বাংলাদেশে দৈনিক ১৭০ টাকার মজুরিতে চা-শ্রমিকদের জীবন চলে কীভাবে?

প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল-বিকাল চা পানের নামে শ্রমিকদের রক্ত পান করছি কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তরুণ শিল্পী

চা বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়। এককাপ চা না হলে যেন বাঙালিদের একটা দিনও চলে না। প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল-বিকাল চা পানের নামে শ্রমিকদের রক্ত পান করছি কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তরুণ শিল্পী তুফান চাকমা। ছবিটি অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের ন্যূনতম দৈনিক মজুরি বেড়ে এখন ১৭০ টাকা হয়েছে। এত দিন ১২০ টাকা দৈনিক মজুরিতে কাজ করে আসছিলেন তারা। তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলনের ফলাফল এই মজুরি বৃদ্ধি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত একটি শিল্পে তাদের বেতন দেশের অন্যতম সর্বনিম্ন এবং তারা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রান্তিক ও শোষিত সম্প্রদায়গুলির মধ্যে একটি। যদিও দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকার দাবিতে তারা আন্দোলন, ধর্মঘটে নেমেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চা-বাগানমালিকদের সাথে বৈঠক করে ২৫% বৃদ্ধি করে নতুন মজুরি নির্ধারণ করেন গত ২৭শে আগস্ট শনিবার।

আবাসন, রেশনসহ অন্যান্য যেসব সুযোগসুবিধা দেয়া হয়, তার সঙ্গে এই দৈনিক মজুরি মিলিয়ে চা-শ্রমিকদের প্রতিদিনের আয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা হবে বলে দাবী করে থাকেন চা বাগানের মালিকেরা। দেশের বিভিন্ন সংগঠন ও সুধীসমাজ চা শ্রমিকদের এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রদান করেছেন।

চা-শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে আন্দোলন করলেও ১৭০ টাকা করায় তারা আপাতঃদৃষ্টিতে খুশি হয়েছেন। তাদের আনন্দ-উল্লাস করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে দেখা গেছে। তবে, অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এই দুর্মূল্যের বাজারে এত কম আয়ে চা-শ্রমিকদের দিন কীভাবে চলবে?

বিবিসি বাংলাকে সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন চা বাগানের শ্রমিক সীমা মাহালী। তিনি বলেন:

না হয় বাগানের জমিতে থাকি, কিন্তু ঘরের মেরামতের খরচ আমাদের। কাপড় কিনতে হয়, বাচ্চাদের পড়ালেখা করাতে হয়, চাল, ডাল সবজি কিনতে হয়। এই ১২০ টাকায় কি এতো কিছু হয়?

শহরের অভিজাত চায়ের দোকানে এককাপ চা ১২০ টাকা হলেও চা-শ্রমিকরা এত কম আয় করেন যে, বাজার থেকে মুরগি কিংবা সবজি কেনার সামর্থ্য রাখেন না। এজন্য তারা চা পাতার একটা ভর্তা খান। বলতে গেলে, প্রতিবেলার খাবারে এই ভর্তা থাকে। সেটা উল্লেখ করে লেখক কাসাফাদ্দৌজা নোমান লিখেছেন:

এই অঞ্চলে চায়ের চেয়ে রোমাঞ্চকর জিনিস আর কী আছে? আমাদের প্রেম, আড্ডা, গল্প, গান, বিপ্লব, বিদ্রোহ কোনো কিছুই চা ছাড়া হয় না। বিজ্ঞাপন মারফত আমরা জানতে পারি কাপ শেষ হলেও রেশ রয়ে যায়, এক কাপ চায়ে তাজা হয়ে যাওয়া যায় নিমেষেই, এমনকি চায়ে চুমুক দিয়ে আমরা বদলে দিতে পারি পরিস্থিতি, প্রতিবাদ করতে পারি যেকোনো অন্যায়ের, পেয়ে যেতে পারি যুগান্তকারী আইডিয়া। কিন্তু বিজ্ঞাপনে চা শ্রমিকরা সারাজীবন ব্যাকগ্রাউন্ড প্রপস। দুটি পাতা একটি কুড়ি তোলার সুন্দর দৃশ্যটি আমাদের কাছে আরও সুন্দর হয়ে ওঠে দারুণ সিনেমাটোগ্রাফিতে। আর আজকাল তো নগরীর অভিজাত চায়ের দোকানে এক কাপ চা বিক্রি হয় ১২০টাকায়। সে চায়েরও হয় ফুড রিভিউ। অথচ শ্রমিকদের ১২০টাকার অসুন্দর জীবনের দৃশ্য সিনেমাটোগ্রাফিতেও আসে না, খবরেও খুব একটা পাওয়া যায় না। কারণ তারা চা পাতা ভর্তা খেয়েই কাটিয়ে দিচ্ছে বেহেশতি এই জীবন!

অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে দেশে এই মুহূর্তে অনেকগুলো মেগা প্রজেক্টের কাজ চলছে। সেদিকে ইঙ্গিত করে তাসমিয়া আফরিন মৌ লিখেছেন:

এত উন্নয়নকালে এই পোস্টার দেখতে হয় কেনো? ১৭০ টাকা রোজে মাসে ৩০ দিন কাজ করলেও চা শ্রমিক মাসে আয় করবেন ৫১০০ টাকা। কোনো আমিষ না, কোনো নিরামিষ না, কেবল ভাত আর রুটি হয় এই টাকায়?

মালিনি ছড়া চা বাগান, সিলেট। ছবি তুলেছেন শাহনূর হাবিব মুনমুন। সিসি বাই ৩.০ লাইসেন্সের আওতায় উইকিপিডিয়া থেকে ছবিটি নেয়া।

বাংলাদেশের চা শিল্প

বাংলাদেশে চা চাষ শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৮৪০ সালে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে প্রথম চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে, বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয় সিলেটে। ১৮৫৭ সালে। বর্তমানে দেশে চা বাগান রয়েছে ১৬৭টির ও বেশী। এর বড় অংশটি সিলেট, হবিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজার এলাকায় অবস্থিত। সব বাগানে শ্রমিক রয়েছে এক লাখ ৪০ হাজারের মতো। এই চা-শ্রমিকদের অনেকেই বংশ পরম্পরায় এসব বাগানে নিয়োজিত রয়েছেন।

১৮৬০-৭০ সালের দিকে আসাম ও সিলেট অঞ্চলে চা বাগানে বাণিজ্যিক সাফল্য দেখা দেয়ায় অনেক বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফলে চা বাগান বাড়তে শুরু করে। সেই সঙ্গে আরও বেশি শ্রমিকদের চাহিদা দেখা দেয়। ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে চা-শ্রমিকদের ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে আনা হয়েছিল উল্লেখ করে হিস্টরি অব টি গার্ডেনস অ্যান্ড টি ওয়ার্কার্স অফ বাংলাদেশ’ বইয়ে রিয়াদ মাহমুদ ও আলিদা বিনতে সাকি লিখেছেন:

চা বাগানে প্রথম যে শ্রমিকরা কাজ করতেন, তারা সিলেটের স্থানীয় ছিলেন না। ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা সেখানে এসেছেন। বেশিরভাগ এসেছিলেন দুর্ভিক্ষ পীড়িত এলাকাগুলো থেকে। স্থানীয়রা তাদের ‘কুলি’ বলে ডাকতেন। এখনো তাদের সেই নামে ডাকা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা, চা বাগান মালিক এবং কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে দাসের মতো আচরণ করতেন।

একুশ শতকে এসেও চা-শ্রমিকদের সেই অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক মজুরি বাড়ানোর আন্দোলনে তাদের আয়, জীবনমান ও বৈষম্যের চিত্র আবারো সামনে এসেছে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .