
Two security cameras mounted on a pole. ছবি Atypeek Dgn এর – পেক্সেলস-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত। পেক্সেলস লাইসেন্সের অধীনে ব্যবহৃত।
ঢাকার রাস্তায় এতদিন ট্রাফিক আইন ভাঙলে সার্জেন্টের সঙ্গে চোখাচোখি, একটু তদবির, কখনো সামান্য লেনদেন, এভাবেই পার পাওয়া যেত। আবার অনেক সময় ট্রাফিক সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়েই পার পাওয়া যেতো। সেই দিন এখন শেষ হতে চলেছে।
গত ৭ মে থেকে ঢাকার রাজপথে চালু হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ট্রাফিক ক্যামেরা। এআই বেসড রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ২০১৮ ভায়োলেশন ডিটেকশন সফটওয়্যার সংবলিত এই আধুনিক ক্যামেরা বিভিন্ন সিগন্যাল ক্রসিং ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বসিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। মামলার নোটিশ পৌঁছে যাচ্ছে গাড়ির মালিকের মোবাইলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম এমন স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু হলো, যেখানে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ক্যামেরা নিজেই মামলা তৈরি করছে।
কীভাবে কাজ করছে এই এআই ক্যামেরা?
সড়কে চলাচলের সময় কোনো যানবাহন লাল সিগন্যাল অমান্য করলে, নির্ধারিত লাইন অতিক্রম করলে বা বাম লেনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে এই এআই-নির্ভর ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানবাহনের নম্বরপ্লেট স্ক্যান করে এবং সঙ্গে সঙ্গে অটো-জেনারেটেড মামলা দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সফটওয়্যার কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও ফুটেজ তৈরি করছে, যা বিআরটিএর ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গাড়ির মালিকের তথ্য শনাক্ত করছে। পরে সেই তথ্যের ভিত্তিতে প্রসিকিউশন চিঠি পাঠানো হচ্ছে।
অর্থাৎ লাল বাতি পেরোলে বা উল্টো পথে গেলে, আইন ভাঙার প্রমাণসহ মামলার নোটিশ সরাসরি চলে যাচ্ছে মালিকের হাতে। যার বিরুদ্ধে মামলা হবে, তিনি চাইলে অনলাইনে নিজের অপরাধের ভিডিওটাও দেখতে পারবেন।
পুলিশের স্পেশাল বেঞ্চের সাবেক প্রধান গোলাম রসুল তার ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘দিনের বেলা ট্রাফিক সার্জেন্টকে হয়তো অনুরোধ করা যায়, তার সঙ্গে ওর সঙ্গে কথা বলানো যায় বা হ্যাডম বেশি থাকলে মামু চাচার ভয় দেখানো যায় কিন্তু এই এআই ক্যামেরার কোনো মন নেই, মায়া নেই, দয়া নেই, সে ভয় পায় না। সে শুধু চেনে নিয়ম আর আপনার গাড়ির নম্বর।’
ডিএমপি কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বর্তমানে শাহবাগের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি ও জাহাঙ্গীর গেট সিগন্যাল এলাকায় এই এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ফার্মগেট মোড়েও ক্যামেরা প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। এর পাশাপাশি ১১ মে উত্তরার বিমানবন্দর ক্রসিংয়ে সৌরশক্তিচালিত নতুন ট্রাফিক সিগন্যাল লাইটও উদ্বোধন হয়েছে।
১০ দিনে ১,০০০-এরও বেশি মামলা, আরও হাজার হাজার মামলার আশঙ্কা
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর তথ্য অনুযায়ী গত ৭ মে চালুর পর থেকে এই অত্যাধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল এবং ই-প্রসিকিউশন প্ল্যাটফর্মটি প্রায় ১,০০০টি ট্রাফিক মামলার জন্ম দিয়েছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে পুরো ঢাকা জুড়ে পূর্ণাঙ্গরূপে স্বয়ংক্রিয় মামলা ব্যবস্থা চালু হবে বলে তারা জানিয়েছে। সেক্ষেত্রে সার্জেন্ট বা ট্রাফিক পরিদর্শকদের কর্তৃক তাৎক্ষনিক মামলা খুব একটা করা লাগবে না। যেকোনো স্থানে ট্রাফিক আইন বা মোটর ট্রান্সপোর্ট আইন ভাঙলে স্বয়ংক্রিয় মামলা হয়ে যাবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে রাজধানীর অন্তত ৫০০টি পয়েন্টে ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ডিএমপি।
তবে এখানে আরেকটি বিষয় জেনে রাখা ভালো: গাড়ি চালানোর সময় কোনো ভুল হলে চালক কে ছিলেন তা বিবেচনা না করে, মামলাটি গাড়ির মালিকের নামেই দায়ের করা হবে। আপনি নিজে গাড়ি চালান কিংবা অন্য কোনো চালকের হাতে স্টিয়ারিং ছেড়ে দেন— তাহলে জরিমানার পয়েন্টগুলো গাড়ির মালিকের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকেই কাটা যাবে। বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক চালকের লাইসেন্সে ১২টি পয়েন্ট দেওয়া থাকে; এই পয়েন্টগুলো কমতে কমতে একেবারে শেষ হয়ে গেলে লাইসেন্সটি বাতিল হয়ে যায়।
ফেসবুক গ্রুপে মিশ্র প্রতিক্রিয়া: প্রশংসা আর সংশয় পাশাপাশি
ঢাকার জনপ্রিয় ফেসবুক ট্রাফিক গ্রুপগুলো যেমন ‘ঢাকা ট্রাফিক এলার্ট (৪ লাখ ৪৭ হাজার সদস্য)’, ‘ঢাকা ট্রাফিক আপডেট (৩৭ হাজার ৩০০ সদস্য)’-এ এই উদ্যোগ নিয়ে নানান আলোচনা চলছে।
একদল মানুষ এই পরিবর্তনে উৎসাহিত। প্রাইভেটকার চালক ওসমান গণি বলেন, ‘সিটবেল্ট নিয়ে অনেকের উদাসীনতা ছিল, এখন নিয়ম না মানলেই মামলা হচ্ছে, তাই সবাই বাধ্য হয়ে মানছে। পথচারী বিলকিস আরা বলেন, আগে রাস্তা পার হতে ভয় লাগত, এখন মানুষ আইন মানছে বলে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন।’
তবে সমালোচনাও কম নয়। জনপ্রিয় ঢাকা ট্রাফিক এলার্ট গ্রুপে ইসমাইল হোসেন নামের একজন ব্যবহারকারী পোস্ট করেছেন:
AI ক্যামেরা এখন সিগন্যাল ভাঙলে সাধারণ মানুষের গাড়ির ছবি তুলে মামলা দিচ্ছে… ভালো কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা লোকাল বাসগুলো?উল্টো পথে দৌড়ানো অটোরিকশাগুলো? ফিটনেসবিহীন কালো ধোঁয়া ছাড়া বাস? স্টপেজ ছাড়া রাস্তা ব্লক করে রাখা পরিবহন? এগুলোর বিরুদ্ধে ক্যামেরা কবে “অটোমেটিক” হবে? আইন যদি থাকে, সেটা সবার জন্য হোক। শুধু প্রাইভেট কার আর বাইক ধরলেই “স্মার্ট ট্রাফিক” হয় না। রাস্তার সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা যারা তৈরি করে, তাদের দেখেও না দেখার ভান করলে AI না, পুরো সিস্টেমকেই মানুষ প্রশ্ন করবে।
ওমর ফারুক নামের একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘সিগনাল পথচারীগন তো মানে না। গাড়ির সিগনাল সবুজ বাতি চলাকালীন পথচারীরাও গাড়ি সামনে দিয়ে রাস্তা ক্রস করে পারাপার হয়! যার ফলে শেষেরদিকের গাড়িগুলো কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ক্যামেরা যদি ঐসব গাড়িকে টার্গেট করে মামলা হয়ে যায় তাহলে এর দায় কেন গাড়ি মালিক নেবে?’
ব্রিলিয়েন্ট অ্যালিগেটর৯৯৯৩ নামের একজন অবশ্য ভোর ৫.১৫ মিনিটেও এআই ক্যামেরা আছে এমন একটি সিগন্যালের ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘ছবিটি ভোর ৫.১৫ মিনিটে তোলা ঢাকার বাংলামোটর এবং কারওয়ান বাজার সিগন্যালে। ভালো লাগছে দেখে যে এ সময়েও এ পথে চলাচলকারীরা ট্রাফিক লাইটস মানছেন। এখন দেখতে চাই, কিভাবে ডিএমপি ট্রাফিক পুলিশ বাস, সিএনজি এবং ব্যাটারি চালিত অটোরিকশাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে।’
ফেসবুক গ্রুপে আরেকটি বহুল আলোচিত বিষয় হলো প্রতারণা। নতুন এই ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়েছে, ট্রাফিক মামলার ভয় দেখিয়ে ফোনে টাকা দাবি করা হচ্ছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, কোনো মামলার টাকা ব্যক্তিগতভাবে কাউকে দেওয়া যাবে না।
তবে এর মধ্যে নগরীর ৩০০ ফিট এলাকায় একটি ক্যামেরা চুরির বিষয়ে একটি ছবি বেশ আলোচিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ক্যামেরাটি কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে! সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবিটি ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। এক্স-এ Voice of Gen-Z নামের একজন লিখেছেনঃ
দেশের বিভিন্ন স্থানে লাগানো অত্যাধুনিক এআই ক্যামেরাগুলো চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে একটি মহল।
এটি ঢাকার ৩০০ ফিট সড়কের একটি ক্যামেরার দৃশ্য। পুরো সিস্টেম খুলে নিয়ে গেছে। pic.twitter.com/KMFsyF9OOL
— Voice of Gen-Z (@VoGen_Z) May 11, 2026
যদিও পরবর্তীতে জানা গেছে, এটি চুরি হয়নি বরং প্রচন্ড বাতাসে ভেঙ্গে পড়ে গেছে এবং এটিও এআই ক্যামেরা না ট্রাফিক লাইট ছিলো।
অননুমোদিত ব্যাটারিচালিত রিকশা: এআই যেখানে নীরব

ঢাকা শহরে যানজটের একটি অন্যতম প্রধান কারণ রিকশা। ছবি উইকিমিডিয়া কমন্সের মাধ্যমে তৌহিদুলের তোলা। সিসি বাই-এসএ ৪.০।
এআই ক্যামেরার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়তো অন্যখানে। রাজধানীর প্রায় প্রতিটি গলিতে, এমনকি প্রধান সড়কেও দাপটের সঙ্গে চলছে অসংখ্য অননুমোদিত ব্যাটারিচালিত রিকশা। ঢাকার রাস্তায় গত কয়েক বছরে বেড়েছে এমন অসংখ্য ব্যাটারিচালিত রিকশা। এগুলোর বেশিরভাগেরই নেই কোনো নিবন্ধন, নেই নির্ধারিত নম্বরপ্লেট। কিন্তু এআই ক্যামেরার পুরো কার্যপদ্ধতি নির্ভর করে বিআরটিএ ডেটাবেজে নিবন্ধিত যানবাহনের নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণের উপর। একটি নম্বরপ্লেটবিহীন বাহন, বাস্তবিকভাবেই এই প্রযুক্তির কাছে সম্পূর্ণ অদৃশ্য।
যদিও ডিএমপি বা সরকারের তরফে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফেসবুক ট্রাফিক গ্রুপগুলোতেও এই প্রশ্নটি বারবার উঠে আসছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির পরিচালক অধ্যাপক ড. বি এম মাইনুল হোসেন গ্লোবাল ভয়েসেস’কে মোবাইলে জানানঃ
এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের উপর, সিস্টেমের স্বচ্ছতা, আপিলের সুযোগ, এবং সর্বোপরি অনিবন্ধিত যানবাহনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এআই ক্যামেরা একটি বড় পদক্ষেপ, সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রযুক্তি একাই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি দরকার সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থাপনার সংস্কার।
ঢাকার রাস্তা এবার দেখছে এআই-এর চোখ। এখন দেখার বিষয়, সেই চোখ কতটা সুষমভাবে সবার দিকে তাকাতে পারে।






