শ্রীলঙ্কায় গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে লড়াই

Photo by Cottonbrostudio via Pexels. Used under a Pexels License.

ছবি: পেক্সেলসের মাধ্যমে কটনব্রোস্টুডিও, পেক্সেলস লাইসেন্সের অধীনে ব্যবহৃত।

মূলত শ্রীলঙ্কার একটি পুরষ্কারপ্রাপ্ত নাগরিক সাংবাদিকতা ওয়েবসাইট গ্রাউন্ডভিউজে প্রকাশিত মিয়া আবেয়াবর্ধনের এই নিবন্ধটির একটি সম্পাদিত সংস্করণ গ্লোবাল ভয়েসেসের সাথে একটি বিষয়বস্তু ভাগাভাগি চুক্তির অংশ হিসেবে নীচে প্রকাশিত হয়েছে।

ঔপনিবেশিক আমলে ১৮৮৩ সাল থেকে আইনিভাবে গর্ভপাতকে অপরাধ বিবেচনা করে শ্রীলঙ্কা দীর্ঘদিন নিজ দেহ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে নারীদের বঞ্চিত করে আসছে। অকার্যকর ভ্রূণ অস্বাভাবিকতার ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা বাতিলের অনুমতি দিয়ে এসব আইন সংশোধনের সাম্প্রতিক প্রস্তাবকে শ্রীলঙ্কা নিরাপদ গর্ভপাত জোট (এসএলএসএসি)সহ অনেকেই স্বাগত জানালেও এই সীমিত সংস্কার যথেষ্ট নয়, এবং এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের বাদ দেওয়া, মৌলিক মানবাধিকার বিষয়ের চিকিৎসা, নারীর প্রজনন পছন্দের উপর কালিমা লেপন ও পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের মতো আরো গভীর পদ্ধতিগত সমস্যাকে উন্মোচিত করে।

এসএলএসএসি সতর্কতার সাথে এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে এটিকে আরো ন্যায়সঙ্গত ও সহানুভূতিশীল আইনি কাঠামোর দিকে একটি সম্ভাব্য প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও তার অবস্থানে স্পষ্ট: প্রস্তাবিত সংশোধনীটি খুব সংকীর্ণ। শুধু মারাত্মক ভ্রূণ অস্বাভাবিকতার কারণে গর্ভপাতের সুযোগ সীমিত করা ধর্ষণ, অজাচার, গর্ভনিরোধের সুযোগের অভাব, অর্থনৈতিক কষ্ট বা শুধু গর্ভাবস্থা চালিয়ে যেতে না চাওয়ার মতো নারীদের গর্ভপাত চাওয়ার বৃহত্তর বাস্তবতাকে মোকাবেলা করে না।

কমিউনিটি চিকিৎসকদের, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের এবং শিশু চিকিৎসকদের এই তিনটি মেডিকেল কলেজ প্রস্তাবিত সংস্কারটি পরিচালনা করলেও এই সংশোধনীর খসড়া তৈরিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পৃক্ততা ও আধিপত্য সমস্যাযুক্ত। এটি প্রজনন স্বাস্থ্যের জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবাধিকারের মাত্রা উপেক্ষা করে গর্ভপাতকে সর্বদা শুধু রোগবিদ্যার আলোকে দেখার একটি প্রবণতা প্রতিফলিত করে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক এই চিকিৎসা সংস্থাগুলি নারী অধিকার সংস্থা, নাগরিক সমাজের সমর্থক এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের সাথে পরামর্শ না করেই এগিয়ে চলেছে। এই বর্জন শুধুই বাদ পড়া নয়; এটি জীবন ও দেহকে প্রভাবিত করা সিদ্ধান্ত থেকে নারীদের দূরে রাখার দীর্ঘস্থায়ী নকশার ধারাবাহিকতা। সুপারিশগুলি তৈরিতে জড়িত প্রায় সকলেই পুরুষ হওয়ায় তা নারীদের মতামত ছাড়াই নারীর দেহ আইন প্রণয়নের পুরুষতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করে বলে এটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

গর্ভপাত চিকিৎসা সমস্যা ছাড়াও মানবাধিকারের একটি বিষয়। বিশেষ করে ধর্ষণ, অজাচার বা প্রাণঘাতী ভ্রূণের অবস্থার ক্ষেত্রে কারো গর্ভাবস্থা বন্ধের ক্ষমতা অস্বীকার করা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের সমান হতে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটিসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি ধারাবাহিকভাবে নিশ্চিত করেছে ব্যক্তিদের এধরনের গর্ভধারণে বাধ্য করা তাদের স্বাস্থ্য, সমতা ও শারীরিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকার লঙ্ঘন করে। ঐতিহাসিক কেএল বনাম পেরু ২০০১ মামলার দৃষ্টান্তমূলক একটি, রায় হলো দেয়  ভ্রূণের মস্তিষ্কত্রুটি রোগ সত্ত্বেও ১৭ বছর বয়সী একটি মেয়েকে গর্ভপাত করতে অস্বীকার করা তার অধিকারের লঙ্ঘন।

আইনজীবী উদা দেশপ্রিয় উল্লেখ করেছেন গর্ভপাতকে অপরাধী ঘোষণা করার অর্থ নারীরা গর্ভপাত-পরবর্তী চিকিৎসা চেষ্টাকালেও বিচারের মুখে পড়ার ভয় পাবে। এর ফলে চিকিৎসা বিলম্ব ও কিছু ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য মাতৃমৃত্যুও ঘটে। গর্ভপাতকে কালিমালেপন ও আইনি বাধা ব্যক্তিদের ক্ষতি ছাড়াও জনস্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অবৈধতা সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কায় গর্ভপাত অস্বাভাবিক নয়। ২০১০ সালে প্ররোচিত গর্ভপাত করানো ৬৬৫ জন নারীর উপর করা একটি সমীক্ষা অনুসারে গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ৭১ শতাংশ নিজে ও ৬৯ শতাংশ বন্ধু বা আত্মীয়দের মাধ্যমে পরিষেবা প্রদানকারী সম্পর্কে জানতেন। এই পরিসংখ্যান নারীদের গর্ভপাত পরিষেবা পেতে প্রায়শই তাদের বড় ধরনের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা ঝুঁকিসম্পন্ন অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরতা তুলে ধরে।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা গর্ভপাতে মিসোপ্রোস্টলের মতো ওষুধের সহজলভ্যতা সেপটিক গর্ভপাতে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা ২০১১ সালের ১৩.৪ শতাংশ থেকে ২০২১ সালে ৪.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে গোপন গর্ভপাতকে উৎসাহিত করা চলমান অপরাধীকরণের মুখে এই অর্জনগুলি এখনো নাজুক।

রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচিত নতুন শ্রীলঙ্কা সরকার তার প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হটছে বলে মনে হচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে জাতীয় গণশক্তি (এনপিপি) ইশতেহারে গর্ভপাতের জন্যে ধর্ষণ ও গুরুতর ভ্রূণ বৈকল্য অন্তর্ভুক্ত করার জন্যে আইনি ভিত্তি সম্প্রসারণ করা ২০১২ সালের আইন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সংস্কারগুলি খুবই অপর্যাপ্ত, লোক-দেখানো এবং নারীদের প্রকৃত চাহিদা পূরণে ব্যর্থ।

এই সংশোধনীর গণমাধ্যম কভারেজ মূলত রক্ষণশীল ধর্মীয় কণ্ঠস্বরকে সন্তুষ্ট করার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সংশোধন প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই এড়িয়ে গেছে। জাতীয় আলোচনায় সক্রিয় কর্মী ও নারী অধিকার গোষ্ঠীগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে অনুপস্থিত, এমনকি নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কেও চাপিয়ে রাখা হয়েছে। দেশপ্রিয় বলেছেনী একজন নারী প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে গণমাধ্যমের নীরবতা ও সরকারের কর্মক্ষম প্রগতিশীলতা জনসাধারণের জবাবদিহিতাকে হ্রাস করেছে।

এসএলএসএসি ও সহযোগী কর্মীরা স্পষ্ট যে নারীর আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্যতা নিশ্চিতসহ মানবাধিকার সমুন্নত রাখার একমাত্র পথ হলো গর্ভপাতের সম্পূর্ণ অপরামুক্তকরণ। অপরাধমুক্তির অর্থ হলো গর্ভপাতকে দণ্ডবিধি থেকে সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়ে এটিকে স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা। আর এই বিষয়টির ফলে সর্বাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করে বাড়িতেও নিরাপদে পরিচালনা করা যেতে পারে।

এই পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অবকাঠামো, নতুন নীতি বা অতিরিক্ত নিয়মকানুন সম্পর্কে অপেক্ষা করার দরকার নেই। গর্ভপাত-পরবর্তী যত্ন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি উপাদান হিসেবে মিসোপ্রোস্টল ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকার অন্তর্ভুক্ত। পরিষেবা লাভের বাধা চিকিৎসা সীমাবদ্ধতা নয় বরং নৈতিক নীতিমালা, কলঙ্ক ও পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ।

শ্রীলঙ্কার শুধু বিবাহিত সিসজেন্ডার (জন্মগত লিঙ্গধারী) নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ বর্তমান পরিবার পরিকল্পনা কাঠামোর গর্ভনিরোধ কর্মসূচি বিশেষ করে অবিবাহিত ও জন্মগত লিঙ্গধারী নয় এমন অনেক নারীকে বাদ দেয়। এই বর্জন অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ায় এবং গর্ভপাতের সুযোগসহ ব্যাপক প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তাকে আরো জোরদার করে।

ছোট, প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত প্রস্তাবিত সংশোধনীটি যথেষ্ট নয়। শ্রীলঙ্কার নারীরা সীমিত ব্যতিক্রম ও পুরুষ-প্রধান সিদ্ধান্তের চেয়েও বেশি কিছু প্রাপ্য। তারা আত্মনিয়ন্ত্রণ, মর্যাদা ও পছন্দের অধিকারের অধিকারী। এসএলএসএসি স্পষ্ট করে বলেছে, প্রজনন অধিকার হলো মানবাধিকার, এবং গর্ভপাতকে সম্পূর্ণ অপরাধমুক্ত করার মাধ্যমে তাদের জীবন পরিচালনাকারী আইন গঠনে নারীদের অর্থপূর্ণ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমেই প্রজনন ন্যায়বিচার অর্জিত হবে।

নারীর দেহের উপর নজরদারি বন্ধ করে আলোচনাটি তাদের ক্ষমতায়নের দিকে নিতে হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত সংস্কারগুলি অন্তঃসারশূন্য ও ন্যায়বিচার অর্জিত হবে না। ডাক্তার, রাজনীতিবিদ বা ধর্মীয় নেতা ছাড়াও নারীদের কণ্ঠস্বর নিয়ে অবশেষে শ্রীলঙ্কা সময় ও উদ্দেশ্যের বাইরে চলে যাওয়া একটি আইনের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শুরু করতে পারে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .