
মৌরিতানিয়ার রাজধানী নুয়াকশটের পোর্ট দ্য পেশ বা ফিশারম্যানস বিচে মহিলারা ঝুড়ি হাতে উপকূলে গিয়ে মাছ ধরার নৌকাকে স্বাগত জানাচ্ছেন, তাজা মাছ ক্রয়ের জন্য। ছবি : উইকিপিডিয়া অ্যাট্রিবিউশন ২.০ জেনেরিক।
এই প্রবন্ধটি গ্লোবাল ভয়েসের ক্লাইমেট জাস্টিস ফেলোশিপের অংশ হিসেবে জমা দেওয়া হয়েছে, যা চীনা ভাষাভাষী ও গ্লোবাল মেজরিটি দেশের সাংবাদিকদের জুটিতে মিলিয়ে একত্রে বিদেশে চীনা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর প্রভাব নিয়ে অনুসন্ধান করানো হয়। আরও গল্প এখানে খুঁজুন।
আটলান্টিক মহাসাগরের সরাসরি সংযোগ থাকা একটি পশ্চিম আফ্রিকান দেশ হচ্ছে মৌরিতানিয়া, যা এর প্রাণবন্ত মাছ ধরা শিল্পেত জন্য পরিচিত বহুযুগ ধরে। তবে, বিদেশি ট্রলার দ্বারা পরিচালিত বৃহৎপরিসরের মাছ ধরা এই শিল্প এবং ক্ষেত্রকে ঝুঁকিতে ফেলছে, স্থানীয় জীবিকার ওপর হুমকি তৈরি করছে এবং স্থানীয় জেলেদের কোনো প্রতিকারমূলক পথ রাখেনি।
যদিও মৌরিতানিয়ার জলসীমায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাহাজ দেখা যায়, একটি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে যে অন্তত ৮০ শতাংশ মৎস্যশিল্পের জাহাজ চীনের। এর কারন হলো, ২০১০ সালের জুনে চীন পলি-হন ডোন পেলাজিক ফিশারি কোম্পানির মাধ্যমে মৌরিতানিয়ার সঙ্গে ২৫ বছরের জন্য একটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
চুক্তির আওতায়, মৌরিতানিয়ার কর্তৃপক্ষ চীনের কাছ থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগের সুবিধা পাবে। এই অর্থ দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী এবং দক্ষিন-পশ্চিমে দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নুয়াধিবুতে একটি মাছ প্রক্রিয়াকরণ কারখানা নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হবে। এর বিনিময়ে, মৌরিতানিয়া চীনকে ২৫ বছরের জন্য মাছ ধরার অনুমতি দিয়েছে। এই অনুমতি একচেটিয়া কার্যক্রমের লাইসেন্স দ্বারা সমর্থিত, যার ফলে চীনা মৎস্য কোম্পানিগুলো মৌরিতানিয়ার মৎস্য শিকার খাতে শক্তিশালী খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এর ফলে নিয়ন্ত্রণহীন মৎস্য শিকারের কারণে মৌরিতানিয়ার উপকূলবর্তী জলরাশিতে মাছের পরিমাণ কমে গেছে, যা স্থানীয় জেলেদের উপর অনর্থক বোঝা সৃষ্টি করছে এবং পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করছে।

বৃহৎ শিল্পকৌশলভিত্তিক বিদেশি ট্রলারগুলো মৌরিতানিয়ার উপকূলে স্থানীয়ভাবে অবস্থান করছে। ইউটিউব থেকে স্ক্রিনশট।
মৌরিতানিয়ার জলসীমায় চীনের এই আধিপত্যকে মৌরিতানিয়ার সমাজসেবা সংগঠনগুলো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ও যেমন গ্রিনপিস আফ্রিকা ব্যাপকভাবে নথিভুক্ত করেছে ও নিন্দা জানিয়েছে। গ্রিনপিস আফ্রিকার উমি সেনে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছেন, যার মাধ্যমে মৌরিতানিয়ার সরকারের প্রতি তাদের জলসীমা রক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে।
Le gouvernement Mauritanien doit faire montre de responsabilité: il doit sauvegarder, maintenir et conserver ses ressources naturelles et protéger les moyens de subsistance de ses pêcheurs, qui en retour nourrissent et maintiennent le pays. Cette convention doit être dénoncée sans délai.
মৌরিতানিয়ার সরকারকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে: তাদের অবশ্যই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা ও সংরক্ষণ করতে হবে এবং দেশের জনসাধারণকে খাদ্য ও জীবনধারণে সহায়তা করা জেলেদের জীবিকা সুরক্ষিত করতে হবে। এই চুক্তি অবিলম্বে নিন্দিত হতে হবে।
যদিও চীনা নৌবহরের এই প্রবেশ মৌরিতানিয়ার জলসীমায় স্থানীয় মৎস্যশিল্পকে উন্নত ও আধুনিকীকরণের একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারত, কিন্তু এটি স্থানীয় উন্নয়নের জন্য মোটেই অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করছে না। স্থানীয় জেলেরা স্পষ্টতই অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছেন, যার সরাসরি ফলাফল হলো মাছের মজুতের উল্লেখযোগ্য হ্রাস।
জেলেদের দারিদ্র্য ও সমুদ্রের ক্ষয়
মৌরিতানিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য মৎস্য শিকার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদিও এই শিল্পের ব্যপকতা দেশের মোট জিডিপির মাত্র ১০ শতাংশ, তবুও এটি দেশের মোট রফতানির ৩৫-৫০ শতাংশে অবদান রাখে এবং এই খাতে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে কর্মরত মানুষের জন্য লাখ লাখ মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে।
যদিও মৌরিতানিয়ার জলসীমার বড় অংশ চীনা নৌযানদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, তবুও কিছু চীনা কোম্পানি স্থানীয় জেলেদের জন্য সংরক্ষিত এলাকায় বেআইনিভাবে মাছ ধরতে এবং অসৎ ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে জড়িত হতে থামছে না, যেমন অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং মৌসুমের বাইরে মাছ ধরা।
চীনা নৌবহরে কয়েকটি মাছ ধরা জাহাজ রয়েছে যা উন্নত প্রযুক্তি ও কৌশল দ্বারা সজ্জিত, যেখানে ঐতিহ্যবাহী মৌরিতানিয়ার জেলেরা তাদের কারুশিল্পজাত দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে মাছ ধরায় প্রতিযোগিতা করতে অক্ষম। সীমিত ক্ষমতার কারুশিল্প পিরগু নৌকা ও হাতে বোনা জাল নিয়ে তারা তাদের ধরা মাছের পরিমাণে নাটকীয় হ্রাস এবং আয়ের পতন দেখছে।

মৌরিতানিয়ার পিরগু নৌকা করে একদল মাঝি অক্টোপাস ধরে ডাঙ্গায় ফিরছে। ছবি উইকিপিডিয়া থেকে, অ্যাট্রিবিউশন-শেয়ারলাইক ৪.০ ইন্টারন্যাশনাল লাইসেন্স অনুযায়ী।
আটলান্টিক মহাসাগরের কাছে অবস্থিত ব্যাংক ব্যাংক দ'আর্গিনের সামুদ্রিক অঞ্চলে কয়েকজন ইমরাগুয়েন বসবাস করে। এরা একটি যাযাবর সম্প্রদায় এবং এদেরকে মৌরিতানিয়ার নৌআধিবু ও নুয়াকশটের মধ্যবর্তী কিছু গ্রামেও দেখা যায়। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে বংশপরম্পরায় মাছ ধরার পেশা চলে আসছে। উল্দ সিদি (ছদ্মনাম) এমন এক জেলেদের পরিবারের সন্তান। গ্লোবাল ভয়েসেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কারণ এখন মৎস্য শিকারের কার্যক্রমে আর তেমন ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
Je suis née dans une famille où la pêche est l’unique activité génératrice de revenus que nous pratiquons. Cette activité a toujours rapporté de l’argent à notre famille. Mais depuis la période où nos autorités ont signé cet accord avec les chinois, tout est parti en vrille. Nous pouvons passer des jours en mer et revenir bredouille, parce que les chinois sont déjà passés par là avec leurs flottes. Le poulpe et le mulet jaune, deux espèces que nous pêchons ont disparu. C’est triste pour notre activité.”
আমি এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি যেখানে মাছ ধরা একমাত্র আয় উপার্জনের কাজ। এই কার্যক্রম সবমসময় আমাদের পরিবারের জন্য অর্থ আয় করেছে। কিন্তু আমাদের কর্তৃপক্ষ চীনের সাথে এই চুক্তি স্বাক্ষর করার পর সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা সাগরে দিন কাটাই এবং শূণ্য হাতে ফিরে আসি, কারণ চীনারা তাদের নৌবহরে আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত থাকে। অক্টোপাস এবং হলুদ মুলেট, দুইটি প্রজাতি যা আমরা ধরি, এখন আর পাওয়া যায় না। আমাদের জীবিকার জন্য এটি খুবই দুঃখজনক।
দীর্ঘদিন ধরে অক্টোপাস মৌরিতানিয়ার মাছ ধরা শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। চীনা নৌবহরের আগমনের পর থেকে এই প্রাণী, হলুদ মুলেট এবং অন্যান্য অনেক বিরল ও অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ মাছ প্রজাতি স্থানীয় জেলেদের নাগাল থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। এটি কেবল মৌরিতানিয়ার মাছ ধরা শিল্পের জন্য নয়, পুরো আটলান্টিক মহাসাগরের জন্যও একটি গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে, যা কিছু মাছের মজুত হ্রাসের কারনে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
ঐতিহ্যগতভাবে, মৌরিতানিয়ার জেলেরা উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করে বিপুল পরিমাণ মাছ ধরতে পারতেন; তবে আজকাল মাছ খুঁজে পেতে তাদের গভীর জলে যেতে হয়। এতে জ্বালানির খরচ অনেক বেড়ে যায় এবং পর্যাপ্ত মাছ পাওয়ার ও নিশ্চয়তা থাকে না।

মৌরিতানিয়ার একটি ঘাট যেখানে স্থানীয় পিরগু নৌকা রয়েছে। স্ক্রিনশট : ইউটিউব।
যদিও এই খাতে চীনের শিল্পায়নের অবদানকে অস্বীকার করা যায় না, তবুও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন জেলে বিশ্বাস করেন যে মৌরিতানিয়ায় মৎস্য শিল্পের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন-
Tant que les chinois seront présents dans ce secteur, la pêche mauritanienne est dans une impasse. Et les conséquences seront très graves pour l'ensemble du pays si rien n’est fait. Aujourd'hui, avec cet accord signé avec la Chine, les pêcheurs mauritaniens sont fortement exclus et marginalisés. Que deviendront les pêcheurs locaux une fois que cet accord aura pris fin? Les autorités doivent changer de cap et considérer notre contribution au développement socio-économique du pays.
যতদিন চীনারা এই খাতে উপস্থিত থাকবে, ততদিন মৌরিতানিয়ার মৎস্য শিকার কার্যক্রম একটি ভুল পথে চালিত হবে। যদি এ বিষয়ে কিছু করা না হয়, তাহলে এর প্রভাব পুরো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুতর হবে। বর্তমানে, চীনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির ফলে মৌরিতানিয়ার জেলেরা ব্যাপকভাবে বঞ্চিত ও উপেক্ষিত হচ্ছে। এই চুক্তি শেষ হলে স্থানীয় জেলেদের কী হবে? কর্তৃপক্ষকে তাদের নীতি পরিবর্তন করতে হবে এবং দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমাদের অবদানকে বিবেচনায় নিতে হবে।
যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে মাছ বাজারে বিক্রি করা হতো এবং সম্প্রদায়ের খাদ্য সরবরাহের জন্য ব্যবহার হতো, নতুন প্রজন্মের শিল্প-শিকারীদের ক্ষেত্রে তা নয়। মৌরিতানিয়ার ৬০০ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে বিদেশি মালিকানাধীন কারখানায় ধরা মাছের একটি বড় অংশ প্রক্রিয়াজাত করে মাছের খাদ্য, মাছের তেল এবং অন্যান্য উপজাত পণ্য তৈরি করা হচ্ছে, যা পরে বিদেশে পাঠানো হয়। মাছের খাদ্য হলো শুকনো ও গুঁড়ো করা মাছ থেকে তৈরি একটি পণ্য, যা প্রধানত শিল্পভিত্তিক খামারে পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সাউথওয়ার্ল্ডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে, ৬৯ বছর বয়সী শেখ মুহাম্মদ সালিম বিরাম বলেছেন যে তিনি মনে করেন স্থানীয় জেলেদের ধরা মাছের পরিমাণে আকস্মিক পতনের জন্য সরকারই দায়ী। তিনি বলেনঃ
আমার প্রতিবেশীরা আমার কাছে এসে অভিযোগ করে যে তারা কিছুই ধরতে পারছে না। কিন্তু আমি সরকারের বিরুদ্ধে কী করতে পারি? তারাই তো চীনাদের দেশে এনেছে। তারা আমাদের মাছ চুরি করে তাদের শূকরের জন্য খাবার তৈরি করে, অথচ আমাদের মানুষদের খাওয়ার জন্য যথেষ্ট মাছও থাকে না।

মৌরিতানিয়ায় একটি শিল্প মাছ প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, পেছনে একটি ট্রলার দৃশ্যমান। স্ক্রিনশট : ইউটিউব।
পরিস্থিতি নিয়ে চীনের দৃষ্টিভঙ্গি
মৌরিতানিয়ার জেলেরা যখন অর্থনৈতিক কষ্ট ও পরিবেশগত চাপ নিয়ে কথা বলছেন, তখন চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরছে—তা হলো ব্যাপক সম্প্রসারণ, পারস্পরিক সমৃদ্ধি এবং দায়িত্বশীল উন্নয়নের গল্প। সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি, পিপলস ডেইলি এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড পোর্টালে প্রকাশিত সরকারি প্রতিবেদনে চীনা মৎস্য শিকার কোম্পানিগুলোকে কেবল আধুনিকীকরণকারী শক্তি হিসেবে নয়, বরং পরিবেশ রক্ষা ও সম্প্রদায় গঠনে সহায়তাকারী দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।
চীনা সংবাদমাধ্যমগুলো দুই দেশের এই অংশীদারিত্বকে তাদের আন্তর্জাতিক বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর একটি বড় সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করে। “আমরা নতুন সিল্ক রোড বরাবর যাত্রা করি,” চীনা মৎস্য শিকার কোম্পানিগুলো চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম পিপলস ডেইলি-কে বলেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড পোর্টালে এক সাক্ষাৎকারে একজন চীনা প্রতিনিধি মৌরিতানিয়ার প্রতি চীনের লক্ষ্যকে “সমুদ্র পেরিয়ে সভ্যতার অনুসরণ” বলে বর্ণনা করেছেন।
২০১৮ সালে সিনহুয়া লিখেছিল, “ঘন ঘন মাছের ঝাঁক উপকূলের কাছে ভিড় করছিল,” যা পশ্চিম আফ্রিকার জলরাশিতে চীনা উদ্যোক্তাদের আবিষ্কারের উত্তেজনা তুলে ধরেছে। মহাসাগরকে দূরবর্তী মৎস্য শিকারের জন্য একটি “উপহারপ্রাপ্ত ভূমি” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। কিন্তু পনেরো বছর পর, স্থানীয় মৌরিতানিয়ার জেলেরা এই মহাসাগরের সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছেন।
নষ্টপ্রায় প্রজাতিগুলোর সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে, মৌরিতানিয়াকে “প্রচুর সম্পদের দেশ” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে চীনা রাষ্ট্রীয় গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক (সি জিটিএন) আফ্রিকার একটি অনুষ্ঠানে এটিকে “জেলেদের জন্য একটি স্বর্গ” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এই বর্ণনাগুলো, হংডং ফিশারির চেয়ারম্যান ল্যান পিংইয়ং-এর মতো নির্বাহীদের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। এখানে চীনকে আফ্রিকার একজন দয়ালু অংশীদার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যে কিনা স্থানীয়দের সুযোগ ও সাফল্যের পথ দেখাচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় প্রতিবেদনগুলোতে উল্লিখিত সম্পদ ক্ষয়, বঞ্চনা এবং অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এই বর্ণনার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায়।
মহাসাগরের সম্পদ হ্রাসের অভিযোগের পাশাপাশি, স্থানীয় মৌরিতানিয়ানরা চীনা কোম্পানিগুলোর দ্বারা স্থলসম্পদের অতিরিক্ত আহরণের কথাও উল্লেখ করেছেন, যা তাদের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়। এদিকে, চীনের পক্ষ থেকে এসব কার্যক্রমকে ‘অবকাঠামো নির্মাণ’ হিসেবে দেখানো হয়। বেল্ট অ্যান্ড রোড পোর্টালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে:
(“渔业公司却先做了建筑公司的活”)
মরুভূমিতে আমরা জেলে হওয়ার আগে নির্মাতা হয়ে উঠেছিলাম।
হংডং ফিশারির প্রেসিডেন্ট চেন ঝংজিয়ে, নুয়াধিবুতে রাস্তা, শীতল সংরক্ষণ ইউনিট, একটি বিশাল ‘ফ্রেন্ডশিপ পোর্ট‘ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নির্মাণের কাজে তাদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন যে সেই সময় খাবার পানিও ১০ কিলোমিটার দূর থেকে ট্রাকযোগে আনতে হতো। তিনি গর্বের সঙ্গে এই কাজের কথা তুলে ধরলেও, অনেক স্থানীয়দের জন্য এই মহৎ প্রকল্পগুলো কারুশিল্পজাত জেলেদের দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করতে বা তাদের উপকূলীয় জলরাশিতে আবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সিজিটিএন-এর ভিডিও থেকে চীনের ‘ফ্রেন্ডশিপ পোর্ট’ কে প্রচার করার একটি স্ক্রিনশট। স্ক্রিনশটের উৎস ইউটিউব। ন্যায্য ব্যবহার।
আঞ্চলিক প্রভাব
বর্তমানে চীনকে বিশ্বের শীর্ষ অবৈধ মাছ শিকারকারী দেশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এই শিল্প দৈত্যের আন্তর্জাতিক মৎস্য শিকার আইন ও নীতিমালা অমান্য করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। স্থানীয়রা সমুদ্র এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য আরও সম্মান ও নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে আসছে। এই নিয়মগুলো সমুদ্র ও এর বাস্তুতন্ত্রকে দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত আহরণের মতো ক্রমবর্ধমান হুমকি থেকে রক্ষা করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও, চীনা মৎস্য শিল্প এগুলো উপেক্ষা করে চলেছে।
ব্যাংক দ'আর্গিনের উপকূলের কাছে, যাযাবর জেলেদের বংশধররা একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। তাদের জন্য আলোচনার টেবিলে কোনো স্থান নেই এবং মাছ ধরার মতো পর্যাপ্ত মাছও অবশিষ্ট নেই।
তবে এই সমস্যা শুধু মৌরিতানিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো পশ্চিম আফ্রিকাজুড়ে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ধারণা করা হয়, এই অঞ্চলে বিদেশি জাহাজের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই চীনা।
যাদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের কাছে খুব কম বিকল্প রয়েছে। কেউ কেউ কাজের খোঁজে শহরে চলে যান, কেউ চীনা মাছ ধরা জাহাজে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে জীবনযাত্রার পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্দশাপূর্ণ। আবার অনেকে ভালো চাকরির আশায় অন্য দেশে পাড়ি জমানোর পথ বেছে নেন। বাস্তবে, পশ্চিম আফ্রিকার মৎস্য শিল্পের পতনের ফলে মানুষের মধ্যে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা বেড়েছে, যার পরিণতি প্রায়শই প্রাণঘাতী হয়।
যদি শিল্পভিত্তিক মৎস্য শিকার পদ্ধতিতে দ্রুত পরিবর্তন আনা না হয়, তাহলে মৌরিতানিয়ার জেলেরা ক্রমাগত দুর্দশা ভোগ করতে থাকবে এবং আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারে।






