
তাজিকিস্তানে উৎপাদিত লেবু। Новости Таджикистана от З -এর YouTube চ্যানেল এর ভিডিও “Таджикские лимоны” থেকে স্ক্রিনশট। ন্যায্য ব্যবহার।
তাদের গল্পটি ১৯৩০-এর দশকের, যখন তাজিকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। ১৯৩৪ সালে সোভিয়েত জর্জিয়ার বাসিন্দা ভ্লাদিমির সুলায়া (Vladimir Tsulaya) লেবুর প্রথম চারা নিয়ে স্তালিনাবাদে এসে পৌঁছান, যা তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবের তৎকালীন নাম। সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি প্রচলিত প্রথা ছিল যে তরুণ পেশাজীবীদের প্রত্যন্ত স্থানগুলোতে পাঠানো হতো, যেখানে নতুন শিল্প বিকাশের জন্য তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজন ছিল।
সুলায়ার চারাগুলো ছিল মেয়ার লেবুর জাত, যা লেবু এবং মান্দারিন কমলার একটি সংকর জাত। এই জাতটির নামকরণ করা হয়েছিল আমেরিকান কৃষি অভিযাত্রী ফ্রাঙ্ক নিকোলাস মেয়ারের নামানুসারে, যিনি ১৯০৮ সালে চীন থেকে প্রথম এই উদ্ভিদটি নিয়ে এসেছিলেন। একজন স্বীকৃত কৃষিবিদ হিসেবে সুলায়া তাঁর পুরো জীবন তাজিকিস্তানেই কাটিয়েছেন। সেখানে তিনি লেবুর একটি নতুন জাত তৈরি ও তা নিখুঁত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং ‘লেবুর জনক’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
তিনি মেয়ার লেবুর সাথে জর্জিয়ান লেবুর সংকরায়ণ ঘটিয়ে একটি নতুন জাত তৈরি করেন, যা পরবর্তীতে ‘তাজিক লেবু’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই সমস্ত কাজ পরিচালিত হয়েছিল দক্ষিণ খাতলোন (Khatlon) প্রদেশের ভাখশ উপত্যকায় (Vakhsh Valley) অবস্থিত একটি আঞ্চলিক ও পরীক্ষামূলক কেন্দ্রে। বর্তমানে এই অঞ্চলের ৯০ শতাংশ পরিবারই লেবু চাষের সাথে যুক্ত।
এখানে তাজিক লেবু নিয়ে একটি ইউটিউব ভিডিও রয়েছে।
এর পাশাপাশি, সুলায়া এবং তাঁর সহকর্মীরা এমন একটি অঞ্চলে লেবু চাষের একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যা লেবুজাতীয় উদ্ভিদের জন্য মোটেও উপযুক্ত ছিল না। শীতকালের তীব্র ঠান্ডা থেকে রক্ষা করতে লেবুগাছগুলোকে গভীর পরিখা গ্রিনহাউসে রোপণ করা হতো। এই পদ্ধতিটি সফল প্রমাণিত হয় এবং পরবর্তীতে প্রতিবেশী দেশ উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তুর্কমেনিস্তানেও এটি গ্রহণ করা হয়।
কয়েক দশক পরেও তাজিকিস্তান লেবু চাষ ও রপ্তানিতে এই অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে। এমনকি তাজিকিস্তান স্বাধীনতা লাভের এক বছর পর, অর্থাৎ ১৯৯২ সালে শুরু হওয়া এবং ১৯৯৭ সালে শেষ হওয়া গৃহযুদ্ধের ধকল কাটিয়েও লেবু শিল্প টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে দেশটির ৫,০০০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে লেবু চাষ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে তাজিকিস্তান মূলত রাশিয়া, বেলারুশ এবং কাজাখস্তানে ২,০০০ টনেরও বেশি লেবু রপ্তানি করেছে।
তাজিকিস্তানে কৃষকেরা প্রতি কেজি লেবু ০.৩ মার্কিন ডলারে বিক্রি করেন। পশ্চিমা মানদণ্ডে এটি অত্যন্ত সস্তা হলেও, তাজিকিস্তানে লেবু চাষকে একটি বেশ লাভজনক ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, অন্য যেকোনো ফসলের তুলনায় লেবু চাষ থেকে ৮ থেকে ১০ গুণ বেশি মুনাফা করা সম্ভব।
এখানে তাজিকিস্তানের লেবু সংগ্রহের মৌসুম নিয়ে একটি ইউটিউব ভিডিও রয়েছে।
সরকার লেবু চাষ কেন্দ্রের পরিধি বাড়াতে উৎসাহিত করছে। ২০২৫-২০২৯ সালের উদ্যানপালন, আঙ্গুর চাষ এবং লেবুজাতীয় ফলের চাষ উন্নয়ন কর্মসূচির লক্ষ্য হলো ফলন ও রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য নতুন ধরনের গ্রিনহাউস এবং প্রযুক্তি চালু করা। এই পরিকল্পনার আওতায় বিভিন্ন প্রদেশে ১১৩ হেক্টর জমিতে নতুন লেবুর বাগান গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে, দেশটি লেবুর বার্ষিক রপ্তানি ৭,০০০ টনে উন্নীত করতে চায়।
আন্তর্জাতিকভাবেও তাজিক লেবুর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করা সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি হলেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই (Wang Yi)। ২০১৯ সালে বেইজিংয়ে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য মেলায় তাজিকিস্তানের লেবুসহ বিভিন্ন পণ্য প্রদর্শিত হয়েছিল; সেখানে পরিদর্শনে গিয়ে তিনি তাজিক লেবুকে বিশ্বের অন্যতম সেরা লেবু হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যারা একবার এই লেবুর স্বাদ নিয়েছেন, তাদের পক্ষে এই বক্তব্যের বিরোধিতা করা সত্যিই কঠিন।






