ডিজিটাল নজরদারি অ্যাক্টিভিস্টদের মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংস করছে

An eye against a dark background overlaid with bright lines and text to simulate computer code

পিট লিনফোর্থের সৌজন্যে পিক্সাবে থেকে প্রাপ্ত ছবি । পিক্সাবের লাইসেন্সের অধীনে ব্যবহৃত ।

লিখেছেন জিনা রোমেরো, সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক

যখন বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেন যে আধুনিক ডিজিটাল নজরদারি কীভাবে নাগরিক পরিসর, মানবাধিকার এবং স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করছে, তখন সেই আলোচনা প্রায়শই অস্পষ্ট আর জটিল আইনি পরিভাষার গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়। আমরা আমাদের সময় ব্যয় করি গোপনীয়তা, এনক্রিপশন সেটিংস (সংকেতীকরণ বিন্যাস) এর মতো কারিগরি বিষয় বা সরকারি ক্ষমতার বিমূর্ত সীমা নিয়ে বিতর্কে। কিন্তু আমি একটি নতুন বৈশ্বিক সমীক্ষাপ্রতিবেদন উপস্থাপন করছি, যা অন্য একটি সত্য এবং মানবিক দিক দিয়ে এক গভীর ক্ষতির দিকে দৃষ্টি ফেরাতে বাধ্য করে। এটি হলো মানসিক স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক আঘাতের সংকট, যা আজ বিশ্বজুড়ে আন্দোলনকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিটি স্তরে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বলা হয়েছে, সরকারি নজরদারি যেন একটি ধারালো অস্ত্র, যা কেবল বিপজ্জনক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সত্যটা হলো, ডিজিটাল নজরদারি আজ সন্দেহের এক বিশাল, সমাজব্যাপী ও স্থায়ী বিষয়ে পরিণত হয়েছে যা সমাজের প্রত্যেককে প্রভাবিত করছে অথবা প্রভাবিত করার সম্ভাবনা রাখে। অতীতের সেই দিনগুলোর মতো নয় যখন পুলিশি নজরদারি ছিল সীমিত এবং নিকটবর্তী। আজকের ডিজিটাল নজরদারি অনেক বেশি দূরবর্তী, অনেকাংশে অদৃশ্য এবং তা কখনো থামে না। বিভিন্ন দেশে স্মার্টফোন স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে আন্দোলনকর্মী, সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মীদের ঘরের ভেতর পর্যন্ত নজরদারি করা হচ্ছে। এর ফলে বাইরের লোকেরা তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের মানচিত্র তৈরি করছে এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করছে। এতে কেবল তাদের কাজের গতিই কমছে না, বরং তাদের ঘনিষ্ঠ মানবিক সম্পর্কগুলোও তছনছ হয়ে যাচ্ছে।

এই অদৃশ্য ফাঁদের মধ্যে কাজ করার মনস্তাত্ত্বিক মূল্য অত্যন্ত চড়া। ৮৪টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডিজিটাল দমন-পীড়নের সবচেয়ে বড় ক্ষতি কেবল সংস্থাগুলোকে অচল করে দেওয়া নয়। এর চেয়েও ভয়াবহ হলো এটি মানুষকে অন্যদের সাথে মেলামেশা করতে ভয় পাইয়ে দেয় – সমাজবিমুখতার প্রভাব – এবং অনেকের মধ্যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা বা আঘাত সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র-সমর্থিত নজরদারির শিকার মানবাধিকার কর্মীরা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন (তীব্র বিষণ্নতা), মানসিক অবসাদ, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি এবং পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি)-এর মতো গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন।

নিরন্তর নজরদারির অধীনে বেঁচে থাকার অর্থ হলো স্থায়ীভাবে অতি-সতর্কতার মধ্যে ডুবে থাকা। আন্দোলনকর্মীরা জানান, তাঁরা তীব্র উদ্বেগের সাথে নিজেদের ফোনের তথ্য দেখেন। প্রযুক্তির ছোটখাটো ত্রুটি নিয়ে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ করেন এবং রাস্তায় চলার সময় প্রতিনিয়ত ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতে থাকেন। এই সন্দেহপ্রবণতা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে এমনভাবে গ্রাস করে যে, তাঁরা নিজেদের উদ্বেগের গভীরতাটুকুও আর বুঝতে পারেন না। এটি ডিজিটাল নজরদারির কোনো আকস্মিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, বরং ভয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা এক সুপরিকল্পিত কৌশল। যখন রাষ্ট্র এই অনিশ্চয়তাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন মানুষের মন নিজেই নিজের কারাগারে পরিণত হয়।

এর চেয়েও বড় বিপর্যয় হলো নজরদারির কারণে তৈরি হওয়া গভীর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। পারস্পরিক বিশ্বাস হলো যেকোনো সম্মিলিত কর্ম ও সংহতির প্রাণশক্তি, কিন্তু নজরদারির দাপটে তা পুরোপুরি উবে যায়। যখন পেগাসাস বা সমগোত্রীয় কোনো স্পাইওয়্যার কোনো কর্মী বা সংস্থাকে আক্রমণ করে, তখন আক্রান্ত ব্যক্তি সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে পড়েন এবং তার সাথে এমন আচরণ করা হয় যেন তিনি কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত। পরোক্ষ নজরদারির ভয়ে সহকর্মীরাও বার্তা পাঠানো বন্ধ করে দেন। ভেঙে পড়ে সব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং অন্তরঙ্গ অংশীদারিত্বগুলো। অধিকার কর্মীরা এমন এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যেখানে তাদের বেছে নিতে হয়— জনহিতকর কাজ চালিয়ে যাবেন, নাকি প্রিয়জন – যেমন বাবা-মা কিংবা সন্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন তাদের প্রতিশোধমূলক নজরদারি ও ডক্সিং থেকে দুরে রাখার জন্য।

সম্পর্ক ছিন্ন করার এই পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া মানবাধিকার কর্মীদের চরম একা করে ফেলে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের (জেন জি) কর্মীদের ওপর এর প্রভাব আরও গভীর। তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া জোরপূর্বক চুপ থাকার নীতি (সেলফ সেন্সরশিপ) এমন এক মানসিক অবসাদ তৈরি করে, যা প্রকাশ্যে মুখোমুখি হওয়া অনলাইন বিদ্বেষ বা শারীরিক হেনস্থার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। এই ক্ষত এতটাই ব্যাপক যে, আন্দোলন জগতের মধ্যেই এখন থেরাপিকে কেন্দ্র করে একটি নতুন শিল্প গড়ে উঠেছে। এটি বিশেষভাবে ডিজিটাল নজরদারির শিকার অধিকার কর্মীদের মানসিক ক্ষত সারিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করছে।

যখন পিটিএসডি-র মতো গুরুতর অসুস্থতা সামাজিক আন্দোলনের নিয়মিত পেশাগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়, তখন মানবাধিকারের বৈশ্বিক কাঠামো মৌলিকভাবে ভেঙে পড়ে। যদি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শুধুমাত্র গোপনীয়তার মতো আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই রাষ্ট্রীয় নজরদারিকে মূল্যায়ন করতে থাকে, তবে তারা এর সম্মিলিত মানবিক ক্ষতিকে ক্রমাগত অবমূল্যায়ন করবে।

ডিজিটাল নজরদারি শুধু তথ্য চুরি করে না। এটি মানুষের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। এটি মানুষকে নিরাপদে তাদের পরিচয় গড়ে তুলতে বাধা দেয় এবং এমন মানসিক আঘাতের জন্ম দেয় যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকতে পারে। যতক্ষণ না আমরা আইনি কাঠামোর পাশাপাশি বিষণ্ণতা, অবসাদ এবং ভয়ের মতো প্রকৃত মানবিক ক্ষতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা সেই অন্ধকারের দিকেই মুখ ফিরিয়ে থাকব, যেখানে আমাদের সবচেয়ে সাহসী পরিবর্তনকারীদের মানসিক সুস্থতা নীরবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .