বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

নেপালে মৃতপ্রায় এক ভাষায় কথা বলা সর্বশেষ নাগরিকদের একজন গেয়ানি মাইয়া সেন এর সাথে কথোপকথন

গেয়ানি মাইয়া সেন কুসুন্ডা। ছবি লেখকের।

দীর্ঘসময় ধরে সাধারণ মানুষ কুসুন্ডা ভাষা মানুষ খুবই কমই জানতো, যা নেপালের পশ্চিম এবং মধ্যাঞ্চলের কিছু এলাকার ভাষা। নেপাল পরিসংখ্যান বিভাগ পরিচালিত বেশ কয়েকটি শুমারিতে জানা গেছে পশ্চিম নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে বাস করা কুসুন্ডা জাতির জনসংখ্যা ২৭৩ জন মাত্র। কুসুন্ডা জাতির ভাষা এবং সংস্কৃতি সম্বন্ধে জানার জন্য গেয়ানি মাইয়া সেন কুসুন্ডা এর সাথে গ্লোবাল ভয়েসেস এক আলাপচারিতার আয়োজন করে; কুসুন্ডা ভাষায় অনর্গল কথা বলা যে দুজন ব্যক্তি জীবিত আছেন গেয়ানি মাইয়া সেন তাদেরই একজন।

‘জঙ্গলের রাজা’

দিনটা ছিল উষ্ণ ও আদ্র, রাস্তাঘাট জনশূন্য, এমনকি ব্যাটারি চালিত টুকটুক চালকেরাও আমাদেরকে নিতে অনিচ্ছুক। সাথে থাকা ভারী ট্রাইপড, ক্যামেরা এবং চলচ্চিত্রের যন্ত্রপাতি নিয়ে আমরা নেপালের ডাং জেলার কূলমর গ্রামের উদ্দেশ্য যাত্রা করলাম, যেখানে গেয়ানি মাইয়া সেন এর বাড়ি। বয়স তাঁর আশি অতিক্রান্ত হয়েছে। কুসুন্ডা ভাষার জীবিত যে দুজন অনর্গল কথা বলতে পারে তাদের মধ্যে তিনি একজন। ধারনা করা হচ্ছে কুসুন্ডা জাতির মোট জনসংখ্যা এখন ২৭৩ জন। আর গবেষকদের মাঠ পর্যায়ের গবেষনা প্রদর্শন করছে নেপালের ডাং, রোলপা, পিয়ুথান, আরগাখানচি এবং সুরখতে জেলায় তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

এক সময় জঙ্গলে বাস করার কারণে এখনো তাদেরকে জংলি বা জঙ্গলের বাসিন্দা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বর্তমানে তারা নামের শেষে ঠাকুরি যুক্ত করে যেমন শাহী, সেন এবং খান–নামের শেষের এই পদবীগুলো সাধারণত নেপালের শাসক গোত্রের থেকে আসা পদবী। কুসুন্ডারা নিজেদের বন রাজা বা জঙ্গলের রাজা হিসেবে দাবী করে থাকে।

কুসুন্ডা হচ্ছে এক বিচ্ছিন্ন ভাষা, যার অর্থ হচ্ছে এটি প্রধান কোন ভাষাগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত নয়। দুর্ভাগ্যবশত কুসুন্ডা তরুণ প্রজন্ম নির্ধারণ করেছে যে তারা আর এই ভাষায় কথা বলবে না-যার ফলে কুসুন্ডা জাতীর প্রবীণ নাগরিকরা যখন একে একে জগৎ থেকে বিদায় নিচ্ছে তখন এই ভাষাটির পৃথিবী মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই সম্প্রদায়ের মাঝে গেয়ানি মাইয়া ছাড়া তাঁর বোন কমলা হচ্ছে একমাত্র ব্যক্তি যারা এই ভাষায় কথা বলতে পারে।

উদয় রাজ আলেই একজন গবেষক, যিনি কুসুন্ডা ভাষার প্রতি তাঁর একাগ্রতা প্রদর্শন করেছেন, একই সাথে তিনি এই ভাষায় কথাও বলতে পারেন। তবে গেয়ানি মাইয়ার শঙ্কা তাঁর নাতনি রাকসা কোনদিন নিজের মাতৃভাষায় কথা বলবে না। যখন গেয়ানি মাইয়ার সাথে আমাদের দেখা হল, তখন তিনি তাঁর নাতনির সাথে মিলে কাঁচা আমের খোসা ছড়ানোয় ব্যস্ত ছিলেন। ভবিষ্যত সংরক্ষণের জন্য কুসুন্ডা ভাষা নিয়ে কীভাবে কাজ করা যায় সেটার আলাপচারিতার ফাঁকে আম টুকরো করে কাটা এবং শুকনোর প্রক্রিয়া নাতনিকে শেখাচ্ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত তখন তারা নেপালি ভাষায় কথা বলছিলেন।

নাতনির সঙ্গে গেয়ানি মাইয়া সেন। ছবি লেখকের।

খুর নয়, শুধু নখওয়ালা প্রাণী

যখন আমরা গেয়ানি মাইয়ার সাথে কথা বলা শুরু করলাম এবং তিনি তাঁর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্বন্ধে বলা শুরু করলেন। এমন সময় পথ হারা এক গরু গোলাঘরে প্রবেশ করল, এই অবস্থায় তিনি তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, লিসনো নামের কাঠের মইটি নীচে এবং গৃহপালিত পশুটিকে সরিয়ে দিলেন। ফিরে এসে তিনি আমাদের কুসুন্ডা খাদ্যাভাস সম্বন্ধে বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, “খুর আছে এমন প্রাণীদের কুসুন্ডারা খায় না। আর যাদের নখ আছে সে সমস্ত প্রাণীদের তারা খেতে ভালবাসে। এমনকি তারা ছাগল এবং শূকরের মত গবাদি পশুর মাংস ছুঁয়েও দেখে না। তারা কোন হরিণ মারে না, কিংবা এই সমস্ত প্রাণীর মাংস খায় না, যা প্রদর্শন করে প্রকৃতির সাথে তাদের সহাবস্থানের বিষয়টি।

তবে, তারা পাখীর মাংস খেতে ভালবাসে, রঙ্গীন পাখি তাদের অত্যন্ত পছন্দের। এছাড়াও গুইসাপ তাদের পছন্দের শিকারের তালিকায় রয়েছে। এটি তাদের কাছে এতটাই বিশেষ এক প্রাণী যে এটা কুসুন্ডাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের গুইসাপ এক অংশে পরিণত হয়েছে বিশেষ করে বিয়েতে উপহার হিসেবে এর ডিম, মাংস , পোষাক অপরিহার্য। সাথে অবশ্যই বরকে কিছু টাকা কনের পরিবারের তরফ থেকে প্রদান করা হয়। যদি তারা কোন গুইসাপ এর ডিম খুঁজে না পায়, তাহলে আগ্রহী দুই পক্ষের বিয়ের আলোচনা শুরুই হবে না। আর গুইসাপের মাংস না থাকা মানে কোন বিয়ে নয়।

The bag and the snare Image by author.

থলে এবং জালটি। ছবি লেখকের

এখনো শিকার এবং সংগ্রহক

এরপর গেয়ানি মাইয়া সেন একগুচ্ছ রশি খুললেন, জট পাকানো এই রশি সমূহ হচ্ছে এক ধরনের ফাঁদ যা জঙ্গলে বনমোরগ ধরার কাজে ব্যবহার করা হয় এবং তাদের এক বিশেষ ধরনের থলে ফাঁদে আটকা পড়া পাখী বহন করে আনার জন্য ব্যবহার করা হয়। এই ফাঁদগুলো এক ধরনের বুনো লতার রশি দিয়ে বানানো কুসুন্ডা ভাষায় যার নাম ‘আনত’ আর থলেটিকে বলা হয় ‘আমজী'। কুসুন্ডারা এই ফাঁদকে দুটি গাছের মাঝখানে বেঁধে রাখে তার আর এর কাছে লুকিয়ে থাকে। এই সময় তারা তাদের দুই ঠোঁঠের মাঝে সাইকাস পাতা পুরে ফিজেন্ট বা রঙ্গীন একদল পাখীর মত শব্দ করে। পাখিরা এই গাছের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ফাঁদে আটকা পড়ে আর কুসুন্ডারা এই সকল পাখিকে বেঁধে থলের ভিতরে পুরে বাসায় নিয়ে যায়।

যখন কুসুন্ডা ভাষার বিশেষ শব্দমালা নথিবদ্ধ করতে আমরা ব্যস্ত, তখন আমি দেখতে পেলাম এক ছোট্ট পোকা গুড়ি মেরে এগিয়ে কাঠের গর্তের দিকে যাচ্ছে, যা মৌমাছিও নয় আবার মাছিও নয়। গেয়ানি মাইয়ার কথা আনুযায়ী তারা এটিকে বলে পুটকা এবং তারা মধুর মত উপাদান চেটে থাকে।

সবশেষে, গেয়ানি মাইয়া তার শস্যখেত আমাদের দেখালেন । তিনি এর প্রতিটি অংশে মিষ্টি আলুর গাছ লাগিয়ে রেখেছেন, একটা ছোট্ট কোদাল এর সাহায্যে তিনি কয়েকটি আলু মাটি থেকে তুলে আনলেন এবং সেগুলোকে আমাজিতে রাখলেন। ৮০ বছর বয়স্ক গেয়ানি মাইয়া এখন অনেক শক্ত সমর্থ। আর সর্বোপরি তার রাজকীয় কন্ঠস্বর প্রদান সাক্ষ্য প্রদান করছে যে পরিমণ্ডলে তিনি বাস করতেন সেখানে তিনি ছিলেন জঙ্গলের রানীর মতই শক্তিশালী একজন।

পুটকা, ছবি লেখকের।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .