উহান থেকে কোভিড-১৯ দিনলিপি: নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি

Winston Chiu
Arif Innas

ইংরেজী

একটি কুকুর বাইরের পৃথিবীর দিকে চেঁচাচ্ছে। ছবির কৃতজ্ঞতা: গুও জিং। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা নারীবাদী পণ্ডিত এই জিয়াওমিং এবং নারীবাদী কর্মী গুও জিং রচিত ধারাবাহিক দিনলিপির মধ্যে নীচের পোস্টটি  অষ্টম। দুজনই কোভিড -১৯ মহামারীর কেন্দ্রস্থল উহান শহরে বসবাস করছেন এখানে ধারাবাহিকটির প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়চতুর্থ, পঞ্চম,  ষষ্ঠ এবং সপ্তম অংশের সংযোগ রয়েছে

কোভিড-১৯ এর বৈশ্বিক প্রভাব সম্পর্কে গ্লোবাল ভয়েসেসের বিশেষ কভারেজটি দেখুন।

এই কিস্তিটি ২০২০ সালের ৩ মার্চ থেকে ৫ মার্চ তারিখের মধ্যে লেখা হয়েছে। চীনা ভাষায় লেখা মূল দিনলিপিগুলি ম্যাটার নিউজে প্রকাশিত হয়েছে।

গুও জিং: ৩ মার্চ, ২০২০

জিয়ানজি এমন এক ব্যক্তি যাকে আমি সত্যিকারভাবেই শ্রদ্ধা করি। এই মহামারীর সময়ে সে অনেক স্বেচ্ছাসেবা করেছে। আমি তার সাথে তার কাজের বিষয়ে ফোনে চ্যাট করেছি।
জিয়ানজি হাসপাতালগুলিকে সরবরাহ কিনতে সাহায্য করে। লকডাউনের সময় এটি কোন সহজ কাজ নয়। চিকিৎসা সরবরাহের ঘাটতি কেবল আমাদের দেশেই নয়, অন্যান্য দেশগুলিতেও রয়েছে। বিদেশ থেকে আসা তার কিছু বন্ধু চিকিৎসা সামগ্রী কিনতে ফার্মাসিতে গিয়েছিল। এই প্রাদুর্ভাবের প্রথম পর্যায়ে চীনা কাস্টমস অফিস চিকিৎসা সরবরাহগুলি আটকে দিলে বহু বিদেশী চীনা লোকজন তাদের পরিচিতদের হাতে করে এই চিকিৎসা সরবরাহগুলি চীনে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে বলে। যারা চীনে সরবরাহগুলি ফিরিয়ে এনেছে তাদেরকে স্বেচ্ছায় উহানে নিয়ে আসার খরচ প্রদান করা হয়েছে।
একবার জিয়ানজি অতিবেগুনী আলো (ইউভি লাইট) কেনার সময় স্টোরের কর্মীরা তাদের নিজেদের পকেট থেকে আরো কিছু লাইটের দাম পরিশোধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। স্বেচ্ছাসেবকদের নেটওয়ার্কটি প্রচুর পরিমাণে সুরক্ষামূলক গাউন পায় যেগুলি সাংহাই পর্যন্ত এসে পৌঁছালেও বেশিরভাগ বিতরণকারী সংস্থা এগুলি উহানে নিয়ে আসতে রাজি হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত তারা হুবেইকে সরবরাহ অনুদানের পরিকল্পনা করা বেস্টাক্স নামে একটি সরবরাহ সংস্থার সহায়তা পেতে সক্ষম হয়।
জিয়ানজি বলেছে অনুদান সরবরাহ গ্রহণের বিষয়ে হাসপাতালগুলি খুবই সতর্ক। তারা শুধুমাত্র চিকিৎসা সরবরাহ এবং শুধু ন্যূনতম পরিমাণে সেগুলি গ্রহণ করে। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা হাসপাতালগুলি স্বেচ্ছাসেবীদেরকে অন্যান্য হাসপাতালগুলিতে সরবরাহ করার পরামর্শ দেয়। চিকিৎসকরা সাধারণত তাদেরকে খুব “বেশি পরিমাণে না কেনা”র কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই চিকিৎসকরা অন্যদের বিরক্ত করতে রাজি নয়। তারা শাকসবজি কেনার মতো যখনই সম্ভব নিজেরাই নিজেদের কাজগুলি করার চেষ্টা করতো।
একজন চিকিৎসক একবার তাকে বলেছিল, “এখানে কী চলছে সে সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। প্রথমে হাসপাতালটি আমাদের প্রয়োজনগুলির তালিকা করার পর অনুদান গ্রহণ করত। পরে নীতি পরিবর্তন হওয়ার পর তাদের অনুদান গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়নি।” কিছু চিকিৎসক একটানা দশ দিনেরও বেশি সময় ধরে কাজ করলেও তাদের একদিনও ছুটি নিতে দেওয়া হয়নি। মহামারী চলাকালীন কিছু চিকিৎসক হোটেলগুলিতে অবস্থান করলেও কেউ তাদের ঘরগুলি পর্যন্ত পরিষ্কার করে দেয়নি। হাসপাতালগুলিতে যাতায়াত করার সময় চিকিৎসকদের রাস্তা এবং হাসপাতালের চেকপয়েন্টে তাদের পরিচয়পত্রটি বেশ কয়েকবার দেখাতে হতো। এমনকি কখনো কখনো কমিউনিটির কর্মীরা তাদেরকে বাস থেকে নেমে যেতেও বলতো।
জিয়ানজি বলেছে তার ফোনটি চালু করার সাথে সাথে সে শুধু নিউমোনিয়ার তথ্যে তার ফোন ভরে যায়। তখন তার উহানকে দোজখের মতো মনে হয়েছে। মহামারীটি কখন যে শেষ হবে তা কেউ জানে না। রোগীদের সহায়তা করার পরিবর্তে মূলত চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ নিয়ে স্বেচ্ছাসেবীর কাযে ব্যস্ত থাকায় নেতিবাচক আবেগগুলি তার কাছে ভিড়তে পারেনি।
একটি মেয়ে ‘গৃহ-সহিংসতা বিরোধী প্রচারণা’ লেখা পোস্টার ঝুলাচ্ছে। গুও জিংয়ের তোলা ছবি। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

গুও জিং: ৪ মার্চ, ২০২০

ওয়ানফে হুবেই প্রদেশের জিয়ানলি কাউন্টির একজন পুলিশ সদস্য। তিনি ৩০ বছর ধরে পুলিশ। আর তাই তিনি প্রচুর গৃহ-সহিংসতার ঘটনা দেখেছেন। তিনি ভাবতেন গৃহ-সহিংসতার শিকারদের কাছে পৌঁছানো খুব কঠিন, আর তাই [২০১৪ সালে] তিনি “নিখিল জিয়ানলি নারী ও শিশু অধিকার সমিতি” নামে একটি এনজিও চালু করেন। তিনি নিখিল-চীন নারী ফেডারেশনের সাথে আন্তঃবিভাগীয় গৃহ-সহিংসতা বিরোধী কর্মকাণ্ড জোরদার করার “কোন ঘরোয়া সহিংসতা নয়” নামের একটি দাতব্য প্রকল্পেও কাজ করেছেন।
একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “আমাদের পরিসংখ্যান বলছে (এখনকার) ৯০% গৃহ-সহিংসতা এই কোভিড-১৯ মহামারী সংশ্লিষ্ট। জিয়ানলি থানা এই ফেব্রুয়ারিতে গৃহ-সহিংসতা নিয়ে ১৬২টি ফোন্ পেয়েছে, আমরা গত (বছরের) ফেব্রুয়ারিতে পেয়েছিলাম প্রায় এর তিন ভাগের একভাগ (৪৭)।  গত জানুয়ারিতে যে ফোন এসেছে তার চেয়ে এই জানুয়ারিতে ফোনের সংখ্যাও বেশি। এই সংখ্যাগুলির প্রত্যেকটি বেদনাদায়ক গল্পের প্রতিনিধিত্ব করলেও এটুকুই পুরো চিত্র নয়। পারিবারিক সহিংসতার শিকার অনেক পুলিশই যোগাযোগ করার উপায় খুঁজে পায় না।
সকালটা রৌদ্রোজ্জ্বল। আমি শুধু অল্প কিছুক্ষণের জন্যে সূর্যটাকে দেখিনি। আমি নীচে হাঁটতে গেলাম। তিনজন ভূমি ব্যবস্থাপনা কর্মী উঠোনে আড্ডা দিচ্ছিলো। কুকুরসহ এক ব্যক্তি আমার সাথে কথা বলার সময় আমাকে বলেছেন যে তিনি আমাকে প্রতিদিন বাইরে যেতে দেখেন। তার পারিবারিক নাম চৌ। আমরা একই ভবনে থাকি। তিনি দশম তলায় থাকেন। চৌ সাহেবের স্ত্রী উহান রেনমিন হাসপাতালে চাকরি করেন। লকডাউন থেকে একটানা কাজ চালিয়ে যাওয়ার পর তিনি শেষ পর্যন্ত কিছুদিন আগে কয়েকদিনের ছুটি নিতে পেরেছেন। তার স্ত্রী তাকে গত ডিসেম্বর থেকে হাসপাতালের কর্মীদের নিউমোনিয়া নিয়ে কথা বলার কথা বলেছেন। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় বহু লোক মারা গিয়েছে। তবে তাদেরকে অন্য লোকদের এই কথা জানানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি।
তার স্ত্রী টিউমার বিভাগে কাজ করেন। তার বিভাগের অনেক চিকিৎসা কর্মী ও রোগীরা সংক্রমিত হয়েছে। এখন হাসপাতাল কেবল কোভিড-১৯ গ্রহণ করে। অন্য সব বিভাগ এখন বন্ধ।
মিঃ চৌ একটি হোটেল চালান। তার হোটেলের ভাড়া আরএমবি ১ লক্ষ ১০ হাজার ইউয়ান (প্রায় ১৩ লক্ষ ২০ হাজার টাকা)। তিনি ৩০ জনেরও বেশি লোক লাগে। এখন তিনি তাদের অর্ধেক বেতন দিতে পারছেন। তিনি আর তাদের সামাজিক বীমা প্রদান করতে পারছেন না। চলতি মাসের ১৫ তারিখে তার কর্মচারীদের বেতন দিতে হওয়ায় তিনি দুঃখিত।
সাধারণত তিনি হোটেল থেকে যা আয় করেন তা তার বিভিন্ন প্রকার বিল পরিশোধেই ব্যয় হয়ে যায়। তার হোটেলের মূল উপার্জনটি তিনি আয় করে থাকেন চীনা নববর্ষের আগের এবং পরের মাস দুটিতে। এই চীনা নববর্ষের আগে তিনি তার হোটেলের জন্যে খাবার কিনতে হাজার হাজার ইউয়ান (কয়েক লক্ষ টাকার বেশি) ব্যয় করেছিলেন। তিনি এখন জানেন না তিনি এই খাবারগুলি দিয়ে কী করবেন। মিঃ চৌ আমাকে বলেছিলেন, “আমি মনে করি ৫০ থেকে ৬০% হোটেল মহামারীর পরে বন্ধ হয়ে যাবে।”

গুও জিং: ৫ মার্চ, ২০২০

হুবেই প্রদেশের জিংঝুর এক বন্ধু নগরীর সংবাদমাধ্যমে একটি উইচ্যাট নিবন্ধ প্রকাশের কথা বলেছে, যাতে ১০ মার্চের মধ্যে জিংঝুর লকডাউন তুলে নেওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই নিবন্ধটিতে কর্তৃপক্ষের উৎস” থেকে এই সংবাদটি এসেছে বলে জোর দিয়ে বলা হয়েছে।” সে বলেছে, “আমি আশা করি এটি যেন জাল সংবাদ না হয়।”
আমি এটা নিয়ে খুব উত্তেজিত ছিলাম। লকডাউন তুলে নেওয়া নিঃসন্দেহে ভাল সংবাদ। আমি নিবন্ধটির লিঙ্কের জন্যে তাকে জিজ্ঞাসা করলে সে এটা খুঁজতে খুঁজতে বলে ” লকডাউনটি উঠানোর পর আমি পার্কে বেড়াতে যেতে চাই।”অবশেষে সে জানতে পারলো যে সংবাদটি ভুয়া। তবে সরকারের ১০ কেজি শাকসবজি দেওয়ার খবরটি আসল। আমার বন্ধুটি খুব হতাশ হয়েছিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “হঠাৎ আমার মনে হচ্ছে সেই দিনটি কখনোই আসবে না।”
দলবদ্ধ কেনাকাটার ব্যবস্থা থেকে আমি যা আদেশ দিয়েছিলাম তা বিকেলেই পৌঁছে গেল। আমি ৫ বোতল লাও গান মা (একটি মশলাদার সস) কিনেছি। আদেশটি দেওয়ার সময় সত্যিই আমার এত কিছু কেনার দরকার কিনা তা নিয়ে আমি ভাবছিলাম। সিদ্ধান্তটি ছিল যৌক্তিক পছন্দ থেকে অনেক বাইরের। আমার অনেক বন্ধু আমাদের আড্ডায় বাধ্যতামূলক কিনে জমা করে রাখার একই ধরনের এসব গল্প ভাগাভাগি করেছিল। এই মহামারীটি আমাদের অনিরাপদ করে তুলেছে এবং আমরা আমাদের অজান্তেই জিনিসপত্র সংরক্ষণ করি।