বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

কোন ঔষধ নেই, কোন আরোগ্যতা নেই : সুদানের ঔষধ সামগ্রীর সংকট

সুদানের আল জাজিরা রাজ্যে ফার্মাসিস্টদের বিক্ষোভ।

সুদানের আল জাজিরা রাজ্যে ফার্মাসিস্টদের বিক্ষোভ। সুদান ফার্মাসিস্টের কেন্দ্রীয় কমিটির ছবি, ফেসবুকের থেকে অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

আপনার কি মাথাব্যথার সমস্যা আছে? কল্পনা করুন আপনি প্যারাসিটামল, পানাডল, অথবা ভিটামিন সি এর মত সহজপ্রাপ্য ঔষধ কিনতে পারছেন না। হ্যা, এটাই সুদানের রাজধানী খার্তুমের বাস্তবতা, একটা জাতি যারা ভয়াবহ ঔষধ সংকটে ভুগছে।

ঔষধসামগ্রীর সংকট শুরু হয়েছে ২০১৬ সালে যখন সরকার ঘোষণা করে যে তারা সকল ঔষধের জন্য ভর্তুকি সরিয়ে দিয়েছে। বিরোধীরা,‌‌ সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য আইন অমান্য করার ডাক দেয় যাতে এই সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয়, কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয় নি। তখন থেকেই, সুদানে ঔষধের দাম ক্রমান্বয়ে বাড়ছে আর সরকার এই চাপ কমানোর জন্য খুব সামান্য কিছুই করেছে।

পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় যখন সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অপরিহার্য ঔষধ ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়। সুদানের প্রায় ২৭টি ঔষধ কোম্পানি আছে যারা প্রায় ৯০০ ধরনের ঔষধ তৈরি করে, পাশাপাশি বিক্রির জন্যে ৪৮টি ঔষধ কোম্পানি আছে, কিন্তু এরা সুদানের প্রয়োজন মেটাতে পারে না। এদের মধ্যে, সুদানের বৃহত্তম ঔষধ প্রস্তুতকারক আল-শিফা ঔষধ কারখানা ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিসাইল হামলায় ধংস হয়ে গিয়েছে।

বেশিরভাগ কোম্পানি ঔষধ এবং চিকিৎসা সামগ্রী সুদানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সিবিওএস এর মাধ্যমে আমদানি করে, যেই ব্যাংকটি এখন ভীষণভাবে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

১১ই জুন, পেশাজীবী ফার্মাসিস্ট এসোসিয়েশন এবং সুদানের কেন্দ্রীয় ফার্মাসিস্ট কমিটি ও সুদানীজ পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যরা, সরকারকে চাপ প্রয়োগের জন্য একটি নীরব প্রতিবাদের ঘোষণা দেয় যাতে সরকার ঔষধ ক্রয়ের জন্য প্রতিমাসে ৫৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করে।

এই গ্রুপ একটি হ্যাশট্যাগ তৈরি করে #الدواء_معدوم যার মানে হলো “ঔষধের অস্তিত্ব নেই”।

ড. আকরাম [স্বাস্থ্য মন্ত্রী] : এখন, আমরা তোমাদের সত্যে সমর্থন করি এবং সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করার ক্ষেত্রে তোমাদের ব্যর্থতায় পথ দেখাই। হ্যা, তোমরা তোমরা অভাবগ্রস্ত এবং আমরা যেভাবেই এই কারণ মেনে নেই না কেন, সমাধান তোমাদের হাতেই থাকবে, বা যেসব লোকেরা স্বচ্ছভাবে দৃশ্যের অন্তরালের ঘটনার মুখোমুখি হবে। নাগরিকেরা এভাবে মারা যায়।

এপ্রিলে, জাতীয় ফার্মেসি ও বিষদ্রব্য কাউন্সিল, ঔষধ আমদানিকারক সমিতির সাথে ঔষধের দাম বাড়ানোর জন্য রাজি হয়। এতে আমদানিকৃত ঔষধের দাম ১৬ শতাংশ এবং ফার্মেসিগুলোর লাভের সূচক ২০ শতাংশ বাড়বে, এবং ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীর জন্য লাভের মার্জিন তৈরি করতে এই বৃদ্ধিকে পূর্ববর্তী ভাবে প্রয়োগ করা হবে।

কিন্তু পরবর্তী মাসে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড.আকরাম ‌‌‌‌এল-টম এই সিদ্ধান্ত বাতিল করেন, এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ঔষধের দাম এতোটাই বেড়ে গিয়েছে যে নাগরিকরা ঔষধ ক্রয় করতে পারছে না। এই সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ের ভিতরকার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটায়।

১৮ই মে, সিবিওএস ঔষধ আমদানির উদ্দেশ্যে রাখা রপ্তানি আয় থেকে ১০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা রাখার নির্দেশ বাতিল করে, যা ঔষধের মজুদকে খারাপভাবে প্রভাবিত করে।

সুদানিজ ফার্মাসিস্ট এবং রাজনৈতিক কর্মী ড. আমিন মাক্কী ফেসবুকে পোস্ট করেন:

আমরা ৫ই সেপ্টেম্বর ২০১৯ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে বেশ কয়েকটি বৈঠকে যোগ দিয়েছি। তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে, এবং আমরা বিগত পাঁচ বছরের চিকিৎসা সমস্যা তাকে দেখিয়েছি, সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছি, এবং এমনকি ঔষধের মজুদও এবং তাকে বলেছি যে আমরা এমন অবস্থায় পৌঁছাবো যে আমরা হয়তো প্যারাসিটামলও (ব্যাথার ঔষধ) পাবো না। এইসব বৈঠকগুলোতে বিশেষজ্ঞ এবং মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকেরা অংশ নিয়েছেন। যাবতীয় পরিকল্পনা নাগরিকদের জন্য কার্যকর, নিরাপদ, এবং সাশ্রয়ী মূল্যে ঔষধের ব্যবস্থা করার জন্য নেয়া হয়েছিলো। ফেব্রুয়ারিতে, সুদানের কেন্দ্রীয় ফার্মাসিস্ট কমিটি একটি কনফারেন্সের আয়োজন করে যেখানে সকল অংশীদারদের: জাতীয় ফার্মেসি ও ঔষধ কাউন্সিল, অর্থ মন্ত্রণালয়, সুদান কেন্দ্রীয় ব্যাংক, চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহের জাতীয় তহবিল, সার্বভৌম কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দ, এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই বৈঠকে উপস্থিত হননি এবং কোন প্রতিনিধিও পাঠাননি। এই ফাইলটির প্রতি মন্ত্রীর আচরণে সম্পূর্ণভাবে অবহেলা ছিল, এবং আমরা এই জটিল পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমরা প্রতিদিন তার কাছে এটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতাম…

গত জুলাইয়ে, জাতিসংঘও নিশ্চিত করে যে সুদান চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে একটি ভয়াবহ ঔষধ সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

সুদানের ফার্মাসিস্টরা তাদের দেশে জরুরি ঔষধ সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। ছবি সুদানের কেন্দ্রীয় ফার্মাসিস্ট কাউন্সিল, খার্তুম, সুদান, ১২ই জুন ২০২০, ফেসবুকের মাধ্যমে অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

কিভাবে একটি ভয়াবহ ঔষধ সংকট শুরু হয়?

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সুদানীজ যুক্তরাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আবুযাইদ স্বীকার করেন যে, “সুদানে ঔষধের ঘাটতি মারাত্মক,” এবং সিবিওএস-এর দায়িত্বের কথা বলেন।

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয়ের (ইউএনওসিএইচএ) মার্চ ২০২০ প্রতিবেদন অনুসারে, সুদানের অর্থনৈতিক সংকট ঔষধের সহজলভ্যতার উপর প্রভাব রেখে চলছে।

সিবিওএস এর একটি ২০১৯ বৈদেশিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান দেখায় যে ২০১৯ সালের চতুর্থভাগে সুদান $৩৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ঔষধ আমদানি করেছে। ২০১৮ সালের তুলনায় এটি‌ $৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (১৫ শতাংশ) বেড়েছে, কিন্তু ২০১৭ সালের তুলনায় $৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (২০ শতাংশ) কমেছে। (চিত্র ১ দেখুন)

চিত্র-১: ইউএনওসিএইচএ থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট পরিস্থিতি রিপোর্ট সুদান, মার্চ ২০২০।

প্রফেসর স্টিভ হ্যাঙ্কের তৈরি সুদানে মুদ্রাস্ফীতির উপর একটি মাসিক রিপোর্ট অনুসারে, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি একটি কালো বাজার তৈরি করেছে যার ফলে ৩ জুন পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ১১৮.১৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

কালোবাজারীরা এখানে একটি স্বল্পমেয়াদী সমাধান হিসেবে কাজ করেছে, তারা সুদানের ঔষধ বানিজ্য চালু রেখেছে ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ীদের দ্বারা যারা পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে লাগেজে করে ঔষধ পাচার করে।

যদিও এসব ঔষধের কোন মান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয় না।

১৬ই মার্চ থেকে সীমান্ত বন্ধের কারণে ঔষধ পাচার কমে যায়, যখন সুদানীজ কর্তৃপক্ষ কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে সীমান্ত বন্ধ করে রাখে । এটি কালোবাজারে জরুরি ঔষধের সরবরাহ আরো কঠিন করে তুলেছে।

চিত্র ২: সুদানের মুদ্রাস্ফীতির হার, জুলাই ২০১৭- জুন ২০২০, প্রফেসর স্টিভ হ্যাঙ্ক এর টুইট অনুসারে।

কোভিড-১৯ দোষারোপের খেলা

মার্চ থেকে, যখন কোভিড-১৯ অতিমারী সুদানে আঘাত হানে, ব্যাক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর (পিপিই) দাম স্টক না থাকার কারণে ৩০০ ভাগেরও বেশি বেড়ে গিয়েছে

চিকিৎসা সেবা প্রায় থেমে গিয়েছে কারণ অনেক রোগী এবং চিকিৎসকেরা ভাইরাসে আক্রান্ত হবার ভয়ে হাসপাতাল এবং স্বাস্থকেন্দ্রে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। ১৮ই জুন (২০২০) পর্যন্ত, ৮০০০ জনের অধিক কোভিড-১৯তে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় ৫০০ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। যদিও, ঔষধ সংকটের কারণে কতজন মানুষ অনান্য রোগে ভুগে মারা গিয়েছেন এই ব্যাপারে এখানে কোন দাপ্তরিক ঘোষণা নেই।

এদিকে, সুদানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সমবেদনা বার্তায় মুখরিত হয়ে উঠেছে। এরমধ্যে একটি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রনালয় থেকে — কয়েকজন আলেমের মৃত্যুকে উল্লেখ করে

সুদানের কোভিড-১৯ প্রতিক্রিয়া চরমভাবে বিতর্কিত হচ্ছে, যেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কাঁদা ছোড়াছুড়ি চলছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. আকরাম এল-টম থেকে ফাঁস হওয়া একটি চিঠি।

সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি চিঠিতে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী এল-টম অর্থমন্ত্রী ইব্রাহীম আল-বাদাওয়ীকে করোনা ভাইরাসের জন্য নির্দিষ্ট করে পাওয়া বৈদেশিক সাহায্য, বিদ্যুৎ ও কূটনৈতিক ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছেন বলে অভিযুক্ত করেন।

চিঠিটিতে আরো আভিযোগ করা হয় যে, বাওয়াদী ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে জাতীয় ঔষধ বিল পরিশোধ করছেন নাঃ

আমি আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে আপনি ঔষধ বিলের আংশিক পরিশোধের জন্য প্রতিমাসে ২০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।… আমার মনে আছে, অর্থ মন্ত্রণালয় যখন অন্য মন্ত্রণালয়ের সম্পদ নির্ধারণের জন্য স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নেয়, সেই সময় শেষ হয়েছে যেদিন এই সরকার শহীদদের রক্তের বিনিময়ে একটি বিপ্লবের পর শপথ গ্রহণ করেছিল।

এলবাদাওয়ী, অর্থমন্ত্রীকে উত্তর দেয় :

অর্থায়ন এবং অর্থনৈতিক পরীকল্পনা মন্ত্রনালয় স্পষ্টভাবে চলমান গুজবকে অস্বীকার করে যে  অর্থ মন্ত্রণালয় যে কোন ধরনের সুবিধা, অথবা অনুদান, অথবা অর্থ যা সুদানকে করোনা ভাইরাস মোকাবেলার জন্য দেয়া হয়েছিলো সেগুলো নিয়ে কাজ করেছে। অর্থায়ন এবং অর্থনৈতিক পরীকল্পনা মন্ত্রনালয় নিশ্চিত করে যে ওইসব ভর্তুকি এবং অনুদান যা সুদানে পৌঁছেছে, সেগুলো সম্পূর্ণভাবে এই অতিমারী মোকাবেলা করতে ব্যাবহার করা হয়েছে।…

এই কাদা ছোড়াছুড়ি নাগরিকদের বিস্মিত করছে, কখন এবং কিভাবে এই সংকট দূর হবে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .