বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

ভারতে বিক্ষোভের সময় ভিন্নমত দমনে প্রযুক্তি-ভিত্তিক সরঞ্জামের ব্যবহার অন্বেষণ

রণদীপ মদ্দোকের তোলা ছবি, সিসি বাই-এসএ ৪.০, উইকিমিডিয়া সাধারণের মাধ্যমে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর একটি শীতল প্রভাব তৈরি করে ভিন্নমত, বিশেষ করে প্রতিবাদকারীদের, পর্যবেক্ষণ করতে ভারতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে। ২০১৮ সাল থেকে বিভিন্ন আকারের অন্তত তিনটি উল্লেখযোগ্য বিক্ষোভ হয়েছে যার সবগুলিই একই ফলাফলের দিকে পরিচালিত করেছে: বিক্ষোভকারীদের নজরদারি ও সীমাবদ্ধ করার জন্যে প্রযুক্তিগত সরঞ্জামাদির নির্বিচার ব্যবহার।

রাজনীতিতে প্রযুক্তি স্থাপন

ভারত সরকার ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট তারিখে পূর্ববর্তী জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া ৩৭০ ধারা অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার করে একটি কেন্দ্রীয়-শাসিত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করে। ৩৭০ ধারা দেশের বাকি অংশের তুলনায় এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের রাজনৈতিক বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করার সুযোগ দেয়। সংসদে আইনটি সীমিত করার পদক্ষেপের ব্যাখ্যা করে সরকার যুক্তি দিয়েছিল যে এই পদক্ষেপটি সেখানে বেড়ে ওঠা দুর্নীতি, সন্ত্রাসবাদ এবং অনুন্নয়নকে কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে। এই সিদ্ধান্তের পরে সরকার জম্মু ও কাশ্মীরে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ আরোপ করে। প্রতিবেদনে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আটক, আঞ্চলিক গণমাধ্যম সীমিত এবং জনসমাবেশ অননুমোদিত করা হয়। ক্ষমতাসীন সংগঠন বিরোধিতা করলেও, পাওয়া সীমিত তথ্য থেকে মনে হয় নিষেধাজ্ঞাগুলি ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের পর কিছু কিছু বিক্ষোভ সংঘটিত হয়েছিল।

এর কয়েক মাস পরে ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর তারিখে সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাস দেশের বিভিন্ন রাজ্যে একের পর এক বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়। সরকার অস্বীকার করলেও বিক্ষোভকারীদের যুক্তিতে আইনটি মুসলমানদের জন্যে বৈষম্যমূলক। এই বিক্ষোভগুলির বেশিরভাগই শান্তিপূর্ণ হলেও ২৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে রাজধানী শহর নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভের স্থানগুলিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে যা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দিকে পরিচালিত করে। এই সহিংসতায় কমপক্ষে ৫৩ জন প্রাণ হারায়, ২০০ জন আহত এবং অনেক বাড়ি ও দোকান ভাংচুর করা হয়।

২০২০ সালের ৫ জুন তারিখে সরকার বেসরকারিকরণ বৃদ্ধি এবং সরকারি হস্তক্ষেপ হ্রাস করে খামার বৃদ্ধিকে উদ্দীপিত করার যুক্তিতে  তিনটি কৃষি খামার আইন পাস করার উদ্যোগ নেয়। তবে কৃষকরা আশঙ্কা করে  তাদের অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে দিতে পারে। এই মতবিরোধের ফলে কৃষক ও সরকারের মধ্যে এক বছর ধরে টানাপোড়েন চলে। বিক্ষোভের সময় কতজন কৃষক মারা গেছে তার কোন তথ্য সরকারের কাছে না থাকার কথা বললেও, কৃষক ইউনিয়নগুলি কমপক্ষে ৫৩৭ জন কৃষকের প্রাণ হারানোর কথা জানিয়েছে। ২০২১ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী মোদি সরকারের তিনটি আইন বাতিলের ঘোষণা দেন

প্রযুক্তি-ভিত্তিক নজরদারির প্রবণতা

তিনটি ক্ষেত্রেই আইন প্রয়োগকারীরা বিক্ষোভকারীদের উপর নজরদারি চালাতে ড্রোন ব্যবহার করেছে। কাশ্মীরের একটি সংবাদ নিবন্ধে ড্রোন দেখে জনগণ শুরুতে কীভাবে “মুখ ঢেকে রাখবে” সেই সম্পর্কে কথা বলা একজন বিক্ষোভকারীকে নথিভুক্ত করেছে। তবে বিক্ষোভকারীরা তাদের উপর ড্রোন ঘোরাফেরার বিষয়ে খুব অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় চর্চাটি বন্ধ হয়ে গেছে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। ড্রোনগুলি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বিক্ষোভকারীদের গতিবিধি অনুসরণ করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছে

সিএএ-বিরোধী বিক্ষোভ এবং কৃষকদের বিক্ষোভের সময় বিক্ষোভকারীদের ছবি তোলার জন্যে আইন প্রয়োগকারীরা ড্রোন ব্যবহার করে। কর্মকর্তারা এছাড়াও উভয় ক্ষেত্রেই মুখমণ্ডল সনক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। জাতীয় দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে যে দিল্লি পুলিশ ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে সমাবেশ সনাক্তকরণের জন্যে স্বয়ংক্রিয় মুখমণ্ডল সনক্তকরণ ব্যবহার করে৷ উদ্বেগজনকভাবে, ব্যবস্থাটি “শহরের প্রধান প্রধান বিক্ষোভের জায়গায়” কর্মকর্তাদের চিত্রায়িত ফুটেজ ব্যবহার করে। ব্যবস্থাটি সম্পর্কে প্রকাশ্যে পাওয়া কোন তথ্য না থাকায় এতে সিএএ বিক্ষোভের ডেটা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কিনা তা কল্পনার জন্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এই বিক্ষোভের স্থানগুলিতে উপস্থিত লোকেরা রাষ্ট্রের ডেটা অপব্যবহারের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হলেও কর্মকর্তারা দাবি করে যে তাদের ডেটা সংরক্ষণের কোন পরিকল্পনা নেই। একটি গণমাধ্যম প্রতিবেদনে, একজন জ্যেষ্ঠ্য পুলিশ কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন যে “আমি শুধু লক্ষ্যিত লোকদের ধরছি।” তিনি আরো বলেন যে “আমাদের কাছে কোন প্রতিবাদকারীর ডেটা নেই, অথবা আমরা এটা সংরক্ষণ করার পরিকল্পনাও করি না।”

উপরন্তু, কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে মুখমণ্ডল সনক্তকরণ প্রযুক্তি আইন ভঙ্গকারীদের সনাক্ত করতে এবং গ্রেপ্তার করতে সাহায্য করে। সংসদে দিল্লি দাঙ্গার বিষয়ে আলোচনার প্রতিক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন যে মুখমণ্ডল সনক্তকরণ প্রযুক্তি সহিংসতা প্ররোচিতকারী ১,৯০০ জনকে সনাক্ত করতে সহায়তা করেছে। এই পদক্ষেপের সাফাই গেয়ে তিনি বলেন, “এটা একটা সফটওয়্যার। এটা বিশ্বাস দেখে না। এটা জামাকাপড় দেখে না। এটা কেবল মুখ দেখে এবং মুখের মাধ্যমে ব্যক্তিটি ধরা পড়ে।” প্রক্রিয়াটি নিয়ে অস্বচ্ছতা থাকলেও সংবাদ প্রতিবেদনগুলি বলেছে যে সিসিটিভি এবং “মুক্ত উৎস ভিডিও” এর মাধ্যমে ধারণ করা ছবিগুলি ভোটার আইডি এবং ড্রাইভারের লাইসেন্সের ডাটাবেজের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়। মুখমণ্ডল সনক্তকরণ ছাড়াও, কর্মকর্তারা “দাঙ্গায় উপস্থিত লোকদের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি থেকে মুছে ফেলা ডেটা পুনরুদ্ধার,” ভৌগলিক-অবস্থান, ড্রোন মানচিত্রায়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরঞ্জামাদি এবং ডিএনএ ছাপ ব্যবহার করেছেন। এই সরঞ্জামগুলি একটি “অবাধ ও সুষ্ঠু তদন্ত” পরিচালনা করতে সাহায্য করে বলে তারা যুক্তি দেয়।

বিক্ষোভকারীদের সরেজমিন নজরদারি ছাড়াও সরকার তিনটি ক্ষেত্রেই যোগাযোগ পরিষেবা ব্যহত করে এবং সামাজিক গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কথা বলা বন্ধ করার চেষ্টা করে। জম্মু ও কাশ্মীরের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট থেকে বিভিন্ন মাত্রার যোগাযোগ অবরোধের মধ্য দিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি সামাজিক গণমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যা কাশ্মীরে উপস্থিত ব্যক্তিদের তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করতে বাধা দেয়। শুধু ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে উচ্চ-গতির ইন্টারনেট পরিষেবাগুলি পুনরুদ্ধার করার মানে হল যে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটিতে কোভিড-১৯ এর কোন ইন্টারনেট প্রবেশযোগ্যতা নেই। সিএএ-বিরোধী বিক্ষোভের সময় সারা দেশের অন্তত সাতটি রাজ্য কোনো না কোন এক সময়ে ইন্টারনেট বন্ধের মুখোমুখি হয়েছিল। এছাড়াও কৃষক আন্দোলনের সময় একটি সমাবেশ হিংসাত্মক হয়ে গেলে দিল্লি এবং হরিয়ানায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিভিন্ন রকমের যোগাযোগ অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল

প্রতিরোধের কাজ: প্রযুক্তিতে রাজনীতি স্থাপন

নিপীড়নের এই কাজগুলি প্রতিরোধের কাজ দিয়ে মোকাবেলা করা হয়েছে। সিএএ-বিরোধী বিক্ষোভের সময় রাজধানী শহরে মুখমণ্ডল সনক্তকরণ ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিক্ষোভকারীরা তাদের মুখ ঢেকে নিরাপদ থাকার বিষয়ে সামাজিক গণমাধ্যমে মোকাবেলার বিভিন্ন উপায় ভাগাভাগি করেছে। অন্য আরেকটি ক্ষেত্রে একজন স্বাধীন ডেটা শাসন গবেষক মুখমণ্ডল সনক্তকরণের রূপরেখা এবং কীভাবে সেগুলি প্রশমিত করা যায় তার পরামর্শ দিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। এক ধরনের পদক্ষেপে কৃষক ইউনিয়ন ইন্টারনেট এবং যোগাযোগ বিধিনিষেধের নিন্দা করেছে। তা্রা পরিষেবা চালু করার দাবি করে বলে তা না হলে আরো আন্দোলন করা হবে।

দেশের সুশীল সমাজ সংগঠনগুলি প্রযুক্তির নির্বিচার ব্যবহারকে চ্যালেঞ্জ করার জন্যে বিভিন্ন উপায় ব্যবহার করে। এগুলোর কয়েকটির মধ্যে রয়েছে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, তথ্যের অধিকারের অনুরোধ দায়ের করে স্বচ্ছতা চাওয়া এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করা। উদাহরণস্বরূপ, ডিজিটাল অধিকার সংস্থা ইন্টারনেট স্বাধীনতা ফাউন্ডেশন বেআইনিভাবে স্বয়ংক্রিয় মুখমণ্ডল সনক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্যে দিল্লি পুলিশকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। অন্য একটি ক্ষেত্রে, ডিজিটাল এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আরেকটি নাগরিক সমাজ সংস্থা সফ্টওয়্যারের স্বাধীনতা আইন কেন্দ্র ইন্টারনেট বন্ধের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে আদালতে গেছে।

ব্যক্তিগত এবং সাংগঠনিক স্তরে এই ধরনের প্রতিরোধের কাজগুলি আশার আলো হলেও ভারত গোপনীয়তা রক্ষা এবং বিক্ষোভকারীদের ডিজিটাল অধিকার নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।


পরাধীনতা পর্যবেক্ষক থেকে আরো খবর পেতে অনুগ্রহ করে প্রকল্পটির পাতা দেখুন।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .