বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ অনুমোদন, তবে আইনের বিশেষ বিধান নিয়ে বিতর্ক

বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি নারী, যাদের বয়স ২০ থেকে ২৪-এর মাঝামাঝি, তারা ১৮তম জন্মদিন পালনের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন।

বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি নারী, যাদের বয়স ২০ থেকে ২৪-এর মাঝামাঝি, তারা ১৮তম জন্মদিন পালনের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। ছবি স্যাম নাসিমের ফ্লিকার অ্যাকাউন্ট থেকে নেয়া, সিসি লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত ।

গত ২৪ নভেম্বর ২০১৬-এ বাংলাদেশের সরকার বিয়ের জন্য মেয়েদের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর বয়স হওয়ার শর্ত রেখে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন’ অনুমোদন দিয়েছে। বাল্যবিবাহ কমানোর জন্যে এই আইনে কঠিন সাজা অর্থাৎ জেল ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে এবং সাজার পরিমাণ এর সাথে জড়িত থাকার পরিমাণের উপর নির্ভর করে।

তবে বিশেষ প্রেক্ষাপটে আদালতের নির্দেশ নিয়ে এবং মা-বাবার সমর্থনে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদেরও বিয়ের সুযোগ রাখা আছে এ আইনে এবং বলা হচ্ছে যে এটা মেয়েদের সম্মান বাঁচাবে।

দেশটিতে ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ মেয়েদের বিয়ের বয়সে ছাড়ের সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে এতে ধর্ষণ ও বাল্যবিবাহের মাত্রা বাড়বে।

উল্লেখ্য,বাল্যবিবাহ বিশ্বব্যাপী একটি সমস্যা এবং বাল্যবিবাহের প্রচলন আছে এমন ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যদিও বাংলাদেশে আইন করে বিবাহের বয়স নির্ধারণ করা আছে এইতো এক দশক আগেই অধিকাংশ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছরের আগে হতো। বর্তমানে এর সংখ্যা কিছুটা কমেছে কারণ লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। বাল্যবিবাহের মূলে রয়েছে দারিদ্র্যতা, নারীদের নিরাপত্তা এবং অশিক্ষা, যা নারীকে স্বাবলম্বী হতে দেয় না। বাল্যবিবাহের শিকার নারীরা অসুস্থতায় ভুগে এবং দাম্পত্য সহিংসতার শিকার হয়।

এই আইনগত ফাঁকের কারণে বাল্যবিবাহ আয়োজন করা সহজ হবে।

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সমালোচনার প্রেক্ষিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বক্তব্য রেখেছেন। সেখানে তিনি দেশের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেই এটা করা হয়েছে জানিয়ে বলেন:

বাস্তবতাকে বিবেচনা নিয়েই বাল্যবিবাহ আইনটি করছি। গ্রামের পারিবারিক মূল্যবোধ ও সমস্যা সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। যে কারণে তাঁদের অনেক বড় বড় কথা। এঁরা রাজধানীতে বসবাস করেন। রাজধানীর পরিবেশটাই তাঁরা দেখেন।

আমরা ১৮ বছর পর্যন্ত বিয়ের বয়স নির্ধারণ করে দিয়েছি। কিন্তু একটি মেয়ে যদি… যে কোনো কারণে ১২-১৩ বা ১৪-১৫ বছরের সময়ে গর্ভবতী হয়ে যায়- তাকে গর্ভপাত করানো গেল না। তাহলে যে শিশুটি জন্ম নেবে তার অবস্থান কী হবে? তাকে কী সমাজ গ্রহণ করবে?

বাংলাদেশে বিয়ের আগে যৌনমিলন ও গর্ভবতী হওয়াকে খুব খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হয়।

এদিকে একজন “অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের স্বার্থ বিবেচনায়” ব্যাপারটি কী আসলে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্লগার, কবি আশরাফ মাহমুদ। তিনি এই আইনের মাধ্যমে নারী অধিকার এবং নারীর আত্মমর্যাদাকে অপমান করা হচ্ছে বলে ফেইসবুকের এক পোস্টে উল্লেখ করেছেন:

অভিভাবকের সম্মতি”তে যখন মেয়েটির বয়স ১৮ বছরের আগেই বিয়ের ব্যবস্থা রাখা হয় তখন আপনি বা আপনারা খেয়াল রাখেন না যে আমাদের দেশে অধিকাংশ অভিভাবকরা এই মনোভাব রাখেন যে মেয়ের বিয়ে দিতে পারা এক ধরণের দায় মেটানো, অধিকাংশ মেয়েদের বিয়ে হয় পরিবার ও অভিভাবকের চাপে, নিজ অসম্মতিতে; সেই অভিভাবক ও পরিবারের উপর সিদ্ধান্তের আইনী বৈধতা দিয়ে আপনি বা আপনারা মেয়েদের আত্মসম্মানবোধ ও নারী-অধিকারকে অপমান করছেন।

তুহিন দাস লিখেছেন:

এখনো পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মাঝে কন্যাশিশুর পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান সব দেশের নিচে, বাল্যবিবাহ আইন সংশোধন সে পরিস্থিতি ও সুযোগ আরো সংকোচন করে তলানিতে নিয়ে আসবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে (যেমন ধর্ষণের কারণে গর্ভধারণ) বাবা-মায়ের অনুমতি থাকলে ১৪ বছরের মেয়েকেও বিয়ে দেয়া যাবে। [..] অর্ধ-বিকৃত সমাজের চাপের কাছে মাথা নত করে ধর্ষককে বিয়ে করতে বাধ্য হবে কন্যাশিশুরা।

সাংবাদিক ইশতিয়াক রেজা বিশেষ বিধানে বিশেষ সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করে লিখেছেন:

দেশ জুড়ে মেয়েদের ওপর বেড়ে চলা যৌন-হিংসার জেরে, সর্বত্র মেয়েদের, বিশেষত অল্পবয়সি মেয়েদের, পথেঘাটে বেরোনোর আত্মবিশ্বাসে অনেকটাই ফাটল ধরেছে। প্রশ্ন হল, নতুন আইন এলে ইভ টিজিং-এর শিকার মেয়েদের দ্রুত বিয়ের আয়োজন করবেন বাবা-মা’রা এবং তারা ব্যবহার করবে এই বিশেষ বিধান। যখন প্রয়োজন নিরাপত্তার অভাবে ভুগতে-থাকা মেয়েদের মনে সাহস জোগানো, তখন যদি এমনটা ঘটে তাহলে লিঙ্গ-ন্যায্যতা কতটা নিশ্চিত করা যাবে?

তবে প্রধানমন্ত্রী’র বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন অনেকে। এদের একজন আশা নাজনীন। এই আইন কীভাবে নারীকে সুরক্ষা দিবে, সেটা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন:

বাংলাদেশে বিয়ের আগে এক মেয়ে প্রেগন্যান্ট হইছে, আপনি তারে ঘরে জায়গা দিবেন?
দিবেন না|
তার বাচ্চারে ‘জারজ’ না বইল্যা কাছে ডেকে আদর করবেন?
করবেন না|
অতএব, ১৮ বছরের আগে বিয়ে করা যাবে না, এইসব এনজিও মার্কা বুলি আপনার আমার বেলায় খাটে|
কিন্তু, গ্রামের খুব সাধারণ খেটে খাওয়া পরিবার যখন ‘মেয়ে’ কে নিয়ে বিপদে পড়ে, মোল্লারা দোররা নিয়ে ধেয়ে আসে, তখন আপনি আমি কেউ যাব না- ওই মেয়েকে কিংবা তার পরিবারকে উদ্ধার করতে|
এই আইন তখন ভুক্তভোগী পরিবারকে সুরক্ষা দেবে|

কামরুজ্জামান কামরুলও সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন করে লিখেছেন:

ঢাকা বসে থেকে গ্রামের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। সুশীল সমাজ বাল্যবিবাহ দেখতে পেলেও কেনো বাল্যবিবাহ হয় তা খুঁজে দেখতে নারাজ। মানুষের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন হলে, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে, শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলে এমনিতেই বাল্যবিবাহের হার কমে আসবে। সেজন্য সময় দরকার। ছেলেদের ২১ আর মেয়েদের ১৮ ঠিক রেখে প্রয়োজনের তাগিদে এই শর্ত শিথিল করে নতুন যে বাল্য বিবাহ আইন করা হয়েছে তা সময়োপযোগী।

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের পরিস্থিতির চিত্র

২০১৪ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত গার্ল সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ১৮ বছরের নিচে বাল্যবিবাহ বন্ধের ব্যবস্থা করবেন।

বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০০৭ এর তথ্যমতে, দেশে নারীর বিয়ের গড় বয়স ১৫ বছর তিন মাস। ২০ বছর হতে ২৪ বছর বয়সের নারীদের মধ্যে যাদের ১৮ বছরের মধ্যে প্রথম বিয়ে হয় তাদের শতকরা হার ৬৬ শতাংশ। যা ২০০৪ সালে ছিল ৬৮ শতাংশ।

সামাজিক কারণে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। অশিক্ষা ও অসচেতনতার কারণে অভিভাবকরা কন্যা সন্তানকে বোঝা মনে করেন। তারা মনে করেন কন্যা সন্তান ভবিষ্যতে তাদের কোনও কাজে তো আসবেই না বরং বিয়ে দিতে গিয়ে বাড়তি খরচ যেমন যৌতুকসহ নানারকম ঝামেলায় পড়তে হবে। ফলে বাবা-মা অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়াটাকেই যুক্তির কাজ মনে করেন।

এদিকে বিআইটিএ-এর একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবকরাই সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দেয়।

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার উপর করা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি:

বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নারীর অধিকারও৷ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ লৈঙ্গিক সমতা অর্জন করেছে৷ মাতৃমৃত্যু ২০০১ সালের তুলনায় ২০১০ সালে ৪০ ভাগ কমে এসেছে৷ এতসব সাফল্য থাকা সত্ত্বেও বাল্যবিবাহের হার এতো কেন সেটা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .