ মধ্যকার দূরত্বটুকু মুছে যেতে শুরু করল।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা বৃদ্ধির সাথে সাথে খবরের সুরও বদলে গেল। এটি আর কেবল নির্দিষ্ট কোনো এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিবেদনে উপসাগরের কথা উঠে আসতে শুরু করল। পর্দায় ভেসে উঠতে লাগল জরুরি সতর্কবার্তা। ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘ড্রোন’-এর মতো শব্দগুলো আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায় ঢুকে পড়ল; তবে কোনো দূরবর্তী শব্দভাণ্ডার হিসেবে নয়, বরং বাস্তব এক আশঙ্কা হিসেবে।

বিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে গেল। থমকে গেল স্বাভাবিক জীবনযাত্রার গতি।

আর তারপর সেই মুহূর্তটি এলো যা সবকিছু ওলটপালট করে দিল: এই উপলব্ধি যে, আমাদের আবাসস্থল কাতারসহ উপসাগরীয় অন্যান্য দেশগুলোও এখন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। একসময় যে শিরোনামগুলো আমি কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে পড়তাম, সেগুলোই এখন অস্বস্তিকরভাবে আমাদের নিজেদের ঘরের দোরগোড়ায় এসে হাজির হলো।

ভয় প্রকাশ পাওয়ার আগেই আমি তা প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

আমার বড় মেয়ে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু এবার তার প্রশ্নগুলো ফিরে এলো আরও দ্রুত এবং আরও তীক্ষ্ণভাবে। “এখানেও কি এমন কিছু ঘটবে?” “আমরা কি নিরাপদ?” এমন একটি সত্যের মুখোমুখি হওয়া ছাড়া এই প্রশ্নগুলোর সহজ কোনো উত্তর ছিল না, যা আমি নিজেও পুরোপুরি জানতাম না।

আমার ছোট সন্তানটি কোনো প্রশ্ন করেনি। সে কেবল আঁকড়ে ধরেছিল।

হঠাৎ একটা শব্দে সে চমকে উঠল। একটি বিজ্ঞপ্তি মুহূর্তের মধ্যেই তার মনোযোগ আকর্ষণ করল। যে আকাশটা একসময় শুধুই এক বিস্তীর্ণ সীমানা ছিল, তা-ই এখন গভীর সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করার বিষয়ে পরিণত হলো, যেন যেকোনো মুহূর্তে কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই বদলে যেতে পারে তার রূপ।

ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম যে এতকাল ধরে আমি আসলে কী দেখতে ব্যর্থ হয়েছিলাম।

যুদ্ধকে আপনার ঘরে প্রবেশ করার জন্য আপনার দোরগোড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে হয় না। এটি নিঃশব্দে আসে, পর্দার মাধ্যমে, কোনো সংবাদ শিরোনামের মাধ্যমে কিংবা এমন সব কথাবার্তার মধ্য দিয়ে যা ছোটদের শোনার জন্য নয়। আর যখন এটিকে বাস্তব বলে মনে হয়, ততক্ষণে তা শিশুদের মনে গেঁথে যায়, এমন সব ভয়ের জন্ম দেয় যা প্রকাশ করার মতো ভাষা তাদের তখনও তৈরি হয় না।

শিশু মনস্তত্ত্বের গবেষণায় দীর্ঘকাল ধরে দেখা গেছে যে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি শিশুদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। আজকের ২৪ ঘণ্টার সংবাদ মাধ্যমের যুগে, যেখানে বিভীষিকাময় ছবি আর জরুরি খবরের সতর্কবার্তা অবিরত চলতে থাকে, সেখানে দূরবর্তী সংঘাত আর ব্যক্তিগত বাস্তবতার মধ্যকার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। একসময় যা পরিমার্জিত  হয়ে আসত, এখন তা সরাসরি এসে পৌঁছায়। অথচ শিশুদের কাছে প্রায়শই এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় মানসিক প্রস্তুতি থাকে না।

আমরা প্রায়শই যুদ্ধকে ভূখণ্ড, ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ফলাফলের ভিত্তিতে পরিমাপ করি। কিন্তু এর আরেকটি মূল্য রয়েছে, যা কম দৃশ্যমান এবং অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী। এটি বয়ে বেড়ায় শিশুদের মনে জেগে ওঠা প্রশ্নগুলোর মধ্যে, তাদের নীরবতার মাঝে বেড়ে ওঠার মধ্যে এবং তাদের পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে, যেখানে তারা পৃথিবীকে সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে নয়, বরং অনিশ্চিত কিছু হিসেবে দেখতে শুরু করে।

শৈশব হলো অন্বেষণের সময় — যখন আকাশ মানে শুধুই আকাশ, ভয়ের কিছু নয়। যখন উচ্চ শব্দ বিপদের সংকেত না হয়ে আনন্দের মুহূর্ত হয়ে ওঠে। যখন পৃথিবীটা বিশাল, কিন্তু নিরাপদ মনে হয়।

আজকের বহু শিশুর ভেতর থেকে সেই নিরাপদ বোধটুকু নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে।

কেউ কেউ সরাসরি সংঘাতের ছায়াতলে তা হারিয়ে ফেলে। অন্যরা এর কিছু অংশ হারিয়ে ফেলে দূর থেকে, ক্রমাগত এসব ঘটনার মুখোমুখি হয়ে, অমীমাংসিত সব প্রশ্ন বুকে নিয়ে এবং এই ক্রমবর্ধমান উপলব্ধির মাধ্যমে যে পৃথিবীটা আগের মতো আর নিরাপদ নয়।

এটি অভিভাবক, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান সবার জন্যই কিছু কঠিন প্রশ্ন উত্থাপন করে। সচেতনতার জন্য কতটুকু জানা প্রয়োজন আর কখন তা সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যায়? আমরা কি শিশুদের যা দেখছে তা বোঝার মতো উপযুক্ত করে তুলছি, নাকি কেবল তারা এগুলো মেনে নিবে এমন আশা করছি? অবগত থাকার চেষ্টায় আমরা হয়তো অনুধাবন করতে পারছি না যে এই মুহূর্তগুলো তরুণ মনকে কতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

আমরা শিশুদের চিরকাল বাস্তবতা থেকে আড়াল করে রাখতে পারি না। কিংবা পৃথিবীটা যে সংঘাতমুক্ত, এমন ভান করাও আমাদের উচিত নয়। কিন্তু সচেতনতা এবং বাস্তবতার মাঝামাঝি কোথাও একটা সীমারেখা টানতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি, যা তথ্যপ্রদান ও মানসিক বিপর্যস্ততা কিংবা প্রস্তুতি ও ভীতি প্রদর্শনের মধ্যবর্তী সীমারেখা।

কারণ একটি শিশু যখন আকাশকে ভয় পেতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে তার জীবনের মৌলিক কোনো অনুভূতি ইতিমধ্যেই হারিয়ে গেছে।

আকাশ কখনো উদ্বেগের কারণ হওয়ার জন্য ছিল না। এটি ছিল রূপ পরিবর্তন করা মেঘেদের জন্য, সীমাহীন আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখিদের জন্য, আর রাতের বুকে নিঃশব্দে উদিত হওয়া তারাদের জন্য।

ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য নয়। ড্রোনের জন্য নয়।

তবুও, আজকের বহু শিশুর কাছে আকাশ এখন আর কোনো বিস্ময়ের জায়গা নয়, বরং একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন। এটি এমন কিছু যার দিকে তারা কৌতূহল নিয়ে নয়, বরং সতর্কতার সাথে তাকায়।

আর সম্ভবত এটিই সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি, কারণ যুদ্ধ কেবল তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করে তা-ই নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য নীরবে নতুন বাস্তবতা তৈরি করে দেয়।

কারণ অশান্ত পরিবেশ শান্ত হওয়ার বহুদিন পরও, এই শিশুরা একটি কথাই মনে রাখবে:

যে পৃথিবীর বুকে তারা বেঁচে আছে, তাকে সম্পূর্ণ জানার আগেই তারা আকাশকে ভয় পেতে শিখেছে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .