বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

আদিবাসী শিল্পীর তুলিতে উঠে এলো কাপ্তাই হ্রদে ভিটে-মাটি হারানো হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাসের গল্প

শিল্পী তুফান চাকমার তুলিতে প্রিয়বালা চাকমা

শিল্পী তুফান চাকমার তুলিতে প্রিয়বালা চাকমা। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

বাংলাদেশে পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয় কাপ্তাই হ্রদ। হ্রদের স্বচ্ছ নীলাভ জলে ভাসতে ভাসতে দেখে নেয়া যায়, পাহাড়ের চারপাশে প্রকৃতির অপরূপ নির্সগ। তাই, সুযোগ পেলেই এখানে ঘুরতে আসেন অনেকে। এর অবস্থান পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলায়। ১৯৬২ সালে কাপ্তাই বাঁধের কারণে সৃষ্টি হওয়া এই কৃত্রিম হ্রদ বেশিরভাগ মানুষের কাছে স্রেফ বিনোদন, আমোদ-ফুর্তির জায়গা হলেও চাকমা জনগোষ্ঠীর কাছে বর পরং নামে পরিচিত। বর পরং বলতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর হওয়া বুঝায়।

কর্ণফুলি পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ১৯৫৬ সালে কাপ্তাই বাঁধের নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৯৬২ সালে তা শেষ হয়। বাঁধটি নির্মাণের ফলে ৫৪ হাজার একর কৃষি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। প্রায় ১৮,০০০ পরিবারের এক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। ৩৫,০০০ হাজারের বেশি চাকমা ও হাজং আদিবাসী সম্প্রদায়কে প্রতিবেশী দেশ ভারতে স্থানান্তরিত হতে হয়।

কাপ্তাইয়ের গভীর নীল জলে কত পরিবারের স্বপ্নের সংসার সলিল সমাধি বরণ করেছে, হাজার হাজার ঘরহারা, ভিটেহারা মানুষের দীর্ঘশ্বাস চাপা পড়ে গেছে, সেই কাহিনি বেশিরভাগ মানুষই জানেন না। নতুন প্রজন্মের কাছে সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা তুলে ধরতে চেয়েছেন আদিবাসী তরুণ তুফান চাকমা। তিনি চারুকলার ছাত্র। তাই বর পরং এর ইতিকথা তিনি ভিজুয়াল স্টোরিতে তুলে ধরেছেন। এজন্য সাহায্য নিয়েছেন অ্যাডভোকেট সমারী চাকমা লিখিত ‘কাপ্তাই বাঁধ: বর-পরং: ডুবুরীদের আত্মকথন’ বইটির প্রিয়বালা চাকমার সাক্ষাৎকার অনুসারে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত কাপ্তাই লেক।

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত কাপ্তাই লেক। ছবি তুলেছেন রেজওয়ান। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

ফেসবুকের মেসেঞ্জারে বর-পরং নিয়ে কাজ প্রসঙ্গে তুফান চাকমা গ্লোবাল ভয়েসেস বাংলা-কে জানানঃ

যে ঘটনা আমাদের পুরো চাকমা জাতিকে এভাবে বিভক্ত করে দিলো, যে ঘটনার কারণে নিজ মাতৃভুমি ছেড়ে পরদেশে শরণার্থী হতে হয়েছিল অসংখ্য মানুষের, সে ঘটনা নিয়ে খুব বেশি কাজ হয়নি। যেসব হয়েছে তার মধ্যে প্রধীর তালুকদারের বর পরং ডকুমেন্টারি (পর্ব ১, এবং পর্ব ২) এবং সমারী চাকমা লিখিত ‘কাপ্তাই বাঁধ: বর-পরং: ডুবুরীদের আত্মকথন’ বইটি অন্যতম। এ কাজগুলো আমাকে উস্কে দিয়েছে ভিজুয়াল স্টোরি করার। […]

বর্তমান সময়ে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। সারাদিন নানা বিষয় আমাদের আমাদের নিউজফিডে আসা-যাওয়া করে। তো, এতবড় ঐতিহাসিক একটা ঘটনাকে যদি নিউজফিডে প্রেজেন্ট করতে পারি, তাহলে সবাই না হলে কিছু মানুষ তো খেয়াল করবে। তাই সেসময়কার পরিস্থিতিগুলো যতদূর পারি কল্পনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছি।

নিচে তুফান চাকমার ফেসবুকে বাংলায় প্রকাশিত গল্পটির নির্বাচিত চিত্র ও সংক্ষেপিত কথা তুলে ধরা হল শিল্পীর অনুমতি নিয়ে।

বর-পরং: প্রিয়বালা চাকমার গল্প

নারী পুরুষ শিশু সবাই এই আমগাছের তলায় চলে আসতে ঠাণ্ডায় জিরাবো বলে। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

নারী পুরুষ শিশু সবাই এই আমগাছের তলায় চলে আসতে ঠাণ্ডায় জিরাবো বলে। শিল্পী তুফান চাকমা। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

আমার নাম প্রিয়বালা চাকমা। বয়স ৬৫ বছরের ওপরে। ১৯৫৮ সালে ১৭ বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়। আমার নিজের গ্রাম থেকে চলে আসি আমার শ্বশুরবাড়ি রাঙামাটি শহরের কাছে একটা গ্রামে। গ্রামটির নাম বুড়িঘাট।

সবুজ আর সবুজ চারিদিকে। দুপুরে যখন গরম তেতে উঠতো তখন নারী পুরুষ শিশু সবাই এই আমগাছের তলায় চলে আসতে ঠাণ্ডায় জিরাবো বলে। কী ঠাণ্ডা এই গাছতলা!

উদ্বেগ উৎকণ্ঠা এক ধরণের চাপা আতঙ্ক নিয়ে কথা বলছে সবাই। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

উদ্বেগ উৎকণ্ঠা এক ধরণের চাপা আতঙ্ক নিয়ে কথা বলছে সবাই। শিল্পী তুফান চাকমা। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

কাপ্তাই বাঁধ বেশ কয়েক বছর আগে থেকে বানানো শুরু হয়েছে। […] একদিন কাকে যেন বলতে শুনলাম আমাদের গ্রামের এইসব চাষাবাদি জমি সব ডুবে যাবে।

হয়তো আমাদেরকে এই গ্রাম এই জায়গা ছেড়ে দূরে যেতে হবে। আমি কিছুই বুঝিনি। কেন ডুবে যাবে? কে ডুবাবে? এসব নানা প্রশ্ন নানা ভাবনা আমাকে ঘিরে ধরে।

একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম এই সব কথার মানে কি?

একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম এই সব কথার মানে কি? শিল্পী তুফান চাকমা। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করলে বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলেন, “অনেক দূরে রাঙামাটি শহর থেকেও দূরে, বড়গাং মু‘ মানে কর্ণফুলির মুখে একট ‘গদা’ মানে বাঁধ নির্মাণ করেছে সরকার।

এই বাঁধে শুধু গেট লাগানো বাকি। আর গেট লাগানো হলে কর্ণফুলির পানি আর বের হতে পারবে না। ফলে পাহাড়ের সকল নদীতে পানি বেড়ে যাবে তেমনি কাজালং-এর পানি জমতে জমতে কর্ণফুলির নদী থেকে মাইল দূরে আমাদের এই গ্রামের নিচু ধানী জমিগুলোও ডুবে যাবে। আমাদের জীবন রক্ষাকারী জমিগুলো পানিতে তলিয়ে যাবে। সবকিছু পানি গ্রাস করে নেবে।

জীবন কীভাবে চলবে সে চিন্তায় আমরা সবাই অস্থির হয়ে গেছি।

জীবন কীভাবে চলবে সে চিন্তায় আমরা সবাই অস্থির হয়ে গেছি। শিল্পী তুফান চাকমা। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

আমাদের জীবন এখন হুমকির সম্মুখীন। বাবা আবার বললেন, কেউ কেউ বলছে আমাদের এইসব জায়গা পানিতে তলিয়ে যাবার সাথে সাথে আমাদেরও এই পাহাড়, এই গ্রাম, এই বাড়ি সব ছেড়ে দূরে চলে যেতে হবে। হয়তো পাশের দেশে চলে যেতে হবে।

তাই গ্রামের লোকজন দিশেহারা হয়ে আছে। আবার অনেকে কিছুতেই বিশ্বাস করছে না যে সেই বাঁধের পানি হাজারো মাইল দূরে এসে আমাদের এই গ্রামকে গ্রাস করবে। যদিও ইতোমধ্যে অন্য জায়গায় জমি নেবার জন্য কিছু ফরম দেয়া হয়েছে আমাদের। কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না।

মনে হচ্ছে, সকলের আর কোনো কাজ কথা নেই, শুধু এই আলোচনাটুকু ছাড়া।

মনে হচ্ছে, সকলের আর কোনো কাজ কথা নেই, শুধু এই আলোচনাটুকু ছাড়া। শিল্পী তুফান চাকমা। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

কবে নাগাদ গেট বন্ধ করবে? আর গেট বন্ধ করলে সত্যিই কি আমাদের এই গ্রাম পানিতে তলিয়ে যাবে? তখন কী হবে আমাদের? মনে হচ্ছে, সকলের আর কোনো কাজ কথা নেই, শুধু এই আলোচনাটুকু ছাড়া। আর অপেক্ষা। অপেক্ষা।

হাতে কত কাজ বাকি! নতুন জায়গা বন্দোবস্ত করা, হঠাৎ করে পানি চলে এলে বাঁচার জন্য নৌকা ঠিক করে রাখা, গবাদি পশুর ব্যবস্থা করা, কত কি কাজ!

আমরা একটা উঁচু পাহাড়ে নতুন ঘর তৈরি করলাম।

আমরা একটা উঁচু পাহাড়ে নতুন ঘর তৈরি করলাম। শিল্পী তুফান চাকমা। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

এরই মধ্যে আমাদের পুরাতন শশুর বাড়ি পরিবর্তন করা হলো। এই কারণে যাতে সেটা পানিতে তলিয়ে না যায়। সেই বিশাল গুদাম ঘরকে নিচে রেখে আমরা একটা উঁচু পাহাড়ে নতুন ঘর তৈরি করলাম।

সারা দিন রাত বৃষ্টি হচ্ছে তো হচ্ছেই ।

সারা দিন রাত বৃষ্টি হচ্ছে তো হচ্ছেই । শিল্পী তুফান চাকমা। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

অবশেষে সেই দিন সেই ক্ষণ হাজির। সাল মাস কিছুই মনে নেই। শুধু ঘোর আষাঢ় মাসের মতো বৃষ্টি শুরু হলো। সারা দিন রাত বৃষ্টি হচ্ছে তো হচ্ছেই । ধীরে ধীরে পানি বাড়তে লাগলো । প্রচণ্ড ঝড়ে পানি বাড়তে শুরু করলে সবকিছু পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে।

এই তো পানি দোরগোড়ায় এসে গেল বলে।

এই তো পানি দোরগোড়ায় এসে গেল বলে। শিল্পী তুফান চাকমা। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

একদিন রাত শেষে সকালে উঠেই দেখলাম চারিদিকে পানি আর পানি। এবং সেই সঙ্গে প্রচণ্ড বৃষ্টি। সবাই বুঝে নিল সেই দিন উপস্থিত। এবারেই সবকিছু ডুবে যাবে ।

সবাই এখন প্রাণ হাতে নিয়ে, অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানোয় ব্যস্ত হয়ে গেল । হাতে সময় নেই একটুও নেই।

সবাই এখন প্রাণ হাতে নিয়ে, অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানোয় ব্যস্ত হয়ে গেল।

সবাই এখন প্রাণ হাতে নিয়ে, অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানোয় ব্যস্ত হয়ে গেল। শিল্পী তুফান চাকমা। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

বিদায় বলারও কারোর সময় নেই। পানি আর কাউকে সময় দিতে পারছে না। ভাগ্যিস আগে থাকতে নৌকা ভাড়া করা ছিল। পানি বেড়ে গেলে আমরা সকলে নৌকায় চেপে আমাদের বাড়ি এসেছিল তাই আমরা একটু সুবিধা পেলাম । তাদের খুঁজতে খুঁজতে আমরাও একসময় পৌছে গেলাম খাগড়াছড়ি লারমা পাড়ায়।

আমার বাবা ভাইবোনদের খবর জানিনা।

আমার বাবা ভাইবোনদের খবর জানিনা। শিল্পী তুফান চাকমা। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

আমার বাবা ভাইবোনদের কোনো খবর আমি জানি না। অনেক বছর পরে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে জানলাম বাবা, ৩ ভাই ও ১ বোন সবাই অরুণাচলে চলে গেছে। ওখানে তারা জীবনের জন্য কঠিন সংগ্রাম করছে।

আমি তখনও জানতাম না আমার বাবা অরুণাচল যাবার পথে মারা গেছেন।

আমি তখনও জানতাম না আমার বাবা অরুণাচল যাবার পথে মারা গেছেন। শিল্পী তুফান চাকমা। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

আমি তখনও জানতাম না আমার বাবা অরুণাচল যাবার পথে মারা গেছেন (দীর্ঘশ্বাস)। কাপ্তাই বাঁধের কারণে সেই যে ১৯৬০/৬৪ সালের মধ্যে আমরা ভাইবোনেরা আলাদা হয়ে গেলাম, তারপর দেখা হলো আমাদের পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের মধ্যে। আবার আমাদের এই দেখাটাও কিন্তু সবার এক সাথে হয়নি। আর হবেও না কোনোদিন। ইতোমধ্যে আমার বাবা, ছোট ভাই মারা গেছে। আমারও বয়স হয়ে গেছে। ঐপারে যাবার সময় হলো বলে।

সম্পূর্ণ গল্পটি পড়ুন এখানে

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .