কাজখস্তানের খাদ্য সংস্কৃতি তাদের জাতীয় পরিচয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত

কাজাখস্তানে খাওয়া হয় এমন জনপ্রিয় খাবার।

কাজাখস্তানে খাওয়া হয় এমন জনপ্রিয় খাবার। ছবি তুলেছেন দানিয়ার মুসিরভ। অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত।

নিবন্ধটি ভ্লাস্ট ডট কেজেড (Vlast.kz)-এর জন্য লিখেছেন নাজেরকে কুরমাঙ্গাজিনোভা। এর একটি সম্পাদিত সংস্করণ গ্লোবাল ভয়েসেস-এ প্রকাশিত হয়েছে একটি গণমাধ্যম অংশীদারিত্ব চুক্তির আওতায়

ইতিহাসবিদ আলিয়া বোলাতখান কাজাখস্তানের খাদ্য সংস্কৃতি ও জাতীয় রন্ধনশৈলী নিয়ে গবেষণার পর দেশটির একটি রন্ধনশিল্পের মানচিত্র তৈরি করছেন। দেশটির জাতীয় রন্ধনশৈলী নিয়ে বিতর্কের জায়গাগুলো এবং এর সমসাময়িক পুনর্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে ভ্লাস্ট তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছে।

কাজাখস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বৃহত্তম শহর আলমাতির তস্তক বাজার থেকে বোলাতখানের সাক্ষাৎকার শুরু হয়েছিল। তিনি ভ্লাস্টের সাংবাদিকদের একটি শাশলিক রেস্তোরাঁয় নিয়ে যান, যেখানে তাদের বিশেষত্ব শিশ কাবাব পরিবেশন করা হচ্ছিল।

আলিয়া বোলাতখান

আলিয়া বোলাতখান। ছবি তুলেছেন দানিয়ার মুসিরভ। অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত।

বসার খুব অল্প জায়গা থাকায় দুপুরের মধ্যেই জায়গাটিতে ভিড় জমে যায়, কারণ বাইরে গ্রাহকদের লাইন লেগে থাকে। এই অঞ্চলের খাদ্য সংস্কৃতিতে শাশলিক সবসময়ই প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে।

বোলাতখান বলেছেন, “১৯৪০-এর দশকের শেষের দিক থেকে শুরু হওয়া ব্যাপক নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় ‘কাজাখস্তানের জাতীয় খাবার’-এর তালিকায় থাকা পাঠ্যপুস্তকগুলোতে মাংস, লাগমান, প্লোভ (পোলাও) এবং শাশলিকের উল্লেখ পাওয়া যায়”।

তার মতে, কাজাখস্তান কেবল জাতিগত কাজাখদের নিয়েই গঠিত নয়, বরং এখানে জন্ম নেওয়া ও বসবাসকারী অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরাও এর অন্তর্ভুক্ত। তাই সাধারণত যা “জাতীয় রন্ধনশৈলী” হিসেবে পরিচিত, তা মূলত এমন সব খাবার নিয়ে গঠিত যা কাজাখস্তানের সকল বাসিন্দা নিয়মিত তৈরি এবং গ্রহণ করেন।

অবশ্যই, কাজাখরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে খাবারগুলো খেয়ে আসছে, তার বেশিরভাগই আমাদের জাতীয় রন্ধনশৈলীর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সব নয়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি কি কখনো ‘ব্যুরমে কারিন’ (bürme qaryn) খেয়ে দেখেছেন? বড় বড় টুকরো করা মাংস, আলু এবং অন্যান্য শাকসবজি ভুঁড়ির সাথে পানিতে সিদ্ধ করে এটি তৈরি করা হয়। এখন আর ঘরে কেউ এটি রান্না করে না, তবে কখনো কখনো ‘ঐতিহ্যবাহী খাবার’ হিসেবে রেস্তোরাঁগুলোতে এর অর্ডার দেওয়া যায়। আমাদের অনেকেই এই খাবারটি কখনো চেখে দেখেনি।  অতীতে ঐতিহ্যবাহী কাজাখ রন্ধনশৈলীতে এর অস্তিত্ব থাকলেও, বিভিন্ন কারণে এটি গণমানুষের খাদ্যতালিকা থেকে হারিয়ে গেছে।

আসল ঐতিহ্যটা কার?

বোলাতখান দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন যে, “দেশের যেকোনো খাবারের তালিকায় পাওয়া যায় এমন যেকোনো খাবারকেই ‘জাতীয় খাদ্য’ বলা উচিত।”

আমরা পোলাও, লাগমান, বোর্শট রান্না করি এবং কুয়িরদাক খাই। কোনো কোনো জায়গায় আবার ‘নান কুয়রদাক’ তৈরি করা হয়, যা বিংশ শতাব্দীতে বেশ সুবিধাজনক খাবার ছিল এবং সম্ভবত এখানে আসা জার্মানদের প্রভাবেই এর সৃষ্টি হয়েছিল। খাবারটির রন্ধনপ্রণালী খুব সহজ হওয়ায় এবং এর স্বাদ সবার পছন্দ হওয়ায় এটি দ্রুতই খাদ্য সংস্কৃতিতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

১৯৩০ থেকে ১৯৫০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত থাকাকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ গুলাগ বন্দী এবং নির্বাসিত মানুষের গন্তব্যস্থলে পরিণত হয়েছিল কাজাখস্তান। তাদের মধ্যে ছিল কোরিয়ান, ফিন, জার্মান, পোল, কুর্দি, ইরানি, ইহুদি, চেচেন, ইনগুশ, ক্রিমিয়ান তাতার এবং ইউক্রেনীয় নাগরিকেরা। এই নীতির ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের ফলেই কাজাখস্তান আজ ১২৪টি জাতিগোষ্ঠীর আবাসস্থল।

কাজাখস্তানের আধুনিক রন্ধনশৈলী মূলত এদেশে নির্বাসিত বা স্থানান্তরিত হওয়া বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বোলাতখান উল্লেখ করেন যে, কোরিয়ান মোরকোভচা (এক ধরনের গাজরের সালাদ) স্থানীয় রন্ধনশৈলীর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

যাদের কাজাখস্তানে নির্বাসিত করা হয়েছিল, তাদের অনেকেই সেই দেশেই থেকে যান। এমনও অনেকেই ছিলেন যারা এখানে ১৫ বছর বসবাস করার পর চলে গিয়েছিলেন। তবুও, আপনি যদি কারও সাথে দীর্ঘ ১৫ বছর বসবাস করেন, তবে আপনি তার কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখতে পারবেন। তাছাড়া, সোভিয়েত ব্যবস্থা যেহেতু একটি অভিন্ন সংস্কৃতি তৈরির চেষ্টা করেছিল, তাই কাজাখস্তান জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে নিজস্ব একটি রন্ধনশৈলী গড়ে তুলেছিল।

দেশের অভ্যন্তরে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য এখানকার খাদ্যের উপর প্রভাব ফেলেছে।

কাজাখরা কখনোই বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করত না। আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে যে সমস্ত ফলমূল ও শাকসবজি তারা নিজেরা উৎপাদন করতে পারত না, তা তারা পারস্পরিক বিনিময় ও ব্যবসার মাধ্যমে সংগ্রহ করত। উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের মানুষ রাশিয়া ও চীনের সাথে বাণিজ্য করত, আর দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষ ব্যবসা করত মধ্য এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাথে।

বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক গবেষণার মাধ্যমে একটি খাদ্যতালিকা তৈরি করে আমাদের দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে বিভিন্ন পদের খাবারের সামঞ্জস্য করা সম্ভব। কারণ আমরা সবাই এই খাবারগুলো খেয়েই বড় হয়েছি এবং আজও আমরা এগুলো খাই। পরিশেষে, সবকিছুই স্বাদের ওপর নির্ভর করে যা আমাদের আবেগকে তাড়িত করে এবং যার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে।

জাতীয় পরিচয় এবং খাদ্য

উপনিবেশমুক্তকরণ নিয়ে চলমান মুখর আলোচনার মধ্যে বোলাতখান বলেন যে, খাদ্য সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা বর্তমান সময়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

অনেকের মতে, ভাষাই হলো জাতীয় পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। তবুও, কিছু কিছু ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয় অন্য সব বিষয়ের ওপরও নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, খাদ্য সংস্কৃতি আপনার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি শক্তিশালী সূচক হতে পারে।

তিনি উল্লেখ করেন যে, কাজাখস্তানের মানুষকে এখনও যাযাবর জীবন থেকে আধা-স্থায়ী এবং পরবর্তীতে পুরোপুরি স্থায়ী জীবনযাত্রায় রূপান্তরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে, যা ঘটেছিল ঔপনিবেশিক শাসন, জোরপূর্বক যৌথ খামার নীতি এবং দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে। এসব ঘটনা তাদের খাদ্যাভ্যাসের ওপর বিধ্বংসী প্রভাব ফেলেছিল।

আমি যুদ্ধোত্তর দশকে বসবাসকারী মানুষদের কাছ থেকে তাদের ‘শৈশবের স্বাদ’-এর স্মৃতিগুলো সংগ্রহ করেছি। তারা প্রায়ই বলতেন যে, ‘ময়দা, লবণ আর পানি দিয়ে তৈরি খাবার’ তাদের শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এবং তাদের কাছে এর চেয়ে সুস্বাদু আর কিছুই নেই। আমরা এই খাবারগুলো স্বাদ বা পুষ্টির জন্য খাইনি, খেয়েছিলাম কারণ সেই সময়ে আর অন্য কোনো খাবারই ছিল না বলে। কালের বিবর্তনে আজ এটি আমাদের জাতীয় পরিচয় আর ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঔপনিবেশিক শক্তির সাথে সম্পর্কের সূত্র ধরেই খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠেছিল, যা রুশ সাম্রাজ্যের আমলেই প্রথম দেখা গিয়েছিল। ‘বেশবারমাক’ (টুকরো করা মাংস, ময়দার খামির ও পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি এক ধরনের খাবার) নামটির ব্যবহার আসলে ঔপনিবেশিক চেতনার একটি প্রতিচ্ছবি, যা আজও টিকে আছে। প্রকৃতপক্ষে, অতীতে কাজাখরা এই খাবারটিকে কেবলই ‘এট’ (কাজাখ ভাষায় যার অর্থ ‘মাংস’) অর্থাৎ ‘খাওয়ার মাংস’ বলে ডাকত।

২০১৫ সালে গিনেস বুক অব রেকর্ডসে নাম লেখানোর প্রচেষ্টায় যখন আমরা সবচেয়ে বড় বেশবারমাক রান্না করেছিলাম, তখন আমরা ‘বেশবারমাক’ নামেই এর প্রচার চালিয়েছিলাম। তবে ঐতিহাসিকভাবে আজকের কাজাখস্তানের কিছু অংশ রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর প্রথম খাদ্য বিনিময়ের একটি তাতার-বাশকির অনুবাদ থেকে এই নামটি (বেশবারমাক) এসেছে।

রুশ সাম্রাজ্যের প্রতিনিধিদের হাত দিয়ে খাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। এভাবেই খাবারটি ‘বিশ বারমাক’ (তাতার ও বাশকির ভাষায় যার অর্থ ‘পাঁচ আঙুল’) নামে পরিচিতি লাভ করে।এ কারণে প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে রুশরা এই খাবারটিকে ‘বিশবারমাক’ নামে ডাকত।

রাজকর্মচারী আলেক্সি লেভশিনের একটি গবেষণার পরেই কেবল রুশভাষী মানুষেরা “বেশপারমাক” শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করে, যেখানে তিনি এটিকে কাজাখস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের একটি বিশেষ উৎসবের খাবার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সময়ের সাথে সাথে যারা এটি পছন্দ করত, তারা এটিকে একটি সাধারণ পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করল।

সোভিয়েত যুগের শেষের দিকে রুশীকরণ প্রক্রিয়ার হাত ধরেই ‘বেশবারমাক’ নামটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে, কাজাখ ভাষায় এর সঠিক বানানটি হওয়ার কথা ‘bes barmak’ (বেস বারমাক) [এবং ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত এটি এভাবেই লেখা হতো]।

কাজাখভাষী শিক্ষাবিদরা এই ভুল উপস্থাপনার বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু তাদের অভিযোগে কেউ কর্ণপাত করেনি।

ঔপনিবেশিকতার রেশ

খাদ্য সংস্কৃতি এবং খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে মধ্য এশিয়ার সমাজগুলোতে এখনো ঔপনিবেশিকতার ক্ষতিকর রেশ রয়ে গেছে।

বোলাতখান বলেন যে, “প্রতিটি দেশই সোভিয়েত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিজেদের পরিচয় তৈরি করে। কারণ আমাদের সেভাবেই চিন্তা করতে শেখানো হয়েছিল এবং অন্যদের বেঁধে দেওয়া মানদণ্ড অনুযায়ী নিজেদের সংজ্ঞায়িত করতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।” তিনি আরও যোগ করেন যে, এটি এখন বেশবারমাক কিংবা অন্যান্য খাবারের ‘প্রকৃত’ উৎস নিয়ে তুচ্ছ বিবাদে পরিণত হয়েছে।

কাজাখস্তানের জাতীয় রন্ধনশৈলীতে এখন হরেক রকমের খাবার অন্তর্ভুক্ত হলেও, এটিকে এখনও একটি অপরিবর্তনশীল সংস্কৃতি হিসেবেই বিবেচনা করা হয়, যা নতুন খাদ্যাভ্যাসের উদ্ভব এবং ভোগ পদ্ধতির পরিবর্তনকে আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

হয়তো একে ‘জাতীয় খাবার’ বলাই উচিত নয়। বরং ‘স্বকীয়’ বা ‘আঞ্চলিক’ বলাটাই শ্রেয়, কারণ আমরা নিশ্চিতভাবেই আমাদের সব জাতীয় খাবার চেখে দেখিনি।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .