
ভিদা রব্বানি- ‘মৃত্যুদণ্ডের প্রাচীর,’ ২০২৪। বিছানার চাদরে অ্যাক্রিলিক – ৫০ x ৭০ সেন্টিমিটার (১৯.৬ x ২৭.৫ ইঞ্চি)। ছবি চিত্রকরের সৌজন্যে।
তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারের দেয়ালের ভেতর — যে স্থান দমন আর যন্ত্রনার প্রতীকে পরিনত হয়েছে — সেখানে ভিদা রাব্বানি রঙের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছিলেন প্রতিরোধের নিজস্ব ভাষা। বিছানার চাদরেকে ক্যানভাস বানিয়ে, চোরাই ব্রাশে, আর আলাদা আলাদা টিউবে আনা রঙে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন তার কারাবাসের অন্তরঙ্গ বাস্তবতা — ইরানের সবচেয়ে পরিচিত নারী বন্দিশালার গভীর স্তরগুলো। তার কাজ একই সঙ্গে সাহসী ও কোমল — আবদ্ধ জীবনকে তিনি রুপ দিয়েছিলেন সৃজনের এক নিরব ঘোষনায়। সহ – রাজবন্দিদের প্রতিকৃতি থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক সিঁড়ির স্তরিত রেখাচিত্র পর্যন্ত – রাব্বানির তুলির টানে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে সেই নারীদের অদৃশ্য জীবন যারা নিঃসঙ্গতা আর সহমর্মিতা, দুই-ই বহন করে চলেছেন বন্দিশালার ভেতরে। তার আঁকা ছবিগুলো শুধু ব্যক্তিগত প্রকাশ নয় ; ছিল এক ধরনের সম্মিলিত স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাও।
শরঘ ডেইলি ও সেদা উইকলি-র সাবেক সাংবাদিক রাব্বানি নিজেকে কখনোই পেশাদার শিল্পী হিসেবে ভাবেননি। কিন্তু ২০২২ সালে ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া এবং দুটি আলাদা মামলায় মিলিয়ে এগারো বছরেরও বেশি কারাদণ্ডে দন্ডিত হওয়ার পর তিনি সত্যিকারের অর্থে চিত্রকল্পে ডুবে যায়। মোট ৩২ মাস কারাভোগের পর তার সাজা স্থগিত হয় এবং অবশেষে তিনি এভিন কারাগারের থেকে মুক্তি পান। ইরানি কর্তৃপক্ষ হয়তো তার কন্ঠকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল, কিন্তু রঙ আর তুলির নিরব ভাষায় তিনি তুলে ধরেছিলেন সেইসব কথা, যা আর সংবাদপত্রে লেখা সম্ভব ছিল না – বন্দিত্বের রেখাচিত্র, প্রতিদিন বাঁচার স্থির অথচ অবিচল রীতি, এবং দমনের মাঝেও টিকে থাকার কোমল, দৃঢ় মুহূর্তগুলো।

ভিদা রাব্বানি, ‘বৃষ্টিতে বসে থাকা’, ২০২৪। বিছানার চাদরের কাপড়ে অ্যাক্রিলিক, মাপ ৫০×৭০ সেমি (১৯.৬ × ২৭.৫ ইঞ্চি)। ছবি চিত্রকরের সৌজন্যে।
“কারাগারে, সীমাবদ্ধতাগুলো কল্পনাশক্তিকে তীক্ষ্ণ করে”, তিনি বললেন। “যখন স্থান ও উপকরণ কম, তখনই মনে মুক্তির পথ খুঁজে নেওয়ার কাজটি করে”। রাব্বানির শিল্প গোপনে বিকশিত হয়েছে, কখনো রাতের শেষ দিকে ডেস্ক ল্যাম্পের আলোয় উদ্ভাসিত এবং মুছে ফেলার আতঙ্কটা সবসময় পাশে থাকত। সহকারী বন্দিদের সাহায্যে তিনি চোরাইভাবে অ্যাক্রিলিক ও ব্রাশ জোগাড় করেছেন এবং কারাগারের কাঠের কর্মশালা থেকে উদ্ধার করা কাঠের ফ্রেমে কাপড় টেনে দিয়েছেন।
শুরুর মিউরালগুলো – যেমন বিপন্ন পারসিয়ান চিতাহ পিরৌজ-এর একটি যা সরাসরি প্রাঙ্গনের দেয়ালে আঁকা হয়েছিল – ছাপিয়ে রাব্বানি দ্রুত অন্তর্মূখী হয়ে গেলেন, ঘর, বিছানা এবং প্রকৃতির রুপরেখা আঁকতে শুরু করলেন, যা শুধু উপস্থিতি নয়, স্মৃতিও প্রকাশ করে। সব চিত্রই পরিসরে ছোট হলেও আবেগের দিক থেকে বিস্তৃত এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যে চমকপ্রদ ভিজ্যুয়াল গল্প বলার একটি ধারাকে চিহ্নিত করে।
গ্লোবাল ভয়েসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে, ভিদা রাব্বানি কারাগারের ভিজ্যুয়াল সংস্কৃতি নথিভুক্ত করা, তার কাজের পেছনে তাৎক্ষনিক পদ্ধতি, নজরদারির মধ্যে শিল্পচর্চার আবেগিক প্রভাব ও নিরাময়, এবং কিভাবে অঙ্কনকে তার সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষী হিসেবে গড়ে উঠল তা নিয়ে কথা বলেছেন।

ভিদা রাব্বানির ‘দেয়ালের পেছনে গ্রীষ্মকাল,’ ২০২৪। বিছানার চাদরের কাপড়ে অ্যাক্রিলিক, মাপ ৫০ × ৭০ সেমি (১৯.৬ × ২৭.৫ ইঞ্চি)। ছবি চিত্রকরের সৌজন্যে।
ওমিদ মেমোরিয়ান (ওএম): আপনি প্রথম কখন আঁকা শুর করেছিলেন, আর সাংবাদিকতার কাজের সাথে এটা কীভাবে বিকশিত হলো?
ভিদা রাব্বানি (ভিআর): স্মৃতিগুলো সবার জন্যই ভিন্নভাবে শুরু হয়। আমি ঠিক কত বয়সে প্রথম আঁকা শুরু করেছিলাম তা মনে নেই, কিন্তু যতদূর মনে পড়ে আমি সবময়ই আঁকা এবং শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট ছিলাম। আমরা দক্ষিণ ইরানের একটি প্রত্যন্ত শহরে মধ্যবিত্ত পরিবারে জীবনজাপন করতাম। আমি স্টেশনারি দোকানগুলোর প্রতি বেসামাল মনযোগী ছিলাম – এখনো আছি। আমার মনে আছে ছোটবেলায় শুধু দুটি পুতুল ছিল আমার, তবে আমি ছবির বই, রঙের জিনিসপত্র আর প্লেডো (খেলার মাটি) দিয়ে খেলায় মগ্ন থাকতাম। আমার মা সবকিছু খুবই যত্ন করে রাখতেন যেন আমি কিছু নষ্ট না করে ফেলি।
প্রায় চার বছর বয়সে আমি আঁকা শুরু করি। আমার স্পষ্টভাবে মনে আছে, যখন শেষমেষ আমার হাতে ছয় রঙের জলচিত্রের সেট এবং মার্কারের একটি বাক্স আসে – সেই আনন্দটা কতটা নতুন ও গভীর ছিল। স্কুলে আমাকে ভালো একজন আঁকিয়ে হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এমনকি একবার জাতীয় প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থানও অর্জন করি। কিন্তু উৎসাহের পরিবর্তে, আমার পরিবার আমার শিল্পের প্রতি আগ্রহকে হুমকি হিসেবে দেখেছিল, বিশেষ করে আমার মা, যিনি চেয়েছিলেন আমি ডাক্তার হই। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে পেইন্টিং আমার পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটাবে। তৃতীয় শ্রেনীতে পড়াকালীন আমি গোপনে একটি আর্ট ক্লাসে ভর্তি হই এবং কয়েক বছর ধরে পড়া চালিয়ে যাই। তবে সত্যিকার অর্থে আমি আঁকা আবার শুরু করি, যখন আমি এভিন কারাগারে বন্দি হই।

ভিদা রাব্বানি, ‘দ্যা ফরবিডেন ওয়াল্টজ: আ মোমেন্ট অফ লাইট,’ ২০২৪। বিছানার চাদরের কাপড়ে অ্যাক্রিলিক, ৫০ × ৭০ সেমি (১৯.৬ × ২৭.৫ ইঞ্চি)। ছবি চিত্রকরের সৌজন্যে।
ওএম: আপনার কারাগারের চিত্রকর্মে আপনি কি অন্বেষণ করেছিলেন, এবং সেগুলো আপনার কাছে কি অর্থ বহন করত?
ভিআর: এটি শুরু হয়েছিল যখন আমি একজন সহবন্দির জন্য একটি ছবি আঁকতে সাহায্য করেছিলাম, আর বাকিরা তা এতটা আনন্দের সাথে গ্রহণ করেছিল যে, আমি আবার হাতে ব্রাশ তুলে নিলাম। তাদের উৎসাহ আমাকে চিত্রকলা সামগ্রীর সাপ্লাই চাইতে উদ্ধুদ্ধ করল, যা আমার স্বামী কারাগারে নিয়ে এসেছিলেন।
দেয়ালে মিউরাল আঁকা দিয়ে আমি আমার যাত্রা আবার শুরু করলাম। একটি মিউরালে পিরুজকে দেওয়ালের ওপর দিয়ে দৌড়াতে দেখা যায়, এটি সহকর্মী বন্দিদের এবং পরিবেশবাদী কর্মীদের – সেপিদে কাশানি ও নিলুফার বায়ানিকে – উৎসর্গ করা। অন্য একটি মিউরাল ভাঙা ইটের পিছনে বনপথ প্রকাশ করেছিল – যা পালানোর প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছিল। করর্তৃপক্ষ এগুলোকে রাজনৈতিকভাবে বিদ্রোহী হিসেবে দাবি করে আঁকার ওপর রঙ দিয়ে ঢেকে দিল এবং আর কোন শিল্পসামগ্রী ব্যবহার নিষিদ্ধ করল।
২০২৪ সালের নববর্ষের কাছাকাছি, আমি ১০-১২ দিন ধরে কারাগারের দেয়ালগুলো রঙ করে পরিবেশেকে নতুন করে তোলার চেষ্টা করেছিলাম। যা শুরু হয়েছিল পরিবেশ আলোকিত করার জন্য, তা ধীরে ধীরে প্রতিদিনের প্রতিরোধ এবং পূরর্জীবনের কার্য হয়ে উঠে।

ভিদা রাব্বানি, ‘এভিনের পাহাড়গুলো,’ ২০২৪। বিছানার চাদরের কাপড়ে অ্যাক্রিলিক, মাপ ৫০ × ৭০ সেমি (১৯.৬ × ২৭.৫ ইঞ্চি)। ছবি চিত্রকরের সৌজন্যে।
পরবর্তীতে, বাকি বন্দিরা আমাকে তাদের বিছানা, ঘর বা ওয়ার্ডের কোনাগুলো আঁকার জন্য অনুরোধ করল যেন তারা তাদের পরিবারের সাথে এটা শেয়ার করতে পারে। এটি আমাকে অনুপ্রাণিত করল, যেন আমি নারীদের ওয়ার্ডকে এমনভাবে নথিভুক্ত করি যা বাইরে থেকেও দেখা যায়। আমার প্রথম অন্তর্মুখী চিত্র ছিল আমার সেল জানালা থেকে দেখা এভিনের পাহাড়ের দৃশ্য।
যদিও আগে আমি কখনো প্রতিকৃতি আঁকিনি, আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যে বন্দিত্ব কিভাবে মানুষের মুখ ও আত্মার ওপর প্রভাব ফেলে। আমি প্রথমবারের মতো গুলরুখ ইরাঈ-এর প্রতিকৃতি এঁকেছিলাম। পরে যখন পাকশন আজিজি-কে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়, আমার বন্ধু হাস্তি আমিরি, যিনি মুক্তির পথে ছিলেন, আমাকে অনুরোধ করে পাকশনকে আঁকার জন্য যাতে সচেতনতা সৃষ্টি করা যায়। তার মুক্তির আগে রাতে আমি এটি বিছানায় ল্যাম্পের আলোয় এঁকেছিলাম। যেহেতু ফটোগ্রাফি নিষিদ্ধ ছিল, আঁকা একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায় কারাগারের মানুষ এবং স্থানগুলোর দৃশ্যমান সংরক্ষণ করার।

ভিদা রাব্বানি, ‘পাকশান আজিজি,’ ২০২৪। বিছানার চাদরের কাপড়ের ওপর অ্যাক্রিলিক, মাপ ৫০ × ৭০ সেমি (১৯.৬ × ২৭.৫ ইঞ্চি)। ছবি চিত্রকরের সৌজন্যে।
ওএম: সীমাবদ্ধতার মধ্যে, আপনি কীভাবে কারাগারে আর্ট সাপ্লাই পেতেন?
ভিআর: এক বন্দি আমাকে সাহায্য করেছিল, পারিবারিক ভিজিটের সময় তেল রঙ ও ব্রাশ আনার মাধ্যমে, এগুলো নিজের কাপড়ে লুকিয়ে নিয়ে আসত। মাস লেগে যেত পর্যাপ্ত সামগ্রী জোগাড় করতে।
শেষ পর্যন্ত, নববর্ষ উপলক্ষে ২০২৩ সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কার বিজয়ী নার্গেস মোহাম্মাদি কর্তৃপক্ষকে রাজি করাতে সক্ষম হন যাতে আমরা একটি বড় পরিমাণ শিল্পকলা সামগ্রী আনতে পারি। আমি সুযোগটি কাজে লাগিয়ে প্রাচ্যের রঙের সাথে মিশিয়ে প্রপার অ্যাক্রিলিক রঙ কারাগারে প্রবেশ করালাম।
এম: কারাগারে পেইন্টিং করার সময় আপনি কি কি বাঁধার সম্মুখীন হয়েছিলেন, এবং তা কীভাবে অতিক্রম করেছিলেন?
ভিআর: অনেক বাঁধা ছিল। আমার কাছে ক্যানভাস ছিল না, তাই কারাগারের কাঠের ফ্রেম ব্যবহার করে এবং বেডশিটের ওপর নোখ দিয়ে টেনে বানিয়েছি। এজন্য আমার সব চিত্রে মাপ ৫০×৭০ সেমি (১৯.৬×২৭.৫ ইঞ্চি)। রঙ সীমিত ছিল – বিশেষ করে সাদা রঙ দ্রুত শেষ হয়ে যেত। তাই আমি রঙ খুব সাবধানে ব্যবহার করতাম। ফলস্বরূপ, রঙের স্তরগুলো খুবই পাতলা।
যখন ব্রাশগুলো ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যেত, আমি ওয়ার্ডেন-এর অফিসের সামনে সারাদিন বসে থাকতাম যতক্ষন না পর্যন্ত তারা আমাকে একটি প্যালেট নাইফ ও দুইটি ব্রাশ দেওয়ার জন্য রাজি হতো, শর্ত হিসেবে বলা হয়েছিল যে কোন শিল্পকর্ম তাদের অনুমতি ব্যতীত বাহিরে নেওয়া যাবে না।

ভিদা রাব্বানি, ‘ভিদা, হারিয়ে যাওয়ার একমাত্র জায়গা,’ ২০২৪। বিছানার চাদরের কাপড়ের ওপর অ্যাক্রিলিক, মাপ ৫০ × ৭০ সেমি (১৯.৬ × ২৭.৫ ইঞ্চি)। ছবি চিত্রকরের সৌজন্যে।
ওএম: কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় পেইন্টিং কীভাবে আপনার মানসিক ও আবেগের অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলেছিল?
ভিআর: যদিও কারাগারে আমি কখনো অকার্যকর অনুভব করিনি, তবুও চিত্রকল্প আমাকে নতুন শক্তি ও উদ্দেশ্য দিয়েছে। আমি প্রতিদিন উত্তেজিত হয়ে ঘুম থেকে উঠতাম, আমার কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি ওয়ার্ডকে সবসময় পর্যবেক্ষন করতাম, নতুন বিষয় খুঁজে বের করার জন্য। জানতাম যে মুক্তির আগে আমি সবকিছু আঁকতে পারব না, তাই পরে বাইরে চলার জন্য প্রচুর স্কেচ করতাম। এটি সময়কে দ্রুত অতিবাহিত করাত এবং আমার কারাগারের অভিজ্ঞতাকে এমন এক শিল্পমূখী সুযোগে রুপান্তরিত করেছিল যা আমি হারাতে চাইনি।

ভিদা রাব্বানির, ‘গুলরুখ ইরাঈ, একটি পোর্ট্রেট,’ ২০২৪। বিছানার চাদরের কাপড়ের ওপর অ্যাক্রিলিক, মাপ ৫০ ×, ৭০ সেমি (১৯.৬ × ২৭.৫ ইঞ্চি)। শিল্পীর সৌজন্যে প্রদত্ত ছবি।
ওএম: অন্যান্য বন্দি ও কারারক্ষীদের আপনার কাজের প্রতি কেমন প্রতিক্রিয়া ছিল?
ভিআর: সবচেয়ে বেশি উৎসাহ পেয়েছি সহবন্দীদের প্রতিক্রিয়া থেকে। আমি প্রথমে শুধু পড়াশোনার ওপর মনোযোগ দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম, কিন্তু তাদের উৎসাহ আমাকে শিল্পের দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছে। নববর্ষের সময়, আমি যখন সিড়িঁর ছবি আঁকছিলাম, তারা বারবার আমার খোঁজ নিতে আসছিল, আমার জন্য খাবার ও কফি নিয়ে আসত যার ফলে আমার মনে হচ্ছিল যে আমি অর্থবহ কিছু করছি।
অনেক রাতে, আমি ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসতাম আর এসেই দেখতাম আমার বিছানায় খাবারের প্লেট রাখা আছে। আমার মনে হয় না আমি কখনো এতটা কৃতজ্ঞ বা উদ্দেশ্যপূর্ণ অনুভব করেছি, যতটা আমি সেই দিনগুলোতে করেছিলাম। একজন বন্দি আমাকে বলেছিল যে দেওয়ালের মিউরালগুলো ওয়ার্ডে নওরুজের প্রান বয়ে এনেছে।

ভিদা রাব্বানি, ’সেপিদে, স্টিম অ্যান্ড সাইলেন্স,’ ২০২৪। বিছানার চাদরের কাপড়ের ওপর অ্যাক্রিলিক, মাপ ৫০ ×৭০ সেমি (১৯.৬ × ২৭.৫ ইঞ্চি)। ছবি চিত্রকরের সৌজন্যে।
ওএম: এই অভিজ্ঞতা কি আপনার শিল্পধারা বা কৌশলের ওপর কোন প্রভাব ফেলেছেন?
ভিআর: আমি কোন প্রশিক্ষিত শিল্পী নই এবং আমার কোন নির্দিষ্ট স্টাইলও ছিল না। বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা ছিল, কিন্তু আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পাইনি। আমি কখনো ফটোরিয়ালিজম পছন্দ করতাম না – অতিরিক্ত বিস্তারিত আমর কাছে আকর্ষণীয় লাগে নি। আমি দৃশ্যমান ব্রাশস্ট্রোক ও টেক্সচার পছন্দ করি এবং রঙগুলো খুব মিশ্রভাবে মিশাতে চাইনি।
তবুও, আমি আমার কারাগারের পেইন্টিং গুলো যখন একসাথে দেখি, তখন আমি সেখানে স্পষ্ট উন্নতি দেখতে পাই। আমার কৌশল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে এবং আমি অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়েছি।
ওএম: এখন যেহেতু আপনি মুক্ত, আপনি কি আপনার কারাগারের চিত্রকর্ম প্রদর্শন বা প্রকাশ করার পরিকল্পনা করছেন?
ভিআর: হ্যাঁ, অবশ্যই। দুইটি কারনে আমি ছবি আঁকতাম: কারাগারকে আরও বাসযোগ্য করা এবং অন্যদের দেখানো যে এর ভিতরের জীবন কেমন ছিল। যদি আমি এই কাজগুলো প্রদর্শন করতে পারি, আমি সত্যিই আনন্দিত হব। এগুলো কেবল শুধু আমার জন্য ছিল না; সবসময় ভাগ করার জন্য তৈরি হয়েছিল।

ভিদা রাব্বানি, ‘নাসিম, দ্যা শ্যাডো অফ এক্সিকিউশন সেনটেন্স, অ্যান্ড দ্যা ফ্লাওয়ারস স্টিল ব্লুম,’ ২০২৪। বিছানার চাদরের কাপড়ের ওপর অ্যাক্রিলিক, ৫০ × ৭০ সেমি (১৯.৬ × ২৭.৫ ইঞ্চি)। ছবি চিত্রকরের সৌজন্যে।
ওএম: আপনার চিত্র কি কোন বিশেষ বার্তা বহন করে?
ভিআর: আমি কারাগারের পরিবেশকে ধরে রাখতে চেয়েছি – কখনো আনন্দময়, কখনো বিষণ্ণ। আমি চেয়েছিলাম ভিতরে জীবনের ছন্দ প্রতিফলিত হোক। কারাগারে আবেগগুলো তীব্র হয়ে যায় – শোক, আনন্দতা, নিঃসঙ্গতা, একাত্মতা; এগুলো সব বাইরে থেকেও অনেক বেশি প্রবল হয়। আমি আশা করি, আমার কাজের মধ্য দিয়ে এই অনুভূতিগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

ভিদা রাব্বানি, ‘উন্মুক্ত ক্ষত,’ ২০২৪। বিছানার চাদরের কাপড়ের ওপর অ্যাক্রলিক, ৫০ × ৭০ সেমি (১৯.৬ × ২৭.৫ ইঞ্চি)। ছবি চিত্রকরের সৌজন্যে।
ওএম: অন্য বন্দি শিল্পীরা কি আপনাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন?
ভিআর: কারাগার থেকে ছোট একটি ছুটিতে, আমি একটি বিবিসি প্রবন্ধে দেখেছিলাম, যেখানে এখন ব্রিটিশ মানুষকে দেখানো হয়েছিল, যিনি হেরোইন পাঁচারের জন্য ১৩ বছরের সাজা ভোগকালে ছবি আঁকতে শুরু করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শিল্পই তার জীবন পরিবর্তন করেছেন এবং মুক্তির পর তিনি পেশাদার শিল্পী হিসেবে পরিনত হন, এমনকি পুরষ্কারও জিতেছেন। আমি বন্ধুদের সাথে মজা করতাম যে আমার সাজা খুব ছোট ছিল; যদি আরও ১০ বছর পেতাম – হয়তো আমিও একজন পুরষ্কারপ্রাপ্ত শিল্পী হতে পারতাম।

ভিদা রাব্বানি, ‘নিলুফারের বাগান’ ২০২৪। বিছানার চাদরের কাপড়ের ওপর অ্যাক্রিলিক, ৫০ × ৭০ সেমি (১৯.৬ ×২৭.৫ ইঞ্চি)। ছবি চিত্রকরের সৌজন্যে।
ওএম: রিচার্ড ড্যাডের মতো শিল্পীরা কারাগারে থাকাকালীন অসাধারণ কাজ করেছেন। আপনি কি মনে করেন যে বন্দিত্ব কোনভাবে আপনার সৃজনশীলতাকে উদ্দীপ্ত করেছে?
ভিআর: আমি মনে করি না, সীমাবদ্ধতাই কেবল একটি ক্লিশে যা সৃজনশীলতাকে উদ্দীপ্ত করে। যখন আপনার শারিরীক পরিবেশ এবং সম্পদ সীমিত থাকে, তখন সমাধান খুঁযে বের করার জন্য এবং মানিয়ে নেওয়ার জন্য কল্পনাশক্তির ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। সেই মানসিক প্রয়াশ মস্তিষ্ককে গতিশীল করে। হয়তো মনোবিজ্ঞানীরা এটি ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ঠিক তাই হয়েছিল।







