নারীবাদের নাম জানার আগেই শিখুন: মিয়ানমারের ভার্সের গল্প

Verse Myanmar

ভার্স চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নারীবাদী ধারণাকে দৃশ্যমান গল্পের মাধ্যমে অনুবাদ করতে শুরু করেন। ছবি নির্বাসন হাব থেকে। অনুমতি্সহ ব্যবহৃত।

মিয়ানমারে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়ায় আত্মপ্রকাশকারী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গ্লোবাল ভয়েসেসের অন্যতম অংশীদার নির্বাসন হাব সাংবাদিক ও মানবাধিকার রক্ষাকারীদের ক্ষমতায়নের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। এই সম্পাদিত নিবন্ধটি একটি বিষয়বস্তু অংশীদারিত্ব চুক্তির অধীনে পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে।

একজন বর্মী চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে ভার্স তার দাদিমার নীরব প্রতিবাদে গড়ে তোলা ওঠা গল্প বলার মাধ্যমে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করে নারীদের প্রায়শই মুছে ফেলা কণ্ঠস্বর তুলে ধরেন ও শক্তিশালী করেন।

ভার্স ২০১৮ সালে মিয়ানমারের একটি স্থানীয় সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদক হিসেবে তার পেশাগত যাত্রা শুরু করেন। তিনি রাজনৈতিক সংবাদ কভার করার স্বপ্ন দেখলেও দ্রুতই পদ্ধতিগত লিঙ্গ বৈষম্যের সম্মুখীন হন। নে পি ত-তে সংসদ-সম্পর্কিত বিষয়াদি কভারের একটি বড় দায়িত্ব পালনের সময় পুরুষ প্রতিবেদক পাঠিয়ে তাকে কাজ থেকে বিরত রাখা হয়।

সেই মুহূর্তটি স্মরণ করে তিনি বলেন: “আমাকে বলা হয় নারীদের সেই সুযোগ নেই। কেবল নারী বলে বিকাশ অস্বীকৃত এমন একটি কর্মক্ষেত্র আমি মেনে নিতে পারিনি।”

তিনি সাংবাদিকতা ছেড়ে একটি নারী অধিকার সংগঠনে যোগ দিয়ে মানবাধিকার ও নারীবাদী প্রচারণায় মনোনিবেশ করেন।

সংবাদমাধ্যমে পা রাখার বা ক্যামেরা হাতে তোলার আগে ভার্স তার দাদীকে চুপচাপ তার সময়ের নিয়ম ভাঙ্গতে দেখে বড় হয়েছেন। একজন অবিচল সম্মানিত রাখাইন নারী হিসেবে তিনি করাতকলের ব্যবসা পরিচালনা্র জন্যে পুরুষদের মধ্যে প্রতিদিন কাজ করতে গিয়ে তার উপর আরোপিত লিঙ্গগত নিয়মের বিধিনিষেধ অস্বীকার করতেন।

ভার্স তার দাদী সম্পর্কে গর্বে করে বলেন: “তিনি আমাকে কখনো বলেননি একজন মেয়ে হিসেবে তুমি এটা করতে পারো না।’ তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন কাজের সীমাবদ্ধতা থাকলেও, কখনোই লিঙ্গগত সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত নয়।”

ভার্সের কাছে তার দাদীর দর্শন তার নারীবাদী বিশ্বদৃষ্টির মেরুদণ্ড হয়ে ওঠে। এমনকি ছোট ছোট দৈনন্দিন কাজেও, তার দাদী সামাজিক প্রত্যাশার বিরুদ্ধে লড়াই করেতেন। পাড়ার লোকেরা কাপড় শুকানোর সময় নারীদের অন্তর্বাস লুঙ্গির নিচে লুকানোর কথায় জোর দিলেও তার দাদিমা ভিন্নভাবে ভাবতেন। স্বাস্থ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি বলতেন, ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধের জন্যে অন্তর্বাসে রোদ লাগা দরকার। তাই তিনি সেগুলো বাড়ির সামনেই ঝুলিয়ে দিতেন। তিনি কখনোই নারী হওয়া কম মর্যাদার মনে করতেন না।

এধরনের প্রভাবের মধ্যে বেড়ে ওঠা ভার্স “নারীবাদী” শব্দটি শেখার অনেক আগেই পুঁথিগত বিদ্যা নয় বরং সহনশীলতা, মর্যাদা ও সমতার আদর্শ একজন নারীর জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ নারীবাদকে আত্মস্থ করেন।

ভার্স ২০২০ সালে ইয়াঙ্গুন ফিল্ম স্কুলে নারীবাদী ধারণাগুলিকে দৃশ্যমান গল্প বলার মাধ্যমে রূপান্তরিত করতে শেখা শুরু করেন। শ্রেণীকক্ষ নিজেই লিঙ্গ বৈষম্যের আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে ছয়জন পুরুষ ও ছয়জন নারী শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। একদিন, একজন পুরুষ সহপাঠী তাকে হাতে চুল বা সামান্য গোঁফ থাকা মেয়েরা “যৌন উত্তেজক” এমন একটি সাংস্কৃতিক কুসংস্কারভিত্তিক অসংলগ্ন প্রশ্ন করেন।

আহত ও রাগান্বিত হলেও তিনি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া বেছে নেন।

শ্রেণিকক্ষে একটি দলগত আলোচনার সময় ভার্স ঘটনাটি সামনে এনে মৌখিক হয়রানির সম্মুখীন শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া জানানোর সঠিক উপায় সম্পর্কে একটি সত্যিকারের আলোচনার সূত্রপাত করেন। তার সাহসের কারণে চলচ্চিত্র স্কুলটি যৌন হয়রানির উপর প্রথমবারের মতো শূন্য-সহনশীলতা নীতি চালু করে।

তখন থেকে ভার্সের চলচ্চিত্র নির্মাণ তার নারীবাদী উত্তরাধিকারের একটি সম্প্রসারণে পরিণত হয়। তার গল্প বলা প্রায়শই অশ্রুত বা অদৃশ্য নারীদের উপর কেন্দ্রীভূত।

“চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমি চাই মানুষ সহমর্মিতা অনুভব করুক—নারীদের আবেগ, অস্তিত্ব ও নিপীড়নকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখুক। আমার মন সব সময় তাদের কথাই ভাবে।”

তার সবচেয়ে অর্থবহ কাজের একটি হলো কলঙ্ক, সহিংসতা ও অপরাধীকরণের শিকার মিয়ানমারের যৌনকর্মীদের বাস্তব জীবনানুভূতি তুলে ধরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র প্রস্থান।” মিয়ানমারের গোয়েথে-ইনস্টিটিউটের সহায়তায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি শি প্রদর্শনী এবং ডিভিবি পিকক চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৪-এ প্রদর্শিত হয়েছে।

ভার্স ২০২২ সালে ক্রিটিক্যাল ভয়েসেস প্রযোজনা অনুদান পাওয়ার পর প্রথম নির্বাসন হাব সম্পর্কে জানতে পারেন। তাকে আবার ২০২৫ সালে নারীবাদী গল্প বলার অনুদানের প্রাপক নির্বাচিত করা হলে তিনি “ফাইট ফর ফ্রিডম” তথ্যচিত্র তৈরি করেন।

এই ছবিটি মিয়ানমারের সামরিক পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকারী একজন নির্বাসিত নারী, সাহসের গল্প ও আদর্শিক বিপ্লবের সূচনা করার তীব্র সংকল্পের কথা বলে। নিপীড়নের ছোট-বড়  কোনো শ্রেণিবিভেদ নেই। প্রতিটি ধরনের নিপীড়নকে চ্যালেঞ্জ করে ভেঙ্গে ফেলা উচিত।

পেশাগত সুযোগ প্রসারিত হলেও ভার্স এখ্নো মিয়ানমারকেই তার বাড়ি ভাবেন। তার দাদী্র বয়স বাড়ছে এবং তার যত্নের প্রয়োজন।

সহজভাবে তিনি বলেন: “তিনি আমাকে শুধু মানুষ করেননি। তিনি আমাকে আমার মূল্য শিখিয়েছেন। তিনি আমার লিঙ্গগত সীমাবদ্ধতায় কখনোই বিশ্বাস না করা নিশ্চিত করেছেন। আমি কখনোই তাকে ফেলে যেতে পারি না।”

তার কাছে নারীবাদ সহনশীলতা ও নিপীড়নকে তৎক্ষণাৎ চ্যালেঞ্জ করার  সাহসে মোড়ানো একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা। ভার্স তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বয়ানকে নতুনভাবে রূপ দিয়ে, প্রতিবন্ধকতা ভেঙ্গে এবং নারীদের কণ্ঠস্বর শুধু শোনা নয়, সম্মানিত করা একটি পৃথিবী কল্পনা করে এই বিশ্বাসকে সম্মান জানান।

ভার্সের জীবন একটি সরল আদর্শে গঠিত: “নারীরা সমতা, মর্যাদা এবং তাদের নিজ জীবন সংজ্ঞায়িত করার স্বাধীনতার যোগ্য।”

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .