
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা যেন জ্বরে আক্রান্ত। ঘরে ঘরে ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত রোগী। অনেক হাসপাতালে রোগীর চাপ এতটাই বেশি যে খালি সিট পাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়েছে। ছবি জেনিফার মাকাউ এর ইউটিউব ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট নেয়া। ফেয়ার ইউজ।
ঢাকায় যেন ভাইরাল জ্বরের ঢেউ লেগেছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে কেউ না কেউ আক্রান্ত। অনেক হাসপাতালে রোগীর চাপ এতটাই বেশি যে খালি সিট পাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়েছে। দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফেসবুকে ঢুকলেই দেখা যাচ্ছে, এই ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত মানুষের অসহনীয় কষ্ট নিয়ে অজস্র স্ট্যাটাস। তীব্র জ্বর, কাশি আর শরীর ব্যথার বর্ণনা দিয়ে সয়লাব ফেসবুক ফিড।
নিয়ামত উল্লাহ শামীম তার অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন:
একটানা ৪দিন ১০৩°থেকে ১০৪° জ্বর ছিলো, সাথে তীব্র মাথা ব্যাথা শরীর ব্যথা। ১০৪° জ্বরে হাত-পা বরফ শীতল, মাথা মনে হচ্ছে গরমে ফেটে যাবে। ঔষধ খাচ্ছি, কিন্তু শরীর ব্যাথা কমছে না। হাটতে পারছি না। মাটিতে পাই রাখা যাচ্ছেনা ব্যাথায়। বিছানা ছেরেই উঠতে পারছি না। খাবার দাবার খেতে পারছি না শরীরে তো কোন এনার্জি নেই, কি যে জ্বর কি বলব প্রচন্ড জ্বর প্রচন্ড মাথা ব্যথা সাথে প্রচণ্ড পায়ে ব্যথা উঠে দাঁড়াবো সেই শক্তি ও নাই।
নাফিসা রুবাইয়েত নাবিলার অভিজ্ঞতা আরো ভয়াবহ:
এইবারের ভাইরাল ফিভার (জ্বর) যাকে ধরসে তার জীবন থেকা ৪/৫ বছর আয়ু এমনেই কমে গেসে। এইটা কি টাইপের জ্বররে ভাই, ৩-৪ দিন হলো প্যারাসিটামল, কোনো কিছুতেই জ্বর কমে না। অলটাইম জ্বর ১০৩/১০৪!! এত্তো দুর্বল বানাই ফেলসে যে স্যালাইন পুশ করার পরও কোনো ইম্প্রভমেন্ট নাই। হাটা চলা করা তো দূরের কথা, বসে থাকা টাও এক প্রকার চ্যালেঞ্জ। একটানা বেশিক্ষন চোখ খুলে রাখলেই সব কিছু অন্ধকার হতে শুরু করে। তিতার যন্ত্রনায় পানিটাও ঠিক মতো খেতে পারছিনা। পুরো শরীরের সাথে অসহ্য মাথা ব্যথা তো আছেই সাথে পুরো চেহারা লাল বানায় ফেলসে।
বাসার একজন আক্রান্ত হলে দেখা যাচ্ছে অন্য সদস্যরাও দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছেন। ওয়াহিদুল ইসলাম ওয়াহিদ তার পরিবারের জ্বরের কথা জানিয়ে লিখেছেন:
গতকাল রাত থেকেই ছোট্ট মেয়েটার জ্বর ১০৫ ডিগ্রি আবার বিকাল থেকে মেয়ের মার জ্বর। দুই দিন আগে আমার ছিল এখনো ভালোভাবে সুস্থ হয়নি ভাইরাল জ্বর অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছে। আল্লাহ্ আমার পরিবারসহ সবাইকে সুস্থতা দান করুক।
অনেকে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন, তবে অসংখ্য রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে।
চ্যানেল ২৪-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, রাজধানীর বেশ কিছু হাসপাতালে ভাইরাল ফিভারের রোগীর সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে, নতুন রোগীদের ভর্তি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ভাইরাল জ্বর নিয়ে কী বলছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা
বাংলাদেশে এখন বর্ষাকাল। এই সময় হঠাৎ গরম, হঠাৎ বৃষ্টি- এই অনিয়মিত আবহাওয়া ভাইরাল সংক্রমণের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। তবে আগের বছরের তুলনায় এবার আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি।
খবরের কাগজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জনস্বাস্থ্যবিদ লেলিন চৌধুরী সারাদেশে ব্যাপক জ্বরের পিছনে ৬টি কারণ চিহ্নিত করেছেন।
সারা দেশেই এখন ব্যাপকভাবে জ্বর হচ্ছে। এই জ্বরের পেছনে প্রধানত ছয়টি কারণ রয়েছে। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, করোনা, সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, শ্বাসতন্ত্রীয় সংক্রমণ এবং পানিবাহিত সংক্রমণ যেমন টাইফয়েড-প্যারাটাইফয়েড। বেশির ভাগ মানুষ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় ভুগছেন। যেসব এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টি বা বন্যার কারণে খাওয়ার পানির লাইনের সঙ্গে ময়লা পানির সংযোগ হয়ে গেছে, সেসব জায়গায় পানিবাহিত রোগ বাড়ছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভয়ংকর হয়ে উঠছে
তবে দেশের প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এ বি এম আব্দুল্লাহ এই প্রকোপের মূল কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করেছেন।
ডেঙ্গু ও করোনার সর্বশেষ চিত্র
ভাইরাল জ্বরের পাশাপাশি এখন ডেঙ্গু ও করোনার প্রকোপও বাড়ছে। করোনার সংক্রমণ হার কম হলেও, ডেঙ্গু আক্রান্তের হার ক্রমশ বেড়েই চলছে, এমনকি ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৬,২৮১ জন। আর এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৬০ জন।
এদিকে মাঠপর্যায়ের গবেষণা থেকে, দেশের প্রতিটি জেলায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব নির্দেশক ব্রেটো ইনডেক্স ২০ এর ওপরে পাওয়া গেছে। এর মানে ডেঙ্গু বিস্তারের ঝুঁকি অনেক বেশি। এই কারণে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার আশংকা করেছেন।
তাছাড়া, গত বছর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এরপর থেকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সেভাবে কার্যকর নেই, যার ফলে মশা নিধন কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে বাংলাদেশ যেহেতু প্রতিবছর ডেঙ্গু সংক্রমণের মুখোমুখি হয় এবং দেশের চিকিৎসকরাও বিষয়টি সম্পর্কে পরিচিত, তাই অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন পরিস্থিতি খারাপ হলেও সামলানো যাবে।






