
ভারতের ল্যান্ডোর থেকে দেখা মহান হিমালয়ের অংশ নন্দাদেবী পর্বতশৃঙ্গ। ছবি তুলেছেন আমেয়া নাগারাজন। অনুমতি সাপেক্ষে ব্যবহৃত।
মে মাসে গ্লোবাল ভয়েসেস টিম যখন প্রথম ইতিবাচক জলবায়ু বিষয়ক সংবাদ প্রকাশের ধারণাটি উত্থাপন করে, তখন আমি কিছুটা শঙ্কিত ছিলাম। বৈশ্বিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার দেশগুলোতে যে এত ইতিবাচক পরিবেশগত ঘটনা রয়েছে, তা থেকে মাসে ১০টি নিবন্ধের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা তো দূরের কথা, লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টিও আমার কল্পনাতেই ছিল না। এপ্রিলে আমাদের হিউম্যান পারসপেক্টিভস অন এআই (এআই সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি) শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদনটি প্রাপ্ত নিবন্ধের সংখ্যা ও পাঠকের প্রতিক্রিয়ার দিক থেকে সব প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যে কারণে আমার দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গিয়েছিল।
কিন্তু তারপরই একের পর এক প্রস্তাব আসতে শুরু করল এবং গল্পগুলো লেখা হতে থাকল। প্রতিদিন আমি আমাদের ট্র্যাকিং স্প্রেডশিটটিকে (হিসাব রাখার ছক) বড় হতে দেখছিলাম: নদী রক্ষা ও পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লড়াই, নির্দিষ্ট প্রভাব মোকাবেলায় মানুষের চমৎকার সব উদ্ভাবনী সমাধান আর বীজ ও খাদ্য উৎপাদনের গুরুত্বের ওপর বিশেষ আলোকপাত। কেনিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, নেপাল, মোজাম্বিক, টুভালু, ইয়েমেন, ব্রাজিল—বিশ্বজুড়ে মানুষ সাহসের সাথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে
মধ্য এশিয়ার আরাল সাগরের আংশিক পুনরুদ্ধার নিয়ে লেখা নিবন্ধটি পড়ার পর, এই ধরনের খবরের গুরুত্ব আমার কাছে একদম স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমার বয়স যখন ত্রিশ দশকের শুরুর দিকে – তখন আমি প্রথম আরাল সাগরের পরিবেশগত বিপর্যয়ের কথা জানতে পারি, তখন আমি কয়েক মাস ধরে শোকে আচ্ছন্ন ছিলাম। প্রায়ই সবাইকে বলতাম, “তোমরা কি জানো, ওটা হারিয়ে গেছে? আমরা মানচিত্রে ওটা আঁকতাম, আর এখন ওটা নেই!?” তাই এই পুনরুদ্ধারের খবরটি পড়া ছিল সত্যিই এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। আপাতদৃষ্টিতে অন্তহীন দুঃসংবাদের এই বছর (না, বরং দশক) জুড়ে, এমন একটি খবর পড়া যেন আমার কাছে উপহারের মতো ছিল। আর ঘটনাটি ঘটেছে এমন এক অঞ্চলে, যা সাধারণত সংবাদমাধ্যমে খুব একটা গুরুত্ব পায় না; অথচ সেখানে এমন এক দেশ সাহায্য করেছে, যাকে মূলধারার ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রায়শই খলনায়ক হিসেবে দেখানো হয়: চীন।
উন্নয়নশীল বিশ্বের গল্পগুলো উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য তুলে ধরার মূল গুরুত্ব এখানেই—যা আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস -এ গভীরভাবে ধারণ করি। । আধুনিক বিশ্ব আমাদের জাদুকরীভাবে একে অপরের সাথে সংযুক্ত করলেও, শেষ পর্যন্ত আমাদের বিচ্ছিন্নই করে রাখছে।

ভারতের আসামের কাজিরাঙ্গা জাতীয় উদ্যানে উড়ন্ত অবস্থায় একটি ওরিয়েন্টাল পাইড হর্নবিল (পাকড়া ধনেশ পাখি)। ছবি তুলেছেন আমেয়া নাগারাজন। অনুমতি সাপেক্ষে ব্যবহৃত।
ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে আমাদের এতোটা গভীরভাবে জড়িয়ে থাকাটা স্বাভাবিক, কারণ এটি আমাদের এমন অনেক কিছু দেখার ও শোনার সুযোগ করে দেয়, যা অফলাইনে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না (যেমন: গ্লোবাল ভয়েসেসের গল্পগুলো)। ঢাকায় বসে ক্যামেরুনের একটি ছাপা পত্রিকা আপনি পড়তে পারতেন না, কিন্তু ইন্টারনেটের কল্যাণে আপনি তা অনায়াসেই পড়তে পারছেন। অথচ, এই ইন্টারনেটই আবার আমাদের কেবল নিজেদের পছন্দসই তথ্য দেখিয়ে এক ধরনের বলয়ের ভেতর আটকে ফেলে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বের যেসব সম্প্রদায় আমাদের মতোই একই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের খবর আমরা খুব একটা পাই না—যতক্ষণ না আমরা সক্রিয়ভাবে তাদের খুঁজে নিচ্ছি। ঠিক এই কারণেই গ্লোবাল ভয়েসেস বিভিন্ন সম্মিলিত গল্পের ওপর গুরুত্ব আরোপ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সারা বিশ্বজুড়ে সফল প্রাণী সংরক্ষণ প্রচেষ্টা নিয়ে লেখা এই প্রতিবেদনটি আমাকে আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা সবাই নানাভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি (এবং জিতছিও)।
এটি স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ যে, অগ্রগতি হচ্ছে। মানুষ কোনো অনিবার্য ধ্বংসের পথে আটকা পড়ে নেই; আর এই সত্যটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পদ ও সুযোগ-বঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ, আমাদের জলবায়ু ন্যায়বিচার বিষয়ক সম্পাদক সিডনি অ্যালেন তার মে মাসের সম্পাদকীয়তে যেমনটি বলেছিলেন, “জলবায়ু সংক্রান্ত সফল কার্যক্রমের অনুকরণযোগ্য ও সম্প্রসারণযোগ্য উদাহরণগুলো তুলে ধরা জরুরি; কারণ অন্য যেসব সম্প্রদায়ের এগুলো প্রয়োজন, তাদের ক্ষেত্রে এই কৌশলগুলো প্রয়োগ করার এটাই একমাত্র উপায়।”
এটি হয়তো খুব সাধারণ একটি কথা, কিন্তু এই বিষয়টি নতুন করে উপলব্ধি করায় যে, নিজেদের লড়াইয়ে জয়ী হতে সম্প্রদায় হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া কতটা জরুরি। বলিভিয়ার দাবানলের বিরুদ্ধে লড়াইরত আদিবাসী নারী থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সোয়াত নদী রক্ষায় সচেষ্ট তোরওয়ালি আদিবাসী গোষ্ঠী, কিংবা তেলের কোম্পানির বিরুদ্ধে ফিলিপিনোদের ঐতিহাসিক মামলা থেকে শুরু করে কেনিয়ার মানুষের নিজ জমি পুনরুদ্ধার—মানুষ যখন একত্রিত হয়, তখন তারা এমন সব আন্দোলন গড়ে তোলে যা তাদের সম্মিলিত শক্তির যোগফলের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।
শুধু মানুষ নয়, মাঝে মাঝে এর পেছনে রাষ্ট্রেরও দায় থাকে
এই প্রতিবেদনটির আরেকটি দিক যা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তা হলো, সরকার আসলে জলবায়ু সংকটের সমস্যাগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করছে না। মধ্য এশিয়াজুড়ে সরকার বার্ষিক বায়ুদূষণ সংকট মোকাবিলায় সাড়া দিচ্ছে (যদিও ভারতে এটি এখনও হওয়ার অপেক্ষায়, যেখানে প্রতি বছর উত্তরের অঞ্চল ধোঁয়াশায় ঢাকা নরকে পরিণত হয়), যা আমাদের চমৎকার অংশীদার Vlast.kz-এর একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের নোয়া-দিহিং নদী। ছবি তুলেছেন আমেয়া নাগারাজন। অনুমতি সাপেক্ষে ব্যবহৃত।
কাজাখস্তানের এই অগ্রগতি সরকারি উদ্যোগেই পরিচালিত হচ্ছে, ঠিক যেমন বারবাডোজে মৎস্য শিল্পকে নতুন রূপ দেওয়ার জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলো—যার মধ্যে রয়েছে নতুন আইন পাস করা, পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং তথ্য সংগ্রহ। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র টুভালু, যারা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে নিজেদের সমস্ত ভূখণ্ড হারানোর বাস্তব ঝুঁকির মুখে রয়েছে, তারা একটি “ডিজিটাল জাতি” হয়ে ওঠার কাঠামো তৈরি করতে শুরু করেছে। কেউ কেউ হয়তো একে লোক দেখানো বলতে পারেন, কিন্তু এই বৈশ্বিক সংকটের অপর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়ার মাঝে জাতীয় পরিচয় টিকিয়ে রাখার হয়তো এটিই একমাত্র উপায়।
নারীদের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা
পুনরুদ্ধারের এই কাজে কত নারী সংগঠন, সম্প্রদায় ও সংঘ যুক্ত রয়েছে, সেটাও আমার নজরে এসেছে। সাধারণভাবে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার নারীদের ওপরই সম্প্রদায়ের যত্ন নেওয়া ও লালন-পালনের দায়িত্ব বর্তায়, যা মূলত এক ধরনের আবেগীয়, আন্তঃব্যক্তিক এবং গার্হস্থ্য শ্রম। তাই, এই লড়াইয়ের সামনের সারিতে নারীদের থাকাটা মোটেও অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয়। প্রকৃতপক্ষে, ফরাসি নারীবাদী ও পরিবেশবিদ ফ্রঁসোয়া দোবোন (Françoise d’Eaubonne) যুক্তি দিয়েছিলেন যে, “নারীর নিপীড়ন এবং প্রকৃতির শোষণ—উভয়ই এমন একটি ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত, যা পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের গভীরে প্রোথিত।”
আমাদের আখ্যান বিশ্লেষণ সম্পাদক সামান্তা আজপুরুয়া তাঁর এ মাসের প্রতিবেদনে উগান্ডার পরিবেশবাদী নারীবাদ নিয়ে কাজ করেছেন, যেখানে তিনি ‘উগান্ডার জলবায়ু কর্মপরিকল্পনায় নারীদের অপরিহার্য ভূমিকা'—এই ধারণাটি খতিয়ে দেখেছেন। নাগরিক গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি উগান্ডার নারীবাদী ও পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রেক্ষাপট সামনে এনেছেন। এই প্রতিবেদনটিকে আমি একটি গ্লোবাল ভয়েসেস ঘরানার গল্প বলব: এটি বৈশ্বিক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনের জটিল আন্তঃসম্পর্কিত দিকগুলোকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগই রাখে না। জলবায়ু, নারীবাদ, আদিবাসী জ্ঞান, অধিকার খর্ব করতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি, পুঁজিবাদ এবং উত্তর-ঔপনিবেশিকতা—সবকিছুরই এখানে ভূমিকা রয়েছে।
ঐক্যবদ্ধ থাকলেই আমরা সবসময় শক্তিশালী
দিনশেষে, জলবায়ু সংকটের ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহ এবং সুশীল সমাজ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও জোট গঠনের মাধ্যমে আমরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হই। আমাদের এমন সব অভিজ্ঞতা, অর্জিত জ্ঞান এবং দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে যা উন্নত বিশ্বের বোধগম্যতার বাইরে; তাই আমরা একে অপরের গল্প যত বেশি শুনব, জলবায়ু সংকট থেকে টিকে থাকার সম্ভাবনা আমাদের ততই বাড়বে।







