বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

কলম্বিয়ায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংবাদিকরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বলছেন নিজেদের মুক্তির গল্প

ছবি: ”মাইক্রোফোনো এন মানো”: ককেশিয়ার করিন্টোর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের রেডিও স্টেশনে দেয়ালের একটি চিত্রকর্ম। ছবি তুলেছেন উইলিয়ান মাভিসয় মুচাভিসয়।

ছবি: ”মাইক্রোফোনো এন মানো”: ককেশিয়ার করিন্টোর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের রেডিও স্টেশনে দেয়ালের একটি চিত্রকর্ম। ছবি তুলেছেন উইলিয়ান মাভিসয় মুচাভিসয়।

সেই পাঁচ বছর আগে কলম্বিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমের ককা অঞ্চলে শান্তি চুক্তি হয়েছিল, কিন্তু সেই শান্তি এখনো আসেনি। এই বছর সেখানে স্থানীয়দের ১২টি গণহত্যার শিকার হতে হয়। কলম্বিয়ার এনজিও ইন্ডেপাজের তথ্য মতে, এই প্রদেশে সতের জন মানবাধিকারকর্মী এবং ৩৬ জন সাবেক গেরিলা সদস্যদের হত্যা করা হয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়গুলো নিজেদের মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য কাজ করে, তাই এই সম্প্রদায়ের সাংবাদিকদের মাঠ পর্যায় রিপোর্ট করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

ককা এলাকাটি কোকেন ও গাঁজার ডিলারদের জন্য আকর্ষনীয় করিডোর। এই জায়গায় সাবেক গেরিলা সদস্য যেমন এফএআরসি, ইএলএন এবং অবৈধ কাজে সংযুক্ত আধা-সামরিক ব্যক্তিদের সাথে প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়ে থাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কর্পোরেশনগুলোর – যারা পানিবিদ্যুৎ, খনন, গাছকাটা, পশু ও চিনিকল প্রকল্পের জন্য সেখানে যান।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যোগাযোগকারীরা রয়েছেন সবচেয়ে বিপদে। এত ঝুঁকির মধ্যেও তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম তৈরি করেছে এবং স্থানীয়দের ভূমি নিষ্পত্তি, সহিংসতা এবং তাদের সংস্কৃতির বিষয়ে ক্রমাগত অবগত করছে। তবুও, এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যোগাযোগকারীরা, যারা বেশিরভাগ অবসর সময়ে ও স্থানীয় রেডিও স্টেশন ব্যবহার করে তথ্য সরবরাহ করেন, তাদেরকে সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় না, যেটা আরেক ধরনের বৈষম্য যা চোখে পড়ার মতো।

১৪৯২ সালে স্প্যানিশদের আক্রমণের পর, বৈধ ও অবৈধ উপায়ে প্রভাবশালীরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জমি দখল করার চেষ্টা করছে। ২০০৯ সালে কলম্বিয়ার সাংবিধানিক আদালত ঘোষণা দিয়েছে, এই সম্প্রদায়গুলো হত্যার শিকার, এখনো — ১২ বছর পরও তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে।

সংগ্রামের কেন্দ্রস্থল থেকে খবর জানানো

এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রিপোর্টাররা, যাদের অধিকাংশই স্বেচ্ছাসেবী; শত বিপদে এবং সামাজিক সংঘর্ষের কথা জেনেও নিজেদের ”মাতৃভূমি মুক্তির” জন্য কাজ করছেন।

ইন্ডিজেনিয়াস রিজিওনাল কাউন্সিল অব ককা (সিআরআইসি) নামের একটি সামাজিক সংস্থা; যা ককা অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সংগঠন হিসেবে পরিচিত, তাদের মতে, মাতৃভূমি মুক্তির অর্থ হল নিজেদের কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা, সম্পদ সংগ্রহ এবং পূর্বপুরুষের জমি রক্ষা- মাতৃভূমির সাথে সম্প্রীতি গড়ে তোলা। মুক্তির এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে সবাইকে জানানো স্বেচ্ছাসেবী যোগাযোগকারীদের হৃদয়ের সাথে গাঁথা, কারণ এই ভূমির সাথে জড়িত রয়েছে তাদের অস্তিত্ব।

রিনেসার কোকনুকো রেডিও স্টেশনের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যোগাযোগকারী হিসেবে পরিচিত জন মিলারের মতে, তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। তার সম্প্রদায়কে স্থানীয় সংবাদ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সচেতনমূলক খবর প্রকাশ করেন এবং এর সাথে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের খাদ্যাভাস ও সংগীত সম্পর্কেও সবাইকে জানানো যায়।

এরমধ্যে আরেকজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যোগাযোগকারী এলদিমির দাগুয়া গ্লোবাল ভয়েসেস’কে বলেছেন, ”আমরা অনেক বেশি ঝুঁকির মুখোমুখি হই, বিশেষ করে আমাদের কাজ এইসব অবৈধ কাজের নিন্দা করে এবং মিংগাস গোষ্ঠীর সাথে সমাজসেবা ও একসাথে সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করতে লোকজনকে অনুপ্রাণিত করে।” কলম্বিয়াতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা মিংগাস গোষ্ঠীর মাধ্যমে সামাজিক কারণগুলোকে সমর্থন করে।

যোগাযোগকারীদের মতে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো — বৈধ ও অবৈধ যে ব্যবসায়ী করুক, তাদের এইসব কাজ অপছন্দ করে, কারণ ওরা এই প্রদেশে যা হচ্ছে — মৃত্যু, স্থানচ্যুতি ও ভূমি অপসারণ – এইসব বহির্বিশ্বে তুলে ধরে। সুরক্ষার ভয়, অর্থ সংকট এবং অসততার কারণে মূলধারার সাংবাদিকরা এই প্রদেশে আসতে চায় না।

টটোরো প্রদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যোগাযোগকারী ইয়ামিল্ক সানচেজ মত প্রকাশ করেছেন যে, তাদের পেশা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, তারা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে। এই কারণে পুরো সম্প্রদায় থেকে তারা হুমকির শিকার। ২২ শে সেপ্টেম্বর ইলিয়া পিলকুলে নামের একজন বয়স্ক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীকে ককার জামবালোতে হত্যা করা হয়।

এমন অঞ্চল থেকে তাদের রিপোর্ট করতে হয় যেখানে তারা নিজেরাও জানে না ঘর থেকে বের হলে তাদের সাথে কি ঘটবে। মানুষের সাথে তাদের প্রতিশ্রুতি ও সততা বেশি থাকায় এসব কাজে ঝুঁকিও বেশি। নিহত হওয়ার পরও তাদের আত্মীয়রা সমস্যার সম্মুখীন হয়। যোগাযোগকারী হিসেবে তাদের স্বীকৃতি শুধু সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে নয়; তাদের খুনের বিচারের ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হয়।

ককা'র করিন্টোর একটি রেডিও স্টেশন, সিআরআইসি প্রোগাম এর সহায়তায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যোগাযোগকারীদের সাথে সংশ্লিষ্ট। ছবি: ফার্নান্দা সানচেজ জারামিলো।

ককা'র করিন্টোর একটি রেডিও স্টেশন, সিআরআইসি প্রোগাম এর সহায়তায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যোগাযোগকারীদের সাথে সংশ্লিষ্ট। ছবি: ফার্নান্দা সানচেজ জারামিলো।

সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়না

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যোগাযোগকারীরা সামাজিকভাবে বৈষম্যের শিকার হয়, যা প্রতিনিয়ত প্রকাশিত। রিপোর্টাস উইথআউট বর্ডারস-এর সাংবাদিক গ্লোবাল ভয়েসস’কে বলেছেন, ”প্রথম ঝুঁকিই হল সাংবাদিক হওয়া। যোগাযোগকারীরা যে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ এবং অধিকারের জন্য জাগ্রত, এই দেশ কখনোই এ বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করেনি। মানুষ জানে না অভ্যন্তরীণভাবে এই তথ্য সরবরাহ করার অর্থ কী এবং কাজটা বৈধ নয়। তারা নিজেরাই এরজন্য ঝুঁকির মধ্যে থাকে।”

তিনি আরও বলেন, মিডিয়ায় যারা কাজ করেন, তাদের মধ্যে ক্রমোচ্চ শ্রেণীবিভাগ আছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রিপোর্টাররা সাংবাদিকতার উপর লেখাপড়া করেনি এবং গ্রামীণ সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে সামাজিক বৈষম্য তুলে ধরাকে সাংবাদিক হিসেবে স্বীকার করা হয় না। তাই এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রিপোর্টাররা নিজেদের চেষ্টাতে ককাতে তথ্য সরবরাহের উদ্দেশ্যে নিজস্ব পন্থা বের করেছে।

কলম্বিয়ার সাংবাদিক ফেডারেশনের আইন প্রতিনিধি আদ্রিয়ানা হুর্টাডো ব্যাখ্যা করেন যে, অপরাধ তদন্তের সময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যোগাযোগকারীদের সাংবাদিক হিসেবে ধরা হয় না, যদিও তারা মাঠ পর্যায় থেকে কাজ করে কিন্তু এই সম্প্রদায়ের সদস্যরা আসলে মাতৃভূমি মুক্তির জন্য চেষ্টা করছে। এর ফলে তারা কাজের মধ্যে নিহত হলেও তাদেরকে স্থানীয় সাংবাদিক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয় না।

কলম্বিয়ার ফাউন্ডেশন ফর প্রেস ফ্রিডম সংগঠনের আইনজীবি এঞ্জেলা কারো বলেন, ”তদন্তের সময় কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের উপর আগ্রাসনের বিষয়টি মাথায় রাখে না। তদন্তে নমুনা হিসেবেও বিবেচিত হয় না বিষয়টি। এর কারণ, ককা অঞ্চলের মানুষের এই বিষয়ে কোনো সচেতনতাই নেই যে এখানে কাজ করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ।”

ককা অঞ্চল সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের রিপোর্ট করা থেকে বিরত রাখে না। সম্প্রতি সিআরআইসি-এর এক সমাবেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যোগাযোগকারীদের কাজের গুরুত্ব স্বীকার করা হয়েছে। ২০২১ সালের আগস্ট মাসের এক প্রতিবেদনে সিআরআইসি সংগঠন লিখেছে:

”ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যোগাযোগকারীরা তাদের মাতৃভূমি রক্ষায়, জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক চর্চার পুর্নজাগরণ, সংগঠনের ক্ষমতায়নে স্বচ্ছতা, সচেতনতা ও সংকল্প প্রণয়নে অবদান রাখছে। যোগাযোগ প্রক্রিয়া নিজেই একটি প্রশিক্ষণের কেন্দ্রবিন্দু, যা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আন্দোলন ও আঞ্চলিক গতিশীলতাকে শক্তিশালী করেছে।”

প্রথম প্রজন্মের এই রিপোর্টাররা পূর্বপুরুষের ঐতিহাসিক জমি সংরক্ষণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সশস্ত্র দলগুলো তাদেরকে চিনে, যা আরো ভয়ঙ্কর। ইয়ামিল্ক সানচেজ এই বিষয়ে মতামত দেন, ”তারা আমাদের তথ্য ছড়িয়ে দিতে বাঁধা দেয়; তাও আমরা সিআরআইসি-এর সাথে যুক্ত হয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যোগাযোগ রক্ষার কাজে যে কোনো প্রতিরোধ অব্যাহত রাখব।”

কলম্বিয়ার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের বিষয়ে, বিশেষ করে আদিবাসী সাংবাদিকদের লেখা পাঁচটি গল্পের মধ্যে এটি দ্বিতীয়। এই উদ্যোগটি জাস্টিস ফর জার্নালিস্টস ফাউন্ডেশন (জেএফজে) দ্বারা সমর্থিত। জেএফজে মিডিয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক অপরাধের উপরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করার জন্যে তহবিল দেয় এবং পেশাদার এবং নাগরিক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে। এই গল্পের একটি সংস্করণ স্প্যানিশ ভাষায় এল এসপেক্টাদোরেতেও প্রকাশিত হয়েছিল।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .