
মার্চে মাল্টায় জড়ো হওয়া বিভিন্ন রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্য। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবার পাশাপাশি নাগরিকত্বহীন জীবনের বাস্তবতা নিয়ে সম্মিলিতভাবে ভাবনা বিনিময় করেন। ছবি: অ্যাপাট্রাইড নেটওয়ার্কের সৌজন্যে
এই প্রবন্ধটি লিখেছেন অ্যাপাট্রাইড নেটওয়ার্কের আলবার্ট আইওফে, জাওয়াদ ফাইরুজ এবং আলেক্সেইস ইভাশুক। এটি গ্লোবাল ভয়েসেসের জুলাই ২০২৬-এর বিশেষ ধারাবাহিক “রাষ্ট্রহীনতা” (Statelessness) এর অংশ। এই ধারাবাহিকে রাষ্ট্রহীনতার সমস্যা এবং এটি কীভাবে মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা, শিক্ষার সুযোগ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণসহ জীবনের বিভিন্ন অধিকার ও সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করে, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশে সহায়তা করতে চাইলে এখানে ক্লিক করে অনুদান দিতে পারেন।
২০২৬ সালের মার্চের শেষ দিকে রাষ্ট্রহীন মানুষের নেতৃত্বাধীন সংগঠন অ্যাপাট্রাইড নেটওয়ার্ক মাল্টায় “হিয়ারিং অ্যান্ড হিলিং” নামে তিন দিনের একটি সমাবেশের আয়োজন করে পোর্টিকাসের আর্থিক সহায়তায়। সেখানে বিভিন্ন রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর মানুষ একত্র হয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন এবং রাষ্ট্রহীনতার ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক প্রভাব নিয়ে সম্মিলিতভাবে ভাবনার সুযোগ পান। অংশগ্রহণকারীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই আয়োজন কেবল আনুষ্ঠানিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং রাষ্ট্রহীনতাকে গভীরভাবে বোঝার জন্য মানুষের প্রত্যক্ষ জীবন-অভিজ্ঞতাকেই আলোচনার কেন্দ্রে রাখা হয়। অংশগ্রহণকারীরা মনোযোগ দিয়ে একে অপরের কথা শোনেন, ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার মধ্যেও মিলের জায়গা খুঁজে পান এবং ভবিষ্যতের অধিকারভিত্তিক প্রচার ও কার্যকর পরিবর্তনের জন্য অভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করেন।
অনুষ্ঠানের বহু গভীর আলোচনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল: রাজনৈতিক, ধর্মীয়, জাতিগত বা অন্য কোনো স্বেচ্ছাচারী কারণে রাষ্ট্র যখন পরিকল্পিতভাবে আমাদের বাদ দেয় এবং নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করে, তখন আমরা কীভাবে নিজেদের পরিচয় ও সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তিকে সংজ্ঞায়িত করব?
এই নিবন্ধে “হিয়ারিং অ্যান্ড হিলিং”-এ অংশ নেওয়া কয়েকজনের ভাবনা ও অভিজ্ঞতার আলোকে সেই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা হয়েছে।
অনেক মানুষের কাছেই নাগরিকত্ব দৈনন্দিন জীবনের এমন এক অদৃশ্য অংশ, যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন পড়ে না; বরং একে স্বতঃসিদ্ধ বলেই ধরে নেওয়া হয়। নাগরিকত্ব একজন মানুষকে আইনি স্বীকৃতি দেয়, চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার অধিকার দেয়, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে এবং নিরাপত্তাবোধ প্রদান করে। এর সঙ্গে আরও বহু অধিকার ও সুরক্ষাও যুক্ত থাকে। কিন্তু নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হলেই বোঝা যায়, একজন ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক গড়ে তুলতে এর ভূমিকা কতটা গভীর।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা এবং শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো রাষ্ট্রই বাস্তবিক অর্থে নিশ্চিত করতে পারে না যে রাষ্ট্রের আইনি সদস্যপদ এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত অধিকার কখনোই খর্ব হবে না, একজন মানুষের সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক যত গভীরই হোক না কেন। রাষ্ট্রহীনতা যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে, হঠাৎ করেই যে কারও জীবনে নেমে আসতে পারে।
রাষ্ট্রহীন মানুষ কিংবা স্বেচ্ছাচারীভাবে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত ব্যক্তিদের জন্য পরিচয় সব সময়ই এক ধরনের টানাপোড়েনের মধ্যে অবস্থান করে। একজন মানুষ কোনো দেশে জন্ম নিতে পারেন, সেই ভূখণ্ডে তার পূর্বপুরুষদের শিকড় থাকতে পারে, তিনি দেশের ভাষায় কথা বলতে পারেন, এর ঐতিহ্য উদযাপন করতে পারেন এবং সারাজীবন সমাজে অবদান রাখতে পারেন। তারপরও হঠাৎ তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হতে পারে যে আইনগতভাবে তিনি সেই দেশের কেউ নন।
এই বৈপরীত্যই রাষ্ট্রহীনতার সবচেয়ে গভীর ক্ষতগুলোর একটি সৃষ্টি করে: একদিকে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, শিকড় ও অন্তর্ভুক্তিবোধ, অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক আইনি স্বীকৃতির অনুপস্থিতি।
মাল্টায় অনুষ্ঠিত আমাদের “হিয়ারিং অ্যান্ড হিলিং” সমাবেশে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীরা ভিন্ন ভিন্ন পটভূমি থেকে এলেও তাদের অভিজ্ঞতায় বিস্ময়কর মিল দেখা যায়। অনেকে বলেছেন, শৈশব থেকেই তারা নিজেদের সম্প্রদায়ের সঙ্গে গভীর সংযোগ অনুভব করেছেন, অথচ একই সময়ে এমন সব আইনি বাধার মুখে পড়েছেন, যা সমাজে তাদের অবস্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এসব আলোচনা স্পষ্ট করে যে রাষ্ট্রহীনতা শুধু একটি পাসপোর্ট না থাকার বিষয় নয়। বরং এটি এমন এক বাস্তবতা, যেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থা বারবার একজন মানুষের অস্তিত্ব ও পরিচয়কে অস্বীকার করে বা স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়।
রাষ্ট্র যখন কাঠামোগত ও বৈষম্যমূলক কারণে নাগরিকত্ব অস্বীকার করে, তখন মানুষ প্রায়ই নিজেদের কমিউনিটি প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করে, ভাষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে, নিজেদের ইতিহাস নথিবদ্ধ করে এবং সীমান্তের ওপারে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহায়তার নেটওয়ার্ক ধরে রাখে। এগুলো নিছক সাংস্কৃতিক চর্চা নয়; বঞ্চনা ও অস্বীকৃতির মুখে এগুলো নিজেদের অস্তিত্বের দৃঢ় ঘোষণা। এই কর্মকাণ্ডের শক্তিকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখা উচিত নয়।
রাষ্ট্রহীনতা শুধু একটি আইনি অবস্থা নয়; এটি কখনো কখনো ইতিহাস, শিকড় এবং অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি মুছে দেওয়ার চেষ্টায়ও রূপ নেয়। অথচ মানুষের পরিচয় বহু পরস্পরসংযুক্ত উপাদানে গড়ে ওঠে, যেগুলো নাগরিকত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়। পরিবার, ভাষা, যৌথ স্মৃতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সম্মিলিত ইতিহাস কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাতিল করে দেওয়া যায় না।
এসবকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সর্বাত্মক কর্তৃত্ববাদের পথ তৈরি করে এবং সবার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, তারা বর্তমানে এর প্রত্যক্ষ শিকার হোক বা না হোক।
আমাদের আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে রাষ্ট্রহীনতা ও পরিচয় মুছে দেওয়ার এসব অভিজ্ঞতা স্বীকৃতি পাওয়া এবং ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই নিরাময়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অনেক অংশগ্রহণকারী জীবনে প্রথমবারের মতো এমন মানুষের সামনে খোলামেলাভাবে কথা বলেছেন, যারা সত্যিকার অর্থেই বোঝেন আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করার অভিজ্ঞতা কেমন। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত গল্প আলাদা হলেও সেগুলো একই মৌলিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে: রাষ্ট্র একজন মানুষের আইনি অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু তিনি কে, তা পুরোপুরি নির্ধারণ করতে পারে না। রাষ্ট্রের হাতে আইনি মর্যাদা এবং অধিকার বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগের ওপর উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে। তবে নীতি, পরিচয় কিংবা অন্তর্ভুক্তিবোধের ওপর তার নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব নেই। এসব গড়ে ওঠে জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, যৌথ ইতিহাস, সংস্কৃতি, আন্তরিক সংলাপ, ব্যক্তির নিজের সম্পর্কে উপলব্ধি এবং পারস্পরিক স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে।
রাষ্ট্রহীনতা চাপিয়ে দেওয়া স্বভাবতই বিভাজনমূলক ও অস্থিতিশীলতাসৃষ্টিকারী। এটি সমাজের সংহতি ও সদস্যত্বের বন্ধনকে খণ্ডিত করে, অথচ এই সামাজিক কাঠামোর ওপরই রাষ্ট্র নির্মিত এবং নির্ভরশীল। রাষ্ট্রহীনতা আক্রান্ত মানুষের জীবনে এক গভীর ও যন্ত্রণাদায়ক বৈপরীত্য সৃষ্টি করে: একজন ব্যক্তি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিকভাবে কোনো ভূখণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হতে পারেন, অথচ সেখানে থাকার আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকতে পারেন। বর্জনের মানবিক মূল্য বুঝতে এবং আইনি অধিকার ও মানবিক মর্যাদা উভয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সমাজকে এই বৈপরীত্য স্বীকার করতে হবে।
মাল্টায় আমাদের এই সমাবেশ মনে করিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রহীনতা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করলেও নিজেদের গল্প ভাগ করে নেওয়া আমাদের আবার সংযুক্ত করে এবং এ বিষয়কে ঘিরে থাকা অস্পষ্টতা দূর করতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে অদৃশ্য থেকে যাওয়া ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সম্মিলিত উপলব্ধিতে রূপ নেয়। একই সঙ্গে এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে পরিচয় শুধু হাতে থাকা নথিপত্র দিয়ে নির্ধারিত হয় না; আমরা যে জীবন যাপন করেছি এবং যেসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সত্যিকার অর্থে নিজেদের যুক্ত মনে করি, সেগুলোও আমাদের পরিচয় নির্মাণ করে।
নাগরিকত্ব, এমনকি জাতীয়তাও কখনো নির্ধারণ করা উচিত নয় যে একজন মানুষের পরিচয় বৈধ বা স্বীকৃত কি না। নথিপত্র কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে একজন ব্যক্তির আইনি সম্পর্কের প্রমাণ দিতে পারে, কিন্তু তা তাঁর অস্তিত্ব, ইতিহাস, পরিবার বা অন্তর্ভুক্তিবোধ সৃষ্টি কিংবা মুছে দিতে পারে না।
বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রহীন কয়েক কোটি মানুষের সংগ্রাম তাই শুধু একটি পাসপোর্টের জন্য নয়। এটি সেই স্বীকৃতির জন্যও যে তাঁরা সব সময়ই অস্তিত্বশীল ছিলেন, সব সময়ই এই সমাজ ও ভূখণ্ডের অংশ ছিলেন এবং যাকে তাঁরা নিজেদের ঘর বলে জানেন, সেখানে পূর্ণ সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার তাঁদের সব সময়ই ছিল।
অ্যাপাট্রাইড নেটওয়ার্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নভিত্তিক রাষ্ট্রহীন মানুষের নেতৃত্বাধীন একটি সংগঠন। এটি প্রভাবসৃষ্টিকারী প্রকল্প, আইনি সহায়তা, কৌশলগত মামলা পরিচালনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করে। সংগঠনটির উদ্যোগে ইউরোপের ব্যাংকিং বিধিমালায় এমন পরিবর্তন এসেছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যাংকিং সেবা আরও সহজলভ্য করেছে। পাশাপাশি, ইউএনএইচসিআর ও জাতিসংঘ সচিবালয়ে রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের পথে থাকা প্রশাসনিক বাধা দূর করতেও এর কাজ ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া, অ্যাপাট্রাইড নেটওয়ার্কের প্রচেষ্টার ফলে চেক প্রজাতন্ত্রের আদালত লাটভিয়ার তথাকথিত “অনাগরিকদের” আইনগতভাবে রাষ্ট্রহীন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই জনগোষ্ঠীই ইউরোপের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী।







