বিয়ের প্রতিশ্রুতি থেকে মানবপাচারের ফাঁদ: রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা কিশোরীদের সমুদ্রযাত্রা

A Rohingya refugee woman stands outside the Women's Centre in Balukhali camp in Cox's Bazar, Bangladesh. Image via Flick by UN Women. CC BY-NC-ND 2.0

বাংলাদেশের কক্সবাজারের বালুখালী শরণার্থী শিবিরে উইমেনস সেন্টারের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন এক রোহিঙ্গা নারী শরণার্থী। ছবি: ফ্লিকারে ইউএন উইমেন। CC BY-NC-ND 2.0।

লেখাটি গ্লোবাল ভয়েসেসের জুলাই ২০২৬-এর বিশেষ আয়োজন ‘রাষ্ট্রহীনতা (Statelessness)’ সিরিজের অংশ। এই সিরিজে রাষ্ট্রহীন মানুষের জীবন ও তাদের নানা সংকট: যেমন চলাচলের স্বাধীনতা, শিক্ষার সুযোগ, রাজনীতিতে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। এই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশে সহায়তা করতে চাইলে এখানে ক্লিক করে অনুদান দিতে পারেন।

বাংলাদেশের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের ১৬ বছর বয়সী রোহিঙ্গা কিশোরী মাহমুদা কক্সবাজারে বাবা-মাকে বিদায় জানিয়ে অন্য শিশুদের সঙ্গে একটি মানবপাচারকারীর গাড়িতে ওঠে। চরম দারিদ্র্যে ভোগা এবং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ভয়ে আতঙ্কিত এই শরণার্থী পরিবার, মালয়েশিয়ায় আগে থেকেই বসবাসরত এক রোহিঙ্গা শ্রমিকের কাছ থেকে প্রায় ১৮ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (৪ হাজার ৩৯৫ মার্কিন ডলার) গ্রহণ করে। শর্ত ছিল, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর মাহমুদার সঙ্গে ওই শ্রমিকের বিয়ে দেওয়া হবে।

তারা এর নাম দিয়েছে ‘কনের যাত্রা’। ভোর হওয়ার আগেই অন্ধকারে বাড়ি ছাড়ে মাহমুদা। তার বিয়ের ছবিগুলো তখনো একটি প্লাস্টিকের ফোল্ডারে রাখা। দালালের হাতে সেগুলো তুলে দেওয়ার আগে শেষবারের মতো ছবিগুলোতে চুমু খান তার মা। দালাল আশ্বাস দিয়েছিল, বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে একটি নৌকা তাকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাবে। সেখানে কুয়ালালামপুরের কাছে একটি ভাড়া করা ঘরে ধার করা একটি সোনার আংটি আর নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তার হবু স্বামী।

বঙ্গোপসাগর আর আন্দামান সাগরের মাঝামাঝি কোথাও, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই একটি মাছ ধরার নৌকা ডুবে গেলে মাহমুদার আর কোনো খোঁজ মেলেনি।

মাহমুদার নাম নেই কোনো সরকারি নথিতে। তার পরিবারের কাছে রয়ে গেছে শুধু বিদায়ের সেই মুহূর্তের স্মৃতি আর একটি গুঞ্জন। আরও শত শত মানুষের মতো সেও নাকি ‘বিয়ের যাত্রা’র নামে পরিচালিত সেই মানবপাচারের পথে সাগরের পানিতে হারিয়ে গেছে।

ফাতেমা, যে ২০১০ সালে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেছিল, তার আশা ছিল অন্যরকম। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এক আত্মীয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বললেই স্বামীর মারধরের শিকার হতেন তিনি। এমনকি রেশন কার্ড দিতে অস্বীকৃতি জানালেও তাকে নির্যাতন করা হতো। স্কুলে যাওয়া বন্ধ, কাজ করার সুযোগ নেই। তার ওপর ‘বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে’, এমন কথায় সমাজের চাপও বাড়ছিল। ফাতেমার কাছে যেন বেরিয়ে আসার আর কোনো পথই খোলা ছিল না।

একজন স্থানীয় দালাল তাকে বলেছিল, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় সে “কাজ ও নিরাপত্তা” পেতে পারে। সেখানে গেলে সে স্বামীর কাছ থেকে মুক্তি পাবে এবং পরিবারে টাকা পাঠাতে পারবে।

কিন্তু বাস্তবে তাকে এক উপকূলীয় আস্তানা থেকে আরেক আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। কেড়ে নেওয়া হয় তার পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় নথি, জব্দ করা হয় মোবাইল ফোন। পরে সমুদ্রপথে থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর পর তাকে দক্ষিণ থাইল্যান্ডের একটি যৌনপাচার চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

তার মতো আরও অনেক নারীর গল্পের শেষটা নিরাপত্তা বা আশ্রয়ে গিয়ে থামে না; বরং বিদেশের মাটিতে তারা নতুন করে শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হন।

এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং এগুলো একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন, যেখানে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে থাকা রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা কিশোরীরা অল্প বয়সে বিয়ে ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়ে এমন এক অনিশ্চিত সমুদ্রযাত্রায় পা বাড়াতে বাধ্য হয়, যেগুলোকে অনেক সময় পরিবারকে পুনর্মিলন বা নিরাপদ আশ্রয়ের পথ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব যাত্রা মানবপাচারেরই আরেক রূপ।

ঘেরাটোপে বন্দি রাষ্ট্রহীন কন্যারা

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে থাকা রোহিঙ্গা মেয়েরা যেন একসঙ্গে বহু ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি। ১২ লাখের বেশি রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা শরণার্থী এখনো ৩৩টি ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে সীমাবদ্ধ জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের বড় অংশ নারী ও শিশু। আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করার সুযোগ নেই বললেই চলে, আবার শিবিরের সীমানার বাইরে স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগও সীমিত।

এখানে মানুষের প্রতিদিনের জীবন নির্ধারিত হয় না স্কুলের ঘণ্টা বা কাজের মজুরির হিসাব দিয়ে। বরং তা নিয়ন্ত্রিত হয় চেকপোস্ট, অনুমতিপত্র আর রেশন কার্ডের নিয়মে।

দাতা দেশগুলোর অর্থ সহায়তা কমতে থাকায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) বারবার সতর্ক করেছে, শরণার্থী পরিবারগুলোর মাসিক খাদ্য সহায়তা আবারও কমে যেতে পারে। ২০২৩ সালে একবার কমানোর পর এবার তা আরও হ্রাস পেলে পরিবারগুলোকে আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক সহায়তা নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করতে হবে।

মানবিক সহায়তাকর্মী ও শিশু অধিকারকর্মীরা তখন অভিভাবকদের মুখে একই কঠিন বাস্তবতার কথা শুনতে পান, খাদ্য সহায়তা আরও কমে গেলে তাদের সামনে হয়তো আর কোনো বিকল্প থাকবে না। বাধ্য হয়ে মেয়েদের দালালদের হাতে তুলে দিতে হবে, অথবা আয়ের আশায় সন্তানদের পাঠাতে হবে বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায়।

একই সময়ে, মেয়েদের জন্য একটু স্বস্তির জায়গাগুলোও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। অর্থ সংকটের কারণে স্কুল বন্ধ হয়েছে, বন্ধ হয়ে গেছে যুবকেন্দ্রগুলোও। এর ফলে শুধু পড়াশোনার সুযোগই কমেনি, হারিয়ে গেছে এমন কিছু নিরাপদ জায়গা ও সহায়তার মাধ্যম, যেগুলো একসময় কিশোরীদের বাল্যবিয়ে ও শিকারিদের হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করত।

কমিউনিটি কর্মী ও শিক্ষকেরা বলছেন, এসব জায়গা বন্ধ হওয়ার পর বাল্যবিয়ে, অপহরণ ও জোরপূর্বক শ্রমের ঘটনা বেড়েছে। এখন ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরের সরু গলি থেকে শুরু করে ঘরের ভেতরের ব্যক্তিগত পরিসর—সবখানেই মেয়েরা আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যেখানে তাদের শরীর ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়।

“আমি এখন আর ওই মেয়েদের পড়াই না,” উচ্চ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ানো এক নারী শিক্ষক নিচু স্বরে বললেন। “এখন শুধু তাদের চলে যেতে দেখি। একে একে তারা শিবির থেকে হারিয়ে যায়, বেশিরভাগ সময় রাতের অন্ধকারে। আমি যখন মায়েদের জিজ্ঞেস করি, তাদের মেয়েরা কোথায় গেছে, তারা বলেন, ‘স্বামীর কাছে মালয়েশিয়া গেছে।’ কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই স্বামীরা আসলে দালালদের দেওয়া কিছু নামমাত্র। মেয়েরা সেটা বুঝতে পারে না।”

তিনি সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন সেই বিষয়টি নিয়ে, যা মেয়েরা জানেই না। “পাচার বলতে কী বোঝায়, তারা সেটা বোঝে না,” তিনি বলেন। “তারা মনে করে বিপদ শুধু সাগরের ঢেউ আর ঝড়ের মধ্যে। তারা বুঝতে পারে না, আসল বিপদ লুকিয়ে থাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির মধ্যেও। যখন তারা বিষয়টি বুঝতে পারে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। তারা হয়তো তখন সমুদ্রের মাঝপথে, নয়তো অন্য কোনো দেশে একটি ঘরের মধ্যে আটকা পড়ে আছে।”

অন্যদিকে, শিবিরের ভেতরে ও আশপাশে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ধর্মীয় ফতোয়া জারি করে নারীদের শিক্ষকতার মতো পেশা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, জনপরিসরে তাদের উপস্থিতি সীমিত করছে এবং স্বামী ও পুরুষ নেতাদের প্রতি আনুগত্যের ধারণাকে আরও জোরদার করছে।

এসব নির্দেশনার কারণে মেয়েদের সামনে শিক্ষার্থী, পেশাজীবী বা সমাজের নেতৃত্বে ভূমিকা রাখার মতো ভবিষ্যৎ কল্পনা করাও কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে পরিবারগুলোর কাছেও বিয়ে, যে কোনো বিয়েই হোক, মেয়েদের জন্য একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ বলে মনে হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, ভেঙে পড়া সহায়তা ব্যবস্থা এবং কঠোর সামাজিক রীতিনীতির মিলিত প্রভাবে মানবপাচারকারীদের জন্য তৈরি হয়েছে এক উর্বর ক্ষেত্র। তারা এমন এক সমাজে সুযোগ খুঁজে নেয়, যেখানে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া অনেক সময় পরিবারের আর্থিক বোঝা কমানোর উপায় এবং তার নিরাপত্তার পথ হিসেবে দেখা হয়।

পাচারকারীরা এই বাস্তবতাকেই কাজে লাগায়। তারা সমুদ্রপথের ওপারে ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়, বিদেশে স্বামী, কাজ ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির আড়ালে রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা মেয়েরা পরিণত হয় একটি ভয়াবহ সমুদ্রপথের মানবপাচার চক্রের শিকার হিসেবে।

কনে ও কন্যাদের জন্য মরণযাত্রা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিবাসনপথগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা বঙ্গোপসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের অর্ধেকই ছিলেন নারী ও শিশু।

২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ এপ্রিলের মধ্যে ২ হাজার ৮০০-এর বেশি রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সমুদ্রযাত্রায় নামেন। ২৬ মার্চ বাংলাদেশ থেকে ছেড়ে যাওয়া অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই একটি নৌকা উত্তাল সাগরে ডুবে যায়। ধারণা করা হয়, ওই দুর্ঘটনার পরও প্রায় ২৫০ জনের কোনো খোঁজ মেলেনি।

পরিবারগুলো যখন সিদ্ধান্ত নেয়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে কে যাবে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েদেরই বেছে নেওয়া হয়। কারণ, বিয়ের মাধ্যমে তাদের বিদেশে পাঠানোকে সমাজ সহজে মেনে নেয়। আবার অনেকের বিশ্বাস, বিদেশে স্বামীর সঙ্গে থাকলে মেয়েরা নিরাপদ থাকবে এবং তাদের দেখাশোনা করারও কেউ থাকবে।

কিন্তু কোনো নৌকা ডুবে গেলে, নিখোঁজ বা প্রাণ হারানো যাত্রীদের মধ্যে প্রায়ই থাকে কিশোরী মেয়েরা—কেউ বিয়ের অপেক্ষায়, কেউ অল্প বয়সেই বিয়ে করেছে, আবার কেউ নির্যাতনের হাত থেকে পালানোর চেষ্টা করছিল। অথচ সরকারি কোনো তালিকায় তাদের নামও থাকে না।

শরণার্থী শিবিরে তখন মা-বাবারা মেয়ের ছবি আর ফোন নম্বর লেখা ছোট্ট কাগজ হাতে বসে থাকেন। সেই নম্বরে আর কখনো যোগাযোগ হয় না। কেউ বলেন, নৌকাটি মিয়ানমারের উপকূলের কাছে ডুবে গেছে। আবার কেউ শোনেন, থাইল্যান্ড থেকে অনেক দূরে সাগরে তলিয়ে গেছে সেটি। তখন তাদের বারবার একটাই প্রশ্ন তাড়া করে ফেরে—মেয়ের ভালো হবে, এই বিশ্বাসে তাকে বিয়ের উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে পাঠানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটিই কি শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াল?

বিয়েই যখন হয়ে ওঠে সমুদ্রযাত্রার টিকিট

গত এক দশকে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বিয়ে মানে নিঃশব্দে বিদেশে যাওয়ার একটি পথ হয়ে উঠেছে। শিবিরে প্রায়ই এমন পাত্রের কথা শোনা যায়, যারা আগে থেকেই মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ায় থাকেন। তাদের অনেকেই কয়েক বছর আগে অনিয়মিত পথে দেশ ছেড়ে যাওয়া আত্মীয় বা প্রতিবেশী।

বিদেশে থাকা এমন একজন পাত্রকে অনেক পরিবার নতুন জীবনের ভরসা হিসেবে দেখে। তাদের আশা, তিনি নিয়মিত টাকা পাঠাতে পারবেন, থাকার ব্যবস্থা করবেন এবং কক্সবাজারের গাদাগাদি করে থাকা শরণার্থী শিবিরের চেয়ে মেয়েকে আরও নিরাপদ জীবন দিতে পারবেন। এই আশাকেই পুঁজি করে দালালরা এগিয়ে আসে।

তারা অভিভাবকদের বোঝায়, পুরো যাত্রার দায়িত্ব তাদের। শিবির থেকে টেকনাফ, বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের শহর, সেখান থেকে নৌকায় বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে, তারপর স্থলপথে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হবে – এমন প্রতিশ্রুতি থাকে।

দালালরা পুরো বিষয়টিকে পরিবারের জন্য লাভজনক একটি সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরে। তারা অভিভাবকদের বোঝায়, “আপনার মেয়ে স্বামীর কাছে চলে যাবে, সংসারের বোঝাও কিছুটা কমবে, আর সেখানে ওর দেখাশোনারও মানুষ থাকবে।” এই আশ্বাসের আড়ালেই তারা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা নেয় এবং পাচারকারী চক্রের সঙ্গে চুক্তি করে।

এই বিশ্বাস নিয়েই নৌকায় ওঠে অনেক রোহিঙ্গা কিশোরী, যাদের অনেকের বয়সই ১৮ বছরের কম। তাদের ধারণা, তারা স্বামীর কাছে যাচ্ছে। কিন্তু নৌকা সমুদ্রে ভাসার পর তাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় নৌকার লোকজনের হাতে। যাত্রাপথে হঠাৎ অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হলে, কিংবা পরিবার সেই টাকা জোগাড় করতে না পারলে, কাউকে ছোট নৌকায় ফেলে যাওয়া হয়, আবার কাউকে অন্য পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়—বকেয়া টাকার বিনিময়ে।

এভাবেই স্বামীর কাছে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া একটি যাত্রা শেষ পর্যন্ত মানবপাচারে পরিণত হয়। মেয়েদের সম্মতি প্রতারণার মাধ্যমে আদায় করা হয়, তারপর লাভের আশায় তাদের এক হাত থেকে আরেক হাতে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

এই প্রতিবেদনের সাক্ষাৎকারগুলো লেখক অনলাইনে গ্রহণ করেছেন। এতে কক্সবাজারের মানবিক সহায়তাকর্মী ও মানবপাচারবিরোধী ওয়ার্কিং গ্রুপ সহযোগিতা করেছে। সাক্ষাৎকারদাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .