
কির্গিজস্তানে ফুলমারের মৌমাছি খামার ও শিবির। ছবিটি ফুলমারের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত।
বিশ্বের সবচেয়ে খাঁটি মধু মধ্য এশিয়ার দুর্গম পাহাড়ে হাঙ্গেরীয় মৌচাষীদের দ্বারা উৎপাদিত হয়। মধু উৎপাদন ও প্যাকেজিংয়ে বিশেষায়িত হাঙ্গেরীয় কোম্পানি ফুলমার এভাবেই কির্গিজস্তানের তোকতোগুল অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা তাদের আমিরকাল মধু বাজারজাত করে থাকে। কোম্পানির প্রতিনিধিরা দেশটি সফর করে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে মধু সংগ্রহ করে এবং পরীক্ষার জন্য তা হাঙ্গেরিতে নিয়ে যাওয়ার পর এই নির্দিষ্ট স্থানটি বেছে নেয়। তোকতোগুল অঞ্চলের বর্ণনা দিতে গিয়ে ফুলমারের ফেরেন্স তাকাচ বলেছেন: “এটি মৌমাছির জন্য একটি স্বর্গরাজ্য, কারণ এটি ফুলের স্বর্গরাজ্য।”
ফুলমারের আমিরকাল মধু সম্পর্কিত ইউটিউব ভিডিওটি এখানে দেওয়া হলো।
২০২২ সালে ফুলমার উত্তর-পশ্চিম কির্গিজস্তানের অন্যতম এক দুর্গম এলাকায় তাদের মৌমাছি খামার স্থাপন করে। কোম্পানিটির এই ক্যাম্পটি নিকটতম জনপদ থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কির্গিজস্তানে ফুলমারের কার্যক্রম নতুন হতে পারে, তবে নিজ দেশ হাঙ্গেরিতে কোম্পানিটির ৯০ বছরেরও বেশি মৌচাষের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফেরেন্সের দাদা গিয়োর্গি ফুলমার ১৯২৯ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম হাঙ্গেরির সোমোগি কাউন্টিতে তার প্রথম মৌমাছি খামার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মৌচাষের এই শিল্পটি পরিবারেই থেকে যায় এবং নব্বইয়ের দশকে ফেরেন্স ব্যবসাটিকে প্রসারিত করে ফুলমারকে দেশটির বৃহত্তম মধু প্যাকেজিং কোম্পানিতে রূপান্তর করেন। বর্তমানে কোম্পানিটি চতুর্থ প্রজন্ম হিসেবে ফেরেন্সের দুই ছেলে বোটি ও পেটি যৌথভাবে পরিচালনা করছেন।
ফুলমারের ইতিহাস সম্পর্কিত ইউটিউব ভিডিওটি এখানে দেওয়া হলো।
ফুলমারের মৌচাষের ঐতিহ্যের সাথে কির্গিজস্তানের মধু উৎপাদনের ইতিহাসও তুলনীয়। বছরের পর বছর ধরে কির্গিজ মধু অসংখ্য পুরস্কার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করেছে। বিংশ শতাব্দীতে কির্গিজস্তান যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল, তখন দেশটি রাশিয়া ও ইউক্রেনের পরেই এই জোটের তৃতীয় বৃহত্তম মধু উৎপাদনকারী দেশ ছিল। সে সময় কির্গিজস্তানে ৫ লাখ মৌমাছির কলোনি ছিল এবং বার্ষিক ১২,০০০ টন মধু উৎপাদিত হতো।
১৯৯১ সালে কির্গিজস্তান স্বাধীন হওয়ার পর মৌ কলোনির সংখ্যা এক লক্ষের নিচে নেমে আসে এবং বার্ষিক মধু উৎপাদন কমে মাত্র ২,০০০ টনে দাঁড়ায়। কির্গিজস্তানের মৌচাষ শিল্পের এই পুনরুজ্জীবনের পেছনে দেশের বাইরে এর ব্যাপক চাহিদার বড় ভূমিকা রয়েছে। এর মূল কারণ হলো বৃহত্তম আন্তর্জাতিক মৌচাষী কংগ্রেস অ্যাপিমন্ডিয়া-তে নিরবচ্ছিন্ন সাফল্য, যেখানে কির্গিজ মধু প্রায়ই বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের মধু হিসেবে গ্র্যান্ড প্রিক্স পুরস্কার লাভ করে। কির্গিজ মধুর শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক দেশ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব।
কির্গিজস্তানের মধুর স্বাদ ও গন্ধ মৌমাছির উপনিবেশের আশেপাশের ফুল এবং লতাগুল্মের ওপর নির্ভর করে। আতবাশি, তোকতোগুল, সুসামির এবং ইসিক কুল হলো মৌচাষের জন্য জনপ্রিয় কিছু অঞ্চল। উত্তর-পূর্ব কির্গিজস্তানের আতবাশি অঞ্চলের মধু গত এক দশকে অ্যাপিমন্ডিয়াতে চারটি স্বর্ণপদক অর্জন করেছে। এটি এসপারসেট নামক একটিমাত্র উদ্ভিদ থেকে সংগৃহীত সাদা ক্রিম মধু। আতবাশি মধু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এবং অন্যান্য মধুতে যাদের অ্যালার্জি রয়েছে, তারাও খেতে পারেন।
ফুলমার যে অঞ্চল থেকে মধু সংগ্রহ করে, সেই তোকতোগুল অঞ্চলে বারবেরি, ল্যাভেন্ডার, রাস্পবেরি, থাইম ও সেজসহ গ্রীষ্মকালীন ফুল ও ভেষজ উদ্ভিদের তীব্র সুবাসের কারণে দেশের সবচেয়ে সুগন্ধযুক্ত মধু উৎপাদিত হয়। এই অঞ্চলে বৈচিত্র্যময় মধুপ্রদায়ী উদ্ভিদ এবং প্রচুর পরিমাণে ঔষধি উদ্ভিদের উপস্থিতির কারণে তোকতোগুল মধুর পুষ্টি ও ঔষধি গুণাগুণ সাধারণ মধুর চেয়ে অনেক বেশি।
মৌমাছি ও মধু উৎপাদনের জন্য কির্গিজস্তানের অনন্য পরিবেশকে বিদেশি মৌচাষীরা যে কাজে লাগাবে, তা ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার। এক্ষেত্রে ফুলমার ছিল প্রথম। কির্গিজস্তানে মৌমাছি খামার স্থাপনের সিদ্ধান্তের কথা বলতে গিয়ে বোটি বলেন, “আমরা সহজ পথে এটি করতে চাইনি—আমরা সঠিক পথে এটি করতে চেয়েছিলাম।” তিনি আরও বলেন যে, তোকতোগুল অঞ্চল হলো একমাত্র জায়গা যেখানে এমন মধু তৈরি করা সম্ভব। ফুলমারের কৌশল হলো যথাসম্ভব প্রাচীনতম ও প্রাকৃতিক উপায়ে মধু উৎপাদন করা, আর এই কারণেই তাদের কার্যক্রমের স্থানটি এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। ফেরেন্স ও তাঁর ছেলেরা গাছের কোটরে মৌচাক তৈরি করেছেন, কারণ প্রকৃতিতে মৌমাছিরা সাধারণত এভাবেই বসবাস করে। পেটি উল্লেখ করেন যে, কোম্পানিটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব মৌচাষ প্রযুক্তি প্রয়োগ করে, যার জন্য প্রচুর পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়।
ফেরেন্সের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল “মানুষকে সর্বোৎকৃষ্ট মানের মধু দেওয়া”, যা তাকে নিজ বাড়ি থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে মধ্য এশিয়ায় নিয়ে এসেছিল। এর মাধ্যমে, এটি মৌচাষের বিশাল সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলের প্রতিও অনেকের নজর কেড়েছে।






