বায়ুদূষণ রোধে বাংলাদেশের সাভার উপজেলাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা

ঢাকা শহর। ঢাকায় ২ কোটির বেশি মানুষের বাস। আশেপাশের অঞ্চলের ইটভাটার ঢাকার বায়ুদূষণ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে। ছবি তুলেছেন এ সাবের ৯১। উইকিপিডিয়া থেকে সিসি বাই ২.০ লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত।

বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর সম্প্রতি সাভার উপজেলাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সার্বক্ষণিক বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্রগুলোর তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণে সাভারের পরিবেষ্টক বায়ুর বার্ষিক মানমাত্রা জাতীয় বার্ষিক নির্ধারিত মানমাত্রার প্রায় তিনগুণ অতিক্রম করায় এবং জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় সাভার উপজেলা মারাত্মক বায়ুদূষণযুক্ত এলাকায় পরিণত হয়েছে।

২০২৩ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, সাভারে ২০০-এর বেশি ইটভাটা রয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান নির্মাণ প্রকল্পের জন্য এই ইটভাটাগুলোয় ইট গুরুত্বপূর্ণ রসদ এবং তাই এদের চাহিদাও বেশী। এই ভাটাগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া সাভারের বায়ু দূষণকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তাছাড়া শুষ্ক মৌসুমে সাভারে সৃষ্ট বায়ুদূষণ বাতাসের মাধ্যমে ঢাকা শহরে প্রবেশ করে ঢাকার বায়দূষণের তীব্রতা অনেক বাড়িয়ে দেয়। যা ঢাকার জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের উপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। আর এই কারণেই বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২২-এর বিধি ৫-এর ক্ষমতাবলে সমগ্র সাভার উপজেলাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২২-এর বিধি ৫ অনুযায়ী, কোনো এলাকার বায়ুমান নির্দিষ্ট মানমাত্রা অতিক্রম করে দূষিত এলাকায় পরিণত হলে এলাকাটিকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করা যায়।

বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম। এই ঘোষণার মাধ্যমে সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে সাভার অঞ্চলের সকল ইট ভাটায় (টানেল ও হাইব্রিড হফম্যান কিলন ব্যতীত) ইট পোড়ানো ও উন্মুক্ত অবস্থায় কঠিন বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নতুন শিল্পকারখানার মাধ্যমে বায়ুদূষণের সম্ভাবনা থাকলে সেগুলোর জন্য অবস্থানগত ও পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করেছে।

বাংলাদেশের একটি ইটভাটার চুল্লী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের পেছনে ইটভাটা ২৮ শতাংশ দায়ী। ছবি তুলেছেন ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। উইকিপিডিয়া থেকে সিসি বাই-এসএ ৪.০ লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত

২০২৩ সালে সাভার উপজেলায় ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১৬৪ দিনের বায়ু ছিল মানমাত্রা-বহির্ভূত। আর ২০২৪ সালে ছিল ১৬০ দিন। বায়ুর এমন মান খারাপের পিছনে ইটভাটা, ব্যাটারি কারখানা, সীসা কারখানা, পরিবহণের ধোঁয়া ও নির্মাণ প্রকল্পগুলো রয়েছে। তবে সবচেয়ে দায়ী করা হয় ইটভাটাগুলোকে। রাজধানী ঢাকার নির্মাণ কাজের জন্য দরকারী ইটের বেশিরভাগই আসে এই সাভার থেকে। পরিবেশ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সাভারে ১০৭টি ইটভাটা রয়েছে যেখানে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় না।

বাংলাদেশে অনিয়ন্ত্রিত ইটভাটা কীভাবে বায়ুর মান খারাপ করছে, তা উঠে এসেছে উঠেছে স্ট্যানফোর্ডের এক গবেষণাতে:

বাংলাদেশে অনিয়ন্ত্রিত ইটভাটা দূষণ বায়ুর মানকে শ্বাসরুদ্ধ করে দিচ্ছে, কিন্তু #StanDOM-এর স্টিফেন লুবি ল্যাবের নতুন গবেষণা দেখা গেছে যে, উৎপাদন বন্ধ না করেও আমরা নির্গমন কমাতে পারি।

একটা সময় সাভার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকা ছিল। কিন্তু শিল্পায়ন কীভাবে সাভারের পরিবেশ ধ্বংস করে দিয়েছে, তা উঠে এসেছে প্রথম আলোতে পাঠক রতন পালের কমেন্টে:

সাভারের বায়ু-দূষণের মাত্রা কয়েক দশক আগেই গ্রহণযোগ্য মাত্রা ছাড়িয়েছে, শুরু হয়েছিল পাকিজা ডায়িং মিল চালু করে। এ মিলের কারণে একটি খালই সম্পূর্ণরূপে মারা গেছে, দোয়েল গ্রুপের কারণে মারা পড়েছে কর্ণফুলি খাল আর বংশী নদীও মৃত প্রায়। সুতরাং শিল্প-কারখানার দূষণ নাই-এমন সনদ দেওয়া মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়! সাভার থেকে আমীন বাজার পযর্ন্ত সড়কের দুই পাশে সড়ক ও জনপথের দুটি খাল ছিল ৮০ এর দশকেও (যা কল্যানপুর অবধি বিস্তৃত ছিল) এ খাল দু’টিতে কংক্রিটের বড় বড় ব্রিজও ছিল, নৌকা বাইছ হতো প্রতি বর্ষায়। শিল্প কারখানা করতে, অবৈধভাবে দখল করে খালগুলিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সরকারগুলি সবসময় এসব দখল প্রশ্রয় দিয়ে গেছে!

সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন খান নঈম। তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন:

পরিবেশ অধিদপ্তর যে উদ্যোগ নিয়েছে, আমরা এটিকে স্বাগত জানাই। মানুষের স্বাস্থ্যের যে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, আমরা দীর্ঘদিন ধরে সেটি নিয়ে কথা বলেছি। আমাদের নদী-নালা, খাল বিল পরিবেশ যেভাবে দূষিত হয়েছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আমরা এখানে বসবাস করতে পারবো না। এগুলো আমরা বারবার বলেছি। সরকার যে ব্যবস্থা নিয়েছে, শুধু কাগজপত্রে যাতে সেটি সীমাবদ্ধ না থাকে। অবস্থা থেকে বেরিয়ে বাসযোগ্য সাভার গড়তে যা যা প্রয়োজন, সরকার সেগুলো করতে পিছপা হবে না। সাভারের প্রাণ প্রকৃতি ফিরিয়ে আনবে সেটিই আমরা চাই।

বাংলাদেশের বায়ুদূষণের সর্বশেষ পরিস্থিতি

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দূষিত দেশ এবং শুধু বায়ুদূষণের কারণে দেশের মানুষের গড় আয়ু সাড়ে পাঁচ বছর কমছে! সম্প্রতি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স (একিউএলআই) এর বার্ষিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণই জীবনকাল হ্রাসের সবচেয়ে বড় বাহ্যিক হুমকি। দেশের ১৬ কোটি ৬৮ লাখ মানুষ এমন অঞ্চলে বসবাস করছে, যেখানে বার্ষিক গড় বস্তুকণা দূষণ ডব্লিউএইচও নির্দেশিকা এবং দেশের জাতীয় মান ৩৫ মাইক্রোগ্রাম পার কিউবিক মিটার ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে কম দূষিত জেলা লালমনিরহাটেও কণা দূষণ ডব্লিউএইচও নির্দেশিকার সাতগুণ বেশি।

১৯৯৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে কণা দূষণের মাত্রা ৬৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে, যার ফলে মানুষের জীবনকাল আরও ২ দশমিক ৪ বছর হ্রাস পেয়েছে।

বায়ুদূষণের কারণে ২০২১ সালে ১৯,০০০ এর বেশি শিশু মারা গেছে, যাদের বয়স ৫ বছরের কম। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বায়ুর মান উন্নত করতে টেকসই পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছে ইউনিসেফ বাংলাদেশ:

২০২১ সালে বায়ু দূষণের কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১৯,০০০+ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যেসব কারণে এতো অল্প বয়সে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে, সেগুলো ঠেকানো সম্ভব।

কেবল আমাদের আজকের শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বায়ুর মান উন্নত করার জন্য টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে বায়ুমান নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেয়ার পলিউশন স্ট্যাডিজ (ক্যাপস)-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদারও বায়ুদূষণ কমাতে পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশন, রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সবার সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেছেন

সাভারের এই ঘোষণা এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। তবে পুরো বাংলাদেশের বায়ুদূষণ কমাতে শুধু একটি এলাকার ওপর মনোযোগ দিলে হবে না, বরং সবার সমন্বিত উদ্যোগই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পৃথিবী নিশ্চিত করতে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .