লাতিন আমেরিকায় ইন্টারনেট বন্ধের বাস্তবতার আড়ালে রয়েছে একটি গোপন হুমকি

সরকার বিরোধী বিক্ষোভেআমরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেখা একটি পেইন্টিংয়ের সামনে ফোন ব্যবহারকারী একজন বিক্রেতা, বোগোটা, কলম্বিয়া, ২০২১ গেটি ইমেজের মাধ্যমে পাওয়া লং ভিজ্যুয়াল প্রেস / ইউনিভার্সাল ইমেজ গ্রুপের জন্যে মার্টিন গ্যালিন্ডোর ছবি

লরা ভিদালের লেখা মূলত ১২ ডিসেম্বর, ২০২৩ আইএফইএক্সে প্রকাশিত এই নিবন্ধটির একটি সম্পাদিত সংস্করণ একটি বিষয়বস্তু-ভাগাভাগি চুক্তির অংশ হিসেবে গ্লোবাল ভয়েসেসে পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে৷

লাতিন আমেরিকার (ইন্টারনেট) বন্ধগুলি এতোটা সরল নয়। ইন্টারনে্টে প্রবেশে হস্তক্ষেপের কৌশলগুলি প্রায়শই সূক্ষ্ম ও সনাক্ত করা কঠিন, এবং সেন্সরের একটি বিশেষ ছলনাময় রূপ রয়েছে। এধরনের লঙ্ঘন অনুসরণ ও মোকাবেলায় নিবেদিত গবেষক ও কর্মীদের জন্যে এটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর ইন্টারনেট বন্ধের ব্যবহার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যে একটি গুরুতর হুমকি হিসেবে বৈশ্বিকভাবে আবির্ভূত হয়েছে। লাতিন আমেরিকায় সাধারণত বিরল হিসেবে হলেও ঘনিষ্ঠভাবে দেখলে তা একটি ভিন্ন বাস্তবতা প্রকাশ করে। ইন্টারনেটে প্রবেশে ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপের পদ্ধতিতে বিভিন্ন সূক্ষ্মতা ও প্রেক্ষাপট লক্ষ্য করছে, যা বোঝা তাদের সনাক্ত ও প্রতিরোধের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ।

একটি বন্ধের মূল যোগাযোগ পরিষেবাগুলির ইচ্ছাকৃত ব্যাঘাত, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে ও বিশেষ পরিস্থিতিতে সেগুলিকে অপ্রবেশ্য বা অব্যবহারযোগ্য করে তোলার মধ্যে নিহিত।

কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলির বন্ধগুলি প্রায়শই জনবিক্ষোভ, সামাজিক অস্থিরতা বা নির্বাচনের সময়ের মতো সামাজিকভাবে সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে (বা তার আগে) আসে। এধরনের বন্ধ আরোপের জন্যে স্বীকৃত ন্যায্যতা বিভিন্ন। কখনো কখনো তারা প্রশাসনিক বা বিচারিক আদেশে আবৃত হয় অথবা অন্য সময় কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়াই। তবে একটি বিষয় ধারাবাহিক: কোনো সঙ্কটের জন্যে কোনো ইন্টারনেট বন্ধ কখনোই ন্যায়সঙ্গত, আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া নয়

আরো পড়ুন: লাতিন আমেরিকার পাঁচটি গণমাধ্যম নীরব থাকতে অস্বীকার করেছে

লাতিন আমেরিকার সরকারগুলি প্রায়শই প্রবেশে হস্তক্ষেপ করতে একটি বিস্তৃত কৌশল প্রয়োগ করে। এগুলি পরিষেবার মানের অবনতি থেকে সরাসরি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট অবরোধ পর্যন্ত হতে পারে। এই কৌশলগুলি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যে প্রবেশাধিকার ও নাগরিক স্থানের সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে দমন করলেও তা বন্ধগুলির মতো সমালোচনার একই মাত্রার উদ্রেক করে না।

ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি দেশে এটি কীভাবে কাজ করে তা দেখুন।

কলম্বিয়াতে ২০২১ সালের সামাজিক বিক্ষোভের সময় ইন্টারনেটে বাধা ও সামাজিক গণমাধ্যম বার্তা অ্যাপের মতো পরিষেবাগুলিতে বিঘ্ন ঘটেছে। কলম্বীয় বেসরকারি সংস্থা ফুন্দাসিওন কারিজমার পিস্তোলাস কন্ত্রা সেলুলারেস (“বন্দুক বনাম সেলফোন”) শিরোনামের একটি প্রতিবেদন এরকম অনেক নথিভুক্ত করেছে৷ এই অঞ্চলের একটি বিশিষ্ট ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী (আইএসপি) মোভিস্টার তার চুরির জন্যে ইন্টারনেট ব্যাঘাতকে দায়ী করেছে, যা প্রধানত আগুয়াব্লাঙ্কা এলাকাকে প্রভাবিত করা ২৫ শতাংশ ইন্টারনেট বিভ্রাটের কারণ বলে জানা গেছে৷ তারা আরো বলেছে চলমান বিক্ষোভের কারণে মেরামত বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তবে সামজিক গণমাধ্যমের অভিযোগ ভিন্ন চিত্র এঁকেছে। প্রাথমিক সমস্যাটি আগুয়াব্লাঙ্কা নয়, বরং সিলো কেন্দ্রিক এবং বিশেষভাবে মোবাইল ফোন সংযোগ সম্পর্কিত। এই অভিযোগ ও বর্ণনার প্রকৃতি অবকাঠামোর ক্ষতির পরিবর্তে সম্ভবত একটি সংকেত  রোধক ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃত হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে।

ফুন্দাসিওন কারিজমার সদস্য ক্যারোলিনা বোতেরোর মতে বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে সেন্সর অনুভূত হয়েছে। ক্যালির জনগণও ৪ মে একই অনুভূতি ভাগাভাগি করেছে, যেখানে সামাজিক অস্থিরতা ও বিক্ষোভের উপর দমনাভিযানে কয়েক ডজন লোক হতাহতের সময় উল্লেখযোগ্য ইন্টারনেট ব্যাঘাত ঘটেছে।

কলম্বিয়ার বিশেষ পরিস্থিতি কিউবার বিপরীত, যেখানে ইন্টারনেট সংযোগের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ অবরোধ ও হস্তক্ষেপকে আরো স্পষ্ট (ও সহজ)। উদাহরণস্বরূপ, দ্বীপটিতে ২০২১ সালে চিহ্নিত প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়ায় বিক্ষোভকারী ও সাধারণ জনগণ ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের মুখোমুখি হয়। বন্ধের সময় একটি আক্রমণাত্মক দমনাভিযানে মাধ্যমে সরকার ১২০ জন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মীসহ ৫,০০০ জনেরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করে। আন্দোলনকারী ও সক্রিয় কর্মীদের মধ্যে অনেকেই কারাগারে রয়েছে

লক্ষ্যবস্তু ভিন্নমতাবলম্বী কণ্ঠস্বরর ও ব্যক্তিদের যোগাযোগের লাইনও কাটা পড়েছে। কৌশলটি নতুন নয়; সরকার ২০০০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকে ব্যক্তিগত যোগাযোগ লাইন কেটে দিলেও ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারীরা প্রযুক্তিগত অসুবিধার কথা বলেছে।

প্যারাগুয়েতে পরিস্থিতি আরো একটি গতিশীলতা উপস্থাপন করে। মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কর্মরত জাতীয় বেসরকারি সংস্থার একটি নেটওয়ার্ক প্যারাগুয়ের মানবাধিকার সমন্বয়কারী (কোডহুপি) ব্যাপক অত্যন্ত সামরিকায়িত উত্তরাঞ্চলে সম্ভাব্য ইন্টারনেট বন্ধ নথিভুক্ত করেছে।প্রায়ই সরকারি হস্তক্ষেপের আগেই এখানে ইন্টারনেট সিগন্যালের ব্যাঘাত ঘটলেও আগে থেকেই খুব কম সংযোগে ভোগা এই গ্রামীণ অঞ্চলগুলি এই বন্ধগুলির প্রকৃত পরিমাণকে আড়াল করতে পারে।

কোডহুপি’র মানবাধিকার প্রতিবেদনে বিশেষ করে নিরাপত্তা অভিযানের সময় টাস্ক ফোর্সের ইন্টারনেট বন্ধের ব্যবহারসহ বিভিন্ন লঙ্ঘন তুলে ধরা হয়েছে। এই ব্যাঘাতগুলি ইতোমধ্যে বাহ্যিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর সমস্যাগুলিকে বাড়িয়ে সমগ্র অঞ্চলগুলিকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে অদৃশ্য করে তোলে৷

বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে ভেনিজুয়েলায় সংযোগের ক্ষমতা বছরের পর বছর কমে গেছে। এস্পাসিও পুব্লিকো এবং ভেনিজুয়েলা ইন্তেলিজেন্তের মতো স্থানীয় সংস্থা ইন্টারনেটে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা নথিবদ্ধ করেছে। এই জাতীয় বিচ্ছিন্নতাগুলি ইচ্ছাকৃত কিনা তা নির্ধারণ করা সবসময় সম্ভব না হলেও তারা অবশ্যই তথ্যহীনতায় অবদান রাখে যা ওয়েবসাইট অবরোধসহ ইন্টারনেট সেন্সরের অন্যান্য উপায়ের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলা সরকার শক্তিশালী করে থাকে।

একই অবস্থা প্যারাগুয়ের। প্রায়শই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেখানো প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বন্ধের প্যাটার্ন নির্ধারণ করাকে জটিল করে তুললেও তা  ভেনিজুয়েলা সরকারের তথ্যে প্রবেশাধিকার সীমিত করার পদ্ধতিগত প্রচেষ্টাকে স্পষ্ট করে। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট অবরোধ, হয়রানি,থেকে শুরু করে নজরদারি পর্যন্ত এটা স্পষ্ট যে এই সেন্সর প্রচেষ্টা শুধু ইচ্ছাকৃত নয়, কাঠামোগত ও কৌশলগত।

বহুমুখী প্রতিক্রিয়া

বিশেষজ্ঞদের মতে এই জটিল প্রেক্ষাপটে প্রতিক্রিয়াও বহুমুখী হওয়া দরকার।

বিশেষ করে ক্যালি বিক্ষোভের সময় কলম্বিয়ার পরিস্থিতি একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। ইন্টারনেটের বিঘ্ন সম্পর্কে বিভ্রান্তি ও স্পষ্ট তথ্যের অভাবের মধ্যে ফুন্দাসিওন পারা লা লিবের্তেদো দে প্রেন্সা (ফ্লিপ) [সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফাউন্ডেশন], কারিজমা এবং ইসুরের মতো কলম্বীয় সংস্থা কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্যে পরিকল্পিত একটি টিউটেলা ফাইলের মাধ্যমে একটি আইনি ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে। সরকারকে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা করতে বাধ্য করা এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য।

আইনি পদক্ষেপের পিছনে যুক্তি হলো ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। সরকারের ইচ্ছাকৃতভাবে ইন্টারনেট বন্ধের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ না থাকলেও যুক্তি হলো এই অঞ্চলে বর্ধিতভাবে উপস্থিত ও জনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে জড়িত থেকে সেনাবাহিনী ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণের কার্যকলাপের তথ্য সরবরাহের বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে।

আদালতের সিদ্ধান্তগুলি তাদের বিরুদ্ধে যাওয়া সত্ত্বেও দুবার, মামলাটি অবশেষে কলম্বিয়ার সাংবিধানিক আদালতে যায়। এক বছর পরে আংশিকভাবে সংগঠনগুলির যুক্তি সমর্থন করে আদালত একটি সিদ্ধান্ত জারি করে। তাদের কেউই ক্যালিতে না থাকায় তথ্য পাওয়ার অক্ষমতার কারণে তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের রায় হয়, যা নাগরিক সমাজের সংগঠন হিসেবে তাদের কাজকে প্রভাবিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ বাস্তব সময়ে ফ্লিপ সাংবাদিকদের আক্রমণের রিপোর্ট পায়নি, এবং কারিজমা কার্যকরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি।

ইন্টারনেট বাধা তথ্য পাওয়া ও চাওয়ার অধিকারসহ মত প্রকাশের স্বাধীনতার সম্মিলিত মাত্রাকে প্রভাবিত করেছে বলে স্বীকার করেছে সাংবিধানিক আদালত।

ইন্টারনেট বন্ধের বিরুদ্ধে লড়াই সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের একটি সহযোগিতামূলক পদ্ধতির দাবি করে। সতর্কতা সংকেত থালেও সরকার কখন-কোথায় ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিতে পারে তা নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করা খুব কঠিন। এই অনিশ্চয়তা অ্যাডভোকেসি প্রচেষ্টাকে জটিল করে তোলে। তাদের প্রভাব প্রশমিত করা গভীরভাবে এই অঞ্চল ও এর বাইরেও ঘটনাটির তীব্র পর্যবেক্ষণ ও বোঝা-পড়ার উপর নির্ভর করে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .