
রয়টার্সের ইউটিউব ভিডিও ‘Kuwait's Stateless Bedoun in Limbo’ থেকে স্ক্রিনশটটি নেওয়া হয়েছে। ন্যায্য ব্যবহারের (Fair Use) আওতায় প্রকাশিত।
নাজিহা সাঈদের এই প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর মুওয়াতিনে। একটি কনটেন্ট শেয়ারিং চুক্তির আওতায় নিচের সম্পাদিত সংস্করণটি গ্লোবাল ভয়েসেসে প্রকাশিত হয়েছে।
লেখাটি গ্লোবাল ভয়েসেসের জুলাই ২০২৬-এর বিশেষ আয়োজন ‘রাষ্ট্রহীনতা (Statelessness)’ সিরিজের অংশ। এই সিরিজে রাষ্ট্রহীন মানুষের জীবন ও তাদের নানা সংকট: যেমন চলাচলের স্বাধীনতা, শিক্ষার সুযোগ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। এই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশে সহায়তা করতে চাইলে এখানে ক্লিক করে অনুদান দিতে পারেন।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া বা বাতিল করার ঘটনা নতুন নয়। তবে এর পেছনে শুধু আইনি প্রক্রিয়া কাজ করে না; প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও শাসনব্যবস্থাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি মৌলিক মানবাধিকার অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের একটি জাতীয়তা পাওয়ার অধিকার এবং কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত না হওয়ার নিশ্চয়তা।
২০২৫ সালে কুয়েত জাতীয়তা আইনে সংশোধনী এনে নাগরিকত্ব বাতিলের বিধান আরও সহজ করে। একই সময়ে দেশটি নাগরিকত্ব অর্জনের প্রক্রিয়া পুনরায় যাচাই করতে দেশব্যাপী একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা কার্যক্রম শুরু করে। কুয়েতি নাগরিকত্ব যাচাই–সংক্রান্ত সুপ্রিম কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪২ হাজারের বেশি মানুষের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। দেশটির ইতিহাসে এত বড় পরিসরে নাগরিকত্ব বাতিলের ঘটনা এর আগে দেখা যায়নি।
এই অভিযানের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন মূলত স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তি, দ্বৈত নাগরিক এবং প্রতারণার মাধ্যমে নাগরিকত্ব নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্তরা। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীও রয়েছেন, যারা আইনের ৮ নম্বর ধারার আওতায় কুয়েতি নাগরিককে বিয়ে করে নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন। পরে ওই ধারাটি বাতিল করা হয়। আদালতের তদারকি বা আপিলের কোনো সুযোগ ছাড়াই এসব নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। ফলে এ নিয়ে গুরুতর আইনি ও মানবাধিকার–সংক্রান্ত উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই এখন রাষ্ট্রহীন। ফলে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সেবা থেকেও তারা বঞ্চিত। পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট জব্দ হওয়ায় স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং জনজীবনে অংশ নেওয়ার সুযোগও কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে।
দেশটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই রাষ্ট্রহীনতার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে কুয়েতের বিদুন (Bidoon) জনগোষ্ঠী। সরকারি পরিচয়পত্র না থাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। এর প্রভাব তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনেও গভীরভাবে পড়েছে।
১০ সদস্যের একটি বিদুন পরিবারের সন্তান খাদিজা ছোটবেলাতেই বুঝে গিয়েছিলেন, অন্য শিশুদের মতো সুযোগ-সুবিধা তাদের কপালে নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় বেতন জোগাড় করতে না পারায় তাকে ও তার বোনকে বাড়িতেই থাকতে হয়। অথচ কুয়েতি নাগরিকদের জন্য সরকারি স্কুলে পড়াশোনা ছিল সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে।
সেই সময়ের কথা মনে করে খাদিজা বলেন, আমরা বাড়িতেই থাকতাম। আগের বছরের বই দিয়ে পড়াশোনা করতাম। পরে এমন সময় এল, যখন সংসারের হাল ধরতে আমাকে আর আমার বোনকেও কাজে নামতে হয়। ভাইদের মতো একটা দুইতলা খাট কিনতে এবং পরের বছরের স্কুলের ফি জোগাড় করতে আমরা টাকা জমাতাম। আমারও অন্য মেয়েদের মতো দৌড়াতে, খেলতে আর ছবি আঁকতে ইচ্ছে করত। কিন্তু আমাদের ছোট্ট উদ্যোগটা এক পৌরকর্মীর ভালো লাগেনি; অন্তত তিনি তাই বলেছিলেন। তিনি আমাদের হুমকি দিলেন। এরপরই আমাদের সেই ছোট্ট উদ্যোগের ইতি ঘটে।
রাজনৈতিক দমনের হাতিয়ার
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শাস্তি দিতে বা নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে নাগরিকত্ব বাতিলের কৌশল শুধু কুয়েতই ব্যবহার করছে না। একই পথ অনুসরণ করেছে বাহরাইনও। ২০১২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশটিতে এক হাজারের বেশি মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি ঘটে। ওই সময় সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে প্রায় ৩০০ জনের বিরুদ্ধে গণবিচার হয়, যার পরিণতিতে তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। ২০১৮ সালের মে মাসে এমনই একটি মামলায় ১১৫ জনের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়।
মুওয়াতিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষক নিকু জাফারনিয়া বলেন, “বাহরাইন রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে নাগরিকত্ব বাতিলের পথ বেছে নিয়েছে।”
২০১৯ সালের এপ্রিলে মানবাধিকার সংগঠন এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার ধারাবাহিক চাপের মুখে রাজা হামাদ বিন ঈসা আল খলিফা রাজকীয় ক্ষমা ঘোষণা করে ৫৫১ জনের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেন। তবে সালাম ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের পরিচালক জাওয়াদ ফাইরুজের মতে “এটি ছিল আংশিক একটি পদক্ষেপ। যাদের বাহরাইনি নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তাদের সবাই এই সিদ্ধান্তের আওতায় আসেননি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখনো প্রায় ৪৩৫টি মামলা অমীমাংসিত রয়েছে। এর পেছনে মূলত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিবেচনা কাজ করেছে, যার লক্ষ্য ছিল বিরোধী পক্ষের প্রভাব সীমিত রাখা।”
২০২৪ সালে বাহরাইন সরকার ২০১০ সাল থেকে যাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের সব কটি মামলার পর্যালোচনায় একটি কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়। উদ্দেশ্য ছিল, বাহরাইনি নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে জমা দেওয়া নথি ও তথ্যের সত্যতা যাচাই করা। জাতীয়তা, পাসপোর্ট ও আবাসনবিষয়ক দপ্তরের তদন্তে কিছু ব্যক্তি জাল নথি বা অবৈধ উপায়ে নাগরিকত্ব পেয়েছেন বলে প্রমাণ মেলার পরই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জাফারনিয়া বলেন, “কারও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া মানেই তাকে রাষ্ট্রহীন করে দেওয়া, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। নাগরিকত্বের দাবিগুলো পর্যালোচনার ক্ষেত্রে বাহরাইন সরকারকে একটি সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, সেই প্রক্রিয়ায় যেন মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হয়।”
বাহরাইনে নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্ব না দেওয়ার ইতিহাসও রয়েছে। ইরানি বংশোদ্ভূত হাজারো বাহরাইনি ২০০০ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রহীন ছিলেন। পরে রাজা হামাদের শাসনামলের শুরুর দিকের সংস্কার কর্মসূচির সময় তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। তবে জাওয়াদ ফাইরুজের মতে, “স্বাধীনতার পর থেকেই বাহরাইনের কর্তৃপক্ষ নাগরিকত্বের বিষয়টি আইন বা মানবাধিকারের দৃষ্টিতে নয়, বরং নিরাপত্তা, রাজনীতি ও জনসংখ্যার ভারসাম্যের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করেছে। বিশেষত, ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাহরাইনে বসবাস করা ইরানি বংশোদ্ভূত অনেক পরিবারকেও নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি। এর লক্ষ্য ছিল জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখা, যা প্রায়ই সাম্প্রদায়িক বিবেচনা বা বাইরের হুমকির আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত ছিল।”
বাহরাইন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের পরিচালক নিদাল আল সালমানের মতে, বাহরাইনের রাষ্ট্রহীনতার সংকট একটি জটিল মানবাধিকার সংকট, যার শিকড় দেশটির রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে নিহিত। তিনি বলেন, সচেতনতার অভাব, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সময়কাল; এসব কারণে কিছু পরিবার সরকারি নথিভুক্তির বাইরে থেকে যায়।
তিনি আরও বলেন, “ইরাকি বা ইরানি বংশোদ্ভূত মানুষদের নাগরিকত্ব না দেওয়ার বৈষম্যমূলক নীতি সমাজে বিভাজন আরও গভীর করেছে এবং তাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। অথচ এসব পরিবারের অনেকেই বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বহু আগে বাহরাইনে এসে বসতি গড়েছিল। আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও আগে তারা মানামা ও মুহাররাকের মতো শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে এবং কৃষি, কারুশিল্প ও বাণিজ্যের মাধ্যমে বাহরাইনের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।”
বাহরাইনের বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সরকার সেনাবাহিনী ও পুলিশে নিয়োগের উদ্দেশ্যে হাজার হাজার বিদেশিকে নাগরিকত্ব দিয়েছে। তাদের আরও অভিযোগ, সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে এই নীতি ব্যবহার করা হয়েছে।
নারী: দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক
উপসাগরীয় কোনো দেশেই নারীরা পুরুষদের সমানভাবে তাদের সন্তানের কাছে নাগরিকত্ব হস্তান্তরের অধিকার পান না। বিরল ও জটিল কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অনুমোদন মিললেও সেটি কখনোই স্বয়ংক্রিয় নয়। ফলে কাকে বিয়ে করবেন, কোথায় বসবাস করবেন বা সন্তানের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ হবে; এমন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তেও অনেক নারীকে নাগরিকত্বের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হয়।
এই সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক নারী নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত আইনি সুবিধার কথা বিবেচনা করে নিজ দেশের নাগরিককে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। আবার অনেকে সন্তানের আইনি পরিচয় নিয়ে সব সময় উদ্বেগে থাকেন, বিশেষত বাবা যদি নিজের নাগরিকত্ব সন্তানের কাছে দিতে না পারেন।
এই বৈষম্যের সবচেয়ে গুরুতর পরিণতিগুলোর একটি হলো রাষ্ট্রহীনতা। নাগরিক মায়ের ও বিদেশি বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তান অনেক সময় কোনো স্বীকৃত নাগরিকত্বই পায় না। বাবা যদি রাষ্ট্রহীন হন, তার কোনো বৈধ পরিচয়পত্র না থাকে বা তিনি নিজের নাগরিকত্ব সন্তানের কাছে হস্তান্তর করতে না পারেন, তাহলে সেই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা (মেনা) স্টেটলেসনেস নেটওয়ার্ক ‘হাওয়িয়াতি’র সহসমন্বয়ক থমাস ম্যাকগি বলেন, “আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের অধিকার রয়েছে। তবে সেই আইন লিঙ্গ বা পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো ধরনের বৈষম্যকে অনুমোদন দেয় না। উপসাগরীয় দেশগুলোর যেসব আইনে নারীরা তাদের সন্তানের কাছে নাগরিকত্ব হস্তান্তর করতে পারেন না, সেগুলো আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।”
বঞ্চনার পরিণতি
২৭ বছর বয়সী আহমেদ নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ৩৪ বছর আগে তাঁর বাহরাইনি মা এক পাকিস্তানি নাগরিককে বিয়ে করেন। তাদের চার সন্তান। বাহরাইনেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও আহমেদ কখনো বাহরাইনি নাগরিকত্ব পাননি।
তিনি বলেন, “বাবার কর্মস্থলে সমস্যা দেখা দেওয়ার পরই প্রথম বুঝতে পারি, আমরা এই দেশের নাগরিক নই। তখন শোনা যাচ্ছিল, বাবাকে হয়তো দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হবে।”
এখন আহমেদ একজন প্রকৌশলী। বাহরাইনি মায়ের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও নাগরিকত্ব না পাওয়ায় জীবনে যেসব বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে, সেগুলোর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন,
আমি খুব ভালো ছাত্র ছিলাম। কিন্তু নাগরিক না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি পাইনি। বাবার আয় কম ছিল, তাই পরিবারের পাশে দাঁড়াতে আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল চাকরির চুক্তিতে সই করার পর সেটি বাতিল হয়ে যাওয়া। পরে কোম্পানিটি কর্মী ছাঁটাই শুরু করলে আমার চুক্তিও বাতিল করে দেয়। হঠাৎ আমার বৈধ আবাসিক অনুমতি আর থাকল না। দেশ ছাড়ার জন্য হাতে ছিল মাত্র এক মাস। বাহরাইনই ছিল আমার একমাত্র ঠিকানা। এখানে আমি ২২ বছর কাটিয়েছি। এর আগে কখনো দেশ ছাড়িনি। অথচ আমাকে জানানো হলো, নতুন কোনো চাকরি না পেলে বা আবার পড়াশোনা শুরু না করলে এক মাসের মধ্যে সব ফেলে দেশ ছাড়তে হবে।
খাদিজার অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নয়। তিনি বলেন, “অন্যদের কাছে যেটা খুবই স্বাভাবিক, রাষ্ট্রহীন মানুষ হিসেবে আমাদের কাছে সেটাই একেকটা চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের মনে একটাই প্রশ্ন আসে, ‘কিন্তু আমি তো বিদুন। এটা কি আদৌ আমার করার অধিকার আছে?’ পড়াশোনা, চাকরি, ফ্রিল্যান্সিং, বিয়ে, সন্তান নেওয়া, সবকিছুতেই এই প্রশ্ন আমাদের তাড়া করে।”
সমাধানের পথে
উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক রাষ্ট্রহীন মানুষ অত্যন্ত কঠিন বাস্তবতায় জীবন কাটাচ্ছেন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও অবাধ চলাচলের অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যেরও শিকার হচ্ছেন।
ফাইরুজের মতে, “সমাধানের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক আইনি ও সামাজিক সংস্কার। একই সঙ্গে নাগরিকত্ব ও পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইনি কাঠামো কার্যকর করতে হবে। বিশ্বায়ন এবং সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাহরাইনকে সমাজের এই জনগোষ্ঠীর প্রতি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায্য দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। তবেই আরও সংহত ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে।”
থমাস ম্যাকগিরও এক মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “সমাধান প্রতিটি দেশের বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে। তবে সাধারণভাবে, কোনো দেশে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুর সেই দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার থাকা উচিত, যদি তা না হলে সে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে। এতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র; সবারই উপকার হয়।”
আহমেদ চান, নাগরিকত্ব আইনে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের অবসান হোক। তিনি বলেন, “বাহরাইনি মায়ের সন্তানদেরও বাহরাইনি বাবার সন্তানদের মতো সমান অধিকার পাওয়া উচিত। অন্তত তাদের যেন বৈধ অনুমতি নিয়ে দেশে বসবাস ও আসা-যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এই বৈষম্যের কারণে বহু পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। দুঃখজনকভাবে, অনেক পরিবার ভেঙেও গেছে।”
খাদিজার চাওয়াটাও খুবই সাধারণ। তিনি বলেন, “আমার পরিচয়, আর আইনের কাছে স্বীকৃতি না পাওয়া আমার অস্তিত্ব, যেন আর প্রতিদিন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বাধা না হয়।”






