বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

বিশ্ব সাহিত্যের স্বাদ উপহার দেয়া লেখকের বিদায়ে স্মৃতিকাতর পাঠকসমাজ

মাসুদ রানা সিরিজের বই দিয়ে তৈরি কোলাজ। কৃতিত্বঃ লেখক।

মাসুদ রানা সিরিজের বই দিয়ে তৈরি কোলাজ। কৃতিত্বঃ লেখক।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় স্পাই থ্রিলার সিরিজ ‘মাসুদ রানা’র স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন সম্প্রতি মারা গেছেন। তিনি সেবা প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন। পাঠকের কাছে কাজী দা নামে অধিক পরিচিত কাজী আনোয়ার হোসেন প্রায় এক হাতেই বাংলাদেশে দাঁড় করিয়েছেন রহস্য-রোমাঞ্চ গল্পের জনপ্রিয় সাহিত্যধারা। বাঙালি পাঠকসমাজ তাঁর হাত ধরেই বৈশ্বিক হয়েছে, পেয়েছে বিশ্ব সাহিত্যের স্বাদ। তাঁর প্রয়াণের খবর শুনে কৈশোরের রঙিন দুনিয়ার স্মৃতিচারণায় বুঁদ হয়েছেন তাঁর বইয়ের পাঠকেরা।

১৯৬৪ সালের জুনে কুয়াশা-১ বইটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে সেবা প্রকাশনী ও থ্রিলার লেখক হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে ‘ধ্বংস পাহাড়’ নামে মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই বের হয়। কাপ্তাই বাঁধ রক্ষা নিয়ে বইটির কাহিনি গড়ে উঠেছিল। ঐ বাঁধ রক্ষার দায়িত্ব পেয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট মাসুদ রানা। অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পায় বইটি। এরপর তরুণ প্রজন্মের পাঠকদের কাছে জেমস বন্ডের মত আইকন হয়ে ওঠে মাসুদ রানা চরিত্র। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে সাড়ে চার শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে এ সিরিজের যার অর্ধেকের বেশীর স্বীকৃতি ও সত্ত্ব পেয়েছেন ছায়ালেখক শেখ আব্দুল হাকিম

ডেইলি স্টার পত্রিকায় রাশা জামিল মাসুদ রানাকে পাঠকের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেনঃ

He's mysterious. He's charming. He's strong, skilled, and agile. He makes you think of James Bond, or perhaps Jason Bourne.

Except that he's deshi. He's Masud Rana.

The books gained a cult following in Bangladesh, so much so that Walther PPK pistols, known to be both Bond's and Rana's preferred weapons, became popular as kids’ toys all around Dhaka city.

তিনি রহস্যময়। তিনি রমণীমোহন। তিনি বলিষ্ঠ, দক্ষ এবং চটপটে। তার ব্যক্তিত্ব আপনাকে জেমস বন্ড অথবা জেসন বোর্নের কথা ভাবতে বাধ্য করে।

কিন্তু তিনি বিদেশি নন। তিনি মাসুদ রানা।

মাসুদ রানা সিরিজের বইগুলো বাংলাদেশে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে বন্ড এবং রানা উভয়েরই পছন্দের অস্ত্র হিসেবে পরিচিত ওয়ালথার পিপিকে পিস্তল ঢাকা শহরের চারপাশে বাচ্চাদের খেলনা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে (৭০ এর দশকে)।

কাজী আনোয়ার হোসেন। এক হাতেই বাংলাদেশে দাঁড় করিয়েছেন রহস্য-রোমাঞ্চ গল্পের জনপ্রিয় সাহিত্যধারা। ছবি নেয়া হয়েছে উইকিপিডিয়া থেকে হুমায়রা আহমেদের তোলা। সিসি বাই-এসএ ৩.০

কাজী আনোয়ার হোসেন ছিলেন পাঠক গড়ার কারিগর। তাঁর হাত ধরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্মার্ট পাঠক। বাংলাদেশের পাঠকেরা শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য রাঙানো, জ্ঞান পিপাসা মেটানো, অনুসন্ধিৎসু হতে, কল্পনার রাজ্যে লাগামহীন দৌড়ঝাঁপ করার সুযোগ পেয়েছে তাঁর বই পড়ে। তাঁর সৃষ্ট কল্পলোকের এক চরিত্র ঠাঁই করে নিয়েছে বাঙালি পাঠকের প্রতিদিনের নিত্যকার একঘেয়ে জীবনে। তাই প্রিয় লেখকের বিদায়ে সাংবাদিক সিমু নাসের লিখেছেন:

বিদায় প্রিয় মাসুদ রানা, প্রিয় কাজী আনোয়ার হোসেন, প্রিয় লেখক।

আপনার কারনেই আমরা একটা প্রজন্ম পাঠক হতে পেরেছি। আপনার কারনেই সেই স্কুলে থাকতে খোঁজ পেয়েছি টম-হাকলবেরি ফিনের, রবার্ট লুই স্টিভেনসনের, আয়েশার, জেকিল-হাইডের। মাসুদ রানাকে সাথে দিয়ে আমাদের ভ্রমণ করিয়েছেন উত্তর মেরু থেকে শুরু করে ইউরোপ-অ্যামেরিকা, আফ্রিকার শহরের অলিতে গলিতে।

বিদায় আমাদের স্বপ্ন দেখানোর, স্বপ্নের দরজা খুলে দেওয়া লেখক। আমার এই ক্ষুদ্র লেখক জীবনে আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নাই।

টুইটার ব্যবহারকারী ক্রিকেটসকার টুইট করেছেঃ

সেই দিনগুলো ছিল বই আর অ্যাডভেঞ্চারের দিন। সেই দিনগুলি ছিল যখন একটি প্রজন্ম নির্ভীক, বিপ্লবী হওয়ার এবং গোয়েন্দার মতো বিভিন্ন জ্ঞান সংগ্রহ করার জন্য উৎসাহী হয়েছিল। এই কিংবদন্তি মাসুদ রানা সিরিজের কৃতিত্ব কাজী আনোয়ার হোসেনের। ধন্যবাদ স্যার।

এদিকে প্রিয় লেখকের বিদায় মেনে নিতে পারেননি লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট জান্নাতুন নাঈম প্রীতি:

শৈশবে যে জাদুর বাক্সর দেখা পেয়েছিলাম সেই জাদুর বাক্সের জাদুকর আমার অতি প্রিয় লেখক ও অনুবাদক কাজী আনোয়ার হোসেন আর নেই, তা কেন যেন মানতে পারছিনা। মনে হচ্ছে খুব কাছের এক আত্মীয় মারা গেছেন আর বুকের মধ্যে কোথাও ছিঁড়ে ফুঁড়ে যাচ্ছে! আমার অপূর্ণ আশা থেকে গেলো কখনো তাঁকে বলার- আই লাভ ইউ ম্যান!

লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের প্রেইরি ভূমি অথবা ফ্রান্সের কোনো এক শ্যাঁতো যার কারণে চিনেছিলাম, সেই মানুষতো তিনিই! এতো বই না পড়লে কেমন করে প্রতিবাদ শিখতাম? কেমন করে জানতাম প্রিয় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সেই বুড়ো সান্তিয়াগোর বাণী- মানুষ বারবার ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু কখনো হারেনা!

কাজী আনোয়ার হোসেন শুধু পাঠক নন, সেবা প্রকাশনীর মাধ্যমে অসংখ্য লেখকও তৈরি করেছেন। আবার তাঁর লেখা পড়ে অনেক পাঠকই লেখক হয়ে উঠেছেন। এদের একজন তরুণ লেখক সুহান রিজওয়ান। তিনি লিখেছেন:

যদি প্রশ্ন করা হয়, লিখতে চাওয়ার ইচ্ছের শুরুটা হয়েছে কাকে দেখে, আমার উত্তর চিরকালই কাজী আনোয়ার হোসেন। ভেঙে বলতে গেলে বলতে হবে সেবার আরো কিছু চমৎকার লেখকের কথাও, কিন্তু তারপরেও কাজী আনোয়ার আলাদা করে টিকে যান একটা অনুমেয় কারণেই। অনেকেই লেখক, কিন্তু কেউ কেউ লেখক নামের প্রতিষ্ঠান।

মাসুদ রানা’র স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন বাঙালি পাঠকের ‘জীবনে প্রথম’ নামক অনেক স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছেন। সেটা স্মরণ করে সাংবাদিক ও লেখক ফারুক ওয়াসিফ লিখেছেন:

মাসুদ রানা এই ঘাড়কুঁজো বাঙালিকে বৈশ্বিক করেছে। বাংলাদেশি এক স্পাই দুনিয়ার বাঘা বাঘা কিংবা শেয়ালজাতীয় স্পাইদের হারিয়ে দিচ্ছে, টম অ্যান্ড জেরি খেলছে ভয়ংকর কবীর চৌধুরী কিংবা উ সেনের সঙ্গে; এই গর্ব রাখি কোথায়? তখন তো জানতাম না যে জেমস বন্ড কিংবা অন্য কোনো থ্রিলারের কাহিনির ছায়াতেই এই দুর্ধর্ষ বীরের জন্ম। জানলেই–বা কী? প্রথম প্রেমের কোনো দোষ চোখে পড়ে না। পড়েওনি। কাহিনি ধার নেওয়া হয়েছে তো কী, নায়ক তো আসলই।

শুরুর দিকের মাসুদ রানার কাহিনিগুলো মৌলিক হলেও পরে বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে লিখেছেন তিনি। এ দিনে অনেক কথাও উঠেছিল। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন কাহিনি ধার করার পেছনের কারণও

মূল কারণ, আমার অভিজ্ঞতার অভাব। মাসুদ রানা বইয়ে যেসব দেশের কথা, অভিজ্ঞতার কথা, ঘটনার কথা, জটিল পরিস্থিতির কথা থাকে, সেসব সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা একজন মধ্যবিত্ত বাঙালির পক্ষে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। তাই বিদেশি কাহিনির সাহায্য আমাকে নিতেই হয়েছে।

কাজী আনোয়ার হোসেনের জনপ্রিয় চরিত্র মাসুদ রানাকে নিয়ে তৈরি সিনেমার পোস্টার। ১৯৭৪ সালে সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল। ছবি নকিবের মাধ্যমে – উইকিপিডিয়া থেকে। ফেয়ার ইউজ।

তাঁর বই, চরিত্রগুলো কীভাবে পাঠকদের উদ্বুদ্ধ করেছে, তার স্মৃতিচারণ করেছেন পরিব্রাজক তারেক অণু সচলায়তন ব্লগে:

অনুবাদক তো দুই বাংলা মিলিয়ে কয়েক লক্ষ আছেন, সবার কাজের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি কাজীদার অনুবাদের বা রূপান্তরের পাশে কেন পিছনে দাঁড়াবার মত অনুবাদকের সন্ধান আজ পর্যন্ত আর মিলল কোথায়! আর সেটি কেবল রোমাঞ্চ গল্প বলে নয়, সিরিয়াস সাহিত্য নিয়েও। [..]

কাজীদা হচ্ছেন আমাদের সত্যিকারের সব্যসাচী- এককালে পেশাদার গায়ক ছিলেন, পরবর্তীতে সুপার হিট গানের গীতিকার, এমনকি পুরস্কার পাওয়া সংলাপ নির্মাতা, দুর্দান্ত মাছশিকারি, গীটার বাদক, আলোকচিত্রগ্রাহক, সেই সাথে একজন দক্ষ ব্যবসায়ী তো বটেই। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব বইবিমুখ একটি জাতিকে আস্তে আস্তে নানা ভাবে বই পড়ার দিকে আকৃষ্ট করা এবং জ্ঞানভাণ্ডের সন্ধান দেওয়া।

এক দেশ থেকে অন্য দেশ, এক সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন সংস্কৃতি, শহর থেকে নগর, গায়ে কাঁটা দেয়া রোমাঞ্চ থেকে গা কাঁপানো গল্পের মঞ্চের নির্মাতা তার নির্মাণষজ্ঞ ফেলে, মুগ্ধ পাঠকদের ফেলে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাঁর এই চলে যাওয়ায় মুগ্ধ পাঠকেরা তাঁর বইয়ের শিরোনাম থেকেই জানালেন, যখন থামবে কোলাহল, তখনও কাজী আনোয়ার হোসেন, জানবেন, আই লাভ ইউ ম্যান।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .