সীমার বাইরে: এক কুর্দী বালিকার গল্পে সিরিয়ায় ন্যায় বিচার এর অনুপস্থিতি

Digital image of a woman, holding the hands of two children and looking out into the distance from a crossroad.

ছবিসিরিয়াআনটোল্ড-এর, অনুমতিক্রমে ব্যবহার করা হয়েছে।

এই প্রবন্ধটি প্রথম ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ এ সিরিয়াআনটোল্ড-এ প্রকাশিত হয়েছে। কন্টেন শেয়ার চুক্তি অনুসারে এর এক সম্পাদিত সংস্করণ গ্লোবাল ভয়েসেস-এ প্রকাশিত হয়েছে।

আমার নাম রীমা(ছদ্মনাম), আমি সিরিয়ার আফরিন নামের এক এলাকার এক কুর্দী বালিকা। কাজের জন্য বর্তমানে আমি কুয়ামিশিল শহরে বাস করি, কিন্তু তৃতীয়বারের মত বাস্তচ্যুত হওয়ার আগে আমার পরিবার সিরিয়ার রাজধানী আলোপ্পোর উপকন্ঠে বাস করতো । আমার পরিবার প্রথমবারের মত বাস্তুচ্যুত হয় ২০১৩ সালে, যখন ফ্রি সিরিয়ান আর্মি বনাম শাসক দল আল আশরাফিয়ার ও শেখ মকসুদ এলাকার আশেপাশে বোমা বর্ষণ করছিল, যার ফলে আমাদের বাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়। যতদিন না নিরাপদ এক রাস্তা খোলা হলো, সেই চারদিন পর্যন্ত আমরা বেসমেন্টে আটকা পড়ে ছিলাম, পরে উক্ত পথ ধরে আমরা আফরিন শহরে পালিয়ে গিয়েছিলাম।

বাস্তচ্যুত ও বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়ার মাঝে

আফরিনের দুই তৃতীয়াংশ বাসিন্দা দুটি বাড়ির মালিক, যার একটি আফরিনে আরেকটি আলেপ্পোতে, দ্বিতীয় বাসাটি কাজ বা চাকুরি ও পড়ালেখার জন্য। যখন আমরা প্রথম ঘরছাড়া হই, তখন আমরা আমাদের গ্রামের বাড়ি জিনদিরেস-এ চলে যাই। ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমরা সেখানে বাস করি। এরপর শুরু হয় তুরস্কের অপারেশন অলিভ ব্রাঞ্চ নামের এক অভিযান, আর সেটার কারণে আমরা দ্বিতীয় বারের মত বাস্তচ্যুত হই। আমরা আবিষ্কার করি আমরা নিরুপায় ও অসহায়, আমাদের কোন বাড়ি নেই যেখানে আমরা আশ্রয় নিতে পারি। আল আশরাফিয়ায় আমাদের যে ঘর ছিলো সেটি ধব্বংস করে ফেলা হয়েছে, আর আমাদের কাছে সেই পরিমাণ টাকা নেই যা দিয়ে আমরা বাড়িটা আবার মেরামত করে নিতে পারি। এই সময় আমার পরিবার সিরিয়ার এর উপকন্ঠে একটা বাসা ভাড়া নেয়। কিন্তু আল আশরাফিয়ার সাথে আমাদের যে নিবিড় বন্ধন সেটা আমাদেরকে সেখানে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়, আর সে কারণে আমরা আমাদের ধব্বংস হয়ে যাওয়া বাসার কাছে একটা বাসা ভাড়া নেই।

একই সময়ে, আফরিনে আমাদের যে বাড়িটি ছিল সেটি দখল হয়ে যায়। ২০১৮ সালে আমার বাবা দারায়া থেকে একজনের একটি ফোন পায়, সে জানায় যে সে আমাদের বাসায় বাস করছে, যা কিনা এর আশেপাশে পড়া বোমার আঘাত সত্ত্বেও টিকে আছে। সেই লোকটি বাড়িটি ঠিকঠাক করার জন্য আমাদের কাছে টাকা চাইলো। আমার বাবা তাঁর এই আবেদন প্রত্যাখান করলেন, আর তাকে সেই বাসায় থাকার অনুমতি দিলেন না, অথবা বাসাটা দখল করে রাখার জন্য তাকে ক্ষমাও করলেন না।

২০২৩ সালের ভূমিকম্পের পর আমাদের পরিচিত একজন সেই বাসাটি পরিদর্শন করে, সেই ভূমিকম্পে এলাকার অনেক বাড়ি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো। এই ভুমিকম্প জিন্দারিসে বেশ বড় রকমে ক্ষতিসাধন করে, আর তার ফলে আফরিনের মধ্যে ও সেখান থেকে এক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের সেই পরিচিত ব্যক্তিটি নিশ্চিত করেছিলেন যে আমাদের বাড়িটির তেমন ক্ষতি হয়নি, যেমনটা সেই বাড়িটি আগের মত জলপাই গাছ দিয়ে ঢাকা রয়েছে, কিন্তু পুরো বাসাটায় ঘেরা দেওয়া রয়েছে আর দেখা যাচ্ছে এর প্রতিটি কোনায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। আহরার আল শাহারকিয়া নামের এক সরকার বিরোধী গোষ্ঠি, সিরিয়ার এক যুদ্ধবাজ বিদ্রোহী দল, যারা ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে, তারা এই বাসায় বাস করা শুরু করেছে।

২০২৪ সালে বাসার আল আসাদের শাসনের পতনের অনেকে আফরিনে গিয়ে তাঁদের সম্পত্তির দশা কি সেটা দেখে আসতে পেরেছে, আর আমার পিতা তাঁদের মধ্যে একজন, সিরিয়ার শাসকের পতনের একমাস পরে স্থানীয় এক গুরুত্বপুর্ণ সঙ্গে করে। যখন তিনি আমাদের বাসায় গিয়ে পৌঁছান তখন ঘরটি দখল করে থাকা ব্যক্তিটি মৌখিক ভাবে আমার পিতাকে অপমান করে, তাকে এক শুয়োর বলে অভিহিত করে ও সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের একজন সদস্য বলে অভিহিত করে (কুয়াদস আই) আমার পিতা তাকে কেবল শান্ত করার চেষ্টা করে গেছে ব্যাখ্যা করে যে তিনি একজন সাধারণ নাগরিক যে কিনা কোনদিন কোন অস্ত্র বহন করেনি আর বছরের পর বছর ধরে ভাড়া বাসায় থাকতে থাকতে নিছক তাঁর বাসায় ফিরে আসতে চেয়েছে। বাসা দখল করে থাকা ব্যক্তিটি এর জবাবে বাসা ছেড়ে দেওয়ার জন্য ৫০০০ মার্কিন ডলারের বেশী দাবী করেছিল।

আমার পরিবার আর্থিক ভাবে ধনী নয় আর এত বড় অঙ্কের টাকা দিতে সমর্থ নয়। যখন স্থানীয় সেই গণ্যমান্য ব্যক্তি এতে হস্তক্ষেপ করেন , তখন সেই দখলদার ব্যক্তি দাবীকৃত টাকার পরিমাণ অর্ধেক করে ফেলে। কিন্তু সেটাও ছিলো আমাদের সাধ্যের বাইরে । আমার ভাই ও আমি একসাথে মিলে কোন রকমে ১০০০ ডলার জোগাড় করি আর আমার পিতাকে বলি তিনি যনে দখলদারকে আবার যেন অনুরোধ করে ঘর খালি করে দেওয়ার জন্য। তবে সে টাকা নিল ঠিকই কিন্তু বাড়ি আর খালি করল না, তার বদলে সে আমার পিতার সাথে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ করতে থাকলে যেন আমার পিতা সেই বাসায় যাওয়ার সময় উল্লেখিত অর্থ নিয়ে আসে। ততদিন পর্যন্ত সে এই কাজটি করতে থাকলো যতক্ষন পর্যন্ত না আমার পিতা তাঁর নিজের ফোন দুই মাসের জন্য বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলেন।

উক্ত ব্যক্তি যে কিন দেইর এজ্জ জোর শহরের বাসিন্দা তিনি আমার পিতাকে জানান যতক্ষণ পর্যন্ত সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স সেই শহর থেকে বিদায় নেবে না ততক্ষণ পর্যন্ত সে বাড়ি ছেড়ে যাবে না। তার সাম্প্রতিক হুমকি যা সে এখনো প্রদান করেনি আর সেটা হচ্ছে উক্ত ব্যক্তিটি সাধারণ নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য নির্বাচিত হয়েছে, আর সেই সাথে আমাদের দুটি সুযোগ দিয়েছে, হয় তাকে পুরো টাকা দিয়ে দিতে হবে অথবা সে এই বাড়িটি উড়িয়ে দেওয়ার পর সে এই বাড়ী থেকে বিদায় নেবে।

আতঙ্কের মাঝে বসবাস

আল আশরাফিয়ার ও শেখ মাকসুদ এর সাম্প্রতিক আক্রমণগুলোতে আমার পরিবার তৃতীয়বারের মত বাড়ি থেকে উদ্বাস্তু হয়ে যায়, সেই সাথে আমার বোনের পরিবারও। আরও একবার তারা আফরিনের দিকে যেতে বাধ্য হয় কারণ এবার জাজিরার অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, আমি উদ্বেগের সাথে অপেক্ষা করছিলাম কখন তারা কামিশলিতে পৌছে যায়, তাদের জন্য এমনকি আমি আমার এই সামান্য গৃহ প্রস্তুত করে রেখেছিলাম, কিন্তু গাড়িচালক আমাকে বললো তা অসম্ভব কারণ যানজট ছিল প্রচণ্ড, আর এই পথ যা পাড়ি দিতে সাধারণত আধ ঘন্টারও কম সময় লাগে, সেটি পাড়ি দিতে সেদিন প্রায় সাত ঘন্টা সময় লেগেছিলো।

বর্তমানে আমার পরিবার আমার বোনের বাসায় বাস করছে, যে নিজেও একের বেশী বাড়ি হারিয়ে ফেলেছে। সে কয়েক শত মার্কিন ডলার দিয়ে অনেক কষ্টে কেবল একটি বাড়ি সে উদ্ধার করতে পেরেছে। এখন এমন কোন দিন নেই যেদিন কোন না কোন ব্যক্তি এসে তাঁর বাড়ির কোন না কোন জিনিস লুট করে নিয়ে যায়।
আমার মা আমার হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করেছেন যেন আমি স্যোশাল মিডিয়াতে কিছু না লিখি, তিনি আমার দুই ভায়ের জন্য উদ্বিগ্ন। আমাদের সর্বশেষ আলাপে তিনি আমাকে বলেন যে যখন তারা আমাদের এলাকা ছেড়ে চলে যায়, তিনি পুরো রাস্তায় তাঁর দুই সন্তানের হাত ধরে ছিলেন, যেন একটা ছোট্ট শিশুর হাত ধরে আছেন, এই আশঙ্কায় যে কেউ তাঁদের ক্ষতি করতে পারে। তারপরে তিনি এখানে বাস করা কুর্দী নয় এমন ব্যক্তিকে বলতে শোনেন, ভালো এক মুক্তি লাভ করলাম, আর যেন তোমরা ফিরে না আসো।

বর্তমানে, আমাদের পরিবারের দুজন সদস্য আমাদের আল আশরাফিয়ার বাসায় ফিরে গেছেন। তবে আমার মা, স্পস্টতই সেখানে ফিরে যেতে অস্বীকার করেছেন, বিশেষ করে আমার ভাইদের নিয়ে তাঁর ভয়ের কারণেঃ তিনি আফরিনে আমাদের নিজের বাসায় বাস করতে না পারার মত এক ভগ্ন হৃদয় নিয়ে বাস করছেন। এদিকে আমার বোন আমাকে বলেছে যে, আশেপাশের এলাকা এখন ঠিকঠাক, যদি অনেক অচেনা মুখ সেখানে দেখা যাচ্ছে আর ভবনের ধব্বংসস্তুপের টুকরা এখনো মাটির চারপাশে ছড়িয়ে আছে এটির সাথে এক আতঙ্কের অনুভূতি চারপাশের সবার মাঝে বিরাজ করছে, যে কেউ যখন এই এলাকায় প্রবেশ করছে সাথে সাথে সে নিরাপত্তার এক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে তরুণ যারা তাঁদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূরর্ণ সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

যা কিছু ঘটেছে এত কিছুর মাঝেও.আমরা আফরিনের বাসিন্দারা আজকে অনুভব করছি আমরা সকলের হাতে দর কষাকষির এক বস্তুতে পরিণত হয়েছি। আমাদের যে বিষয়টি অনুভুতিতে বিশ্বাসঘাতকতা করার মত এক অনুভূতি এনে দেয় সেটা হচ্ছে আফরিনে আমাদের সম্পত্তি বেদখল হয়ে যাওয়া. যেন কেউ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখছে না।এলাকায় যখন হামলা চালানো হয় সেই সময় আমার মনে হচ্ছিল যেন আমি ঘুমের মাঝে আছি আর আমার কোন জ্ঞান নেই; কিন্তু এরপরে আমার জন্য কি ঘটছে সেটার প্রক্রিয়া বোঝা ও বের করা কঠিন। আমার ফোন কখনো আমার হাত থেকে আলাদা হয়নি, আর এই এই ফোন আমার পরিবার ও আমার মাঝে যোগাযোগকে সচল রেখেছিল। আমি দায়িত্ববোধের বোঝা অনুভব করছিলাম, যেন তারা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল যে আমি কোন শুভ সংবাদ বয়ে আনছি ও আর তাদের পুনরায় নিশ্চিয়তা দিচ্ছি যে আর তাদের জোর করে ঘর ছেড়ে যেতে হবে না।আমার চেতনা আমাকে তাড়া করেছিল যে তাদের থেকে দূর থাকার কারণে, এই অবস্থায় আমি আলোপ্পোতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টায় বেশ কয়েকটি দলের সাথে যোগাযোগ করেছি।

আলোপ্পোতে আমার সেই যাত্রায় আমার সাথে আমার বোন ছিল, আমরা শহরের মূল কেন্দ্রে গিয়েছিলাম, শেখ মকসুদ এলাকার পূর্ব অংশে—কফি পান করতে.” যদিও এটি আমার স্বভাব নয় যে এই রকম মূহুর্ত ছবিতে ধারণ করি, যেহেতু আমার ভেতরের অনুভুতি আমাকে বলছিল আমার সামনে ঘটা এই অনুভূতি যেন আমি ধারণ করি।আজকে, আমি ছবির দিকে তাকাই আর অনুভব করি যে আবার এটা দেখার জন্য আমাদের আরো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে আর সেটা হবে খুব বেদনাদায়ক এক বিষয়, এক কুর্দী বালিকা হিসেবে, আমি ভগ্ন মন নিয়ে ফিরে আসবো।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .