এক্সাইল হাব হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গ্লোবাল ভয়েসেস-এর এক অন্যতম অংশীদার। মিয়ানমারে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের বাস্তবতায় এক্সাইল হাবের উত্থান, সাংবাদিক ও মানবাধিকার রক্ষায় নিয়োজিত কর্মীদের ক্ষমতায়নের প্রতি এটি মনোযোগ প্রদান করে থাকে। সম্পাদিত এই নিবন্ধটি কন্টেন শেয়ার চুক্তির অধীনে এখানে পুনরায় প্রকাশ করা হয়েছে
আপনি এই ছবিতে যা দেখতে পাচ্ছেন সেটা হচ্ছে ক্যামেরা হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে এক নারী।
কিন্তু ছবিতে আপনি যেটা দেখতে পাবেন না সেটা হলো এর পেছনের সবকিছু; মাথার উপরে উড়তে থাকা সামরিক যুদ্ধ বিমানের আওয়াজ, আরেকবার হামলার আশঙ্কা, আর নিরাপত্তার জন্য নাগরিকদের ছোটাছুটি।
অন্যরা যখন সংঘাতময় এলাকা থেকে পালিয়ে যাচ্ছিল, তখন এক্সাইল হাব এর ‘ক্রিটিক্যাল ভয়েসেস ফেলোশিপ ২০২৬’- অর্জনকারী মায়াৎ মোয়ে থু ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে গেলেন।
শান ও কায়াহ (কারেন্নি) রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে প্রতিবেদন পাঠাতে থাকা একজন সাংবাদিক হিসেবে মায়াৎ যুদ্ধের বাস্তবতাকে চোখের সামনে তুলে ধরেন। যেদিন এই ছবিটি তোলা হয়েছিল, সেদিন একটি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এক সামরিক বিমান একটি বেসামরিক গ্রামের উপর দুটি ৫০০-পাউন্ডের বোমা ফেলে। আরেকটি হামলার ভয়ে গ্রামের বাসিন্দারা যখন পালাচ্ছিল, তিনি তখন খবর সংগ্রহের জন্য সেই গ্রামের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে হেঁটে যান।
তার পরনে কোন নিরাপত্তার পোশাক
ছিল না। নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের এক সাক্ষী হওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে।
যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ার জন্য মায়াৎ এর কোনও সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ছিল না। তার নিরাপত্তার কোনও নিশ্চয়তা ছিল না। ছিল ঘটনাস্থলে কি ঘটেছে শুধু সেটার সাক্ষী হওয়ার এক সিদ্ধান্ত।
কাজটির ধরণ কি সে সম্পর্কে মায়াৎ এর পুরোপুরি ধারণা ছিল না, কিন্তু সে চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং অবশেষে লেখার মাধ্যমে গল্প বলা ও তথ্য ভাগ করে নেওয়ার ভালোবাসায় আকৃষ্ট হয়ে যায়।
এমন কি অভ্যুত্থানের আগেও সে মিয়ানমারের সশস্ত্র সংঘাতের খবর সংগ্রহ শুরু করে এবং ধীরে ধীরে এর জটিলতা, ঝুঁকি ও বাস্তব রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা গড়ে তোলে। অভ্যুত্থানের পর সে আর কখনো মিয়ানমার ছেড়ে যায়নি। এর পরিবর্তে, সে দেশটির বহুবিভক্ত বিভিন্ন আদিবাসী জাতির নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘মুক্ত অঞ্চল’ হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে গিয়েছে এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ভেতর থেকেই একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে নিজের কাজ চালিয়ে গেছে।
মায়াৎ মো থুর কাছে সাংবাদিকতা শুধু কিছু ঘটনা নথিভুক্ত করা নয়। এটি দায়িত্ব ও নৈতিকতার বিষয়।
যা ঘটছে তা যদি আমরা তুলে না ধরি, তাহলে সত্য হারিয়ে যায়। প্রতিবেদন করার অর্থ কোনো পক্ষ নেওয়া নয়। এর অর্থ হলো নির্ভুল হওয়া, ক্ষতিগ্রস্তদের মর্যাদা রক্ষা করা এবং সাধারণ নাগরিকরা যে পক্ষেই থাকুক না কেন, তাদের কণ্ঠস্বর যেন বিকৃত বা অপব্যবহার না হয় তা নিশ্চিত করা। আমি জানি যে এই বিষয়ে সবাই হয়তো আমার সঙ্গে একমত হবেন না।
কোন এক সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কাজ করার ক্ষেত্রে সাহসের চেয়ে বেশী কিছু প্রয়োজন। এটা দাবী করে সতর্ক বিচার-বিবেচনা: কী ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে, তথ্যের উৎসগুলোকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং কীভাবে নিশ্চিত করতে হবে যে সংবাদগুলো যেন আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর আরও ক্ষতি করতে না পারে।
যুদ্ধক্ষেত্রে প্রমীলা সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা এক বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে।
সাংস্কৃতিক প্রত্যাশার কারণে প্রায়শই মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনকে পুরুষদের জন্য বেশি উপযুক্ত হিসেবে দেখা হয়। নারীদের প্রায়শই বিপজ্জনক পরিবেশে প্রবেশ করতে অবমূল্যায়ন করা হয় বা নিরুৎসাহিত করা হয়। একই সাথে, দীর্ঘ পথ ভ্রমণ এবং পুরুষ সহকর্মীদের সাথে সীমিত জায়গায় কাজ করার মতো বাস্তবতার কারণে নারীদের এমন কিছু ব্যক্তিগত আপোষের প্রয়োজন হয়, যা খুব কমই (মেনে নেওয়া) স্বীকার করা হয়।
এইসকল বাধা সত্ত্বেও, সে নীরবে তার কাজ করে যাচ্ছে আর সে সামাজিক প্রত্যাশা ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দুটোকেই চ্যালেঞ্জ করছে।
শারীরিক ভাবে আঘাত পাওয়ার মত ঝুঁকি ছাড়াও, মায়ানমারের সাংবাদিকরা প্রায়ই তাদের নিজ সম্প্রদায় থেকেও ভুল বোঝাবুঝির সম্মুখীন হন। কিছু মানুষ সাংবাদিক, তথ্যদাতা এবং গোয়েন্দা এজেন্টদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। অন্যরা সাংবাদিকদের অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তি হিসাবে দেখে যারা অনেক বেশি প্রশ্ন করে। এমনকি একটি প্রবাদ রয়েছে যা সাংবাদিকদের “অনেক বেশি কিছু খুঁজে বের করা” এড়াতে একজনের খাবার নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করার পরামর্শ দেয়।
মায়াৎ মো থু-এর ক্ষেত্রে এই ভুল বোঝাবুঝি তার ব্যক্তিগত জীবনেও বিস্তৃত। এমনকি পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনরাও তার কাজের উদ্দেশ্য এবং গুরুত্ব পুরোপুরি উপলব্ধি করতে হিমশিম খান।
তার মনে হয় যে, সাংবাদিকতা কিছুর বিনিময়ে পাওয়া যার জন্য দাম দিতে হয় , এটা দূরত্ব, বিচ্ছিন্নতা এবং কখনও কখনও প্রত্যাখ্যানর মত ঘটনার সাথেও জড়িত।
“আমি মাঝে মাঝে ভাবি, যে যারা ভুল করেছে তারাও হয়তো জীবনে দ্বিতীয় সুযোগ পেতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে তা ঘটেনা, মানুষ একবার সাংবাদিকের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেললে আর সেটাকে ফিরিয়ে আনার কোনো উপায় থাকে না।”
দৃশ্যমান ঝুঁকিগুলোর আড়ালে রয়েছে এক নীরব সংগ্রাম: মানসিক ও আবেগময় অবসাদ।
দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত, অস্থিতিশীলতা এবং মানসিক আঘাতের সংস্পর্শে থাকলে তা অবসাদের মত পরিস্থিতি তৈরি করে। নির্বাসনে কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এমনিতেই সীমিত। আর যারা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ভেতর থেকে প্রতিবেদন তৈরি করেন, তাদের জন্য তা আরও বেশি নাগালের বাইরে।
প্রায়শই সাহায্য চাওয়ার জন্য থাকে না সময়, সুযোগ বা সামর্থ্য। তবুও, সে এগিয়ে যায়।
যা তাকে এগিয়ে নিয়ে যায় তা ভয়ের নয়, বরং অনুশোচনার অনুপস্থিতি।
তিনি জানিয়েছেন, “আমি জানি, আমি যা বিশ্বাস করি তা বেছে নেওয়ার জন্য আমি অনুশোচনা করব না।”
মায়াৎ মো থু-র মতো সাংবাদিকদের জন্য পেশাগত কর্তব্য এবং ব্যক্তিগত অস্তিত্ব রক্ষার সীমারেখা কখনোই চিহ্নিত থাকে না। প্রতিটি কাজ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি ঝুঁকি নেওয়ার সাথে সাথে তা পরিবর্তিত হতে থাকে।
তারপরেও মায়াৎ সংবাদ প্রতিবেদন পাঠিয়েই চলেছেন। কারণ যেখানে নীরব থাকতে বাধ্য করা হয়, সেখানে সত্য বলাটা শুধু কেবল নিছক এক সাংবাদিকতা নয়, বরং তা এক ধরনের প্রতিরোধ।







